বিশ্বকাপের টিকিট তো পাওয়া গেল – কিন্তু আর্জেন্টিনা কি প্রস্তুত?

শত বাধা পার করে অবশেষে রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০০ মিটার উচ্চতার ভয়, ইকুয়েডরের মাটিতে ১৬ বছর ধরে ইকুয়েডরকে না হারাতে পারার ব্যর্থতা, স্কোয়াডের সমন্বয়হীনতা, গোল করতে না পারা – এরকম হাজারো সমস্যাকে অন্তত একদিনের জন্যে হলেও কাঁচকলা দেখিয়ে মেসি আবারও মহামানব হয়ে উঠলেন, আর্জেন্টিনাকে একাই কাঁধে নিয়ে কাটলেন বিশ্বকাপের টিকিট।

কিন্তু বিশ্বকাপে উঠতে গিয়ে আর্জেন্টিনার এই হাঁসফাঁস অবস্থা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে দল হিসেবে আর্জেন্টিনার দুর্বলতাগুলোকে। এরকম অবস্থা থাকলে আদৌ কি আর্জেন্টিনা রাশিয়াতে গিয়ে কিছু করতে পারবে? আদৌ কি লিওনেল মেসি ক্যারিয়ার সায়াহ্নে এসে একটা বিশ্বকাপ জিতে নিজের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের উপরে সর্বসম্মতির সিলটা লাগিয়ে দিতে পারবেন?

দুঃখজনক হলেও সত্যি আর্জেন্টিনার স্কোয়াড দেখে এরকম কোন আশার বাণী মনে আসে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই বাস্তব এই স্কোয়াড নিয়ে শুধুমাত্র লিওনেল মেসি নামক মহামানবের উপর ভর করে একের পর এক জিততে জিততে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্নটা আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই না। লিওনেল মেসি মাঝে মাঝে এরকম অতিমানবীয় পারফরম্যান্স দিয়ে ম্যাচ জেতাতে পারবেন, যেমনটা সেদিন সকালে করলেন। কিন্তু প্রতি ম্যাচে এরকম অতিমানবীয় পারফরম্যান্স তো মেসির পক্ষেও দেওয়া সম্ভব না। মনে রাখতে হবে, প্রতি আর্জেন্টিনা-ইকুয়েডর ম্যাচে মেসির অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পিছে একটা করে বার্সেলোনা-জুভেন্টাস চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে মেসির অনুজ্জ্বল পারফরম্যান্সের মত পারফরম্যান্সও থাকে। কোন একটা ম্যাচে মেসি যদি কোনভাবে নিষ্প্রভ থাকেন, অপেক্ষাকৃত চতুর কোন প্রতিপক্ষ যদি মেসিকে থামানোর সকল সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত থাকে সেক্ষেত্রে অন্য কেউ কি আর্জেন্টিনাকে ম্যাচ জেতাতে পারবেন? দুঃখজনক হলেও সত্যি, উত্তরটা হবে না। আর্জেন্টিনা কি আদৌ বিশ্বকাপে ঔজ্জ্বল্য ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত? উত্তর – এখনকার অবস্থা বিবেচনা করলে – না। কেন নয়? সে উত্তর পাওয়ার জন্য আর্জেন্টিনার স্কোয়াডের দিকে একটু নজর রাখি, আসুন!

যেসব খেলোয়াড়ের ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের জন্য আর্জেন্টিনা দলে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে তারা হলেন –

গোলরক্ষক : সার্জিও রোমেরো (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), নাহুয়েল গুজম্যান (টিগ্রেস), অগাস্তিন মার্চেসিন (ক্লাব আমেরিকা), জিরোনিমো রুইয়ি (রিয়াল সোসিয়েদাদ), মারিয়ানো আন্দুজার (এস্তুদিয়ান্তেস), অ্যালেক্স ওয়েমার (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ)

ডিফেন্ডার : হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো (বার্সেলোনা), নিকোলাস ওটামেন্ডি (ম্যানচেস্টার সিটি), গ্যাব্রিয়েল মের্কাদো (সেভিয়া), ইম্যানুয়েল মামানা (অলিম্পিক লিওঁ), ফেদেরিকো ফাজিও (এএস রোমা), জার্মান পেজেলা (ফিওরেন্টিনা), মিল্টন ক্যাসকো (রিভারপ্লেট), নিকোলাস পারেহা (সেভিয়া), ফ্যাব্রিসিও বুস্তোস (ইন্দিপেন্দিয়েন্তে), হ্যাভিয়ের পিনোলা (রিভারপ্লেট), জোনাতান মাইদানা (রিভারপ্লেট), হোসে লুইস গোমেজ (ল্যানুস), নিকোলাস ত্যাগলিয়াফিকো (ইন্দিপেন্দিয়েন্তে), হুয়ান ফয়থ (টটেনহ্যাম হটস্পার), ভিক্টর কুয়েস্তা (ইন্দিপেন্দিয়েন্তে), ফ্যাকুন্দো রনক্যাগলিয়া (ফিওরেন্টিনা), রামিরো ফিউনেস মোরি (এভারটন), মার্কোস রোহো (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), এজেক্যিয়েল গ্যারায় (জেনিত সেইন্ট পিটার্সবার্গ), মার্কাস অ্যাকুনিয়া (স্পোর্টিং লিসবন)

মিডফিল্ডার : লুকাস বিগলিয়া (এসি মিলান), অ্যানহেল ডি মারিয়া (প্যারিস সেইন্ট জার্মেই), এনজো পেরেজ (ভ্যালেন্সিয়া), লিয়ান্দ্রো পারেদেস (জেনিত সেইন্ট পিটার্সবার্গ), এমিলিয়ানো রিগোনি (জেনিত সেইন্ট পিটার্সবার্গ), এভার বানেগা (সেভিয়া), এদুয়ার্দো সালভিও (বেনফিকা), অ্যালেহান্দ্রো গোমেজ (আটালান্টা), পাবলো পেরেজ (বোকা জুনিয়র্স), লুকাস রোমেরো (ক্রুজেইরো), ফার্নান্দো গ্যাগো (বোকা জুনিয়র্স), হ্যাভিয়ের পাস্তোরে (প্যারিস সেইন্ট জার্মেই), গ্যিদো পিজারো (সেভিয়া), অগুস্তো ফার্নান্দেজ (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), ম্যানুয়েল লানজিনি (ওয়েস্ট হ্যাম), ইগনাসিও ফার্নান্দেজ (রিভারপ্লেট), গ্যিদো রদ্রিগেজ (ক্লাব আমেরিকা), জিওভানি ল’ সেলসো (প্যারিস সেইন্ট জার্মেই), মাতিয়াস ক্রেইনভিটার (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), নিকোলাস গাইতান (বেনফিকা), এরিক লামেলা (টটেনহ্যাম হটস্পার), ইজেক্যিয়েল লাভেজ্জি (হেবেই চায়না ফরচুন), রবার্তো পেরেইরা (ওয়াটফোর্ড)

স্ট্রাইকার : লিওনেল মেসি (বার্সেলোনা), পাবলো ডিবালা (জুভেন্টাস), মাউরো ইকার্দি (ইন্টার মিলান), দারিও বেনেদেত্তো (বোকা জুনিয়র্স), লাউতারো অ্যাকোস্তা (ল্যানুস), সার্জিও অ্যাগুয়েরো (ম্যানচেস্টার সিটি), গঞ্জালো হিগুয়াইন (জুভেন্টাস), লুকাস আলারিও (বেয়ার লেভারক্যুসেন), হোয়াক্যুইন কোরেয়া (সেভিয়া), জোনাথান ক্যালেরি (সাও পাওলো), অ্যানহেল কোরেয়া (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), জিওভান্নি সিমিওনে (ফিওরেন্টিনা), ইজেক্যিয়েল পনচে (লিল)

মোটামুটি এই হল আর্জেন্টিনার স্কোয়াডের অবস্থা। এবং একেবারে অচেনা কাউকে তুলে না আনলে মোটামুটি এদের মধ্যে থেকেই সামনের বছর ২৩ সদস্যের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করবেন কোচ হোর্হে সাম্পাওলি এ কথা বলে দেওয়া যায় মোটামুটি। কিন্তু এই স্কোয়াড কি বিশ্বকাপ জেতার মত কোন স্কোয়াড?

প্রথমে গোলবারের নিচের পজিশান থেকে আলোচনা শুরু করা যাক। বিশ্বকাপ দলে মূলত গোলরক্ষক থাকেন তিনজন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরোর বিশ্বকাপ যাত্রা নিশ্চিত। ২০০৯ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা এই গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার কিংবা জিয়ানলুইজি বুফনের মত সুপারস্টার না হলেও সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আর্জেন্টিনা স্কোয়াডের অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আগে প্রচুর ভুল করা রোমেরো এখন সময়ের সাথে সাথে অনেক নির্ভরযোগ্যও হয়ে উঠেছেন। গোলরক্ষকের বাকী দুই পজিশনের জন্য টিগ্রেসের নাহুয়েল গুজম্যান ও ক্লাব আমেরিকার অগাস্টিন মার্চেসিন কিংবা রিয়াল সোসিয়েদাদের জিরোনিমো রুইয়ির স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক। তাই বলা যেতে পারে গোলবারের নিচে আর্জেন্টিনা মোটামুটি শক্তিশালীই।

গোলবারের নিচে সেই রোমেরোই ভরসা

এবার আসা যাক ডিফেন্সের বিষয়ে। প্রথমেই দেখি সেন্ট্রাল ডিফেন্সের কি অবস্থা। নতুন কোচ হোর্হে সাম্পাওলি আসার পর থেকে মূলত আর্জেন্টিনা তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার নিয়ে ৩-৪-৩ কিংবা ৩-৪-২-১ ফর্মেশানে খেলে যাচ্ছে। সেন্ট্রাল ডিফেন্সের এই তিন পজিশানে কোচের মূল পছন্দ হচ্ছেন বার্সেলোনার হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো, সেভিয়ার গ্যাব্রিয়েল মের্কাদো ও নিকোলাস ওটামেন্ডি। সাথে তাঁদের কেউ নিষিদ্ধ কিংবা ইনজুরিতে পড়লে কোচের নজর যায় লিওঁর ইম্যানুয়েল মামানা কিংবা এএস রোমার ফেদেরিকো ফাজিওর দিকে। এখানে বলে রাখা ভালো, ম্যাশচেরানো কিংবা মের্কাদো কেউই কিন্তু জাত সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার নন। বার্সেলোনাতে কার্লোস পুয়োল কিংবা জেরার্ড পিকের কেউ ইনজুরিতে পড়লে দেখা যেত সেন্টারব্যাক সংকটের কারণে হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানোকে কাজ চালানো সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলানো হত। পরবর্তীতে সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা ম্যাশচেরানো সেন্ট্রাল ডিফেন্সেও অনেক ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে এই পজিশানকেই আপন করে নেন। আর ওদিকে গ্যাব্রিয়েল মের্কাদো মূলত একজন ফুলব্যাক, যিনি কিনা সেন্টারব্যাক হিসেবেও খেলতে পারেন। সেভিয়াতে মের্কাদোকে ৪-৩-৩/৪-২-৩-১/৪-৪-২ ফর্মেশানে রাইটব্যাক (এমনকি কখনো কখনো লেফটব্যাকও) আর ৩-৫-২/৩-৪-৩/৩-৪-২-১ ফর্মেশানে রাইট উইংব্যাক পজিশানেও খেলতে দেখা যায় মাঝে মাঝে। আবার সেন্টারব্যাক হিসেবেও সেভিয়াতে খেলেন তিনি। ফুলব্যাক হিসেবে বেশ সাবধানী হবার কারণে তাঁকে এই সেন্টারব্যাকের ভূমিকা দেওয়া হয় মাঝে মাঝে। অর্থাৎ গ্যাব্রিয়েল মের্কাদোকে বলা যেতে পারে “জ্যাক অফ অল ট্রেডস মাস্টার অফ নান” এর এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ফুলব্যাক হিসেবেও সেরকম নজরকাড়া কেউ নন, সেন্টারব্যাক হিসেবেও বিশ্বের সেরাদের কেউ নন। আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচ হোর্হে সাম্পাওলি যখন সেভিয়ার কোচ ছিলেন তখন তিনিই এই মের্কাদোকে সেভিয়াতে এনেছিলেন, আর তিনিই এরকম বিভিন্ন বিভিন্ন পজিশানে সর্বপ্রথম মের্কাদোকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা শুরু করেন, যেটা কিনা বর্তমানে আর্জেন্টিনা দলের হয়েও বহাল আছে। ওদিকে গত বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার হয়ে সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে খেলা হাভিয়ের ম্যাশচেরানো এবার হয়ে গেছেন পুরোদস্তুর সেন্টারব্যাক। বাকী থাকেন ওটামেন্ডি। ক্যারিয়ারের শুরুতে এই ওটামেন্ডি কিন্তু খেলতেন রাইটব্যাক হিসেবে! মনে আছে? আর্জেন্টিনা যেবার বাংলাদেশে এসে নাইজেরিয়ার সাথে খেলে গেল? সেবার নিকোলাস ওটামেন্ডি কিন্তু রাইটব্যাক হিসেবেই খেলেছিলেন আর্জেন্টিনার হয়ে! নিকোলাস ওটামেন্ডির ক্ষেত্রেও গ্যাব্রিয়েল মের্কাদোর কথাটা প্রযোজ্য কিন্তু মের্কাদোর থেকে আবার সেন্টারব্যাক হিসেবে ওটামেন্ডি অপেক্ষাকৃত ভালো। নিজের ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতেও খেলেন সেন্টারব্যাক হিসেবেই। এক্ষেত্রে একটা কথা বলে রাখা ভালো, কোচ সাম্পাওলির মূল পছন্দের এই তিনজন সেন্টারব্যাকের অধ্যে মের্কাদো আর ওটামেন্ডি দুইজনের কেউই বল পজেশানে রেখে ডিফেন্স থেকে খেলা গড়তে অতটা স্বচ্ছন্দ নন, বল-প্লেয়িং সেন্টারব্যাক বলা যেতে পারেনা তাঁদের। দুইজনই তাঁদের এই দুর্বলতাটা তাঁদের গায়ের শক্তি দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করেন। ওদিকে হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো আবার তা নন। গায়ের শক্তি কিংবা রাফ অ্যান্ড টাফ ট্যাকলিং তো আছেই, সাথে বার্সেলোনাতে খেলার ফলে নিজেকে সময়ের সাথে সাথে বিশ্বের অন্যতম সেরা বল-প্লেয়িং সেন্টারব্যাক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এই ম্যাশচেরানো এখন আবার প্রচণ্ড ফর্মহীনতায় ভুগছেন। আর্জেন্টিনা-ইকুয়েডর ম্যাচটায় ইকুয়েডরের গোলটার কথাই ভাবুন, ম্যাশচেরানোর দুর্বল পজিশানিং ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই ম্যাচের ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গোল খেয়ে বসে আর্জেন্টিনা। এমনকি আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খুব সম্ভবত সবচেয়ে বাজে ম্যাচটা সেদিন খেলেছেন সমর্থকদের প্রিয় “এল জেফেসিতো”। বয়স প্রায় ৩৪ হয়ে যাওয়া ম্যাশচেরানো ফর্ম আদৌ ফিরে পাবেন কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সেক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে বিশ্বকাপ দলে চান্স পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী এগিয়ে আছেন লিওঁর ইম্যানুয়েল মামানা, জেনিত সেইন্ট পিটার্সবার্গের এজেক্যিয়েল গ্যারায়, এএস রোমার ফেদেরিকো ফাজিও, এভারটনের রামিরো ফ্যুনেস মোরি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মার্কোস রোহো। এখানে বলে রাখা ভালো, সাম্পাওলির আগে কোচ জেরার্ডো মার্টিনো কিংবা কিছুক্ষেত্রে এডগার্ডো বাউজার অধীনে আর্জেন্টিনা যখন চারজনের ডিফেন্স নিয়ে খেলত তখন আর্জেন্টিনার মূল দুই সেন্টারব্যাকের জায়গায় ম্যাশচেরানোর সাথে প্রায়ই রামিরো ফ্যুনেস মোরি খেলতেন। আর লেফটব্যাকে নিজের জায়গাটা পাকাপোক্ত করে ফেলেছিলেন মার্কোস রোহো। দুর্ভাগ্যবশত এই দুইজনই এই মৌসুমে ইনজুরিগ্রস্থ। তবে বিশ্বকাপের আগে আগে সুস্থ হয়ে গেলে এই দুইজনও রাশিয়ায় যাবেন, এ কথা বলা যায়। এখানে বলে রাখা ভালো, রোহো কিন্তু আবার নিজের ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে বামদিকের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে খেলেন! তবে একটা জিনিস একটু আশ্চর্যের, আর সেটা হল ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সেরা সেন্টারব্যাক এজেক্যিয়েল গ্যারায় এর এখন দলে না থাকা। বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনার কোচ আলেহান্দ্রো সাবেয়ার পর জেরার্ডো মার্টিনো তাঁকে কিছুদিন খেলিয়েছিলেন, কিন্তু পরে এডগার্ডো বাউজা এবং এখন হোর্হে সাম্পাওলি, কারোর পরিকল্পনাতেই গ্যারায় নেই, কিন্তু কেন নেই, সেই কারণ এখনো পর্যন্ত অজানা। অথচ সামনের বিশ্বকাপ রাশিয়ায় হবার কারণে এই গ্যারায়ই হতে পারতেন এখন আর্জেন্টিনার অন্যতম প্রধান তুরুপের তাস, কেননা এরই মধ্যে গ্যারায় দুই বছর রাশিয়ান ক্লাব জেনিত সেইন্ট পিটার্সবার্গের হয়ে দুইবছর খেলে এসে ঐ দেশের আবহাওয়া, পরিবেশ, কন্ডিশান, পরিস্থিতি সব কিছু বুঝে এসেছেন। আর রাশিয়ার এসবকিছু যেহেতু ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের থেকে আলাদা, সেই ক্ষেত্রে গ্যারায় হতে পারতেন এখন আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের অন্যতম কান্ডারি, বল পায়ে তার দক্ষতাও মের্কাদো কিংবা ওটামেন্ডির থেকে অনেক বেশী। কেন গ্যারায় এখন সাম্পাওলির পরিকল্পনাতে নেই, কেন নেই, আদৌ আসবেন কি বিশ্বকাপের আগে – কে জানে!

পড়তির দিকে এল জেফেসিতোর ফর্ম

আগের প্যারাটা পড়ে বুঝতেই পারলেন আমি কিন্তু আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের সবচেয়ে বড় সমস্যার দিকে ইতোমধ্যে নজর দিয়ে ফেলেছি। সেটা হল ফুলব্যাক সমস্যা।

আধুনিক ফুটবলের বিভিন্ন ফর্মেশানে ফুলব্যাক বা উইংব্যাকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানে চারজন/পাঁচজনের ডিফেন্সে যারা একদম ডান ও বাম প্রান্তে খেলেন আরকি। এখন ডিফেন্সের বামদিকে ও ডানদিকে খেলার মত একটা খেলোয়াড়ও নেই বর্তমানে আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে, দুঃখজনক হলেও সত্যি।

আধুনিক ফুটবলে ফুলব্যাকের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কয়েকটা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করছি। ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের কথা মনে আছে? এক রোনালদিনহো ছাড়া ব্রাজিলের সেই মিডফিল্ডে সেরকম কেউই সুপারস্টার কেউ ছিলোনা। জিলবার্তো সিলভা, ক্লেবারসন, এডমিলসন – সকলেই ঐ বিশ্বকাপের পরেই/বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়েই নিজেদের ফর্মের তুঙ্গে ওঠেন। তার আগে কিন্তু তারা প্রত্যেকেই আর দশটা মিডফিল্ডারের মতই সাধারণ ছিলেন। কিন্তু এই সাধারণ সেন্ট্রাল মিডফিল্ড দিয়েই লুইস ফেলিপে স্কলারি ব্রাজিলকে পঞ্চম বিশ্বকাপটা জেতান। কারণ? সেই সাধারণ মিডফিল্ডকে সামলানোর জন্য দুইপাশে কাফু আর রবার্তো কার্লোস নামের দুই বিশ্বসেরা ফুলব্যাক ছিলেন। দুইদিকে মেশিনের মত দৌড়াতে পারা, একইসাথে ডিফেন্স ও আক্রমণে পারদর্শী এই দুই ফুলব্যাককে সামলাতে প্রতিপক্ষ এতটাই হিমশিম খেত যে ব্রাজিলের মিডফিল্ড অত ভালো না হলেও সেটা ব্রাজিলের কোন ক্ষতির কোন কারণ হতে পারত না। ২০০৬ সালেও বিশ্বকাপজয়ী ইতালির ডিফেন্সের দুইদিকে দুই কার্যকরী ফুলব্যাক ফাবিও গ্রোসো আর জিয়ানলুকা জামব্রোত্তা ছিলেন, গ্রোসো তো সেমিফাইনালে গোল করে ইতালিকে ফাইনালেই নিয়ে গিয়েছিলেন। ২০১০ সালে স্পেইনের রামোস-ক্যাপডেভিয়া, ২০১৪ সালে জার্মানির লাম-হুভেডেস – প্রত্যেকেই ছিলেন কার্যকরী। পাপ গার্দিওলার বিশ্বজয়ী বার্সা দলের অন্যতম মূল দুই কাণ্ডারি ছিলেন দুই ফুলব্যাক দানি আলভেস আর এরিক আবিদাল। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের সেই বিখ্যাত চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী স্কোয়াডের দুই ফুলব্যাক ছিলেন গ্যারি নেভিল আর প্যাট্রিস এভরা। মরিনহোর অধীনে ইংলিশ লিগ কাঁপানো চেলসিতে ছিলেন পাওলো ফেরেইরা আর অ্যাশলি কোল, আর্সেনালের ইনভিন্সিবলস স্কোয়াডে ছিলেন লরেন আর অ্যাশলি কোল। সদ্য টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন লিগ জেতা রিয়াল মাদ্রিদ স্কোয়াডে দুই ফুলব্যাক পজিশান সামলেছেন দানি কারভাহাল আর মার্সেলো। শুধুমাত্র স্কোয়াডে ভালো কোন ফুলবাক ছিল না দেখেই ম্যানচেস্টার সিটিতে এসে প্রথম মৌসুমে কিছুই জিততে পারেননি পেপ গার্দিওলা। আধুনিক ফুটবলে ফুলব্যাকদের ভূমিকা যে কিরকম অপরিসীম, সেটা জানেন গার্দিওলা। তাই এইবার দলবদলের বাজারে বেছে বেছে সেরা তিনজন ফুলব্যাককে দলে এনেছেন তিনি – ডানদিকে কাইল ওয়াকার আর দানিলো, বামদিকে বেঞ্জামিন মেন্ডি। আর সেটার ফলাফল এখন হাতেনাতে পাচ্ছেন তিনি!

তো সমস্যা হল আর্জেন্টিনার এরকম একটা ফুলব্যাকও নাই বর্তমান স্কোয়াডে। ২০১৪ বিশ্বকাপে তাও ডানদিকে ম্যানচেস্টার সিটির পাবলো জাবালেতা আর বামদিকে মার্কোস রোহো ছিলেন, এবার রোহো থাকলেও জাবালেতা নেই। রোহো নিজেই আছেন ইনজুরিতে। ফলে বাছাইপর্বের শেষ কয়েকটা ম্যাচ প্রতিষ্ঠিত কোন ফুলব্যাক ছাড়াই তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার নিয়ে খেলেছে আর্জেন্টিনা। ভুগেছেও সেইরকম। শেষ ম্যাচে মেসি ম্যাজিক না হলে তো এই সমস্যার জন্যেই আর্জেন্টিনা বাদ পড়ে যেতেও পারত। তা হয়নি, কিন্তু আর্জেন্টিনার এই সমস্যার সমাধানও তো হয়নি!

রোহো না থাকায় আর্জেন্টনার ডিফেন্সের বামদিকটা (চার জনের ডিফেন্সে লেফটব্যাক। পাঁচ বা তিনজনের ডিফেন্সে লেফট উইংব্যাক) সামলাতে হচ্ছে স্পোর্টিং লিসবনের মার্কাস অ্যাকুনিয়াকে। যে মার্কাস অ্যাকুনিয়া আদতে একজন লেফট উইঙ্গার! অপরিচিত পজিশানে খেলার ফলে তার পারফরম্যান্সও হচ্ছে জঘন্য। বামদিক থেকে সেরকম সাহায্য তাই আসছে না আর্জেন্টিনা আক্রমণে।

বামদিকে তো তাও অ্যাকুনিয়া আছে, বা (ইনজুরি থেকে ফিরলে) রোহো আছেন, ডানদিকের অবস্থা আরও খারাপ। যে পজিশানে এককালে জানেত্তির মত খেলোয়াড় খেলতেন সেই পজিশানে (রাইটব্যাক, রাইট উইংব্যাক) এখন একজন ডিফেন্ডারও নেই। হোর্হে সাম্পাওলির ৩-৪-৩ বা ৩-৫-২ ফর্মেশানে ডানদিকে খেলতে হচ্ছে উইঙ্গার এদুয়ার্দো সালভিও বা আটালান্টার উইঙ্গার আলেহান্দ্রো ‘পাপু’ গোমেজকে। পরে দেখা যাবে হোর্হে সাম্পাওলি যদি ৪ জনের ডিফেন্স খেলান তাহলে ডানপায়ের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মের্কাদো নাহয় নিকোলাস ওটামেন্ডিকেই সেই পজিশানে খেলতে হচ্ছে। আছেন মিল্টন ক্যাসকোও। কিন্তু তার পারফরম্যান্সও হতাশাজনক। পাপু গোমেজ বা এদুয়ার্দো সালভিও কিংবা টটেনহ্যামের এরিক লামেলা, এরা ডানদিকে খেলতে পারলেও এরা ডিফেন্ডার না হবার কারণে ডিফেন্সের কাজটা করতে পারেননা। ফলে প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণ করে তারা সময়মত পিছনে চলে গিয়ে আক্রমণ আটকাতে পারেন না। যে কাজটা পারেন প্রতিষ্ঠিত কোন ফুলব্যাক/উইংব্যাক। আর্জেন্টিনা দলে এরকম খেলোয়াড় না থাকাটা অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ তাঁদের জন্য। মনে আছে ২০১৪ বিশ্বকাপের বেলজিয়ামের কথা? হ্যাজার্ড, লুকাকু, বেনটেকে, উইটসেল, ফেলাইনি, ভার্টঙ্ঘেন, ভ্যান বাইতেন, কর্তোয়া, ভারমায়েলেন, কারাসকো, মার্টেন্স – তারকায় ঠাসা দলটা কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বাদ পড়েছিল এই আর্জেন্টিনার কাছেই, শুধুমাত্র একটা কারণে। তাঁদের কোন প্রতিষ্ঠিত ফুলব্যাক ছিল না। সেন্টারব্যাকরাই ফুলব্যাক হিসেবে খেলত। ফলে তাঁদের খেলার স্টাইলটা অনেক ‘ন্যারো’ ছিলো। দুই উইং ব্যবহার করে না খেলতে পারার ফলে তাঁদের খেলার স্টাইল অনেক বেশী অনুমেয় আর বিরক্তিকর ছিল, যার মাশুল তারা দেয় কোয়ার্টার ফাইনালেই আর্জেন্টিনার কাছ থেকে বাদ পড়ে। এবারও যে আর্জেন্টিনার কপালে সেরকম কিছু নেই, সেটা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছেনা কিন্তু। এই ফুলব্যাক সমস্যাটা লিওনেল মেসির পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ অর্জনের ক্ষেত্রে বিরাট একটা বাধা হিসেবে উপস্থিত হতে পারে। বিশেষত ৩-৪-৩ ফর্মেশানের অনুরাগী সাম্পাওলির সিস্টেমে ফুলব্যাকদের ভূমিকা অনেক, চিলির হলে কোপা আমেরিকা জেতানো সেই দলে দুজন কার্যকরী উইংব্যাক ছিলেন। মাঝে ছিলেন গ্যারি মেদেল ও আর্তুরো ভিদালের মত পাওয়ারহাউজ মিডফিল্ডাররা, যারা মাঝমাঠকে এতটাই দুর্ভেদ্য রাখতেন যে দুইপাশ দিয়ে দুই উইংব্যাক ডিফেন্সের চিন্তা বাদ দিয়ে আক্রমণে যোগ দিতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্পাওলির এই আর্জেন্টিনা দলে সেই বিলাসিতা করার সুযোগ নেই।

আধুনিক যুগের সফল যত দল আছে, বার্সেলোনা, জার্মানি, স্পেইন, রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ, চেলসি – মোটামুটি সবাই-ই “হাই লাইন ডিফেন্স” এই সিস্টেমে খেলে। অর্থাৎ দলের ডিফেন্ডাররা মাঠের মধ্যে বেশ উঁচু অবস্থানে থাকেন। খেয়াল করলে দেখবেন, এসব দলের ডিফেন্স লাইন (ডিফেন্ডাররা যেভাবে দাঁড়িয়ে থাকে তাদেরকে একটা সরলরেখায় কল্পনা করলে যে লাইন টা হয়) একেবারে মাঝমাঠের সেন্টার লাইনের কাছাকাছি। দলে যদি দ্রুতগতির ডিফেন্ডার থাকেন ও কার্যকরী ফুলব্যাক থাকেন, তবে এই হাই লাইন ডিফেন্স সিস্টেমটা আপনাকে দু’হাত ভরে পুরষ্কৃত করবে। কারণ মাঠের বেশ উপরে থাকার কারণে ও ডিফেন্ডাররা বল পায়ে দক্ষ হবার কারণে তারা শুধুমাত্র কেতাবি রক্ষণ করা ছাড়াও আক্রমণে অংশ নিতে তো পারছেই, সাথে প্রতিপক্ষের কাছে বল হারিয়ে ফেললেও দ্রুতগতিতে পিছনে নেমে এসে আক্রমণ নস্যাতও করে দিতে পারছে। হাই লাইন ডিফেন্সে খেললে স্বাভাবিকভাবেই মিডফিল্ডারদের বল আনার জন্য পিচের বেশী নিচে নামতে হয়না, আক্রমণ রচনা করার জন্য বেশী নিচে নামতে হয়না। বল পায়ে দক্ষ ডিফেন্ডাররাই আক্রমণের শুরুটা করে দিতে পারেন। চেলসির ডেভিড লুইজ, এসি মিলানের লিওনার্দো বোনুচ্চি কিংবা বায়ার্নের ম্যাটস হামেলসের কথা চিন্তা করুন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আর্জেন্টিনার কোণ ডিফেন্ডারই বল পায়ে অতটা দক্ষ নন, ফলে সাম্পাওলি চাইলেও “হাই লাইন ডিফেন্সে” প্রেসিং দেওয়া ফুটবল খেলাতে পারেন না, কারণ একবার যদি ডিফেন্ডাররা মাঝমাঠ থেকে বলের দখল হারিয়ে ফেলেন, একদম কেল্লাফতে হয়ে যাবে! তাঁর উপর আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডও সেরকম সৃষ্টিশীল নয় (এ প্রসঙ্গে একটুপর আসছি), যার কারণে প্রায়ই দেখা যায় লিওনেল মেসি নিজেই উপর থেকে নিচে নেমে এসে প্লেমেকিং এর কাজটাও করে দিয়ে যান। এটা অনেক বড় একটা সমস্যা।

এবার মনোযোগ দেওয়া যাক মিডফিল্ডে। মিডফিল্ডের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পজিশান হল সেন্ট্রাল মিডফিল্ড। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের মধ্যেও প্রকারভেদ আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করা শুরু করলে সেটা নিয়েই আলাদা এক-দুইটা আর্টিকেল হয়ে যাবে যদিও। তাও মোটামুটি অল্প কথায় বোঝানোর চেষ্টা করি। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের মধ্যেও কিছু প্রকারভেদ আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটা প্রকার হল – সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার (CDM), বক্স-টু-বক্স সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ও রেজিস্টা/ডিপ লায়িং প্লেমেকার (Regista/Deep Lying Playmaker)। সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান দায়িত্ব হল নিজের ডিফেন্সের সামনে থেকে ডিফেন্সকে রক্ষা করা, ডিফেন্সের ঢাল হিসেবে কাজ করা। একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সবসময়েই চাইবেন প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে বা ট্যাকল করে মিডফিল্ডেই প্রতিপক্ষকে থামিয়ে দিতে, প্রতিপক্ষ ডিফেন্স পর্যন্ত যাওয়ার আগেই। কোন কারণে তিনি যদি সেই কাজটা করতে না পারেন, প্রতিপক্ষকে আটকাতে না পারেন শুধুমাত্র তখনই ডিফেন্সকে প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে হয়। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের ভূমিকাটা হয় একটা অতিরিক্ত ডিফেন্ডারের, পরে সময়-সুযোগ পেলে চাইলে তিনি উপরে উঠে আক্রমণে যোগ দিতেও পারেন বা না-ও পারেন, কিন্তু মিডফিল্ডেই ট্যাকল-ইন্টারসেপ্ট করে প্রতিপক্ষকে আটকে দেওয়াটাই তার প্রধান দায়িত্ব। মিডফিল্ড থেকে খেলা বানিয়ে দেওয়াটা তার দায়িত্ব নয়। এ ধরণের মিডফিল্ডারদের মধ্যে সর্বসেরা হলেন ফ্রান্সের ক্লদ ম্যাকেলেলে। অন্যান্য সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হল ইতালির জেনারো গাত্তুসো ও ড্যানিয়েলে ডি রসি, ঘানার মাইকেল এসিয়েন, আয়ারল্যান্ডের রয় কিন। এখনকার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের মধ্যে সেরা হলেন ফ্রান্সের এনগোলো কান্তে, জার্মানির স্যামি খেদিরা, সার্বিয়ার নেমানিয়া মাতিচ, ব্রাজিলের ফার্নান্দিনহো ও ক্যাসেমিরো, চিলির গ্যারি মেদেল, আর্জেন্টিনার হ্যাভিয়ের ম্যাশ্চেরানো।

এরপর আসা যাক বক্স-টু-বক্স সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের দিকে। এরা অনেকটা ইঞ্জিনের মত। পুরো নব্বই মিনিট ধরে মেশিনের মত নিজ দলের ডিবক্স থেকে প্রতিপক্ষের ডিবক্স পর্যন্ত অবিরাম দৌড়াদৌড়ি, বল কেড়ে নেওয়া, নিজে শট নেওয়া, পাস দেওয়া এসব কাজ করবেন। মানে একজন আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজ তো করেনই, সাথে আক্রমণে যাওয়ারও স্বভাব আছে একজন বক্স-টু-বক্স সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের। আগের যুগে এইধরণের মিডফিল্ডার ছিলেন নেদারল্যান্ডের ইয়োহান নিসকেন্স ও ক্ল্যারেন্স সিডর্ফ, জার্মানির লোথার ম্যাথাউস, ইংল্যান্ডের স্টিভেন জেরার্ড ও ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড। এখনকার ফুটবলারদের মধ্যে এই ভূমিকায় সেরা হলেন চিলির আর্তুরো ভিদাল, আইভোরি কোস্টের ইয়ায়া ত্যুরে, ফ্রান্সের তিমুইয়ে বাকায়োকো ও পল পগবা, গিনির নাবি কেইটা, ব্রাজিলের পাওলিনহো ইত্যাদি। প্রায়ই এরা নিজেরা একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজ করতে গিয়ে উপরে উঠে যান, দূরপাল্লার শট নেবার চেষ্টা করেন, অবিরত প্রাণশক্তির উৎস হয়ে মাঠময় প্রতিপক্ষের পিছে লেগে থাকেন।

এবার আসা যাক রেজিস্টা/ডিপ লায়িং প্লেমেকার এই পজিশনটার দিকে। এই পজিশানে খেলোয়াড় একদম হাতেগোনা। এই স্টাইলে খেলতে পারার জন্য একদম নিখুঁত পাস (সেটা দূরপাল্লার হলেও হবে) দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে, একেবারে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ রচনা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। ভুল পাস একদম দেওয়াই যাবেনা। এই পজিশানে কিছুদিন আগ পর্যন্তও বিশ্বসেরা তিনজন খেলোয়াড় এই পজিশানে খেলে গেছেন – স্পেইনের জাভি হার্নান্দেজ ও জাবি আলোনসো, ইতালির আন্দ্রেয়া পিরলো। এখনকার খেলোয়াড়দের মধ্যে ইংল্যান্ডের মাইকেল ক্যারিককে এই ভূমিকার একজন খেলোয়াড় বলা যেতে পারে। এখনকার অন্যান্য খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মডরিচ, জার্মানির জুলিয়ান ভাইগেল, বসনিয়ার মিরালেম পিয়ানিচ ও স্পেইনের বোর্হা ভ্যালেরোকে মোটামুটি এই পজিশানের খেলোয়াড় বলা যেতে পারে। এ ধরণের মিডফিল্ডারদের আবার ডিফেন্স/ট্যাকল/ইন্টারসেপ্ট করার দায়িত্ব নেই। তারা শুধু চোখ বন্ধ করে সঠিক পাসের ফুলঝুরিতে আক্রমণ শানাবে, এটাই তাদের প্রধানতম দায়িত্ব।

মজার ব্যাপার হল এদের মধ্যেও অনেক মিডফিল্ডার আছেন যাদের কোন স্টাইলের গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না। সার্জিও বুসকেটসের কথাই ধরুন। তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বলা হলেও তার কাজ একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের চেয়েও বেশী কিছু। তিনি অনেকটা খাঁটি ডিফেন্সিভ মিড আর একজন Deep Lying Playmaker এর হাইব্রিড রূপ। একই কথা বলা যেতে পরে জার্মানির জুলিয়ান ভাইগেলের ক্ষেত্রেও। জার্মানির টোনি ক্রুস আবার Deep Lying Playmaker আর বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের মিশেল।

এই তিন ধরণের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের মধ্যে মূলত একজন রেজিস্টা (নিখুঁত পাস দিয়ে দিয়ে আক্রমণের কলকাঠি নাড়াতে পারে এমন) বা Deep Lying Playmaker এর গুরুত্ব সর্বাধিক। হিসাব করে দেখুন, প্রায় প্রত্যেকটা বিশ্বজয়ী দলেই মিডফিল্ড থেকে এরকম একটা করে আক্রমণের কলকাঠি নাড়ানো একজন করে পাস মাস্টার আছেন। অ্যান্দ্রেয়া পিরলোর উপর ভর করে ইতালি জিতেছিল একটা বিশ্বকাপ, উঠেছিল ২০১২ ইউরোর ফাইনালে, ২০১৩ কনফেডে হয়েছিল তৃতীয়। এই আন্দ্রেয়া পিরলোকে কেন্দ্র করেই কার্লো অ্যানচেলত্তির বিশ্বসেরা এসি মিলান দল জিতেছিল দুটো চ্যাম্পিয়নস লিগ, দুটো লিগ। উঠেছিল আরেকটা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও, মহাকাব্যিক যে ফাইনালে এসি মিলান লিভারপুলের কাছে হেরে যায়। সেই লিভারপুল দলেও ছিলেন জাবি আলোনসো নামের এক রেজিস্টা। পরে পিরলো জুভেন্টাসের হয়েও টানা তিনটা লিগ জিতেন, একবার দলকে নিয়ে যান চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও। এখন লুকা মডরিচকে নিয়ে যেরকম একের পর এক সাফল্যগাথা রচনা করছেন জিনেদিন জিদান, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে। পেপ গার্দিওলার বিশ্বজয়ী বার্সা ও দেল বস্কের বিশ্বজয়ী স্পেইন দলের মূল প্রাণভোমরা তো ছিলেন এরকম একজন রেজিস্টা – জাভি হার্নান্দেজ। ইতালির বিশ্বকাপজয়ী ১৯৮২ দলে ছিলেন জিয়ান্নি রিভেরা, সত্তরের বিশ্বজয়ী ব্রাজিল দলে ছিলে গারসন। বুঝতেই পারছেন একজন পাস মাস্টারের ভূমিকা কিরকম একটা দলে, বিশেষত যে দলটা তিন থেকে পাঁচজন মিডফিল্ডার নিয়ে খেলে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি বর্তমান আর্জেন্টিনা দলে এরকম কেউ নেই। একদম নেই। সাম্পাওলির মিডফিল্ডে ঘুরেফিরে বর্তমানে যাদের খেলানো হয় তারা হলেন লুকাস বিলিয়া, এনজো পেরেজ, ফার্নান্দো গ্যাগো, এভার বানেগা, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, অগুস্তো ফার্নান্দেজ – এরাই। এদের মধ্যে লুকাস বিলিয়াকেই মোটামুটি কার্যকরী একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বলা যেতে পারে। অন্যান্য মিডফিল্ডারদের মধ্যে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার আর আছেন অগুস্তো ফার্নান্দেজ। এনজো পেরেজ আর এভার বানেগার ধরণটা অনেকটা বক্স-টু বক্স মিডফিল্ডারের। এদের মধ্যে কেউ যদি সামান্যতম রেজিস্টা হবার একটু হলেও যোগ্যতা রাখেন তিনি লিয়ান্দ্রো পারেদেস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তিনি এখনো সাম্পাওলির মূল একাদশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। রাশিয়ান ক্লাব জেনিত সেইন্ট পিটার্সবার্গের এই মিডফিল্ডার আগে থেকেই রাশিয়াতে খেলে খেলে নিজেকে গড়ে তুলছেন, রাশিয়ান সংস্কৃতি ও পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন, সাথে পাসও দিতে পারেন বেশ নিখুঁত, আক্রমণ রচনা করতে পারেন। তাই সাম্পাওলি যত তাড়াতাড়ি পারেদেসকে সুনজরে আনতে পারেন, ততই ভালো।

যেহেতু প্রত্যেকটা দলের রেজিস্টাদের মূল কাজ থাকে পাসের পর পাস নিখুঁতভাবে দেওয়ার, এবং যেহেতু ডিফেন্ড করাটা তাদের মূল লক্ষ্য না, তাই তাদেরকে মাঠে সঠিকভাবে খেলতে দেওয়ার জন্য তাদের পাশে অতি আবশ্যিকভাবে একজন বা দুইজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, নাহয় বক্স-টু-বক্স সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের উপস্থিতি থাকতে হয়। কারণ, সেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার প্রতিপক্ষের পা থেকে ট্যাকল ইন্টারসেপ্ট করে বল কেড়ে নিয়ে রেজিস্টাকে আক্রমণ রচনা করার জায়গা করে দেন। এ কারণেই অ্যান্দ্রেয়া পিরলো ইতালি দলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে পেয়েছিলেন জেনারো গাত্তুসো আর ড্যানিয়েলে ডি রসি কে, মিলান দলে পেয়েছিলেন গাত্তুসো আর ক্ল্যারেন্স সিডর্ফকে, জুভেন্টাসে এসে পেয়েছিলেন আর্তুরো ভিদালকে। স্পেইন আর বার্সেলোনাতে জাবি আলোনসো আর জাভি হার্নান্দেজের সঙ্গী ছিলেন সার্জিও বুসকেটস। এখন রিয়াল মাদ্রিদে লুকা মডরিচ আর টোনি ক্রুসের জন্য এই ভূমিকাটা পালন করেন ক্যাসেমিরো।

এখন আর্জেন্টিনা দলে এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজটা মোটামুটি লুকাস বিলিয়াকে দিয়ে করানো গেলেও আদর্শ রেজিস্টা/Deep Lying Playmaker এর কাজটা কাউকে দিয়েই হয়না। কারণ লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে সাম্পাওলি নিয়মিত খেলান না, আর এভার বানেগা, ফার্নান্দো গ্যাগো রা জঘন্য খেলেন। ফলে মিডফিল্ড থেকে আক্রমণ রচনা করার কেউই নেই, মিডফিল্ড থেকে আক্রমণের সংযোগটা একদম শূণ্যের কোঠায়। ফলে যে সমস্যাটা হয়, আক্রমণভাগ থেকে লিওনেল মেসিকে নিচে নেমে এসে নিজেকেই আক্রমণ রচনা করতে হয়, আবার সেই আক্রমণের সমাপ্তিও নিজেকেই করতে হয় – এ এক পাহাড়সম দায়িত্ব। বার্সায় জাভির কাছ থেকে যে সার্ভিসটা মেসি পেতেন, সে কাজটা এখনো মেসিকে নিজেরই করা লাগে, সাথে নিজের কাজটা তো আছেই। মিডফিল্ডে সৃষ্টিশীল খেলোয়াড় না থাকলে যা হয় আরকি। এই পজিশানে ভালো কোন খেলোয়াড় না পেলে কিংবা কেউ পারফর্ম করা শুরু না করলে আর্জেন্টিনার কপালে ভালো ভোগান্তি আছে।

ওয়াইড মিডফিল্ড/উইং পজিশানের বামদিকে অ্যানহেল ডি মারিয়ার থাকাটা নিশ্চিত। কিন্তু তাঁকে খামোকা অপ্রয়োজনীয় শট নেওয়ার বাতিকটা কমাতে হবে। মেসির সাথে সমন্বয় করে খেলতে পারলে মেসি-ডি মারিয়ার মত বিধ্বংসী জুটি খুব কমই আছে বিশ্বে। কিন্তু ডি মারিয়া নিজে মাঝে মাঝে মাতবরি করে একাই শট নিতে যান কোন ধরণের সমন্বয় ছাড়া, যে কারণে আর্জেন্টিনা দলকে ভুগতে হয় অনেক, মেসির উপরেও চাপ পড়ে যায় অনেক। এ পজিশানে ডি মারিয়ার ব্যাকআপ হিসেবে বিশ্বকাপে থাকতে পারেন বেনফিকার নিকোলাস গাইতান। ৪-৩-৩ বা ৩-৪-৩ ফর্মেশানে ডান উইংয়ের পজিশনটা যথারীতি মেসির। মিডফিল্ডের ডানদিকে অন্যান্য খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছেন আটালান্টার অ্যালেহান্দ্রো গোমেজ, টটেনহ্যামের এরিক ল্যামেলা, বেনফিকার এদুয়ার্দো সালভিও। সালভিও, গাইতান, লামেলা, গোমেজ – কেউই চোখে পড়ার মত ফর্মে নেই জাতীয় দলের হয়ে।

এবার আসা যাক স্ট্রাইকারদের দিকে। ঐতিহ্যগতভাবেই আর্জেন্টিনা দলটা সবসময় স্ট্রাইকারদের দিয়ে ঠাসা থাকে। এবারও তাঁর ব্যতিক্রম নেই। সামনের বিশ্বকাপে দলে ডাকার জন্য কোচ হোর্হে সাম্পাওলি পাচ্ছেন লিওনেল মেসি, পাবলো ডিবালা, মাউরো ইকার্দি, গঞ্জালো হিগুয়াইন, সার্জিও অ্যাগুয়েরোর মত স্ট্রাইকারদের। সাথে তরুণ প্রতিভাদের মধ্যে অ্যানহেল কোরেয়া, ইজেক্যিয়েল পনচে, জিওভান্নি সিমিওনে, এরা তো আছেনই। আছেন দারিও বেনেদেত্তো ও লুকাস আলারিওর মত খেলোয়াড়ও। জাতীয় দলের হয়ে হিগুয়াইন-অ্যাগুয়েরোদের ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণেই কি না, সাম্পাওলি দলে ডেকেছেন ডিবালা, ইকার্দি, বেনেদেত্তো, অ্যাকস্টাদের।

এখন সাম্পাওলির হাতে অনেক অপশান থাকলেও তিনি কম্বিনেশানের অভাবে খেলাতে পারছেন না। জুভেন্টাসের পাবলো ডিবালার কথাই ধরা যাক। অনেকের মতেই মেসির পর ডিবালার হাতেই উঠতে যাচ্ছে বিশ্বসেরা হবার ব্যাটনটা। কিন্তু মেসি ও ডিবালা, দুইজনের খেলার স্টাইল এতটাই একরকম, যে দুইজনকে একই সাথে খেলাতে পারছে না সাম্পাওলি, খেলালে দলের কম্বিনেশানটা থাকছে না। ফলে ডিবালার মত প্রতিভাকে ম্যাচের পর ম্যাচ বেঞ্চে বসে থাকতে হচ্ছে। হিগুয়াইন-অ্যাগুয়েরোর জাতীয় দলের ফ্লপ হবার দরুণ যাদের দলে ডাকা হচ্ছে তাদেরকেও সেই হিগুয়াইন-অ্যাগুয়েরোর ব্যধিতেই ধরেছে, গোল না করতে পারার ব্যধি। ৩-৪-৩ ফর্মেশানে শেষ দুই ম্যাচ বোকা জুনিয়র্সের গোল মেশিন দারিও বেনেদেত্তোকে খেলিয়েছেন সাম্পাওলি, বেনেদেত্তোর মুভমেন্ট, জায়গা সৃষ্টি করার ক্ষমতাটা চোখে পড়লেও তাঁকে ঠিক গোলশিকারী বলা যাচ্ছেনা, গোলের মুখে আসলেই গোল করতে ভুলে যাচ্ছেন তিনি। ইকার্দিও একই রোগের রোগী।

এখন আর্জেন্টিনার বর্তমান স্কোয়াড পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে দলে একটা প্লেমেকার, একটা গোল করতে পারা ফর্মে থাকা তুখোড় স্ট্রাইকার, আর দুই দিকে দুই রক্ষণশীল মনোভাবের উইংব্যাকের প্রয়োজনীয়তা প্রচণ্ড, নয়ত উইংনির্ভর ৩-৪-৩ ফর্মেশানে যেকোন সময়েই সমস্যায় পড়তে পারে তারা। ফলে আর্জেন্টিনাকে যদি চূড়ান্ত ডিফেন্সিভ কোন স্টাইলে খেলতে দেখেন তাহলে আশ্চর্য হবেন না কিন্তু মোটেও। এই স্কোয়াডই যদি থাকে, তবে আর্জেন্টিনার স্টাইল হওয়া উচিত প্রচণ্ড ডিফেন্সিভ, সাথে বল পায়ে আসলেই দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। এই দলে ডিবালার মত খেলোয়াড়কে না খেলাতে পারাটাও এখন পর্যন্ত সাম্পাওলির একটা ব্যর্থতা। একজন আর্জেন্টিনা সমর্থক হিসেবে অবশ্যই চাইবো ডিবালা তাঁর আইডলের সাথে সমন্বয় করে খেলতে পারুন। আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এই সমস্যার যে সমাধানটা আসছে, সেটা হল ৩-৪-৩ ফর্মেশানটাকে একটু পরিবর্তন করে, ৩-৩-১-৩ বানিয়ে মেসিকে মিডফিল্ডে খেলানো, প্লেমেকার হিসেবে। আর সামনে মেসির রাইট উইং এর জায়গাটায় খেলবেন ডিবালা। ফর্মেশানটা এরকম হতে পারে –

মেসি এর আগেও আর্জেন্টিনার হয়ে প্লেমেকার হিসেবে খেলেছেন, তাই এই ৩-৩-৩-১ বা ৩-৩-১-৩ ফর্মেশানটা তাঁকে আবারো প্লেমেকার হিসেবেই খেলতে সাহায্য করবে, আমরা জানি মেসি গোল করার পাশাপাশি গোল করানোতেও কত বেশী পটু, এই ফর্মেশানে মেসির মূল কাজ হবে বল বানিয়ে দেওয়া (যে কাজটা মেসিকে আর্জেন্টিনার হয়ে এমনিতেও হরহামেশাই করতে হয়)। উপরের তিনজন ফরোয়ার্ডের মধ্যে মেসি সাধারণত যে পজিশানে খেলেন, সেই রাইট উইংয়ে খেলবেন ডিবালা। বাম উইংইয়ে যথারীতি থাকবেন ডি মারিয়া আর মূল স্ট্রাইকারের জায়গায় লড়াই হবে ইকার্দি, হিগুয়াইন ও অ্যাগুয়েরোর মধ্যে। মেসি যেহেতু প্লেমেকিং করবেন সেহেতু মিডফিল্ডে তাঁর ঢাল হিসেবে কাজ করবেন লুকাস বিলিয়া। যেহেতু স্কোয়াডে কোন ফুলব্যাক নেই সেই দুর্বলতাটাও ৩-৩-১-৩ ফর্মেশানে কাটানো যাবে কারণ এই ফর্মেশানে বিলিয়ার ডানদিকে খেলবেন ডানপায়ের মের্কাদো, আর বামদিকে খেলবেন বামপায়ের রোহো। রোহো আর মের্কাদো আগেও ফুলব্যাক হিসেবে খেলেছেন তাই এই ভূমিকায় তাদের সমস্যা হবার কথা নয়, ফুলব্যাক হলেও তারা বেশী আক্রমণে যাবেন না, মিডফিল্ডের উপরে তেমন উঠবেন না। এই তিনজনের উপরেই প্লেমেকার হিসেবে থাকবেন মেসি। আর পেছনে তিনজন সেন্টারব্যাকের জায়গায় খেলানো হবে ওটামেন্ডি, ম্যাশচেরানো আর গ্যারায় কে। গোলরক্ষক হিসেবে যথারীতি থাকবেন সার্জিও রোমেরো। প্রতিপক্ষের পায়ে বল চলে গেলে ডিফেন্ড করার সময় এই ৩-৩-১-৩ ফর্মেশানটাই হয়ে যাবে ৫-২-৩ এর মত। রোহো, ওটামেন্ডি, ম্যাশ্চেরানো, বিলিয়া, মের্কাদো – সবাই রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হবার কারণে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলাতে বেগ পাবার কথা নয়। আর বল পায়ে গেলেই মেসি, ডি মারিয়া বা ডিবালাদের দ্রুতগতিতে কাউন্টারে যেতে হবে।

এবার হবে তো?

সবই উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা। তবে এখন স্কোয়াডের যে অবস্থা, সে অবস্থার উপর ভিত্তি করে ২৩ সদস্যের বিশ্বকাপগামী যে দলটা আর্জেন্টিনার হওয়া উচিত তা হল :

  • গোলরক্ষক – সার্জিও রোমেরো, নাহুয়েল গুজম্যান, জেরোনিমো রুইয়ি
  • ডিফেন্ডার – হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো, নিকোলাস ওটামেন্ডি, ইজেক্যিয়েল গ্যারায়, মার্কোস রোহো, গ্যাব্রিয়েল মের্কাদো, ইম্যানুয়েল মামানা, মার্কাস অ্যাকুনিয়া, ফেদেরিকো ফাজিও, রামিরো ফ্যুনেস মোরি
  • মিডফিল্ডার – লুকাস বিলিয়া, অ্যানহেল ডি মারিয়া, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, এনজো পেরেজ, ম্যানুয়েল লানজিনি, এদুয়ার্দো সালভিও
  • স্ট্রাইকার – লিওনেল মেসি, মাউরো ইকার্দি, পাবলো ডিবালা, গঞ্জালো হিগুয়াইন, সার্জিও অ্যাগুয়েরো

একজন সমর্থক হিসেবে অবশ্যই চাইবো সুন্দর ফুটবল খেলেই যেন আর্জেন্টিনা লিওনেল মেসির পরম আরাধ্য বিশ্বকাপটা নিয়ে এসে মেসিকে অবিসংবাদিতভাবে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হতে সাহায্য করে। কিন্তু আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে খেলোয়াড়দের ট্যাকটিক্যাল দৈন্যতা আমাকে আশাবাদী করেনা। এই স্কোয়াড নিয়ে ট্রফি জিততে হলে দম বন্ধ করা ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলে গোলের জন্য প্রতিপক্ষের ভুল আর নিজেদের কাউন্টার অ্যাটাকের উপর নির্ভর করতে হবে। তাও, আশায় বুক বাঁধতে তো ক্ষতি নেই। ২০০৪ ইউরোতে গ্রিস, কিংবা ২০১০ সালের ট্রেবলজয়ী ইন্টার মিলান তো দেখিয়েই দিয়েছে, ট্রফি জিততে সবসময় যে সুন্দর ফুটবলই খেলা লাগবে, তার তো কোন মানে নেই!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × 3 =