আমার দেখা আশরাফুলের সেরা পাঁচ

বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম মেগাস্টার, আশার ফুল, লিটল জিনিয়াস কিংবা লিটল মাস্টার- আশরাফুল ক্যারিয়ারের প্রথমভাগে তার ভক্তকূলের কাছ থেকে পেয়েছেন এমন অসংখ্য নাম । আশরাফুল এমন একজন ক্রিকেটার যার প্রতি বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম যুগের ফ্যানদের ভালোবাসার পরিমাণ কোন পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যাবে না । ১৭৭ ওয়ানডে, ২৩ টিটোয়েন্টি আর ৬১টা টেস্ট ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব করেছেন দেশকে । কোন ফরম্যাটেই গড় ২৫ পেরোয় নি । তাতে কি ? ভালোবাসা আর আবেগ তাতে কমে না ! গতরাতের খবর অনুযায়ী, ব্যান কাটিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার জন্যে এখন অবমুক্ত আশরাফুল।

আশরাফুলকে নিয়ে লেখা খুব কঠিন কিছু না । বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভক্ত হয়ে তো না-ই! খুব বেশি ভাবতে হয় না । বাংলাদেশের সব ক্রিকেট রোমান্টিকদের আবেগের জায়গা আশরাফুল । আজ তাই লিখে ফেললাম আমার দেখা ওর সেরা ৫ ইনিংস নিয়ে…

৫) ১৯০, (শ্রীলংকা-মার্চ-২০১৩), গলঃ গল টেস্টে বেশ ব্যাটিংসুলভ উইকেট বানায় শ্রীলংকা। প্রথমে ব্যাট করে সাঙ্গাকারা, থিরিমান্নে আর চান্দিমালের তিন সেঞ্চুরিতে ৫৭০ রানের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে বাংলাদেশ। ৬৫ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে দৃষ্টিতে ছিলো আরেকটি ইনিংস হার । কিন্তু তারপরেই আশরাফুলের বীরত্ব । কখনো মুমিনুলকে নিয়ে আবার কখনো মুশিকে নিয়ে পালটা জবাব দিয়েছিলেন । দেশের ক্রিকেটে অনেক প্রথমই এসেছে এই ডানহাতি ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে। হয়ে যেত দেশের হয়ে প্রথম ডাবলটাও ! কিন্তু আশরাফুল আউট হবার পরে সেটা করে ফেলেন মুশি । আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটি আশরাফুলের খেলা শেষ স্মরণীয় ইনিংস । আশরাফুলের ব্যাট হাসলেই হাসে বাংলাদেশ- আরো একবার প্রমাণ হয়েছিলো সেই গল টেস্টে । জয়সম ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ ।

৪) ১৫৮, (ভারত-ডিসেম্বর-২০০৪), চট্টগ্রামঃ তখন বাংলাদেশ টেস্ট খেলতে নামা মানেই ইনিংস হার । বাংলাদেশ ইনিংস হেরেছে এই টেস্টটাতেও । তবে ভারতের ৫৪০ এর জবাবে খেলতে নেমে বাকিদের আসা-যাওয়ার মিছিলের অন্যপাশে কুম্বলে-হরভজনদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করা আশরাফুলের ইনিংসটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ক্ল্যাসিক । আশরাফুলের ১৫৮ ছাড়া দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিলো আফতাবের ৪৩। এতেই বোঝা যাচ্ছে কতোটা প্রতিকূল ছিলো পরিস্থিতি আর তখনকার আশরাফুলের ইনিংসগুলো কতোটা স্পেশ্যাল ছিলো এই ধুঁকতে থাকা দলটার জন্যে ।

৩) ৬১(২৭), (ওয়েস্ট ইন্ডিজ-সেপ্টেম্বর-২০০৭), জোহানেসবার্গঃ টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ ছিলো সেটি। স্মৃতি ভুল না করে থাকলে ক্যাপ্টেনও ছিলেন আশরাফুল। বোলিং এর সময় ৪ ওভারে ৫৫ রান দেওয়ার একটা লজ্জাজনক নজির গড়ে ফেলেন নিজেই । তবে তা হাড়ে হাড়ে পুষিয়ে দেন ব্যাটিং এ । ২৭ বলে ৬১ রানের আশরাফুলের সেই ইনিংসটি স্পেশ্যাল হয়ে থাকবে ম্যাচ জেতানোর জন্যে ।

২) ৮৭(৮৩), (দঃআফ্রিকা-এপ্রিল-২০০৭),গায়ানাঃ পোলক-এনটিনি-নেইল-ল্যাঙ্গাভেল্ট-ক্যালিসে গড়া শক্তিশালী বোলিং এর বিরুদ্ধে আশরাফুলের এই ৮৭ রানের ইনিংসটি ছিলো দারুন সব উদ্ভাবনী শটে ভরপুর । স্ট্রোকের বৈচিত্র্যে গায়ানার ইনিংসটা বাকি সব ইনিংসের চেয়ে বাকি সবগুলোর চেয়ে উঁচুতে থাকবে। আশরাফুলের স্কুপ থেকে চার খাওয়ার পরে নেইলের সেই চেহারা তো আজও সবার চোখে ভাসে! স্পিনারেরা বাকি কাজ করে দেওয়াতে আসে ৬৭ রানের বিশাল জয়! ম্যাচটা হয়ে থাকে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ ।

১) ১০০(১০১), (অস্ট্রেলিয়া-জুন-২০০৫), কার্ডিফঃ এই অস্ট্রেলিয়া ছিলো রিকি পন্টিং এর দুর্দান্ত অস্ট্রেলিয়া । যাদের সাথে মাঠে নামার আগেই স্কোয়াডের ভারে ২০% হেরে বসত প্রতিপক্ষ। কার্ডিফের সেই ম্যাচটায় বলতে গেলে একাই তো মাটিতে নামিয়ে এনেছিলেন অজিদের। ম্যাকগ্রা-গিলেস্পি-ক্যাসপ্রোভিচ এরা তখন ওডিআই ক্রিকেটের লিডার । উইকেটের চারদিকে কি দারুন সব শট ! বলে বলে রান আর মাঝে মাঝে চার মেরে ২৫০ রানের টার্গেটে রিকোয়ার্ড রেটটাকে সবসময় রেখেছেন নাগালে । আমরা তখন সম্মান নিয়ে ঘরে ফিরতে চাওয়ার দল ! কিন্তু আশরাফুল তো সেদিন সম্মান শুধু নয়, মুকুটও নিয়ে এসেছিলেন। ১০১ বলে ঠিক ১০০ রান । আর তাতে ১১টি চার । তারপরে গিলেস্পির বলে আফতাবের বিশাল ছয় ! আর তাতেই জয় নিশ্চিত হয় ! আহ কার্ডিফ! দশ বছর-বিশ বছর পরে হয়তো বাংলাদেশ ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতবে- টেস্টেও রাজ করবে । কার্ডিফের ১০০ ওভারের ম্যাচটা কি কেউ ভুলতে পারবে ? আমি পারবো না ।

ইংল্যান্ডের সাথে ৫২ বলে ৯৪, বিপিএলের সেঞ্চুরিটা, শ্রীলংকার সাথে ঢাকা টেস্টের হান্ড্রেড- এমন আরো অনেকগুলো ইনিংসই ছিলো। জেতা ম্যাচগুলো মাথায় থাকলো বেশি । তাছাড়া সবচেয়ে কম বয়সে টেস্ট সেঞ্চুরি করা ইনিংসটি সরাসরি টিভিতে দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি। আইরিশদের সাথে ম্যাচটাতে উইকেট নিয়ে ওর সেলিব্রেশনগুলোর ছবি বাংলাদেশের ক্রিকেট হিস্ট্রি নিয়ে একটা রঙাচঙা পোস্টার বানালে সেখানেও জায়গা পাবে। আশরাফুল মানেই খবর । অনেক বড় খবর ! শুধু খেলার পাতার দুই-তিন কলামের খবর নয় । ফ্রন্ট পেইজের বড় খবর। নিয়তির পরিহাস হলো সেটা সবসময় তেমনভাবে আসে নি যেমনটা আমরা ছোটবেলা থেকে চেয়েছিলাম …

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seventeen + 18 =