আর্জেন্টিনার সামনে শত হিসাব নিকাশের বেড়াজাল

প্রথমেই কোন কিছু বলার আগে দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের পয়েন্ট টেবিলের দিকে একটু চোখ রাখি –

এই পয়েন্ট টেবিলের প্রথম চারটা অবস্থানে যে দল থাকবে, তারা সরাসরি রাশিয়া বিশ্বকাপ এর জন্য কোয়ালিফাই করবে, এটা হল একদম সোজা হিসাব। আর এই টেবিলের পঞ্চম স্থানে যে থাকবে, সে ওশেনিয়া অঞ্চলের কোয়ালিফায়ারের চ্যাম্পিয়ন দলের সাথে প্লে-অফ খেলবে, সেই ম্যাচে যে জিতবে সে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে। দক্ষিণ আমেরিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দলগুলোর জন্য বিশ্বকাপে খেলার জন্য শর্ত মোটামুটি এটাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর দল থাকা সত্বেও এই শর্তগুলো এখনো পূরণ করতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকান পরাশক্তি, দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা। তাই বিশ্বকাপ খেলার ভাগ্যটা এখনো সুতোয় ঝুলছে মেসি-ডিবালা-ম্যাশচেরানো-মারিয়া-হিগুয়াইন-অ্যাগুয়েরোদের।

তালিকার প্রথম চারটা অবস্থানে বর্তমানে আছে যথাক্রমে ব্রাজিল, উরুগুয়ে, চিলি ও কলম্বিয়া। পঞ্চম স্থানে আছে পেরু, আর্জেন্টিনার অবস্থান একদম ছয় নাম্বারে। আজকের আগ পর্যন্ত বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রত্যেক দলের হাতেই ছিল দুটো করে ম্যাচ, আর্জেন্টিনার হাতেও ছিল। পেরু ও ইকুয়েডরের বিপক্ষে ঐ দুই ম্যাচ জিততে পারলে এতশত হিসাব-নিকাশের বেড়াজালে পড়তেই হত না। তবে আর্জেন্টাইনরা নিজেরাই নিজেদের একেবারে খাদের কিনারায় নিয়ে গিয়েছে আজ ভোরে পেরুর সাথে গোলশূণ্য ড্র করে। পেরুর জমাটবাঁধা ডিফেন্স একবারের জন্যেও ভাংতে পারেননি মেসিরা। এই ম্যাচ ড্র করার ফলে মোটামুটি রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলার জন্য বাকী একটা ম্যাচের নিজেদের ভাগ্য ও অন্যান্য দলের পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে আলবিসেলেস্তিদের।

পয়েন্ট টেবিলের প্রথম স্থানে থাকা ব্রাজিল আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা উরুগুয়ের বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিতই। ১৭ ম্যাচে ৩৮ পয়েন্ট পেয়ে পয়েন্ট তালিকার একদম শীর্ষে আছে সেলেসাওরা। তাদের থেকে দশ পয়েন্ট কম নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে সুয়ারেজ-কাভানিদের উরুগুয়ে। পরের দুটো স্থান আর প্লে-অফে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার জন্য পঞ্চম স্থান, এই তিনটে অবস্থানের জন্য মূলত কাড়াকাড়ি লাগিয়েছে যথাক্রমে চিলি, কলম্বিয়া, পেরু, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। যে কোন দলই তৃতীয় থেকে সপ্তম যেকোন অবস্থানে থেকে শেষ করতে পারে বাছাইপর্ব। প্রত্যেকটা দলই হয় গোল ব্যবধান, নাহয় কম-বেশী গোল করার জন্য একে অপরের থেকে আগে বা পিছে আছে। এই চারটা দলের পরিস্থিতি আলাদা ভাবে দেখা যাক –

পয়েন্ট তালিকায় বর্তমানে তৃতীয় স্থানে থাকা চিলি ১৭ ম্যাচে পয়েন্ট পেয়েছে ২৬। নিজেদের হয়ে গোল করেছে ২৬টা, গোল খেয়েছে ২৪টা। অর্থাৎ গোল ব্যবধান +২। সমান পয়েন্ট আর একই গোল ব্যবধান চতুর্থ স্থানে থাকা কলম্বিয়ারও। শুধুমাত্র কলম্বিয়া চিলির থেকে কম গোল করতে পেরেছে (২০) দেখেই চিলির পরে অবস্থান তাদের। বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে চিলি লড়বে তালিকার শীর্ষস্থানে থাকা অদম্য ব্রাজিলের সাথে, ব্রাজিলেরই মাঠে। নেইমার-জেসুস-কউতিনহোদের সাথে পাল্লা দিয়ে স্যানচেজ-ভিদালরা পেরে উঠবেন বলে মনে হয়না, বিশেষত বাছাইপর্বে ব্রাজিলের যেরকম ফর্ম। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে চিলি হারছে, আর চিলি হারলেই এক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার লাভ। কারণ ষষ্ঠ স্থানে থাকলে আর্জেন্টিনার সাথে চিলির পয়েন্ট ব্যবধান মাত্র এক। দেখা গেল ব্রাজিলের এই জয়টাই বিশ্বকাপে টেনে নিয়ে গেল আর্জেন্টিনাকেও! যদিও আজকে স্যানচেজ আর ভারগাসের গোলে ২-১ গোলে ইকুয়েডরকে হারিয়ে ইকুয়েডরের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন নস্যাত করে দিয়ে ফর্মে থাকার আভাস দিয়েছে চিলিও, যেটা আর্জেন্টিনার জন্য খারাপ খবর বৈকি!

নিজেদের মাঠে আজ শেষ মুহূর্তে আজ অস্কার কার্দোজো আর টনি সানাব্রিয়ার দুই গোল খেয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে ম্যাচ হেরে বসেছে ৮৮ মিনিট পর্যন্ত রাদামেল ফ্যালকাওয়ের গোলে ১-০ ব্যবধানে ম্যাচে এগিয়ে থাকা কলম্বিয়া। এই ফলের কারণেই মূলর আর্জেন্টিনা এখনো বিশ্বকাপে খেলার অল্প যেটুকু আশা আছে সেটুকু নিয়েই বেচে আছে, নাহলে সেটাও পারত না। শেষ ম্যাচে এখন পেরুর মাঠে পেরুর বিপক্ষেই লড়বে হামেস রড্রিগেজরা। এই ম্যাচে কলম্বিয়ার জেতার জন্য বসে থাকতে হবে আর্জেন্টিনাকে। কলম্বিয়া জিতলে শেষ ম্যাচে কোনরকমে একটা ড্র করলেও চলবে আর্জেন্টিনার।

পয়েন্ট তালিকার পঞ্চম স্থানে থাকা পেরু বেশী গোল করার কারণে এগিয়ে আছে আর্জেন্টিনার চেয়ে, কারণ দুই দলেরই গোল ব্যবধান +১, তবে যেখানে পেরু গোল করেছে ২৬টা, মেসি-ডিবালাদের আর্জেন্টিনা একরকম গোল-বন্ধ্যাত্বতে ভুগে গোল করতে পেরেছে মাত্র ১৬টা। শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সাথে নিজের মাঠে খেলবে তারা। তারা জিতলে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন কার্যত শেষ।

বাছাই পর্বে আর্জেন্টিনার শেষ ম্যাচ ইকুয়েডরের মাঠেই,  ইকুয়েডরের বিপক্ষে। সদ্য চিলির বিপক্ষে বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হওয়া ইকুয়েডর শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে মরণ-কামড় দেবে না সেটার গ্যারান্টি কি?  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার মিটার ওপরের এ মাঠে খেলতে অস্বস্তিতে ভোগে সবাই। নিজেদের শেষ ম্যাচের জন্য এর চেয়ে কঠিন ভেন্যু পেতেন না মেসিরা। তবে এর উল্টো পিঠেও একটা সুসংবাদ পাচ্ছে আর্জেন্টিনা। তিনে থাকা চিলির শেষ ম্যাচ ব্রাজিলের বিপক্ষে, সেটাও সাও পাওলোতে। চার ও পাঁচে থাকা কলম্বিয়া ও পেরু লড়বে পরস্পরের বিপক্ষে। ফলে আর্জেন্টিনার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী যারা, তাদের সবার পয়েন্ট হারানোর ভালো সম্ভাবনা আছে। আর্জেন্টিনা যদি নিজেদের ম্যাচে জেতে এবং কলম্বিয়া-পেরু ম্যাচটি ড্র হলেই বিশ্বকাপ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকবে না মেসি-ডি মারিয়াদের। আর চিলি ও কলম্বিয়া যদি নিজেদের ম্যাচ জিতে যায়, তবে ইকুয়েডরের মাঠে জয় পেলেও প্লে অফ খেলতে হবে আর্জেন্টিনাকে। এখন যা অবস্থা, তাতে আর্জেন্টিনা পাঁচে শেষ করে প্লে অফ খেলতে পারলেই হয়তোবা বেঁচে যায়। কিন্তু আর্জেন্টিনার ভাগ্য এখন নিজেদের হাতে নেই। সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তাটা এখানেই। এদিক দিয়ে দৌড়ে এত দিন অনেক পিছিয়ে থাকা প্যারাগুয়ে হঠাৎ করেই দেখতে শুরু করেছে বিশ্বকাপের স্বপ্ন। শেষ ম্যাচে কনমেবল অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্বল দল ভেনেজুয়েলাকে পাচ্ছে তারা। নিজেদের মাঠে সে ম্যাচ জিতলে প্রথম পাঁচে চলে আসতেই পারে দেশটি। এটাও আর্জেন্টিনার একটা চিন্তার কারণ। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের পয়েন্ট টেবিল এখন এতটাই জটিল, ম্যাচ বাকি আছে মাত্র একটি। অথচ এখন পর্যন্ত মূল পর্ব নিশ্চিত করেছে শুধু ব্রাজিল।

 সব কথার মূল কথা হল শেষ ম্যাচে যেভাবেই হোক ইকুয়েডরের মাঠে গিয়ে মেসিদের জিততেই হবে, নাহয় বিশ্বকাপ স্বপ্নের সমাধি হবে তাদের। নিজেরা না জিতলে পেরু, কলম্বিয়া, চিলি, প্যারাগুইয়ে জিতলো নাকি জিতলো না সেসব অর্থহীন হয়ে পড়বে। কিন্তু বাছাইপর্বের গত ৪ ম্যাচে মোটে একটা গোল করা (তাও আত্মঘাতী) আর্জেন্টিনা ইকুয়েডরের মাঠে গিয়ে এই ফর্ম নিয়ে আদৌ জিততে পারবে কি না, প্রশ্ন সেটাই।
১৯৪১ সাল থেকে এ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সব মিলিয়ে মোট ৩৩টা ম্যাচ খেলেছে ইকুয়েডর। জিতেছে পাঁচটিতে, ড্র করেছে ১০টা ম্যাচ, বাকী ১৮ ম্যাচে জয়ী হয়েছিল আর্জেন্টিনা। এদের মধ্যে ১৩টা ম্যাচ হয়েছিল ইকুয়েডরের মাঠে। চিন্তার বিষয় হল এই ১৩ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ৩টিতেই জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পেরেছে আর্জেন্টিনা। সর্বশেষ ২০০১ সালে হার্নান ক্রেসপো আর হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরনের গোলে ২-০ গোলে ইকুয়েডরের মাঠ থেকে জয় নিয়ে ফিরেছিল আলবিসেলেস্তিরা। তার আগে ইকুয়েডরের মাঠে আর্জেন্টিনার জয় খুঁজতে গেলে চলে যেতে হবে সেই আমাদের বাপ-দাদার আমলে। কারণ ইকুয়েডরের মাঠে আর্জেন্টিনার বাকী দুই জয় এসেছিল ১৯৬০ আর ১৯৪০ সালে! এমনকি এই দুই দলের মধ্যে সর্বশেষ বাছাইপর্বে ম্যাচেও আর্জেন্টিনার মাটিতেই আর্জেন্টিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে এসেছে ইকুয়েডর!
সামনে ঘোর অমানিশা তাই মেসিদের। ইকুয়েডরের মাঠে তাদের হারাতে গেলে তাই অসাধ্যই সাধন করতে হবে একরকম।
 আর সেই অসাধ্য যদি কেউ সাধন করতে পারেন, তবে সেটা মেসির মত ক্ষণজন্মা কোন প্রতিভাই হয়ত পারবেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five × 4 =