আমাদের স্বপ্নপুরুষেরা

তামিমের ব্যাটিং দেখার চেয়ে আনন্দময় কিছু এখন আমার কাছে খুব কমই আছে। সেটা সে ১ রান করুক বা ১০০। ২০ বল খেলুক বা ১২০ বল!

যে অ্যাসিউরিটি নিয়ে সে ব্যাট করে, সেটা দেখতে ভালো লাগে। রান করতে পারুক বা না পারুক, তামিমকে এখন কোনো ইনিংসেই ধুঁকতে হয় না বা ভুগতে হয় না। নিউ জিল্যান্ডে গোটা সফরে বড় রান পায়নি, কিন্তু একটা ইনিংসেও স্ট্রাগল করেনি। যত কঠিন উইকেট হোক, প্রতিপক্ষের বোলিং হোক যতই ধারালো, তামিমকে ভোগাতে পারে কমই। যতক্ষণ উইকেটে থাকে, একটা নির্ভরতা প্রতিফলিত হয় ওর ব্যাটিংয়ে। নিজের খেলাটা সে খুব ভালো বোঝে এখন। একদম পারফেক্ট জোনে আছে।

এখন স্রেফ এখান থেকে নিজেকে পরের লেভেলটায় নিয়ে যাওয়ার পালা। সেটির জন্য চাই নিয়মিত বড় বড় ইনিংস। তামিমের যে প্রতিভা-সামর্থ্য, এই ২০১৭ সালে এসে সব ফরম্যাটে র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা দশের মধ্যে থাকার কথা ছিল তার। বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের ছোট্ট তালিকায় থাকfর কথা ছিল। ২০১০-২০১১-২০১২ সময়টায় যখন তামিমকে দেখতাম-লিখতাম, তখন ৩-৪ বছর পরের তামিমকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম যে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে বা সেরা তিনে থাকবে। সেই উচ্চতায় নিজেকে নিতে পারেনি এখনও। তবে সময় ফুরিয়ে যায়নি। বয়স এখনও এমন কিছু না। এই বছরের মতো নিয়মিত খেলা থাকলে সে পারবে, আমার বিশ্বাস…

একই কথা সাকিবের জন্যও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের সবসময়ের সেরা ক্রিকেটার হয়ে গেছে সে আরও ৫-৬ বছর আগেই। এই ২০১৭ সালে এসে তার হয়ে ওঠার কথা ছিল সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। সাকিব আমাদের অনেক জিতিয়েছে। কিছু কিছু সময় হতাশ করেছে। বাংলাদেশের সেরা হয়েছে, সময়ের সেরা হয়েছে। সবসময়ের সেরার উচ্চতায় ঠিক উঠতে পারেনি। আমাদের স্বপ্নেরা একটু চোট পেয়েছে। তবে পি সারা ওভাল টেস্টে এবং প্রথম ওয়ানডেতে যেভাবে ব্যাট করেছে, তাতে স্বপ্ন দেখার সাহস আবারও পাচ্ছি। আমাদের প্রথম আন্তর্জাতিক তারকা সাকিব। আশা করি, বিশ্ব ক্রিকেটের প্রেক্ষিতে প্রথম অলটাইম গ্রেটও আমরা পাব সাকিবকে দিয়ে…

সবচেয়ে বড় কথা, সাকিব-তামিম-মুশিদের প্রজন্ম নিয়ে সবসময় স্বপ্ন দেখতাম, ওদের হাত ধরে আমাদের ক্রিকেট পরের লেভেলটায় যাবে। ঠিক ডি সিলভা, জয়াসুরিয়া, মুরালিরা যেভাবে নিয়ে গেছে শ্রীলঙ্কাকে। বিশ্বকাপ জিতব। টেস্টে শক্ত একটা জায়গায় পৌঁছাব। একটা সময় স্বপ্নগুলিকে মনে হচ্ছিলো দিশাহারা। কারণ স্বপ্নের সম্ভাব্য নায়কেরা মাঝেমধ্যেই ছিলেন পথহারা। এখন আবার স্বপ্নটা দানা বাধছে। সাকিব-তামিমরা পারবে!

আর আরেকজন…তাকে নিয়ে লিখে তো শেষ করা যায় না। ভাঙা বুড়ো আঙুল এখনও জোড়া লাগেনি পুরোপুরি। সার্জারি না করলে জোড়া লাগবেও না, এভাবেই খেলতে হবে। ব্যথা তো আছেই। এত দিন পর মাঠে নেমে প্রথম ম্যাচে কি বোলিংটাই না করল! চোট কাটিয়ে ফিরলে রিদম পেতে একটু সময় তো লাগে। তবে তিনি তো বরাবরই এসবকে বুড়ো আঙুল দেখান। মাঠে ফিরেই প্রথম ওভারে উইকেট, প্রথম দুই ওভার মেডেন। অসাধারণ প্রথম স্পেল। দ্বিতীয় ম্যাচে আবার শুরুতে উইকেট। ব্যাটিং স্বর্গেও দারুণ বোলিং। মাশরাফি একজনই।

আঙুলে ব্যথার কারণে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার আগে দেশে প্র্যাকটিসে ব্যাটই ধরেননি। ফতুল্লায় প্র্যাকটিস ম্যাচে স্রেফ ব্যাট করেছিলেন। অথচ শ্রীলঙ্কায় গিয়ে ওয়ার্ম আপ ম্যচে কী মারটাই মারল! গত ঢাকা লিগে প্রচণ্ড জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে দারুণ বোলিং করার পর শ্রদ্ধেয় জালাল আহমেদ চৌধুরি বলেছিলেন, “এটা মানুষ না, জ্বীন।” আমি বলি, মানুষ বা জ্বীন কিছুই না, “ইহা হয় একটি মাশরাফি!”

এক-দুই ম্যাচে বোলিং ভালো না করলেই তার বোলিং নিয়ে কথা ওঠে। বলা হয়, “ক্যাপ্টেন হিসেবে খেলেন।” কেউ কেউ সিমপ্যাথি দেখিয়ে বলেন, “শুধু অধিনায়ক হিসেবে হলেও তাকে দলে রাখা উচিত।” অথচ বোলার মাশরাফি এখনও সিমপ্যাথি পাওয়ার জায়গায় যাননি। গত বছরও ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি উইকেট এই মানুষটিরই, ৯ ম্যাচে ১৫টি (৯ ম্যাচে সাকিব ও তাসকিনের ছিল ১৪টি করে)। এই বছর বাংলাদেশ দুটি ওয়ানডে খেলল, দুটিতেই কী দুর্দান্ত বোলিং করল! আমরা মুস্তাফিজের কাটার নিয়ে মাতামাতি করি। অথচ গত কয়েক বছরে কাটারে উইকেটের পর উইকেট নিয়েছেন এই মানুষটিও। ভেতরে বারুদ বরাবরই ছিল। এখন অভিজ্ঞতাও অনেক। বোলার মাশরাফি তাই এখনও অমূল্য,কোনো বিকল্প নেই।

কাল তার হাঁটুর ব্রেস, হাঁটুর ওপরে-নিচে টেপ পেঁচানো ছবি ভাইরাল হয়ে গেল। কমেন্ট্রি বক্সে জিহান মুবারক বলছিলেন, “এসব নিয়ে মাশরাফি নড়াচড়া করে কিভাবে!” কী হাস্যকর, তারা জানে না, এসব নিয়ে সে শুধু নড়াচড়া করে না, সফলতম ওয়ানডে বোলার!

কাল ট্রাউজার তুলেছেন, সবাই দেখেছে, তাই এত আলোচনা, আবেগের ছড়াছড়ি। অথচ এসব তার প্রতিদিনের যুদ্ধ। প্রতি ম্যাচেই এভাবে নি-ব্রেস পরতে হয়, টেপ পেঁচাতে হয় সময় নিয়ে। আবার খুলতে হয়। আরও যে কতশত দৈনন্দিন রুটিন আছে! এর প্রতিটিই লাইফ হেল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এই লোকের ধৈর্য, মাশাল্লাহ!

এসব তিনি সিমপ্যাথি পাওয়ার জন্য করেন না। সিমপ্যাথি নিয়ে খেলতেও চান না। পারফরম্যান্সই তার প্রমাণ। টাকা পয়সা? সেটা এক জীবনে বেশ কামিয়েছেন। তার যে ভাবমূর্তি, জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা, এখনই খেলা ছাড়লেও টাকার স্রোত বন্ধ হবে না। কিন্তু ক্রিকেট তার আবেগ, ভালোবাসার জায়গা। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করাও। সমস্যা হলো, আরও শত শত ক্রিকেটারও দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে চায়। তাদেরও আবেগ, ভালোবাসার জায়গা ক্রিকেট। তিনি তাই জানেন, এই ময়দানে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হলে, যুদ্ধ জিততে হলে কোনো আপোশের সুযোগ নেই। লড়াই করেই টিকতে হবে। এই টেপ পেঁচানো, কষ্টকর সব রুটিন, এসব হলো সেই যুদ্ধ জয়ের প্রস্তুতিরই অংশ। সিম্পল।

তবে এসবই শেষ নয়। একজন অধিনায়কের, বিশেষ করে বাংলাদেশর মত ক্রিকেট কালচারের দেশের একজন অধিনায়ককে অনেক যন্ত্রণা সইতে হয়। শুধু শরীর নয়, যুদ্ধটা প্রতিনিয়ত তাই মনের সঙ্গেও। এই মানুষটি এই সিরিজ খেলছেন ভীষণএকটা মানসিক চাপ নিয়ে। আর কিছু বলতে চাই না,দয়া করে কেউ জিজ্ঞেসও করবেন না। তবে সেই চাপ প্রচণ্ড। ট্রাউজার তুললে হাঁটুর টেপ পেঁচানো দেখা যায়। মনেও যে টেপ পেঁচানো, কজন দেখে!

তবে চাপ যতোই থাকুক, লোকটা ভয়াবহ ত্যাড়া। হারতেই জানে না!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × four =