তারায় ভরা কোপা ! রোমাঞ্চে ভরা কোপা !

দুটো ২০০৪ সালের গল্প দিয়ে শুরু করবো ।
প্রথম গল্পটা রিকার্ডোর । রিকার্ডো বলতেই রিকার্ডো কাকা ভেবে নেবেন না । এই রিকার্ডোর পুরো নাম রিকার্ডো আইজ্যাকসন দস সান্তোস লেইতে নয় । এই রিকার্ডোর পুরো নাম রিকার্ডো আলেক্সান্দ্রে মার্টিন সরেস পেরেইরা । আর তার চাইতে আরো দরকারি কথা হলো এই রিকার্ডো ব্রাজিলের না । আসলে এই রিকার্ডো ল্যাটিন আমেরিকারই না । তবে এই ভদ্রলোকও পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় । পর্তুগিজ । এবং তিনি একজন গোলকিপার । এই ভদ্রলোকের নাম নেয়ার কারণ হচ্ছে আমার একদম স্কুলের দিনগুলিতে (যখন আমার কাছে ক্লাব ফুটবল নামে কিছুই ছিলো না ) ফুটবল নিয়ে গড়ে উঠা আবেগের একটা ভালো অংশজুড়ে এই রিকার্ডোর বীরত্বগাঁথা জড়িয়ে আছে । ২০০৪ এর পর্তুগাল ইউরোর কোয়ার্টারে ইংল্যান্ড-পর্তুগাল ম্যাচের ম্যাচ রিপোর্টে যখন ট্রাইবেকারে রিকার্ডোর গ্লাভস খুলে খালি হাতে পেনাল্টি সেইভ করে আবার তারপরে গোলকিপার হয়েও নিজে গিয়ে ট্রাইবেকারে একটি সফল শট নিয়ে শ্যুটআউটে দলকে ফাইনালে উঠাবার রোমাঞ্চকর গল্প পড়ছিলাম পরের দিনের পেপারে, তখন থেকেই আসলে ফুটবল নামের খেলাটার প্রতিই অন্যরকম ভালোবাসা জন্মে যায় ।

ricardo-1412612691

২য় স্টোরিও শ্যুট আউটের । ট্রাইবেকার যাকে বলে আর কি বেশির ভাগ লোক ! আবারো ২০০৪ ! আবারো মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট ! তবে এবার কোপা আমেরিকা । ব্রাজিলকে সেই কোপায় দেখেছিলাম ট্রফি জিততে । তবে সাথে অনেকটা ভাগ্যের পরশ পেয়ে । সেবার ব্রাজিল কোপা জেতে সেমিফাইনালে উরুগুয়ে আর ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে শ্যুট আউটে হারিয়ে । একদম এখনকার ইকুয়েশনে আসবো এবার । আবেগ সরিয়ে বলুন তো , ফুটবলদুনিয়ায় কাপ ফরম্যাটের টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে সবচাইতে ভালো কোয়ালিটির ফুটবল কোন টুর্নামেন্টে হয় ?

আমার আশপাশ আর একদম নিজের মতামত থেকেই বলছি , আমার তালিকাটা হবে এমনঃ
১) ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
২) ইউরো কাপ
৩) বিশ্বকাপ

আগেই বলেছি, আবেগ আর হাইপ দিয়ে বিচার করবেন না । ওভাবে গেলে ফিফা বিশ্বকাপের চাইতে বড় কিছুই নেই। তবে আজকে লিখতে বসার উদ্দেশ্য এই ফিফা বিশ্বকাপ আর ইউসিএলের গ্রেটনেস নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করা না । সামনে যেটা আসছে সেটা নিয়ে কথা বলি । সামনে যেটা পাচ্ছি , সেটার মহত্ত্ব নিয়ে কথা বলি । কোপা আমেরিকা !

copa_america_2015_logo_colors

কোপা আমেরিকার নামে অপবাদ আছে । প্রথম অপবাদ, দুই দুলের টুর্নামেন্ট হবার অপবাদ । ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি, স্পেইন, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস তো আছেই, তার সাথে ডেনমার্ক, সুইডেন, গ্রিসের মতোরাও কাগজে কলমে পিছিয়ে থাকে না ইউরোতে । সাথে সাথে দেখা যায় , বড় দলগুলোর কেউ কেউ মাঝে মাঝে কোয়ালিফাই করতেই পারে না । আর সে অর্থে কোপা আমেরিকা মানে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার টুর্নামেন্ট । পেলের দলের টুর্নামেন্ট আর ম্যারাডোনার দলের টুর্নামেন্ট ! তবে ২০১১ সালের কোপা সে অপবাদকে নিভিয়ে দেবার ঘরে একটুখানি উঁকি মেরেছিলো । উরুগুয়ে মাঝে একটা বন্ধ্যা জেনারেশন পার করে লুইস সুয়ারেজ আর ফোরলানদের পেয়ে বিশ্বকাপেই ‘আমরা আবারও আসছি’ ডাক দিয়ে রেখেছিলো । কলম্বিয়া ৯০ এর দশকের সোনালি প্রজন্মকে আঁকড়ে ধরে না থেকে ফ্যালকাওদের উত্থানে খুঁজে ফিরছিলো আরেকটা সোনালি প্রজন্মকে । আর মেক্সিকো, চিলি , ইকুয়েডর তো থেকে থেকে সবসময়ই ভালো । এদের মধ্যে মেক্সিকোকে আমি বলবো বড় দলগুলোর জন্যে “খতরনাঁক” দল । টানা দুটো বিশ্বকাপের নক আউট রাউন্ডে আর্জেন্টিনাকে কেমন মজা দিয়েছিলো সেটা তো বেশ করে মনে থাকবে ।

Brazil-v-Chile-penalties

আর ২০১১ এর কোপার রেজাল্টটাও দেখুন … ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা দৌঁড়ে কোয়ার্টারেই হাঁপিয়ে পড়লো । এত সুন্দর সবাই ফিকচার পেয়েই ওদের ফাইনালে উঠিয়ে বসে রইলো । আর ওরা ? সামনে এগোনোর রাস্তা করে দিলো উরুগুয়ে আর প্যারাগুয়েকে । আর সবার সাথে কোপায় থাকছে সেই দুই উরুগুয়ে আর প্যারাগুয়েও ! তবে এই চারবছরে ফুটবলের এই ক্রমেই ফুলেফেপে উঠা দুনিয়ায় বদলে গেছে অনেক কিছুই !
তবে ২০১১ থেকে ২০১৫ – মাঝের এই সময়টাতে কলম্বিয়া যে সোনালি প্রজন্মকে খুঁজে ফিরছিলো , সেটাকে তারা মনে হয় পেয়েই গেছে । ইউরোপের সকারের খোঁজখবর রাখলে স্কোয়াডের দিকে তাকালে আপনি সিল মেরে দেবেন কোপা আমেরিকা এখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বাইরে কলম্বিয়ারও টুর্নামেন্ট । হুয়ান কুয়াদ্রাদো-কার্লোস বাক্কা-পাবলো আর্মেরো-জ্যাকসন মার্টিনেজ-জাপাতা আর সাথে গোলকিপার অসপিনা সবাই পরিচিত নাম । আর সাথে এসে গেছে রাদামেল ফ্যালকাও এর চাইতেও বড় এক সুপারস্টার ! বিশ্বকাপের সোনার জুতা জয়ী হামেস রদ্রিগেজ ! কোপার দাবিদার ওরাও ! সাথে বিশ্বস্ত গুরু হোসে পেকারম্যান ।

1369832359_extras_noticia_foton_7_1

হোসে পেকারম্যান দিয়ে কলম্বিয়ার স্টোরি বলা শেষ করলেও চিলির গল্পটা শুরুই করবো তাদের কোচ হোর্হে সামপাওলির নাম দিয়ে । বিশ্বকাপের সময়ে জোয়াকিম লো টুর্নামেন্ট গড়ানোর সাথে সাথে মুগ্ধ করেছেন , সাবেয়া তার দলের ভাঙা ডিফেন্সকে গড়ে দিয়ে স্যালুট কামিয়েছেন , তবে ডাগ আউটে সামপাওলির মত প্যাশন দেখিয়েছে কতজন ?প্রতিপক্ষ হিসেবে চিলির সবচাইতে খারাপ দিক হলো ওরা জায়গা অনেক কম ছাড়ে আর এই সামপাওলি এই দলটাকেও ল্যাটিন ঘরানার বাইরে থেকে এনে দিনকে দিন প্রয়োগবাদী ফুটবলের সিরাপটাকে একটু একটু করে বেশ ভালোভাবেই গেলাচ্ছেন । পোস্টের নিচে ক্লদিও ব্রাভো আর মাঠে সানচেজ আর ভিদালের মত স্টাররা ভারি করছে স্কোয়াড , সাথে সাথে টুর্নামেন্টের হোস্টও তারা , কোচের কথা তো বললামই – চিলিকে বাইরে রেখে হিসেব করে সাধ্যি কার ? মনে রাখবেন , এরা ব্রাজিলকে খোদ তাদেরই মাটিতে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডেই একদম শ্যুট আউট পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলো , এরাই দুঙ্গাকে ২য় মেয়াদে ৮টা ফ্রেন্ডলিতে এখনোতক সবচাইতে কঠিন চ্যালেঞ্জ উপহার দিয়েছে ।

vidal-alexis_sanchez

বাকি থাকলো উরুগুয়ে আর মেক্সিকো । মেক্সিকো ওদের সেরা দলটা কোপায় পাঠাচ্ছে না । ওরা নিজেদের মহাদেশের টুর্নামেন্ট কনকাকাফ গোল্ডকাপটাকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বেশি । চিচারিতো আর জিওভানি দস সান্তোসের মত নামি তারকাদের বাইরে রেখে দল করেছে মেক্সিকো যেটার মধ্যে তারকা বলতে এখনো সেই বুড়ো রাফায়েল মার্কেজ। সেদিক থেকে মেক্সিকো অন্তত কোপার ঝাঁজ একটু হলেও কমিয়ে দিলো ।

giovani-chicharito-guardado

এ বছর মার্চে ১১২ ম্যাচে ৩৬ আন্তর্জাতিক গোল নিয়ে দিয়াগো ফোরলান আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটালেন । আর সাথে মাথায় রাখুন লুইস সুয়ারেজের ব্যানের বিষয়টা । উরুগুয়েকে আমি ২০১০ এর বিশ্বকাপ বা ২০১১ এর কোপার উরুগুয়ের মতো ভয়ঙ্কর বলবো না । তবে মেন্টর অস্কার তাবারেজ তো আছেন , আর আছেন ফ্রেঞ্চ চ্যাম্পিয়ন কাভানি । তবে গোদিনের নেতৃত্বে উরুগুয়ের ডিফেন্স তো আছে , আর সাথে বুড়ো তাবারেজ এ দলটা নিয়ে আছেন অনেকদিন ধরে । সে হিসেবে এ দলটার শক্তি আর দুর্বলতা তার চাইতে ভালো আর কে জানেন? তাই অস্কার তাবারেজের নামের আগে আমি কোচ ব্যবহার না করে মেন্টর শব্দটা ব্যবহার করেই বেশি মজা পেয়েছি ।

1497058_w2

মেক্সিকো পাঠাক ছোট দল , সুয়ারেজ ছাড়া হোক কোপা আমেরিকা একটু তারকাশূন্য , কিন্তু দিনের শেষে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা নাম দুটো মানেই মাদকতা ! ল্যাটিন আমেরিকা মানেই রোমাঞ্চ । মেসি আর নেইমারের হাতে সেই মাদকতার ঝান্ডা ! জাতীয় দলের মেসি অমর হয়ে উঠতে পারেন নিজের সিনিয়র ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনাকে প্রথম কোন ট্রফি জিতিয়ে ! নেইমারও শেষ হাসি হেসে বলতে পারেন, “শেষটা এখানেই নয়…” পিছে পিছে মিছিল করে আসছে সানচেজ আর হামেস রদ্রিগেজও ! এবারের কোপা তারকাবিহীন নয় ! ফিফা র‍্যাংকিং এ প্রথম ২০ দলের ৫টাই কোপা খেলছে । এবারের কোপাকে বড় দলবিহীন বলবেন না !

NeymarMessi

আগেই বলেছি, ২০১১ সালের কোপা সে অপবাদকে নিভিয়ে দেবার ঘরে একটুখানি উঁকি মেরেছিলো । এখন বলছি, ২০১৫ সালের কোপা সেই দুই দলের অপবাদ ঘোচানোর ঘরে ঢুকে প্রথমবারের মত স্থায়ীভাবে বাস করার কোপা আমেরিকা ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

2 × five =