ইতালির নতুন ভরসা – অ্যান্দ্রেয়া বেলোত্তি

সাধারণত কালজয়ী ডিফেন্ডারদের জন্য ইতালি বিখ্যাত হলেও, বছরের পর বছর তারা আক্রমণভাগেরও এমনকিছু খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে ফুটবল বিশ্বকে, যারা রচনা করেছেন নতুন নতুন ইতিহাস। ফ্র্যানচেস্কো টট্টি, ভ্যালেন্তিনো মাজোলা, স্যান্দ্রো মাজোলা,  রবার্তো বাজ্জিও, অ্যালেসসান্দ্রো দেল পিয়েরো, হোসে আলফাতিনি, জিউসেপ্পে মিয়াজ্জা, ফিলিপ্পো ইনজাঘি, ক্রিস্টিয়ান ভিয়েরি, সিলভিও পিওলা, জিয়ানফ্রাঙ্কো জোলা, লুইজি রিভা… নাম শুরু করলে শেষ করা যাবেনা। তাই প্রত্যেকটা বৈশ্বিক টুর্নামেন্টেই কিংবদন্তী ডিফেন্ডারদের পাশাপাশি স্ট্রাইকারভাগ্যও যথেষ্টই সুপ্রসন্ন ছিল ইতালির। ছিল বলতে হচ্ছে, কেননা সেই টট্টি-ভিয়েরি-ইনজাঘি-টনি-দেল পিয়েরোদের যুগের পর সেরকম কেউই স্ট্রাইকার হিসাবে ইতালির আশার বাতিঘর হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। মারিও বালোতেলি কিংবা আন্তোনিও কাসানোদের ক্যারিয়ারটাই চলে যাচ্ছে “ব্যাড বয়” ইমেজের সাথে তাল মেলাতে মেলাতে, অ্যালেসসান্দ্রো মাত্রি, ফাবিও কুয়াগলিয়ারেল্লা, জিয়ামপাওলো পাজ্জিনি,  আলবার্তো জিলার্দিনো, আন্তোনিও ডি নাটালে, ভিনসেনজো ইয়াকুইন্তারা জাতীয় পর্যায়ে কখনই নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি, জিউসেপ্পে রসি কিংবা স্টেফান এল শারাউইদের মূল লড়াইটা আবার ইনজুরির সাথে। আর এডার, গ্রাজিয়ানো পেলে, সিমোনে জাজা, মার্কো বরিয়েল্লো – এদের ইতালির স্ট্রাইকার হবার সেই ধরণের প্রতিভা কখনই ছিল না। স্ট্রাইক পজিশানে পর্যাপ্ত প্রতিভার অভাব থাকার খেসারত ইতালিকে দিতে হয়েছে ২০১৪ বিশ্বকাপে, দিতে হয়েছে এই ২০১৬ ইউরোতেও। কিন্তু এখন অবস্থার একটু একটু করে পরিবর্তন হচ্ছে সেটা বলাই যায়।

বলা যায় সেটা এক তরুণ স্ট্রাইকারের জন্য। অ্যালবিনোলেফে, পালেরমোর পর তোরিনো মাতিয়ে এখন ইতালি জাতীয় দলের মূল স্ট্রাইকিং ভারটা এখন যার কাঁধে ন্যস্ত – তাঁর জন্য। বলছি তরুণ ইতালিয়ান স্ট্রাইকার অ্যান্দ্রেয়া বেলোত্তির কথা।

অ্যান্দ্রেয়া বেলোত্তি
অ্যান্দ্রেয়া বেলোত্তি

এই মৌসুমে এই পর্যন্ত তোরিনোর হয়ে ১৩ ম্যাচে ১০ গোল করে ইতালি দলে ডাক পেয়েছেন স্বাভাবিকভাবেই। ইতালি দলে ডাকও দিয়েছেন সেই কোচ, তোরিনোতে যার সময় এসেছিলেন তিনি – সেই তোরিনো কোচ এখন ইতালির দায়িত্বে ; জিয়ামপিয়েরো ভেঞ্চুরা।

অ্যালবিনোলেফের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা এই স্ট্রাইকার সিরি আ তে কিন্তু নিজের ক্যারিয়ার শুরু করতে পারেননি, বুঝতেই পারছেন। এই ক্লাবের হয়ে প্রতিভার ঝলক দেখানো নজরে এড়ায়নি তখন মাত্র সিরি আ থেকে অবনমিত হওয়া ক্লাব পালের্মোর কর্তাব্যক্তিদের। কিন্তু পালের্মোতে গিয়ে সেরকম সুযোগ পাননি তিনি। পাবেনই বা কিভাবে?  পাবলো ডাইবালা, কাইল ল্যাফার্টি, অ্যাবেল হার্নান্দেজ কিংবা ফ্র্যাঙ্কো ভ্যাজক্যুয়েজ, পালের্মোর অ্যাটাকিং লাইনআপ তখন যথেষ্টই পরিপূর্ণ আরও যোগ্যতর খেলোয়াড়ে। তাদের জন্য মাঠে নামারই ত সুযোগ পেতেননা বেলোত্তি সেরকম। তাও কোনরকমে ৩ বছরে ৬২ ম্যাচ খেলে ১৬ গোল করতে পেরেছিলেন তিনি। এই অবস্থায় তাঁকে নিয়মিত খেলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোচ জিয়ামিপিয়েরো ভেঞ্চুরা নিয়ে আসেন তোরিনোতে, ৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই প্রতিভাধর স্ট্রাইকারকে।

পালের্মোতে বেলোত্তি
পালের্মোতে বেলোত্তি

গত মৌসুমে ১২ গোল করে তোরিনোর সর্বোচ্চ গোলদাতা এই স্ট্রাইকার এর মধ্যেই করে ফেলেছেন ১০ গোল। গত মৌসুম থেকেই এসি মিলান, জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান, এএস রোমার মত হেভিওয়েটদের বিপক্ষে গোল করে নজর কেড়েছেন। জুভেন্টাস কিংবদন্তী জিয়ানলুইজি বুফনের সবচেয়ে বেশী সময় ধরে সিরি আ তে গোল না খাওয়ার রেকর্ড ভেঙ্গেছে তাঁর দেওয়া এক গোল থেকেই। আর এখন ত গত পাঁচ ম্যাচ ধরে ইতালির মূল স্ট্রাইকারের দায়িত্বটা তাঁর কাঁধেই ন্যস্ত – যেই পাঁচ ম্যাচে ইতোমধ্যে তিনি করে ফেলেছেন তিন গোল।

অ্যালবিনোলেফের হয়ে মিডফিল্ডার বা উইঙ্গার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা বেলোত্তির স্ট্রাইকার হওয়াটা এই ভেঞ্চুরার হাত ধরেই। আর এখন ভেঞ্চুরার দেখানো সেই পথ ধরে স্ট্রাইকার হিসেবে বেলোত্তিকে তিলে তিলে গড়ে তুলছেন বর্তমান তোরিনো কোচ সিনিসা মিহায়লোভিচ। এমনিতে ৪-৪-২ ফর্মেশানে সাপোর্টিং স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতে পছন্দ করা বেলোত্তি অ্যাটাকিং লাইনআপের যেকোন পজিশানেই পারেন খেলতে। সিনিসা মিহায়লোভিচের মতে, তিনি যদি বেলোত্তিকে ফুলব্যাক পজিশানেও খেলতে বলেন ছেলের সেখানেও কোন আপত্তি থাকবেনা, কিন্তু ডিবক্সের আশেপাশে নিজেকে আবিষ্কার করলেই গোল জন্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে সে। এই মৌসুমে ১০ গোলের মধে চারটা বাম পা তিনটা ডান পা ও তিনটা হেড দিয়ে গোল করার স্ট্যাটিস্টিকসটাই বুঝিয়ে দেয় সবরকম ভাবেই গোল করতে স্বচ্ছন্দ এই স্ট্রাইকার, এবং যতক্ষণ না পর্যন্ত বল নেটের সাথে না জড়াচ্ছে, তিনি শান্তি পান না, সেটা বাম পা-ডান পা-মাথা ; যেভাবেই হোক না কেন।

বেলোত্তির উত্থান এই জিয়ামপিয়েরো ভেঞ্চুরার হাত ধরেই
বেলোত্তির উত্থান এই জিয়ামপিয়েরো ভেঞ্চুরার হাত ধরেই

প্রায় ছয়ফুটি এই স্ট্রাইকারকে দেখলে লুকা টনির মত হ্যাংলা মনে হলেও খেলার স্টাইলে কিন্তু দুইজনের মধ্যে রয়েছে আসমান আর জমিন ফারাক। যেখানে টনি ছিলেন ডিবক্সের মধ্যে ওঁত পেতে থাকা সুযোগসন্ধানী এক স্ট্রাইকার বা “টার্গেট ম্যান”, সেখানে বক্সারের মত কাঁধওয়ালা অ্যান্দ্রেয়া বেলোত্তি অন্যের বানিয়ে দেওয়া সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন না, নিজেই বানিয়ে নিতে পারেন নিজের সুযোগ। অ্যাটাকিং লাইনআপে খেললেও প্রতিপক্ষের আক্রমণ কিভাবে শুরুতেই নস্যাৎ করে দিতে হয় সেটা তিনি ভালোই পারেন, দলের ডিফেন্সের প্রথম ব্যাক্তি হিসেবে কাজ করতে পারেন। স্ট্রাইকার হিসেবে তাই তাঁর তুলনাটা প্রায়ই করা হয় ইন্টার মিলান কিংবদন্তী রবার্তো বনিনসেনিয়া কিংবা চেলসি-সাম্পদোরিয়া-জুভেন্টাসের জিয়ানলুকা ভিয়াল্লির সাথে। বেলোত্তির নিজের কথা থেকেই বোঝা যায় যে তিনি কোন এক নির্দিষ্ট দিকে নয় বরং অলরাউন্ড এক স্ট্রাইকার হিসেবেই নিজেকে ভাবতে বেশী পছন্দ করেন, “মারিও গোমেজের মত মাথা ঠান্ডা রেখে ফার্নান্দো টরেসের মত গতি দিয়ে ডিফেন্ডারদের ছিটকে ফেলে, দিদিয়ের দ্রগবার মত শক্তিশালী হয়ে ও সার্জিও অ্যাগুয়েরোর মত মুভমেন্ট নিয়ে খেলতে পছন্দ করি আমি!”

ইতালির এই নতুন ভরসা এখন পরবর্তী দেল পিয়েরো হতে পারেন, না পরবর্তী ইয়াকুইন্তা – দেখা যাক!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

thirteen − 4 =