নিরানব্বইতে সেরা পাঁচ

৯৯ টা টেস্টে আমাদের বড়াই করার মতো বা গর্ব করার মতো ম্যাচ খুব বেশি নেই। তবে যেটা আছে সেটা হলো দারুন কিছু মুহূর্ত। যে মুহূর্তগুলো হয়তো আমি বেঁচে থাকতে থাকতে বাংলাদেশ নিয়মিত টেস্ট জেতা শুরু করলেও মনে থেকে যাবে। সেরকম টুকরো টুকরো কিছু ছবি দেখাবো। টুকরো টুকরো কিছু মুহূর্তের গল্প করবো।

১)মাঠের রাজায় রাজার মত তামিম: এই জায়গাটায় হয়তো কারো সাথে আমার মিলবে না। আমার বেছে নেয়া সেরা মুহূর্তটা হলো লর্ডসে তামিমের সেঞ্চুরি করার পরে “Write-down-my-name” সেলিব্রেশনটা। কেন জানি না, লর্ডসের মত জায়গায়, ইংল্যান্ডের মত দলের বিপক্ষে, নাক উঁচু ইংলিশদের সাথে রাজার মত সেঞ্চুরিটা দেখে একটা মুহূর্তের জন্যে হলেও নিজেকে বাদশাহ মনে হচ্ছিলো। আর তারপরে তামিমের আগে কখনো না করা এক সেলিব্রেশন! লর্ডস, তামিম ইকবাল, ডাকাবুকো সেঞ্চুরি- সেরা কম্বিনেশন, সেরা মুহূর্ত। মুহূর্তের বা অর্জনের বিশালত্ব নয়, এই মুহূর্তটা এগিয়ে থাকবে স্টাইলে, ফ্যাশনে। এই মুহূর্তটা এগিয়ে থাকবে বাঁধানো পোস্টার হয়ে যাবার মত যোগ্যতা থাকার কারণে। পরিসংখ্যান পড়ে থাকে ওয়েবসাইটে আর গাঁদা গাঁদা কাগজে, এই মুহূর্তগুলো ছবি হয়ে সেঁটে যায় স্মৃতির কোন একটা জায়গায় স্থায়ীভাবে…



২) ফতুল্লার সকাল-বিকাল:
ফতুল্লায় বিসিবি টেস্ট খেলা দিক আর না দিক, ফতুল্লাকে আমাদের জেনারেশনের স্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া কারো সাধ্য নেই। বাংলাদেশের গ্রাফ যখন উল্টো দিকে হাঁটছে, রিকি পন্টিং এর অস্ট্রেলিয়ার প্রতিপক্ষ তখন শুধু অস্ট্রেলিয়াই। তেমন এক ভয়ের সকালে শাহরিয়ার নাফীসের সেঞ্চুরি দিয়ে ফতুল্লার ফেয়ারি টেইল শুরু, আর পরেরদিন বিকালে রফিক-শাহাদাতকে দিয়ে সেই ফেয়ারি টেইলে নিজেদের মত রঙ দেবার স্বাধীনতা পাওয়া। গল্পটার রংগুলো পরের দিনগুলোতে আর আলো দেখে না গিলক্রিস্ট নামে এক পেশাদারের পেশাদারিত্বে। বাংলাদেশের অর্জনের বিশালত্বের চাইতে পন্টিং এর অস্ট্রেলিয়ার বিশালত্বটাকে আমি বেশি ক্রেডিট দিবো এই মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখার পিছে….

৩) মিরাজের এক বিকাল: অর্জনের বিশালত্বের কথা ভাবলে মিরাজের বিকালের ধারের কাছে থাকবে না। তবে অবিশ্বাস আর মুগ্ধতার মাত্রায় এ বিকালে ছিলো পরিমিতিবোধ। স্টোকসি-রুট-কুকেরা উইকেটটা অনেক ফাটলে ভেঙে পড়তে পারে এ আশাটা একটু হলেও ছিলো। তবে আগেই বলছি, অর্জনের হিসাবে এই টেস্ট বিশালের চেয়েও বড় কিছু থাকলে বাংলাদেশের জন্যে সেটাই। চড়কির মত বল ঘুরাচ্ছে মাত্র উনিশ পেরোনো এক বালক, স্টোকসিকে সাইলেন্ট স্যালুট, তার সাথে প্রথম কোন পুরোশক্তির টপ টায়ার টেস্ট দলের সাথে জয়- তিনদিন খেলা হবার পরে ঢাকার বিকাল ছিলো স্বপ্নপূরণের এক বিকাল।

৪) জবাব দেবার সকাল: শেবাগ আসেন সেবার ভারতের ক্যাপ্টেন হয়ে। এসেই দুই-একটা তিক্ত সত্যি কথা বলে বেশ সমালোচনায় পড়ে যান। সত্য কথা দুটো ছিলো: বাংলাদেশ টেস্টে যথেষ্ট ভালো দল নয় এবং প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নেবার মত বোলিং লাইন আপ বাংলাদেশের নেই। এই স্টেটমেন্টের কারণে হোক বা অন্যকারণে হোক, পরের দিন সকালে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে যা ঘটলো, সেটা অনেক দিন মনে রাখার মতো। সাকিব আর শাহাদত মিলে টেন্ডুলকার-দ্রাবিড়-শেবাগ আর লক্ষণে গড়া লাইনাপকে প্রথম ইনিংসে বেঁধে ফেললো ২৪৩ রানে। যাই হোক, প্রতিশোধ সুখ দেয়, প্রতিশোধ দেয় পৈশাচিক আনন্দ। সেটা থেকেই বোধ হয় ZACS এর সেই পয়লা দিন অনেকদিনের জন্যে গেঁথে গেলো মগজে।

৫) অত:পর সাকিব-মুশফিক আর তামিম-ইমরুল: সাকিব-মুশফিকের নিউজিল্যান্ডের সাথে জুটি আর তামিম-ইমরুলের পাকিস্তানের সাথে খাটিয়ে মনোবল মেরে খেলা করার জুটির একটা কমন দিক আছে। সেটা হলো দুটো জুটিই ভয়ডরবিহীন এক নতুন বাংলাদেশের ছবি দেখিয়েছিলো। ৭৬ ওভারের মত ব্যাট করে ৩১২ রান তোলা, তাও আবার টার্গেট মাথায় নিয়ে, বাংলাদেশ খেলেছিলো হকচকিয়ে দেবার মতোই এক সেকেন্ড ইনিংস। এমন সেকেন্ড ইনিংসের গল্প রোজ শোনা যায় না! সাকিব-মুশফিকদের বীরত্বের মাপকাঠিতে এগিয়ে দেয় অনেক রানের সাথে বিরুদ্ধ কন্ডিশনের ব্যাপারটা। তিনশ পেরোনো দুটো পার্টনারশিপ অনেক দিনের জন্যে হয়তো নতুন বাংলাদেশের বার্তা দিয়ে যাবার কথা ছিলো।

আমার পছন্দগুলো বেশিরভাগের সাথে মিলবে না, বরং মিলে যাওয়াটাই কাকতালীয়। তবে বাংলাদেশ দলের সার্থকতাটা আসলে সামনের ১০০ টেস্টে আরো এমন অনেক মুহূর্ত জন্ম দেওয়া যাতে আমার বয়সী কেউ ২০০ টেস্টের সময় সেরা ৫টি মুহূর্ত বেছে নিতে ৫ এ থেমে না থাকতে পারে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × 4 =