বার্সেলোনা ছাড়ার মঞ্চ প্রস্তুত : পিএসজি যাচ্ছেন নেইমার

বেশ কিছুদিন ধরেই ঢাক ঢাক গুড় গুড় শোনা যাচ্ছিল। বার্সেলোনার বিখ্যাত এমএসএন ত্রয়ীর ‘এন’ – অর্থাৎ নেইমার বার্সেলোনা ছাড়তে পারেন। প্রথমে বিষয়টাকে কেউই অত গুরুত্ব দেননি, কেননা নেইমারকে কিনতে হলে অবশ্যই তাঁর বাইআউট ক্লজের সম্পূর্ণ টাকা অর্থাৎ ২২২ মিলিয়ন ইউরো বার্সেলোনাকে দিয়েই তারপর কিনতে হবে, এর আগে নয়। পিএসজি ক্লাবটা যতই টাকার কুমির হোক, এত টাকা তারা একটা খেলোয়াড়ের পিছে খরচ করবে, তারা কি, যেকোন ক্লাব খরচ করবে, সেটা কারোরই প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু এই মৌসুমটাকে ভাবা হচ্ছে দলবদলের ক্ষেত্রে সব সম্ভবের মৌসুম। এখানে রোমালু লুকাকুর দাম ওঠে ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড, কাইল ওয়াকাররা বিক্রি হন ৫১ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে, তাই নেইমারের দাম ২২২ মিলিয়ন ইউরো উঠতেই পারে! আর সেই অসম্ভবটাকেই সম্ভব করছে পিএসজি। বার্সেলোনায় থাকলে লিওনেল মেসির ছায়াতলেই থাকতে হবে সারাজীবন, কখনো নিজেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করার জন্য সেই মঞ্চটা পাবেননা, কেননা সেই লাইমলাইটটা সবসময় মেসির উপরেই থাকবে। এই ভাবনা থেকেই বলে বার্সেলোনা ছাড়ার জন্য উতলা হয়ে উঠেছেন নেইমার ডা সিলভা সান্তোস জুনিয়র, আর তাঁর মনের মধ্যেকার সেই চাপা আগুনে সলতে দিচ্ছেন নেইমারের বাবা – নেইমার সিনিয়র!

এর আগেও সান্তোস থেকে যখন নেইমারকে বার্সেলোনাতে আনা হল, এই নেইমারের বাবাই তৎকালীন বার্সা প্রেসিডেন্ট স্যান্দ্রো রোসেলের সাথে মিলে এজেন্ট হিসেবে অনেক টাকা বাগিয়ে নিয়েছিলেন। রোসেল অ্যান্ড কোং প্রকাশ করেছিলেন যে নেইমারের দলবদলের জন্য বার্সেলোনাকে দেওয়া লেগেছে ৫৭ মিলিয়ন পাউন্ডের মত, কিন্তু আসলে তাঁর থেকেও অনেক বেশী টাকা দিয়েছিল বার্সেলোনা, যেটা তখন প্রকাশ করা হয়নি। সাথে নেইমারের বাবাকে একটা মাসোহারা ত দিতে হতই। গত চারবছরে নেইমারের বাবাকে এজেন্ট ফি বাবদ বলে মোটামুটি ৯০ মিলিয়ন পাউন্ডের মতই দিয়েছে বার্সেলোনা, যেখানে খোদ লিওনেল মেসিই এই সময়ে বার্সেলোনা থেকে উপার্জন করেছেন ৭৯ মিলিয়ন পাউন্ডের মত! ভাবা যায়!

এখন কোনভাবে নেইমারকে যদি বার্সা থেকে পিএসজিতে আনা যায় তাহলে নূন্যতম ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের মত এজেন্ট ফি বাবদ করায়ত্ত করবেন নেইমারের বাবা। আর নেইমারের সাথে পিএসজির চুক্তিটা হবে ছয় বছরের, প্রতি বছরে বেতন বাবদ ৩০ মিলিয়ন ইউরো করে নেইমারকে দেবে পিএসজি। অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে বেতনের যে অংকটা ৫ লক্ষ পাউন্ডের চেয়েও বেশী। ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ, সে বিশ্বকাপের আগেই পিএসজির কাতারি মালিকরা যে বিশ্ব ফুটবলে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের মাধ্যমে নিজেদেরকে ফুটবলের অন্যতম মোড়ল হিসেবে প্রমাণ করতে চায়, সে ইচ্ছাটা এখন স্পষ্ট। এমনকি কাতারি রাজপুত্রেরও বলে নেইমারকে প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ে নিয়ে আসার পেছনে প্রত্যক্ষ ইচ্ছা ও ভূমিকা রয়েছে।

এর মধ্যেই হয়ত প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ে চলেই যেতেন নেইমার, যাচ্ছেন না কেবল মাত্র একটা কারণে। সামনের ৩১ জুলাই পর্যন্ত যদি নেইমার বার্সেলোনার খেলোয়াড় থাকেন, তাহলে লয়্যালটি ফি বা আনুগত্য বোনাস বাবদ আরও ২৬ মিলিয়ন পাউন্ড পকেটে পুরবেন তিনি! তাই এতদিন চুপচাপ ছিলেন নেইমার নিজে, দলবদল সম্বন্ধে কিছু মুখ খোলেননি বা কিছু করেননি, কিন্তু যেই ৩১ জুলাই ঘনিয়ে আসছে, সেই গতকাল সদ্য বেনফিকা থেকে বার্সেলোনাতে আসা সতীর্থ পর্তুগিজ রাইটব্যাক নেলসন সেমেদোর সাথে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে আমেরিকার মায়ামিতে হতে থাকা বার্সেলোনার প্রাক-মৌসুম ক্যাম্প থেকে রেগেমেগে বের হয়ে এসেছেন নেইমার! এগুলো ক্লাব ছাড়তে চাওয়ার লক্ষণ না ত কি?

গত কয়েকদিন ধরে চাইনিজ ক্লাব গুয়াংঝু এভারগ্রান্ডে থেকে ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার পাওলিনিও কিংবা লিভারপুল থেকে ব্রাজিলিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ফিলিপ্পে কউতিনিও, কিংবা সান্তোস থেকে মিডফিল্ডার লুকাস লিমা কে আনতে চাওয়ার জন্য বার্সেলোনার যে তোড়জোড় চলছিল, সেটা মূলত নেইমারকে দলে ধরে রাখার জন্যই, কেননা এই তিনজনই নেইমারের খুব ভালো বন্ধু। ওদিকে পিএসজিতে নেইমারের বেশ কয়েকজন সতীর্থ ব্রাজিলিয়ান রয়েছেন – যেমন রাইটব্যাক দানি আলভেস, উইঙ্গার লুকাস মৌরা, সেন্টারব্যাক থিয়াগো সিলভা ও মার্ক্যুইনহোস। বলা বাহুল্য, কউতিনিও, পাওলিনিও কিংবা লুকাস লিমার মধ্যে কেউই বার্সার জার্সি গায়ে জড়াননি এখনো পর্যন্ত, ওদিকে পিএসজি নেইমারকে দলে টানার জন্য নেইমারের যাতে সুবিধা হয় সেজন্য নেইমারের বন্ধুবৎসল পরিবেশ বানিয়ে রেখেছে আগে থেকেই। এটাও নেইমারের দলবদলের আরেকটা মূল কারণ।

বছর চারেক আগে নেইমার যখন বার্সায় এসেছিলেন, বার্সেলোনার কিংবদন্তী খেলোয়াড় ও ম্যানেজার ইয়োহান ক্রুইফ একটা কথা বলেছিলেন, মেসি ও নেইমারকে ইঙ্গিত করে, “এক বনে কখনো দুইবাঘ থাকতে পারেনা” – এতদিন পর তাঁর সে কথাটাই ফলল বুঝি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

3 × 2 =