স্যার ডনের শহরে, লাল সবুজের বিজয় নিশান ওড়ে

‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ,
স্যার ডনের শহরে।
টাইগারদের হামলায় কুপোকাত,
অসিদের চির শত্রুরে!!’

208199
রুবেলের ইয়রকারের কোন জবাবই ছিলনা জেমসের কাছে। তিনি শুধু হতবিহবল হয়ে মাটিতে ব্যাট ঠুকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখলেন কিভাবে বিদেশ বিভুয়েও লাল সবুজের উৎসব হয় দেশের মতো। সকালে সুইঙ্গের প্রদর্শনীতে ভীতিজাগানিয়া জেমস তাই দিন শেষে পরাজিত দলে। নাক উঁচু ইংলিশদের দম্ভ চুরমার হয়েছে বাংলার বাঘেদের বীরত্বে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে পা দিয়েছে আমাদের দল।

মাথা হেঁট জেমসের মাঠ ছাড়া...
মাথা হেঁট জেমসের মাঠ ছাড়া…

অথচ শুরুটা কি ভীতি জাগানিয়াই না ছিল। জেমস সুইং পাচ্ছেনা বলেই তো এই দুর্দশা- এ কথা বলে গলা ফাটানো সাবেকদের মুখে হাসি ফুটল টস জিতে মরগান বোলিং নেওয়া এবং জেমসের সেই পরম প্রার্থিত সুইঙ্গে। আমাদের বুক কাঁপিয়ে দিয়ে দুই ওপেনার বিদায় নিলেন সেই সুইঙ্গের ভাষা বুঝতে না পেরে।

তামিম-ইমরুল, সফল হননি কোন ওপেনারই
তামিম-ইমরুল, সফল হননি কোন ওপেনারই

কিন্তু দিনটা যে আমাদের! মাহমুদউল্লাহ আর সৌম্য বাঁধ দিলেন ইংলিশ আক্রমণে। প্রথমে সামলে নিয়ে পরে পাল্টা আক্রমণও করেছেন সৌম্য আর রিয়াদ। ভয়ডরহীন তারুণ্যের প্রতীক সৌম্য এই বিশ্বকাপে নিজের জাত চেনাচ্ছেন, কালও ৪০ রান করলেন যার মধ্যে দৃষ্টিনন্দন কভার ড্রাইভের অভাব ছিলনা।

সৌম্য ছিলেন যথারীতি দৃষ্টিনন্দন
সৌম্য ছিলেন যথারীতি দৃষ্টিনন্দন

আর রিয়াদ তো সবসময়ই ব্যাটিঙের অলস সৌন্দর্যের প্রতীক আমাদের দলে। যেমন ছিলেন ভারতে দ্রাবিড়, অসিদের ছিলেন একজন মার্ক ওয়াহ, লঙ্কায় আছে একজন মাহেলা জয়াবরধনে। এদের ব্যাটিঙে এখনকার তরুণদের মতো পেশিশক্তির উন্মত্ততা কখনোই ছিল না, বরং মনে হতো কোন শিল্পী বুঝি ব্যাট হাতে নিয়েছেন ভুল করে, আর সবুজ ক্যানভাসে বোলারের নাক আর চোখের জলের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এঁকে যাচ্ছেন অসাধারণ চিত্রকর্ম! রাঙিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন ক্রিকেটপ্রেমীর মন। তো রিয়াদ কাল সেই সৌন্দর্যের ঝাঁপি খুলে বসলেন, কি কভার ড্রাইভ, কি গ্রিনিজের কায়দায় এক পা উচিয়ে পুল, কিংবা পায়ের উপর আসা বলকে লেগ ফ্লিকে সীমানার বাইরে পাঠানো- সবকিছুই প্রত্যাশা পুরণ করেছে শতভাগ।

ইতিহাস গড়েছেন মাহমুদুল্লাহ
ইতিহাস গড়েছেন মাহমুদুল্লাহ

এক রান নিতে গিয়ে ডাইভ দিয়ে শতক ছুঁয়ে ‘ফ্লাইং কিস’ দিয়েছেন হোটেল রুমে থাকা স্ত্রী ও একমাত্র পুত্রকে। হয়তো বুঝিয়ে দিলেন, ব্যাটিঙের সাথে সাথে রোমান্টিকতাতেও তিনি একশতে একশ!

রিয়াদের সেই ফ্লাইং কিস...
রিয়াদের সেই ফ্লাইং কিস…

রিয়াদ যদি শিল্পী হন, মুশফিক তবে বিধ্বংসী সুন্দরের প্রতীক। সৌম্য সাকিবের দ্রুত বিদায়ে কম্পমান বাংলাদেশী নৌকা তখন হাল ধরার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে দুঃসাহসী কাউকে।

কাল কিছু করতে পারেননি সাকিব
কাল কিছু করতে পারেননি সাকিব

মুশফিক করলেন সেই অসাধ্য সাধন। উইকেটে থাকলেন, আবার দুরন্ত সব শটে চোখ ধাধিয়ে দিলেন ইংলিশদের। পেসারকে সুইপ করে ছক্কা মারার বান্দা মনেহয় আমাদের দলে তিনি একাই। সুইপ তার প্রিয় হলেও এদিন উইকেটের চারিদিকেই সমানে চালিয়ে রানের চাকা সচল রেখেছিলেন।

দুর্ধর্ষ মুশফিক
দুর্ধর্ষ মুশফিক
দুই ভায়রাভাইয়ের জুটি দলকে এনেছে স্থিতি!
দুই ভায়রাভাইয়ের জুটি দলকে এনেছে স্থিতি!

২৭৫ রান এই বাস্তবতায় মাঝারি মানের স্কোর। কিন্তু কি দারুণভাবেই না সেটাকে আগলে রাখল মাশরাফি বাহিনী! সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন অধিনায়ক। তিনি সাহসী, ঝুঁকি নিতে মোটেই ভয় পান না। তরুণ দলের শ্রেষ্ঠ সম্পদ এই নেতা। সঠিক সময়ে বোলার পরিবর্তন করেছেন, আবার উইকেট তুলে নিয়ে পথও দেখিয়েছেন। রুবেল হোসেন, একই ওভারে তিনি দুই ইংলিশ নামজাদা ব্যাটসম্যানকে ফেরার পথ দেখিয়েছেন, তার মধ্যে একজন হচ্ছেন মরগান, ইংলিশ সেনাপতি।

????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????

গার্লফ্রেন্ডের উপস্থিতিতে ডাক মারার লজ্জা যে কি সেটা জানতে কোন সাংবাদিক ‘আপনার অনুভূতি কি’ এই বিখ্যাত বাংলা প্রশ্নের ইংরেজিটা জিজ্ঞেস করেছিলেন কিনা, তা আর জানা যায়নি! ৪৯তম ওভারে এই রুবেলের বলেই লালবাতি জ্বলেছে ব্রড আর জেমসের স্ট্যাম্পে। পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা ম্যাচ এসেছে আমাদের দিকে। ২০০৮ এর রুবেল না হয়ে রুবেল হয়েছেন ২০১০ এর রুবেল। যার হাত ধরে কিউইদের ‘বাংলা ধোলাই’ এর শেষ অঙ্ক লেখা হয়েছিলো।

রুবেলের হাত ধরেই জয়
রুবেলের হাত ধরেই জয়

বাংলাদেশের পেসাররা কাল গতির ঝড় তুললেও ছিলেন হিসেবি, চলতি ভাষায় কিপটে! মাত্র একটি নো বল আর কোন ওয়াইডবিহীন এমন সুশৃঙ্খল বোলিং এরা আর কবে করেছেন সেটা দেখার বিষয়। একটি নো বল হয়েছে যার সৌজন্যে, সেই তাসকিন সরিয়েছেন পথের শেষ কাঁটা বাটলারকে। সব মিলিয়ে অসাধারণ!

বাটলারকে সরানোর পর তাসকিনের উচ্ছ্বাস
বাটলারকে সরানোর পর তাসকিনের উচ্ছ্বাস

ম্যাচ শেষে আমাদের সেনাপতি মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে উৎসব করেছেন! সত্যি দিনটা আমাদেরই ছিল, যে কাউকেই ধরে দেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সেনাপতি কথা রেখেছেন। সাকিব আল হাসান শিকল পরিয়ে রেখেছিলেন ইংলিশদের ব্যাটে, তার কিপটে ঘূর্ণির মায়াতে, আর দৌড়ের উপর থেকে মরগানের ক্যাচটা না নিলে কে জানে কি হতে পারতো!

208135
ওসব ভেবে দরকার নেই আর, এখন শুধু আনন্দ করার পালা। বিজয়ের ঢেউ মাতৃভূমিতেও এসে লেগেছে। বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে মেতেছে বাংলার মানুষ।

208191
‘লাল সবুজের বিজয় নিশান,
হাতে হাতে উড়িয়ে দাও’

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 × four =