বার্সার যত ভুল

গতরাতে ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে তুরিনে ৩-০ গোলে জুভেন্টাসের কাছে বিধ্বস্ত হয়েছে বার্সেলোনা। যদিও মাত্র প্রথম লেগ হয়েছে, দ্বিতীয় লেগ এখনও বাকী আছে, তাই নিজেদের মাঠ ক্যাম্প ন্যু তে ৩ গোলের ব্যবধান ঘুচিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে উঠার আশা করতেই পারে বার্সেলোনা সমর্থকেরা, যেখানে আগের রাউন্ডেই এরকম রূপকথার জন্ম দিয়ে বার্সেলোনা গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে প্রথম লেগে পিএসজির কাছে ৪-০ গোলে হেরেও দ্বিতীয় লেগে ৬-১ গোলের জয় অর্জন করে রূপকথা রচনা করে পরের রাউন্ডে ওঠা সম্ভব। কিয়েল্লিনি-বোনুচ্চি-স্যান্দ্রো-আলভেসদের ডিফেন্স চিরে আবারো হালিখানেক গোল দিয়ে দ্বিতীয় লেগে কি আরেকটি রূপকথা রচনা করতে পারবে বার্সা? সে উত্তরটা নাহয় সময়ের কাছেই তোলা থাক। কিন্তু এরকম কেন হচ্ছে বার্সার? এককালের নিশ্ছিদ্র ডিফেন্স দিয়ে এখন কেন হচ্ছে গোলের পর গোল? সম্ভাব্য কারণগুলো দেখে নেওয়া যাক –

  • ডিফেন্সিভ মিডের অভাব

গত রাউন্ডের দ্বিতীয় লেগে হলুদ কার্ডের খাঁড়ায় পড়ে জুভেন্টাসের সাথে ম্যাচটি সাসপেন্ডেড হয়ে কাটিয়েছেন বার্সেলোনার মিডফিল্ড মাস্টারমাইন্ড সার্জিও বুসকেটস। মেসি-নেইমার-সুয়ারেজের বিশ্বজয়ী আক্রমণভাগকে নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, তাদের সাফল্যগাথা নিয়ে যতই দিস্তার পর দিস্তা কাগজ খরচ করা হোক না কেন, এই বুসকেটসই মিডফিল্ডে থেকে তাদেরকে একইসূত্রে গেঁথে রাখেন। বুসকেটস না খেলার ফলে যে অভাবটা কালকে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে বার্সা। বুসকেটস না থাকায় ৪-৩-৩ তে খেলা শুরু করে বার্সেলোনা, ডিফেন্সিভ মিডে চলে আসেন হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো, বুসকেটসের বদলে দলে আসেন ইভান রাকিটিচ আর বামদিকে খেলা শুরু করেন অ্যান্দ্রেস ইনিয়েস্তা। কিন্তু বুসির অভাবটা এমনই প্রকট ছিল, এমনকি অ্যান্দ্রেস ইনিয়েস্তার মত খেলোয়াড়ও গোটা ম্যাচে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন, মেসির অসাধারণ একটা থ্রু বল কে গোলে রূপান্তরিত করতে পারেননি। ডিফেন্সের সাথে মিডফিল্ডের কোন যোগাযোগই ছিল না, যার কারণে ডি-বক্সের সামনে , মোটামুটি ঝামেলাহীনভাবেই ডিবালা-হিগুয়াইন কিংবা মান্দজুকিচরা নিজেদের মধ্যে ঠিকঠাক কম্বিনেশানগুলো করতে পেরেছেন।

  • বারবার ফর্মেশান বদল 

ম্যাচ ৪-৩-৩ ফর্মেশানে শুরু করলেও প্রথম গোল খাওয়ার পরেই ৩-৩-১-৩ ফর্মেশানে খেলা শুরু করে বার্সেলোনা, আবার দ্বিতীয় গোল খাওয়ার পর আগের ৪-৩-৩ ফর্মেশানে চলে যায়। এভাবে বারবার ফর্মেশান পরিবর্তনের ফলে দলের খেলোয়াড়েরা নিজেদের যথাযথ দায়িত্ব সম্বন্ধে বারবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছিলেন। আর ঐদিকে কিয়েল্লিনি-বোনুচ্চির ডিফেন্স নিজেদের কাজটাই গোটা নব্বই মিনিট ধরে ঠিকঠাক করে গেছেন, যেখানে ইনিয়েস্তা, সুয়ারেজ, ম্যাশচেরানো, রাকিটিচরা কখন কি করতে হবে না হবে এটা ভাবতেই বারবার খাবি খাচ্ছিলেন। বুসকেটসের মত অ্যাঙ্কর মিডফিল্ডার বাদে যেরকম লাইনআপে বার্সা কালকে প্রথমে নেমেছিল, চাইলে ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে পুরো ম্যাচ খেলে জুভের সাথে টক্কর দিতে পারত। কিন্তু সেটা তারা করেনি। বার্সার ফর্মেশান নিয়ে এই দ্বিধার সুযোগ লাগিয়েই জুভেন্টাস প্রেস করে গেছে রীতিমত পুরো ম্যাচ। সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছে ইতালিয়ান ফুটবল মানেই যে ডিফেন্সিভ, সেটা সময় নেই আর। কোন একটা ফর্মেশান ঠিক রেখে পুরো ম্যাচ খেললে হয়তোবা এই দ্বিধার জায়গাটা থাকত না। আর আধুনিক ফুটবলে এই জুভেন্টাসই প্রথম আন্তোনিও কন্তের অধীনে তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্সে রেখে ৩-৪-৩ বা ৩-৫-২ ফর্মেশানে খেলা শুরু করে, তাই এই ফর্মেশানের অন্যতম জনপ্রিয় ও কার্যকরী দলের বিপক্ষে বারবার তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্সে রেখে ৩-৩-১-৩ বা ৩-৪-৩ তে খেলাটা বার্সার জন্য একরকম আত্মঘাতীই হয়েছে।

  • জঘন্য ফুলব্যাক

এই মৌসুমে নিজের বহুল চর্চিত ৩-৩-১-৩ ফর্মেশানেই যদি প্রথম থেকে না শুরু করান আপনি, তাহলে কেন লেফটব্যাকে জর্ডি অ্যালবার বদলে জেরেমি ম্যাথিউকে নামানো হল, লুইস এনরিকে? কিছুদি আগে লা লিগাতে মালাগার কাছে হেরেছে বার্সা, সেখানেও প্রথম গোল খাওয়ার পেছনে দায়ী ছিলেন ম্যাথিউ। কালকেও পাবলো ডিবালাকে গোল করতে জন্য বিঘার পর বিঘা জায়গা ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি।

রাইটব্যাকে সার্জি রবার্তোও খেলেছেন যাচ্ছেতাই। সেন্টার মিডফিল্ড থেকে রাইটব্যাকে পরিবর্তিত হওয়া এই রবার্তোর জন্য কোন রাইটব্যাক কেনেনি বার্সা এবার, দানি আলভেসের মত খেলোয়াড় চলে যাওয়ার পরেও। এবং সেটার খেসারতই দিচ্ছে বার্সেলোনা বারবার। এমনকি জুভেন্টাসের মারিও মান্দজুকিচ, যিনি কিনা টিপিক্যালি একজন সেন্টার ফরোয়ার্ড, লেফট উইং যার পজিশান না মূলত, তিনিও পুরো ম্যাচজুড়ে রবার্তোকে নাচিয়ে ছেড়েছেন। আক্রমণে অতটা ভালো না হলেও, ট্র্যাকব্যাক করে বেশ কয়েকবার বার্সার আক্রমণকে থামিয়ে দিয়েছেন এই মান্দজুকিচ, আর সেগুলো সম্ভব হয়েছে কেননা যথারীতি রবার্তো রাইটব্যাকে থেকে তাঁর দায়িয়্ব পালন করতে পারেননি তাই।

  • সুয়ারেজের ব্যর্থতা

সমস্যাটা আজকের নতুন না। হয়তোবা সুয়ারেজ বার্সার হয়ে প্রচুর গোল করেন দেখে সমস্যাটা চোখে পড়েনা। কিন্তু তিনি গোল যেমন করেন, গোল করার সুযোগ নষ্ট করেন তাঁর থেকে ঢের বেশী। আর এই সমস্যাটাই কালকে আরও বেশী করে চোখে পড়েছে। মিডফিল্ড থেকে মেসির অসাধারণ একটা থ্রু বল কালকে ব্যর্থ হয়েছে গোলে পরিণত হতে, শুধুমাত্র সুয়ারেজের জন্য। খুব সম্ভবত সুয়ারেজের মনে ধারণা হয়ে গেছে যে তিনি যত গোলের সুযোগ নষ্টই করুন না কেন, তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হবেনা অন্তত, কারণ বেঞ্চে যে স্ট্রাইকার আছেন প্যাকো অ্যালস্যাসের, তিনিও আহামরি কেউ নন। স্ট্রাইক পজিশানে প্রতিযোগিতার অভাব তাই আস্তে আস্তে সুয়ারেজকে এইসব সহজ সুযোগগুলো নষ্ট করার লাইসেন্স দিচ্ছে বারংবার।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eleven − three =