হলো কি লেস্টারের?

গল্পটা যেন একেবারেই সিন্ডারেলার গল্পের সাথেই মিলে যাচ্ছে। একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। সিন্ডারেলা যেরকম একটা গরীব মেয়ে থেকে দুনিয়ার সবরকম ঐশ্বর্য, যশ, রাজপুত্র পাওয়ার পরেও আবার সেই রাত বারোটার পর গরীব ঘরের মেয়েতেই পরিণত হত, লেস্টারের কাহিনীও তাঁর থেকে কিছুটা কম যাচ্ছে না!

গত মৌসুমেই গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জয় করেছিল লেস্টার সিটি। যে দল মাত্র এক মৌসুম আগেই রেলিগেশন ফাইট দিয়ে প্রিমিয়ার লিগে থাকাটা নিশ্চিত করেছিল, সে দলের এরকম লিগ শিরোপা জয়ের কাহিনীটা কোনধরণের রূপকথার চেয়ে কম কিছু ছিল না। কিন্তু আবার সেই এক মৌসুম পরেই সেই লেস্টার সিটি ঘুরেফিরে আবার ঐ রেলিগেশান জোনেই ঘোরাফেরা করছে। গত সপ্তাহে বার্নলির মত দলের কাছে ১-০ গোলে হেরে পয়েন্ট তালিকার ১৬ নম্বরে আছে তারা বর্তমানে, রেলিগেশনের খড়্গ থেকে মাত্র দুই পয়েন্ট ওপরে।

গত মৌসুমের শিরোপা জয় এখন দূরতম এক স্মৃতি

কিন্তু লিগ শিরোপা জয়ের মাত্র ১৪০ দিনের ব্যবধানেই এমন কি হয়ে গেল যার ফলে ভাগ্যের এতটা এপিঠ-ওপিঠ দেখতে হচ্ছে লেস্টারকে? যে দল নিয়ে ইতালিয়ান কোচ ক্লদিও রানিয়েরি শিরোপা জিতেছিলেন মোটামুটি সেই দলটাই এখনো অক্ষত আছে, তাও কেন পারছেনা লেস্টার, গত মৌসুমের রূপকথার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে?

খুঁজলে বেশ কিছু কারণ পাওয়া যাবে। প্রথমে ট্রান্সফার কার্যক্রম দিয়ে শুরু করা যাক। লেস্টারের গত মৌসুমের দলের প্রায় সবাই-ই এই দলে আছে, প্রায় বলতে হচ্ছে কেবলমাত্র একজনের জন্য। তিনি এনগোলো কান্তে। ফরাসী এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এই মৌসুমেই পাড়ি জমিয়েছেন চেলসিতে, এই একজন বাদে সবাই ঠিকঠাকই আছেন লেস্টারে। স্ট্রাইকার জেইমি ভার্ডি আর্সেনালে যেতে যেতেও যাননি শেষ পর্যন্ত, আলজেরিয়ান মিডফিল্ডার রিয়াদ মাহরেজকেও আর্সেনাল পায়নি, লেফটব্যাক বেন চিলওয়েলকে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে লিভারপুল। উলটো গত মৌসুমের দলের সাথে বেশ কিছু নতুন মুখ যুক্ত করেছিলেন কোচ ক্লদিও রানিয়েরি। মিডফিল্ডে কান্তের অভাব মেটাতে ফরাসী ক্লাব নিস থেকে আনা হয়েছে ন্যামপালিস মেন্ডিকে, জানুয়ারিতে যুক্ত হয়েছেন আরেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার উইলফ্রিড এনদিদি। কিন্তু কেউই কান্তের অভাব মেটাতে পারেননি বিন্দুমাত্রও। উলটো চেলসিতে গিয়ে কান্তে আরেকটা প্রিমিয়ার লিগ মেডেল পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন!

লেস্টার সিটির মূল ডিফেন্সিভ লাইনআপটা হল ; রাইটব্যাক ড্যানি সিম্পসন, সেন্টারব্যাক ওয়েস মরগান ও রবার্ট হাথ, লেফটব্যাক ক্রিস্টিয়ান ফুকস। আলাদা আলাদাভাবে হিসাব করলে প্রত্যেকেই কিন্তু খুবই সাধারণ মানের ডিফেন্ডার। কিন্তু এই সাধারণ চারজনই রানিয়েরির ছোঁয়ায় এক ইউনিট হিসেবে হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ। কিন্তু রানিয়েরি বোধহয় বোঝেননি, এরকম টোটকা শুধুমাত্র একবারই খাটে, তাই হয়ত নিজের বহুল-পরীক্ষিত বর্ষীয়ান ডিফেন্সকে আর পরিবর্তন করতে চাননি। শুধুমাত্র এক স্প্যানিশ ডিফেন্ডার লুইস হার্নান্দেজকেই স্পোর্টিং গিহন থেকে ফ্রি তে নিয়ে এসেছিলেন লেস্টারে। ডিফেন্সে কোন অতিরিক্ত খরচই করেননি।

এই সিদ্ধান্তটাই আত্মঘাতী হয়েছে রানিয়েরির জন্য। এই মৌসুমে বারংবার প্রতিপক্ষরা ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে লেস্টারের ডিফেন্সকে। গত অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটো ক্লিনশিট রাখতে পেরেছে লেস্টারের ডিফেন্স। বাধ্য হয়ে এই জানুয়ারীর দলবদলের শেষ দিনে মালিয়ান ডিফেন্ডার মোল্লা ওয়াগকে গ্রানাডা থেকে ধারে এনেছেন রানিয়েরি।

ভার্ডি কিংবা রানিয়েরি, কেউই গত মৌসুমের মত ঝলক দেখাতে পারছেন না

ডিফেন্সে যতটা কঞ্জুস রানিয়েরি, স্ট্রাইকে ঠিক ততটাই উদারহস্তে পাউন্ড খরচ করেছেন এই ইতালিয়ান ট্যাকটিশিয়ান। পর পর দুইবার ক্লাবের ইতিহাসের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় কেনার রেকর্ড ভেঙ্গে দলে এনেছেন নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার আহমেদ মুসা ও স্পোর্টিং লিসবনের আলজেরিয়ান স্ট্রাইকার ইসলাম স্লিমানিকে। ফলে আগে থেকেই দলে থাকা আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার লিওনার্দো উলোয়ার খেলার সময় আরও বেশী কমে গেছে, গত মৌসুমে ভার্ডির ব্যাকআপ হিসেবে যেই উলোয়া যথেষ্ট ভালো সার্ভিস দিয়ে গেছেন। ফলে উলোয়ার মন উঠে গেছে লেস্টার সিটি থেকে। ক্লাব ছাড়ার যথেষ্ট চেষ্টাচরিত্র করেও লেস্টার ছাড়তে পারেননি তিনি এই জানুয়ারীর দলবদলের সময়টায়। এবং এর জন্য সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় রানিয়েরিকে দোষারোপও করেছেন এই স্ট্রাইকার। ওদিকে মুসা বা স্লিমানি, কেউই সেরকম নজরকাড়া পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি লেস্টারের হয়ে। সাথে গত মৌসুমের দুর্ধর্ষ ফর্ম প্রদর্শন করতেও বারংবার ব্যর্থ হচ্ছেন জেইমি ভার্ডি, যার প্রভাব পড়ছে স্কোরলাইনে। গোটা জানুয়ারি মাসে একটা গোলও করতে পারেনি লেস্টার, ভাবা যায়?

ক্লাবের পড়তি ফর্মের আরেকটা অন্যতম কারণ হচ্ছে ইনজুরি ও সাসপেনশান। গত মৌসুমে লেস্টারের সেরকম ইনজুরি বা নিষেধাজ্ঞা সমস্যা ছিলই না একরকম বলা যায়। কিন্তু এই মৌসুমে গোলরক্ষক ক্যাসপার শ্মাইকেল, ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটার, ড্যানিয়েল অ্যামার্টি, ন্যামপালিস মেন্ডি, জেইমি ভার্ডি, ইসলাম স্লিমানি – প্রত্যেককে হয় ইনজুরি নাহয় সাসপেনশানের খড়্গে পড়ে বেশ কিছু সময়ের জন্য হারাতে হয়েছে লেস্টারকে। তাঁর উপর এই মাসে অনুষ্ঠিত আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের জন্যেও রানিয়েরি পুরো মাস দলে পাননি স্লিমানি, মাহরেজ, মুসা, অ্যামার্টিদের।

সবকিছু মিলিয়ে দলের স্পিরিট কমে গেছে অনেকাংশেই। উইঙ্গার জেফ শ্লাপ ও ডিফেন্ডার লুইস হার্নান্দেজ এর মধ্যেই দল ছেড়ে গেছেন দলের মধ্যে সেই সুরটা কেটে গেছে দেখেই। গত মৌসুমে লেস্টারের খেলা দেখলেই বোঝা যেত জয়ের জন্য কতটা ব্যগ্র তারা। প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের চোখেমুখে ফুটে উঠত জিগীষা। ১৯ টা অ্যাওয়ে ম্যাচের মধ্যে ১১টা জয় আর দুটো ড্র কিন্তু এমনি এমনি আসেনি। আর এখন? এই মৌসুমে এখনো পর্যন্ত একটাও অ্যাওয়ে গেম জিততে পারেনি লেস্টার। ভ্রাতৃত্ববোধটা একরকম নাই-ই হয়ে গেছে খেলোয়াড়দের মধ্যে। একবার লিগ জিতে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার সুযোগ পেয়েই খেলোয়াড়রা তুলতে শুরু করেছে তৃপ্তির ঢেঁকুর, যা ভোগাচ্ছে লেস্টারকে।

সবচেয়ে বড় কারণটা বোধহয় লেস্টারের হঠাৎ জায়ান্ট হয়ে যাওয়াটা। গত মৌসুমে কেউই লেস্টারকে সেরকম শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেনি, হালকাভাবে নিয়েছে, যার সুবিধা পেয়েছে লেস্টার। কিন্তু এই বছর আর সেটা হচ্ছেনা। সবাই লেস্টার নিয়ে গবেষণা করছে, খুঁজছে লেস্টারকে থামানোর পথ। প্রতিপক্ষ অতিরিক্ত ডিফেন্সিভ খেলে মাহরেজ আর ভার্ডির মধ্যকার বোঝাপড়াটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

সেই তিরিশের দশকে শিরোপা জেতার পরের মৌসুমেই অবনমিত হয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটি। লেস্টার সিটি কি তাহলে তাদেরকেই অনুসরণ করছে? দেখা যাক!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

9 − 8 =