মার্কো অ্যাসেনসিওর উত্থান : রোনালদো গেলে চিন্তা কিসের?

জিদানের অধীনের রিয়াল মাদ্রিদকে আগের রিয়াল মাদ্রিদের সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবেনা। যে রিয়াল মাদ্রিদকে আমরা সবসময় চিনে এসেছি, সে রিয়াল মাদ্রিদ মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে খেলোয়াড় কিনত, ”গ্যালাকটিকোস” গঠন করত। এখনকার রিয়াল মাদ্রিদ যে খেলোয়াড় কেনেনা মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে জিনিসটা সেটা না, তবে এখন খেলোয়াড়দের পেছনে আন্দাজে শুধু খেলোয়াড়ের সুপারস্টারডমের উপর ভিত্তি করে টাকা ঢালেনা মাদ্রিদ। আর এর পেছনে যেসব খেলোয়াড়ের ভূমিকা রয়েছে, যেসব খেলোয়াড় মাদ্রিদের এই নতুন যুগের সূচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলেন তরুণ স্প্যানিশ উইঙ্গার মার্কো অ্যাসেনসিও।

মায়োর্কাতে জন্ম নেওয়া এই তরুণ উইঙ্গার ক্যারিয়ার শুরু করেন জন্মস্থানের ক্লাব রিয়াল মায়োর্কার দ্বিতীয় দলের হয়ে। ২০১৩-১৪ মৌসুমে ক্যারিয়ার শুরু করে এক মৌসুম পরেই রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মত ক্লাবের নজরে আসেন তিনি। মাত্র চার মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে রিয়াল মাদ্রিদে যখন যোগ দিলেন তখন কে ভেবেছিলেন এই আঠার বছরের তরুণ উইঙ্গারই কোচ জিনেদিন জিদানের রণপরিকল্পনার এত গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ হবেন? অ্যাসেনসিওদের মত তরুণের জন্যই ক্লাবে জায়গা হারাতে হয়েছে কলম্বিয়ান সুপারস্টার হামেস রড্রিগেজকে, কিছুদিনের মধ্যেই জায়গা হারাতে পারেন এককালের বিশ্বের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় গ্যারেথ বেলও। কারণ শুধুমাত্র একটাই, জিদানের রিয়াল মাদ্রিদ এখন শুধুমাত্র দল কত বেশী সুপারস্টারে পরিপূর্ণ হয়ে থাকল সেটার উপরে নির্ভর করে না, বরং কাকে কাকে মাঠে খেলালে কোচের রণপরিকল্পনার সার্থকভাবে পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে – জিদানের রিয়াল এখন সেটার উপরেই বেশী নির্ভর করে থাকে, আর সেটার জন্যই বেল-হামেসের চেয়ে অ্যাসেনসিও রিয়ালের গেইমপ্ল্যানে বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

রোনালদো খেলতে পারছেন না? অ্যাসেনসিওকে ডাক দাও। গ্যারেথ বেল ইনজুরিতে পড়ে হাসপাতালে? অ্যাসেনসিও ওকে খেলাও! বেনজেমা গোলখরাতে ভুগছেন? ডাকো অ্যাসেনসিওকে। মডরিচ সাসপেনশানের কারণে খেলবেন না? অ্যাসেনসিও আছে ত! সব পজিশানে অসাধারণভাবে পারফর্ম করাটাকে প্রায় অভ্যাস বানিয়ে ফেলা এই একুশ বছর বয়সী তরুণের উপর জিদানের এই ভরসা তাঁর দুর্দান্ত ভার্সেটাইলিটিরই লক্ষণ। কি ফলস নাইন, কি রাইট উইং, কি লেফট উইং, কি সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিড, কি সেন্ট্রাল মিড – অ্যাসেনসিও খেলতে পারেন সবজায়গাতেই। গত মৌসুমে সেভিয়ার বিপক্ষে রোনালদোর জায়গায় মাঠে নেমে ইউরোপিয়ান সুপার কাপের অভিষেকেই গোল করেন তিনি, গোল করেন লা লিগা অভিষেকেও – রিয়াল সোসিয়েদাদের বিরুদ্ধে, চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিষেকেও গোল আসে পোলিশ ক্লাব লেজিয়া ওয়ারশ’ এর বিরুদ্ধে, গোল করেছেন স্প্যানিশ সুপার কাপ অভিষেকেও – চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার বিপক্ষে। মাত্র একুশ বছর বয়সে নিজের খেলা প্রত্যেকটা ক্লাব প্রতিযোগিতার অভিষেকে গোল – তাঁকে যদি স্পেশাল প্রতিভা বলা না হয় তবে কাকে বলা হবে?

দুর্দান্ত গতিশীল এই উইঙ্গারের অন্যতম একটা গুণ হল নিজের গতিকে তিনি নিজের প্রয়োজনমত ব্যবহার করতে পারেন, পারেন বাড়াতে-কমাতে। যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজের মার্কার ডিফেন্ডার ছিটকে না যাচ্ছেন, একজন আদর্শ উইঙ্গারের মত গতি বাড়িয়ে কমিয়ে নিজেকে গোল করার কিংবা করানোর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেন অ্যাসেনসিও অনায়াসেই, নিজের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা বানিয়ে নিতে পারেন। নিজের জন্য জায়গা বের করেই ক্রস বা পাস দেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে, এবারে রিয়াল মাদ্রিদের সাথে বায়ার্ন মিউনিখের সেমিফাইনালের কথাটাই চিন্তা করুন! মার্কো অ্যাসেনসিওর দুর্দান্ত অফ-দ্য-বল মুভমেন্টের কারণেই রোনালদো নিজে গোল করার জায়গায় থাকতে পেরেছিলেন, অ্যাসেনসিওর ক্রস থেকেই ম্যানুয়েল নয়্যারের মত গোলরক্ষককে হারিয়েছিলেন এই রোনালদো! আরেকটা বড় গুণ হল তাঁর সফল পাস দেওয়ার ক্ষমতা, তিনি মাঠের যেকোন সতীর্থের কাছেই নিখুঁত পাস বা ক্রস দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। ছোট ছোট পাস দিতে আগ্রহ, প্রায়ই মিডফিল্ডে এসে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে নতুন আক্রমণ সূচনা করা, বল পায়ে রাখার অভ্যাস এবং সবসময় সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকার প্রবণতাটা ভবিষ্যতে তাঁকে একজন আদর্শ সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারও বানিয়ে দিতে পারে। এমনও দেখা গেছে মিডফিল্ডে বল পায়ে অ্যাসেনসিও আক্রমণের সূচনা করতে যাচ্ছেন, কিন্তু দেখেছেন যে স্ট্রাইকার অফসাইড পজিশানে আছেন, তাই তিনি তাঁকে থ্রু বল না দিয়ে আবারও সাইডপাস দিয়ে নতুন করে আবার আক্রমণের সূচনা করে দিয়েছেন, কারণ ঐ সময়ে থ্রু বল দিয়ে ত লাভ নিয়ে, স্ট্রাইকারই ত আছেন অফসাইড পজিশানে!

দূরপাল্লার শটেও গোল করতে পারেন তিনি, কালকে বার্সেলোনার বিপক্ষে গোলটাই দেখুন! তবে তিনি কিন্তু আরিয়ান রবেনের মত সেরকম উইঙ্গার না যে একইরকম স্টাইলে বারবার খেলতেই থাকবেন (কাটইন করে বারবার বাম পা দিয়ে শট করে গোল করার প্রচেষ্টা), দুই পায়ে খেলতে পারেন বিধায় এবং যেকোন পজিশানে খেলতে পারেন বলে তিনি প্রথাগত যেকোন উইঙ্গারের তুলনায়ই অনেক বেশী অননুমেয়, আর যে বৈশিষ্ট্যটাই সামনে তাঁকে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হয়ে যেতে সাহায্য করবে।

এরকম অস্ত্র আছে যার হাতে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যদি চলেও যান কখনো রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে, জিনেদিন জিদানের চিন্তা কিসের?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

7 − six =