বড় খেলা টেস্ট ক্রিকেট, বড় দল হয়ে উঠার স্বপ্ন এবং আমরা

“বাংলাদেশের হোম সাকসেসগুলি দেখে বিভ্রান্ত হবেন না । বাইরে এসে ম্যাচ জিততে শুরু করুক , তখন আমি বুঝবো ওদের উন্নতি হয়েছে …” কয়েকদিন আগে ভারতের সাথে আমরা ওয়ানডে সিরিজ জিতে যাবার পরে নাক উঁচু ব্রিটিশ ক্রিকেট পন্ডিত জেফ্রি বয়কট এটা বলে ফেলেন । সাথে সাথে কথাটা শোনার পরে খাঁটি বাংলাদেশী হিসেবে খারাপ লাগার মাত্রাটা আর কারো চাইতে আমার কম ছিলো না । কিন্তু একটু ভেবে দেখলে আপনার মনে হবে কথাটার একটা সাইড ভুল হলেও ক্রিকেটের মনোযোগী ছাত্র হিসেবে আরেকটা সাইডের সত্যতা আপনি একদম ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারেন না । একটু ভেতরে যাই কথার ।

215853

ভারতের সাথে সিরিজ জয় আসলেই আমাদের শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছে । এর কিছু কারণ আছে আমি বলবো । প্রথমত, ওদের আর আমাদের শক্তিমত্তার জায়গা আসলে হিস্ট্রিকালি একই রকম । সাবকিন্টিনেন্টের বাইরে গিয়ে আমরা একইভাবে সাফার করি । অতীত ঘাটলে এটাও দেখা যাবে , ওদের তুলনায় আমাদের ব্যাটসম্যানের সাপ্লাই সবসময়ই কম ছিলো । সেখানে আমরা ওদের মেরে দিলাম কীসে ? চার পেইসার খেলিয়ে । এখানে আসলেই আপনার সন্তুষ্টির জায়গা আছে । এমনকি ক্রিকেটের মনোযোগী স্টুডেন্ট হলেও । মোস্তাফিজের সামনে ওদের মুখ থুবড়ে পড়া আসলে কি দেখাচ্ছে ? আমরা আমাদের অপনেন্টের দুর্বলতাকে কাজে লাগানো শিখে গেছি । এবং তার চাইতে বড় কথা, আমাদের রিসোর্স ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে বলেই আমরা আগের চাইতে ভালোভাবে স্ট্র্যাটেজিক পজিশন নিতে পারছি । “আমরা আমাদের প্রতিপক্ষের খারাপ দিনের অপেক্ষা করে আমাদের স্বাভাবিক খেলা খেলে যাবো”- সেই মুখস্থ জায়গায় আর নেই । প্রতিপক্ষের খারাপ দিন নিজেরা প্ল্যান করে নিজেদের রিসোর্স দিয়ে নিয়ে আসতে পারছি ।

Tamim-Soumya

তারপরে আসি দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের কথায় । কি হলো ? ভারতের সাথে যেখান থেকে শেষ করা হয়েছিল, সেখান থেকে শুরুটা আসলে করা গেলো না । প্রথম ওয়ানডে আর ২টা টি২০ সহ ৩টে খেলায় হারতে হলো । প্রথমত , ঐ সিচুয়েশন থেকে ফিরে এসে শরীরী ভাষায় মাঠে পরিবর্তন দেখানোই বড় চ্যালেঞ্জ । সেটা বাংলাদেশ করে দেখালো দারুনভাবে । আর মাঠের আসল খেলাটায় অলআউট খেলে হারিয়ে দিলো দক্ষিণ আফ্রিকাকে । যখন পেসারে কাজ হচ্ছে না , নাসির এসে নিজের চ্যানেল বুঝে বল করে দারুন সব ব্রেকথ্রু দিয়েছে । আবার যখন নাসির-সাকিবে ওরা একটু থিতু হয়ে গেছে তখন ম্যাশ মুস্তাফিজের কাটার এনে ওদের পাঁতে তুলে দিয়ে ক্রিজে প্রোটিয়াদের জীবনটাকে দুর্বিষহ করে দিয়েছে । সাইকোলোজিকালি দল তার এমন রূপ দেখিয়েছে যা আগে কেউ দেখে নি । আর কৌশলগতভাবে নিজেদের প্ল্যানগুলো এমনভাবে বাস্তবায়ন করেছে , যা আগে কখনো হয় নি ।

তবে আসলেই ভেবে দেখবার সময় এসেছে, বছর খানেক আগে মুশফিকের ওয়ানডে দলটা যে ধুঁকছিলো, আসলে কেন ধুঁকছিলো ? আগেই বলে নেই , ওয়ানডে দারুন ক্যালকুলেটিভ খেলা । আপনি এখানে আপনার মেন্যুর সাথে ভালো দুটো আইটেম জুড়ে দিলেই আপনার অপনেন্টের মেন্যুর চাইতে আপনার মেন্যু তাদেরকে আউটক্লাস করে দিতে পারঙ্গম ।
তা বাংলাদেশ আসলে কী দিয়ে আউটক্লাস করার কাজটা করে দেখালো ?

373464-mashrafe-mortaza-odi-clbb-7

অবশ্যই মাশরাফির গেম রিডিং এর ক্ষমতা সবার আগে থাকবে । ডেথ ওভারের বোলিং মানে আপনার কাছে কী? জায়গায় বল ফেলে তোমার অপনেন্টকে কম রান নিতে বাধ্য কর । মাশরাফিকে কখনোই রান বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করতে দেখি নি । বরং ক্যাচিং পজিশনে ফিল্ডার বাড়িয়ে উইকেট নেবার পিছে ছুটতে দেখেছি । ফিলোসোফি নরমাল । ব্যাটিং এর টেইল বেরিয়ে গেলে রান কমবে আপনাআপনি । ভারতের সাথে সেই ম্যাচটার কথাই ভাবুন । রায়না আস্তে আস্তে সেট হচ্ছিল । একটা বড়সড় ছক্কাও মেরে দিলো । মাঠে আপনি আমি হলেই বা কি করতাম ? বাউন্ডারি লাইনে সবচেয়ে ভালো ফিল্ডারগুলো পাঠিয়ে বাউন্ডারি বাঁচানোর চেষ্টা করতাম । কিন্তু মাশরাফি কি করলেন ? মুস্তাফিজকে আনলেন । যাকে ভারত কোনদিনই খেলে নি । আর তার তূণের কাটার আর স্লোয়ারগুলো কতোটা মারাত্নক সেটা মুস্তাফিজ ঐদিনই সেট রোহিত শর্মাকে আউট করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন । এবং কাটারগুলোই কিস্তিমাত করে দিলো ।

215863

এরপরে আগের চাইতে বেটার ফিল্ডিং এর কথা বলবো । ইউনিট হিসেবে বাংলাদেশ ফিল্ডিং এ এখনো ভালো জায়গায় যেতে পারে নি । এটা অস্বীকার করার কারণ নেই । তবে নাসির আর সাব্বিরের মত ফিল্ডার সবচেয়ে ভালো ক্যাচিং পজিশনে থাকলে হাফ চান্সগুলোয় উইকেট এসে দলকে চার্জড আপ রাখতে পারে সবসময়ই । রাহানের হাফ চান্সটাকে নাসির ওভাবে উড়ে না লুফে ফেললে একটা জুটি জমে যেত না তার গ্যারান্টি কে দিতে পারে । কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে ম্যাচটায় সাব্বির মিলারের ক্যাচটা নিয়ে বৃষ্টির পরে প্রোটিয়াদের যে ধাক্কাটা দিলো এগুলো তো আসলে বিচ্ছিন্ন উন্নতিতই ফসল । তবে ওভার অল টীম হিসেবে আমাদের ফিল্ডিং এর স্কেল এখনো সিক্স আউট অফ টেনই রয়ে গেছে ।

216965

আর অন্য কে কী বলবে আমি জানি না । তবে আমার কাছে টপ অর্ডারে একজন সৌম্য সরকার দলের মনোভাব বদলে দিয়েছে । সে তামিমকে তার খেলা খেলতে দিচ্ছে- এই কথা তো আগে অনেকবার বলা হয়েছে । কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা, সে ১৬০/১৭০ রানের চেইজগুলো ট্রিকি হবার সুযোগ দিচ্ছে না । দুই বলে দুটো চার মারলেই ফিল্ডিং সাইডের ক্যাপ্টেন বাউন্ডারি থেকে একটা ফিল্ডার সরিয়ে সামনে আনার আগে দুইবার ভাবে । সৌম্য স্রেফ এই গেইমটাই খুব ভালোভাবে খেলেছে । একসময় ভিতোরিও আমাদেরকে সারা সিরিজ সাফার করাত । আর এখন ? রাবাদাকে ঠিক একই সিরিজে তিন বলে তিন বাউন্ডারি মেরে সৌম্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন, That was an accident Kid … That was an accident…

আমরা আগের চেয়ে বেশি জিরো সিচুয়েশনে উইকেট নিতে পারি,
আমরা আগের চেয়ে বেশি ইনার সার্কেলে ভালো ভালো ক্যাচ নিতে পারি, তাই
আমরা আগের চেয়ে বেশি বেশি থিতু হওয়া পার্টনারশিপ ভেঙে দিতে পারি ,
আমরা আগের চেয়ে বেশি ফার্স্ট পাওয়ারপ্লেতে মেরে রান রেটটাকে বুস্ট আপ করতে পারি

CRICKET-BAN-RSA

এই কয়েকটা জিনিস আগের চাইতে বেশি নিয়ে মাশরাফির হাতে থাকা মেন্যুটায় এখন বিচিত্রতা অনেক বেশি । এই কয়েকটা জায়গা জুড়ে দিয়ে মাশরাফির মেন্যুটা এখন আগের চাইতে অনেক বেশি অননুমেয় । ক্যালকুলেটিভ ওয়ানডে গেইমে বাংলাদেশ টীমের টোটাল হিসেব করে দেখা যাচ্ছে টীমটার আউটপুট আগের চাইতে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে ।

তবে খেলাটার আরেকটা ভার্সন আছে । টেস্ট ক্রিকেট । আসল ক্রিকেট । যেই খেলায় উন্নতিটা আসলে আপনার দীর্ঘদিনের উন্নতির সূচক বহন করে । সেই খেলাটা কি আসলে এতোটা ক্যালকুলেটিভ ? সেই খেলায় কি একটা দুইটা জায়গায় বদলে দিয়ে ক্যালকুলেটরে অনেক বেশি রেজাল্ট দেখানো যায় ? এটাও খতিয়ে দেখার আছে অনেক দিক দিয়ে ।

…………………………………………………………………………………..…(চলবে )

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

18 + fourteen =