১৯৯৪… সৌন্দর্য ছাড়া বিশ্বজয়ের কাহিনী

ব্রাসিল আসলে কি..?
.
ছন্দময় খেলা, সুন্দর খেলা, ১-২-১ পাস খেলে এটাকে যাওয়া। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ব্রাসিলের ছন্দময় নান্দনিক জোগো বনিতার খেলা শেষ হয়ে গেছে ৮২ বিশ্বকাপের পরেই যার শুরু হয়েছিলো ১৯৫৮ সাল থেকে..!
.
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জিতার পর ব্রাসিলের সাফল্যগুলো হলো ১৯৭৪ এ ২য় রাউন্ড, ১৯৭৮ এ ৩য় স্থান, ১৯৮২ তে কোয়াটার ফাইনাল, ১৯৮৬ তে কোয়াটার ফাইনাল আর ১৯৯০ তে ২য় রাউন্ড। টানা ২৪ টি বছর ব্রাসিলের বিশ্বকাপ শিরোপা খড়া। ১৯৮২ সালে বিশ্বকাপ না জিতলেও সুন্দর খেলা দিয়ে বিশ্বের মন জয় করে নিয়েছিলো জিকো-সক্রেটিস-ফ্যালকাও রা। যাদেরকে বলা হয় সর্বকালের সেরা স্কোয়াড ব্রাসিলের ইতিহাসে আর ফুটবল ইতিহাসেও। যাদের প্রত্যেকটি প্লেয়ার ছিলো সৃজনশীল প্লেয়ার। এই রকম সৃজনশীল প্লেয়ারদের নিয়েও আর ছন্দময় খেলা দিয়েও বিশ্বকাপ জিত্তে পারে নি। অপর দিকে অসুন্দর আর পাওয়ার ফুটবল খেলে ৫ বারের মধ্যে কাপ নেয় ইউরোপরা ৩ বার ই..!
.
তাইতো, এক প্রকার বাধ্য হয়ে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নান্দনিক খেলা বিসর্জন দিয়ে, ট্যাকটিস-ফর্মেশন বদলে খেলতে নামে রোমারিও-দুঙ্গা-বেবেতো-ব্রাঙ্কোরা..! সফল হয়, দল বিশ্বকাপও পায়, কিন্তু মন জয় করতে পারে না। অধিনায়ক দুঙ্গা তখন উপাধী পায় অব্রাসিলিয়ান হিসেবে, যিনি কিনা ইউরোপ স্টাইলে খেলতো..!
.
যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের আয়োজক। এই প্রথম আয়োজক হিসেবে আমেরিকা। ৯টি ভেন্যু, ২৪টি দল নিয়ে প্রথমবারের মত আমেরিকাতে বসছে বিশ্বকাপের ১৫ তম আসর। আর এই আসরটিই ছিলো ব্রাসিলের বিশ্বকাপ খড়া কাটানোর আসর..!
.
১৭ জুন থেকে শুরু হওয়া ১৫তম বিশ্বকাপের আসরের যাত্রা হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালীর মধ্যকারের খেলা দিয়ে আর শেষ হয় ইতালী বনাম ব্রাসিলের এক উত্তেজিত খেলার মধ্য দিয়ে..! পুরো বিশ্বকাপে দর্শক হয়েছিলো ৩৫ লক্ষ ৮৭ হাজার ৫৩৮ জন। প্রতি ম্যাচে গড়ে দর্শক হয়েছিলো ৬৮ হাজার ৯৯১ জন। ৫২ টি ম্যাচের মধ্যে ১৪১ টি গোল হয়েছে তন্মধ্যে ১টি ছিলো আত্মঘাতি গোল..
.
১৯৯৪ বিশ্বকাপ ছিলো ব্রাসিলের বিশ্বকাপ খড়ার আসর। টানা ২৪ টি বছর বিশ্বকাপ খড়ায় জ্বলতে থাকে ব্রাসিল। যাদের পা থেকে শুরু হয়েছিলো ছন্দময় খেলা, সুন্দর নান্দনিক খেলা, তারাই কিনা টানা ২৪ টি বছর বিশ্বকাপ খড়ায়। ভাবা যায়..? তাইতো সুন্দর খেলা বিসর্জন দিয়ে, ট্যাকটিস বদলে এক প্রকার বাধ্য হয়ে আক্রমণাত্মক আর ইউরোপ স্টাইলে খেলতে থাকে ব্রাসিল। বিশ্বজয় হলেও, মন জয় করতে পারে নি সেলেসাওরা। উল্টো আরও দুয়োধ্বনি শুনতে হয়েছে অনেক..
.
৯৪ এর কোচ হয়ে আসেন কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা। ৯০ বিশ্বকাপের কোচ সেবাস্তিয়াও লাজারনির দলকে তিনি এতটা পরিবর্তন করেনি। গোলকিপার তাফারেল আর জোরগিনহো, দুঙ্গা, ব্রাঙ্কো, রোমারিও, রাই, জিনহো, বেবেতো, লিওনার্দো, আর তরুন রোনালদোদের নিয়ে স্কোয়াড সাজান পেরেইরা। অধিনায়ক হয় এবং ১০ নাম্বার জার্সি পরিধান করে কিংবদন্তী প্লেয়ার সক্রেটিসের ভাই রাই..! যদিও নক আউট পর্ব হতে ইঞ্জুরীর জন্য আর মুল একাদশে খেলতে পারে নি। তাই নক আউট থেকে অধিনায়ক হয় বর্তমান কোচ দুঙ্গা..!
৯৪ এর বিশ্বকাপে ব্রাসিলের অবস্থান হয় গ্রুপ বি তে। ব্রাসিলের প্রতিপক্ষ সুইডেন, রাশিয়া, আর রজার মিলার ক্যামেরুন..!
.
২০ জুন ১৯৯৪। ব্রাসিল খেলতে নামে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ রাশিয়াদের সাথে। ২৬ মিনিটে রোমারিওর গোলে এগিয়ে যায় ব্রাসিল। এরপর ৫২ মিনিটে পেনাল্টিতে অধিনায়ক রাই এর গোলে ২-০ গোলের জয় নিয়ে বিশ্বকাপের শুভ সুচনা করে ব্রাসিল..!
.
২৪ জুন ১৯৯৪। ব্রাসিল তাদের ২য় ম্যাচ খেলতে নামে আফ্রিকার রিপ্রেজেন্টেটর ক্যামেরুনের সাথে। খেলার ৩৯ মিনিতে রোমারিও অসাধারন ফিনিশিং এ এগিয়ে যায় ব্রাসিল। এরপর ৬৬ মিনিটে সান্তোসের আর ৭৩ মিনিটে বেবেতোর গোলে ৩-০ গোলের জয় নিয়ে ২য় রাউন্ড নিশ্চিত করে ব্রাসিল..!
.
২৮ জুন ১৯৯৪। ব্রাসিলের গ্রুপ পর্বের শেষ প্রতিপক্ষ সুইডেন। খেলার ২৩ মিনিটে এন্ডারসনের গোলে এগিয়ে যায় সুইডেন। এরপর ৪৬ মিনিটে রোমারিওর গোলে ১-১ এ সমতা আনে ব্রাসিল। রোমারিও ইতমধ্যে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচেই গোল দিয়ে ফেলেছে। এরপর আক্রমন পাল্টা আক্রমনে আর কোন দলই গোলের দেখা পায় নি।
.
গ্রুপ পর্বের ২ ম্যাচে জয় আর ১ ড্র নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে আর সুইডেনকে গ্রুপ রানার্স আপ হিসেবে সঙ্গী করে ২য় রাউন্ডে যায় ব্রাসিল..!
.
৪ জুলাই ১৯৯৪। ২য় রাউন্ডে ব্রাসিলের মুখোমুখি স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। অধিনায়কের আর্মব্যান্ড বর্তমান কোচ দুঙ্গার হাতে। রাই এর বিশ্বকাপের মুল একাদশএকাদশ শেষ হয় ইঞ্জুরীর ফলে, যার জন্য পেরেইরা অধিনায়ক নির্বাচন করেন ৮ নাম্বার জার্সি পরিহিত কার্লোস দুঙ্গাকে। এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলতে থাকে দুই দলের মধ্যে। অবশেষে বেবেতোর ৭২ মিনিটে করা গোলে ১-০ গোলের জয় পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রদের নিজ ঘরে হারিয়ে ব্রাসিল চলে যায় কোয়াটারে..!
.
৯ জুলাই ১৯৯৪। কোয়াটারে ব্রাসিল মুখোমুখি হয় ইউরোপের ত্রাস, টোটাল ফুটবলের জনক নেদারল্যান্ডের সাথে। এক চরম উত্তেজনার ছিলো ম্যাচটি, যার ফলে এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের সেরা উত্তেজনার ম্যাচ হিসেবে গন্য হয়। ম্যাচটিতে গোল হয়েছিলো ৫ টি। ৫টি গোলই হয় ৫০ মিনিটের পরে। এতেই বুঝা যায় কি উত্তেজনার ছিলো ম্যাচটি..! ম্যাচটি ব্যাপারে একটু বলি।
.
চরম উত্তেজনা, আক্রমন পাল্টা আক্রমনের মধ্যে শেষ হয় খেলার অর্ধেকাংশ..! গোল শুন্য ড্র..
.
খেলার বয়স ৫৩ মিনিট। মিডফিল্ড থেকে সোজা লং ক্রসের মাধ্যমে বল পায় ল্যাফট উইং এ থাকা বেবেতো। বলটাকে একটু পারফেক্ট পজিশনে বানিয়ে নিয়ে সাথে সাথে রাইট সাইডে ক্রস করে স্কোরিং পজিশনে থাকা রোমারিও কে। আর “ডি-বক্সের হিংস্র বাঘ” উপাধী পাওয়া রোমারিও তার অসাধারন মাষ্টার ক্লাশ ফিনিশিং এ দলকে ১-০ এগিয়ে নিয়ে যায়..!
.
গোল করার পর রোমারিওর উল্লাস আর কর্নার ফ্লাগের দিকে গিয়ে হাটু গেড়ে উদযাপন ছিলো দেখার মত..!
.
খেলার ৬৩ মিনিটে বেবেতো, রোমারিও আর মাজিনহোর এক চমৎকার সেলেব্রেশন ফুটবল ইতিহাসের এখনো সেরা সেলেব্রেশনের উপাধী প্রাপ্ত সেলেব্রেশন..!
.
খেলার ৬৩ মিনিটে দুই জন ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দিয়ে বল নিয়ে ডি-বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়ে বেবেতো, গোলকি একদম খালি। গোলকি সামনে এগিয়ে আসলে তাকে ড্রিবল করে বল জালে ঢুকিয়ে সাথে সাথে কর্নারের দিকে দৌড় দেয় বাচ্চা কোলে নেওয়ার ভঙ্গিতে। সাথে সাথে দৌড়ে আসে রোমারিও আর মাজিনহো। প্রায় ৬-৭ সেকেন্ড চলে তিনজনের এই অসাধারন সেলেব্রেশন। বাচ্চা কোলে নেওয়া ভঙ্গিমার সেলেব্রেশন যা ফুটবল ইতিহাসের সেরা সেলেব্রেশন উপাধী প্রাপ্ত..!
.
এই সেলেব্রেশনের ব্যাপারে বেবোতোকে জিজ্ঞাসা করা হলে বেবোতে বলে- ঠিক আগের রাত্রে (এই ম্যাচের আগের রাত্রে) জানতে পারলাম আমার একটি কন্যা সন্তান জন্ম হয়েছে। কিন্তু আমি ত তাকে দেখতে যেতে পারি নি। তাই আমার বাচ্চার স্মরনে গোল করার পর এইভাবে উদযাপন করি..”
.
এর ঠিক এক মিনিট অর্থ্যাৎ ৬৪ মিনিটে সেলেসাও ডিফেন্ডারদের ভুলে ডাচ ম্যান বারকাম্পের গোলে ব্যবধান কমায় ডাচরা।
.
তারপর আবারও ৭৬ মিনিটে কর্নার হতে গোল করে দলকে ২-২ গোলের সমতায় ফেরায় হল্যান্ডিয়ান উইন্টার..! প্রচন্ড উত্তেজনার ম্যাচে স্টেডিয়াম ফেঁটে পড়ে..!
.
সব উত্তেজনার অবসান হয় ৮১ মিনিটে।
.
ডি-বক্সের অনেক বাহিরে ফ্রি কিক পায় সেলেসাওরা। স্যার ব্রাঙ্কোর দুর পাল্লার বাঁ পায়ের শট প্রতিহিত করে ডাচ গোলকিকে..!
.
দল এগিয়ে যায় ৩-২ এ..! এক চরম উত্তেজনার মধ্যে শেষ হয় এই ম্যাচটি। যার ফলে সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশী উত্তেজনার ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃতি পায়..! ব্রাসিল চলে যায় শেষ ৪ এ..!
.
১৩ জুলাই ১৯৯৪। সেমিতে ব্রাসিলের প্রতিপক্ষ সেই গ্রুপ পর্বের আর ৫৮ বিশ্বকাপের আরেক ফাইনালিস্ট সুইডেন। গ্রুপ পর্বে সুইডেনের সাথে ব্রাসিল রোমারিও একমাত্র গোলে ড্র করেছিলো ম্যাচটি। এক হাড্ডাহাডি লড়াইয়ের মধ্যে ম্যাচটি ৭৯ মিনিট পর্যন্ত গড়ায় গোলশুন্য ড্র এ। ৮০ মিনিটে রোমারিওর ম্যাজিক গোলে ব্রাসিল ১-০ এ জয় পায়।
.
ব্রাসিল ফাইনালে চলে যায় ৫ম বারের মত টানা ২৪ বছর পর। ব্রাসিল পারবে কি শিরোপার খড়া কাটাতে..?
.
ওইদিক দিয়ে সেই ৭০ বিশ্বকাপের কাহিনি। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ আয়ারল্যান্ডের সাথে হেরে, নরওয়ের সাথে জিতে আর মেক্সিকোর সাথে ড্র করে ভাঙ্গাচুরা অবস্থায় গ্রুপ রানার্স আপ হয়ে ২য় রাউন্ডে নাইজেরিয়াকে, কোয়াটারে স্পেইনকে, আর সেমিতে বুলগেরিয়াকে হারিয়ে এক যুগ পর ৫ম বারের মত ফাইনালে যায় অবাক করা ফ্রাঙ্কো ব্রারেসসি, দিনো বাজ্জিও, পাওলো মালদিনি আর রবার্তো বাজ্জিওর দল ইতালী..!
.
সমীকরন এমন দাঁড়ায় যে, ব্রাসিল যদি বিশ্বকাপ জিতে তাহলে রেকর্ড সংখ্যক ৪ বার বিশ্বকাপ জিতবে ব্রাসিল। আর ইতালীও যদি বিশ্বকাপ জিতে তাহলেও রেকর্ড সংখ্য ৪ বার বিশ্বকাপ জিতবে ইতালী। একদম ৭০ বিশ্বকাপের কাহিনি। কারন ৭০ এর পর ২৪ বছরের মধ্যে ১৯৮২ বিশ্বকাপ ইতালী জিতে নিয়ে ব্রাসিলের সাথে সর্বোচ্চ তিনবার বিশ্বকাপ জয়ে ভাগ বসায়..!
.
২৪ বছর ফাইনালে মুখোমুখি ব্রাসিল আর ইতালী। দুই দলকেই ইতিহাস আর রেকর্ড হাতছানি দিয়ে ঢাকছে। জাতীয় সংগীতের সময় ক্যামেরাম্যান যখন রোমারিও দিকে ক্যামেরা ঘুরায় তখন ধারাভাষ্যকার বলেন ব্রাসিল যদি বিশ্বকাপ জিতে তাহলে এই ব্যক্তিটির জন্যই। আর যখন ইতালীর রবার্তো বাজ্জিওর দিকে ক্যামেরা ঘুড়ায়, তখনও ধারাভাষ্যকার বলেন, ইতালী যদি কাপ জিতে তাহলে এই ব্যক্তিটির জন্যই..!
.
পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে রোমারিও আর বাজ্জিও ছিলো দারুন ফর্মে..!
.
১৭ জুলাই ১৯৯৪। বিশ্বকাপের ১৫তম আসরের ফাইনাল ম্যাচ। এই ম্যাচেই একটা রেকর্ড হতে চলেছে..! জুলে রিমে ট্রফি ব্রাসিল একেবারে নিজেদের করে নিয়ে নেয়। তারপর ফিফা কর্তৃপক্ষরা একটা ট্রফি বানাতে পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দেয়। সবার ভোটের মাধ্যমে ইতালীর ভাস্কর্য সিলভানিও গাজ্জানিগার ট্রফিটি ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের ট্রফি হিসেবে নির্বাচিত হয়। এই ট্রফি যে যতই বার জিতুক, কেও একেবারে নিয়ে যেতে পারবে না। এই ট্রফি ইতমধ্যে (১৯৯৪ অবধি) জার্মানী দুইবার, ইতালী একবার, আর্জেন্টিনা দুইবার পেয়ে গেছে..! কিন্তু ব্রাসিল একবারও পায় নি। কিন্তু এই বিশ্বকাপের ১৫ তম আসরেই হয়তো ব্রাসিল তা পেতে যাচ্ছে..
.
ইতালীর চিরচারিত রক্ষন এবং ব্রাসিলের আক্রমন আর অসাধারন ট্যাকটিসের ফলে পুরো ৯০ মিনিট গোল শুন্য ড্র থাকে ম্যাচটি। এরপর বাকী ৩০ মিনিটও গোলশুন্য ড্র থাকলে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে..!
.
ফুটবল ইতিহাসের এই প্রথম ফাইনাল ম্যাচ গোলশুন্য ড্র হয়, আর এই প্রথম টাইব্রেকারে ফাইনাল ম্যাচ গড়ায়..!
.
টাইব্রেকার পর্ব→→→→
.
পুরো বিশ্বকাপে দুই দলের গোলকিপার তাফারেল(ব্রাসিল) আর গিয়ানলুকা(ইতালী) কে তাদের সামর্থের পরীক্ষা ভালোভাবে না দিতে হলেও এখন পুরো পৃথিবী তাদের দিকে তাকিয়ে..! তারাই পারবে নিজ নিজ দেশকে ইতিহাসের পাতায় সোনার কালি দ্বারা মুদ্রিত করতে। তাদের দুই হাত যে এখন শুধু বল আটকাবে না, তাদের দুই হাত যে আজকে তাদের শত্রুদের আটকাবে..! তাইতো পুরো ব্রাসিল আর ইতালী মানুষেরা ছলছল চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে। আল্লাহর (ওদের ঈশ্বর) পরে যে তারাই ভরসা, তারাই সব..!
.
দুই গোলকি প্রস্তুত, দুই দলের প্লেয়াররা প্রস্তুত..! সিদ্ধান্ত হলো ইতালী আগে পেনাল্টি নিবে..
.
পেনাল্টি 1-
———–
পেনাল্টির নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ইতালীর ডিফেন্ডার বাররেসি। মৃদ ভাবে তাকিয়ে আছে বলের দিকে। গোলবারের নিচে অতন্দ্র প্রহরী তাফারেল দ্যা সেলেসাও। রেফারী বাঁশি..!
.
বাররেসীর দ্রুত রান আপ। বলে শট…
.
এবং বল ক্রসবারের উপর দিয়ে বাহিরে।
বাররেসী মুখে হাতে দিয়ে সাথে সাথে বসে গেলো..! তাফারেল দ্রুত এসে তাকে স্বান্তনা দিতে লাগলো..!
.
এবার পালা ব্রাসিলের। ব্রাসিলের হয়ে পেনাল্টি নিতে আসলো মার্কেরিও সান্তোস। বল প্লেস করে দ্রুত পায়ে পিছে গিয়ে রান আপের জায়গা করে নিলো। রেফারীর বাঁশি…..
.
দ্রুত রান আপ। গ্রাউন্ড শট…
.
আর ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করে গিয়ানলুকা..!
ব্রাসিলের মিস। ইতালীর উল্লাস..! ব্রাসিল ০(১)- ইতালী ০(১)
——————–

পেনাল্টি 2-
———-
পেনাল্টি নিতে আসলো ইতালীয়ান প্লেয়ার আলবার্তেনি। অল্প পিছনে গিয়ে রান আপ এর জায়গা নিলো। রেফারী বাঁশি…..
.
শট, এবং গোল..!

পেনাল্টি নিতে আসলো ব্রাসিলের প্রান ভোমরা রোমারিও। বিশ্বকাপ জিতলে গোল্ডেন বল নিশ্চিত। হালকা একটু পিছনে এগিয়ে রান-আপের জায়গা নিলো। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ ভীষন..! রেফারীর বাঁশি…..
.
রান-আপ নিলো, হালকা থামলো। ডান দিকে জোড়ালো শট, ডান বারে লেগে বল জালে। গোল…..
.
একটুর জন্য মিস হয়ে গিয়েছিলো গোলটি। ব্রাসিল ১(২), ইতালী ১(২)
———————

পেনাল্টি 3-
———-
নাদুস নুদুস ভাবে বল মাটিতে বাড়ি দিতে দিতে পেনাল্টি নিতে আসলো ইতালীয়ান প্লেয়ার এভানি। বল টাকে ঠিক ঠাক ভাবে প্লেস করে পিছনে গেলো। রেফারী বাঁশি…
.
গোলকিপার বরারবর জোড়ালো শট। তাফারেল ডান দিকে ঝাঁপ দেওয়ায় সেইভ করতে পারলেন না গোলটিকে..! নিজের জায়গায় দাঁড়ালেই সেইভ হয়ে যেত। যাকগে..
.
পেনাল্ট নিতে আসলো ব্রাসিলিয়ান ডিফেন্ডার ব্রাঙ্কো। বলটাকে ঠিক জায়গা রেখে পিছিয়ে যেতে যেতে একেবারে ডি-বক্সের বাহিরে গেলো রান-আপের জায়গা তৈরী করার জন্য। এত বড় রান আপ.. রেফারীর বাঁশি…..
.
দ্রুত পায়ে দৌড়। বাম পায়ে বাম দিকে জোড়ালো শট এবং গোওওওওওওওল..
.
ব্রাসিল ২(৩), ইতালী ২(৩)
————————

পেনাল্টি 4-
———
.
পেনাল্টি নিতে আসলো ইতালীয়ান মাসারো। কিছুটা পিছিয়ে রান-আপের জায়গা করে নিলো। রেফারীর বাঁশি……
.
বাম দিকে শট এন্ড সেইইইইইইইইইইইইইইভ, ইটস তাফারেএএএএএএএএএল…! grin emoticon grin emoticon grin emoticon
.
উল্লাসে ফেটে পড়ছে স্টেডিয়াম।
.
পেনাল্ট নিতে আসলো আমাদের সবার প্রিয় কোচ, তৎকালীন অধিনায়ক স্যার কার্লোস দুঙ্গা..! grin emoticon grin emoticon বলটা জায়গা মত বসালো। পিছনে ফিরে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলো ডি-বক্সের বাহিরে..রেফারী বাঁশি……..
.
ডান পায়ের জোড়ালো শট & ইটস দুঙ্গা..! গোল গোল গোল গোল গোল গোল গোল গোল গোল………..!
.
অধিনায়ক অধিনায়কের মতই কাজ করলেন। উল্লাস আর উদ্দীপনায় চিৎকার দিয়ে উঠলেন অতিথির বেঞ্চে বসে থাকা সর্বকালের সেরা প্লেয়ার স্যার পেলে। ব্রাসিল ৩(৪), ইতালী২(৪)
——————————-

পেনাল্টি 5-
———-
পেনাল্টি নিতে আসলো তৎকালীন ফুটবল সুপারস্টার, সুদর্শন, যার সুন্দর হেয়ার স্টাইল, আর পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে অসাধারন খেলে যাওয়া ইতালীর রবার্তো বাজ্জিও..
.
সমীকরন এমন দাঁড়ায় যে, যদি বাজ্জিও লক্ষ্যভেদ করতে পারে তবে ব্রাসিলকেও পেনাল্টি নিতে হবে এবং ব্রাসিল যদি গোল করতে পারে তবে বিশ্বকাপ জিতে যাবে ৪-৩ এর ব্যবধানে আর যদি বাজ্জিও মিস করে তাহলে ব্রাসিলকে পেনাল্টি নিতে হবে না। বিশ্বকাপ জিতে যাবে ৩-২ এর ব্যবধানে..! ইতমধ্যে সমীকরনটা বাজ্জিও জেনে গেছে..!
.
ঠিক জায়গায় বলটি বসালো। টেলেস্টার (বলের নাম) এর দিকে তাঁকিয়ে তাঁকিয়ে পিছনে যাচ্ছে বাজ্জিও। যেতে যেতে একেবারে ডি-বক্সের বাহিরে। মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝা যাচ্ছে কত হতাশা দ্বারা মুখটি ঢেকে আছে..! আর তাফারেল আছে নিজের আত্মবিশ্বাস নিয়ে গোলবারে..
.
রেফারীর বাঁশি……..
.
বাজ্জিওর লম্বা লম্বা পায়ের আস্তে আস্তে দৌড়..!
.
শট নিলেন..
.
বল যাচ্ছে ভেসে ভেসে..
.
যেতে যেতে বল ক্রসবারের উপর দিয়ে গ্যালারীরে গিয়ে পড়লো..!
.
বাজ্জিইইইইইইইইইও মিস দিজ… & ব্রাসিল উইন দ্যা ওয়ার্ল্ড কাপ & দে গেট ফোর টাইমস ওয়ার্ল্ড কাপ টাইটেল..!
.
ভেসে যাওয়া বলের দিকে তাঁকিয়ে, কোমড়ে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে সাথে সাথে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়েন বাজ্জিও..! পুরো টুর্নামেন্টে দাপটের সাথে খেলে আসা বাজ্জিওর ভুলে আজ ইতালী বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে বিতাড়িত। কান্না আর থামছে না বাজ্জিওর..! হয়ে গেলেন ইতালীর প্রধান শত্রু। এরপর থেকে তাকে ইতালীর আর কোন ফুটবলের ব্যাপারে দেখা যায় নি।
.
পেরেইরার অধীনে ২৪ বছর পর ৫ম বারের মত ফাইনালে গিয়ে ইতিহাস গড়ে নিলো সেলেসাওরা। রেকর্ড সংখ্যক বিশ্বকাপের মর্যাদা..!
.
দুঙ্গার একরোখা ট্যাকটিস আর ছন্দহীন খেলার মধ্য দিয়েও ব্রাসিল জিতে নিলো তাদের রেকর্ড সংখ্যক বিশ্বকাপ..
.
দুঙ্গা যতদিন ব্রাসিলের হয়ে খেলেছে ততদিন ব্রাসিলকে বলা হয়েছে দুঙ্গার যুগ। ছন্দময় খেলা বাদ দিয়ে খেলেন আক্রমণাত্মক খেলা যার কাছে সুন্দর এর চেয়ে জিতাটাই মুখ্য ছিলো। যার বিশ্বাস ছিলো সুন্দর খেলে যদি না জিতা যায় তাহলে সুন্দর খেলে লাভ কি..?
.
তবে রোমারিও, বেবেতো, রাইদের পায়ের জাদুতে কিছুটা ছন্দ ছিলো তবে সেটা পুরো দলে দেখা যায় নি..!
.
২৪ বছর পর শিরোপার বন্ধ্যাত্ব কাটালো ব্রাসিল। সেদিন জয়ের নায়ক ছিলো তাফারেল..!
.
রোমারিও ৫টি গোল করে, পুরো বিশ্বকাপে দারুন খেলে আর দলকে বিশ্বকাপ জিতানোর ফলে টুর্নামেন্টের সেরা প্লেয়ার হয়ে গোল্ডেন বল পাওয়া, পুরো টুর্নামেন্টে দাপটের সাথে লড়ে যাওয়া বাজ্জিওর হাত থেকে বিশ্বকাপ মিস হওয়া, ড্রাগ নেওয়ার অপরাধে বিশ্বকাপ হতে ম্যারাডোনার বহিষ্কার হওয়া, টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোল করে রিস্টোর গোল্ডেন বুট পাওয়া, ছন্দহীন ব্রাসিলের বিশ্বকাপ জিতা আর স্যার কার্লোস দুঙ্গার হাতে ব্রাসিলের রেকর্ড সংখ্যক বিশ্বকাপ উঠার মাধ্যমে শেষ হয় বিশ্বকাপের ১৫ তম আসর..!
.
আমাদের বর্তমান দলেও হয়তো ছন্দ নেই। কিন্তু তাতে কি? ৯৪ এর মত বিশ্বকাপ জিততে পারবোই আমরা..! আমরা আশাবাদী আমাদের ছোট ছোট তরুন সেলেসাওদের নিয়ে..! আমরা গর্বিত..
.
‪#‎AHM80‬

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seven + twenty =