তবে কি রিকি পন্টিংয়ের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া?

সময়টা তখন ২০০৭ সাল। অস্ট্রেলিয়া তথা ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন সে বছরের জানুয়ারি মাসে সব ধরনের ক্রিকেট হতে অস্ট্রেলিয়া দল থেকে অবসর গ্রহন করলেন। আর এর ঠিক পরপরই সার্চ লাইট দিয়ে অস্ট্রেলিয়ান টিম ম্যানেজমেন্ট হন্যে হয়ে একজন স্পিনার খোঁজা শুরু করল। ওয়ার্নের অনুপস্থিতিতে কাজ চালানোর জন্য স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল, ব্র্যাড হগরা দলে ডাক পেলেন। কিন্তু ততদিনে তাঁরাও তাদের হাতের জাদু অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন। ফলে দলে একের পর এক নতুন মুখ আসতে থাকল। স্পেশালিস্ট স্পিনার হিসেবে পর্যায়ক্রমে দলে ডাক পেলেন জেসন ক্রেইজা, ব্যু ক্যাসন, ব্রাইস ম্যাকগেইন, নাথান হরিটজ এবং এমনকি ক্যামেরন হোয়াইট! কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওয়ার্নের রিপ্লেসমেন্ট হবার ন্যুনতম যোগ্যতাও ছিল না তাদের।

অবশেষে ২০১০ সালে দলে যোগ দিলেন স্টিভেন স্মিথ। ওয়ার্নের মতই সোনালি চুল, তাঁর মতই লেগ-ব্রেক…হুম, অস্ট্রেলিয়া বুঝি এবার সত্যিই ওয়ার্নের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে গেল। টেস্টে অভিষেক হল ৮ নম্বর ব্যাটসম্যান এবং দলের স্পেশালিস্ট স্পিনার হিসেবে। কিন্তু বিধিবাম! ম্যাচের পর ওয়ার্নের উত্তরসূরি হওয়া দূরে থাক এইরকম নিম্নমানের প্রতিভা নিয়ে তিনি ব্যাগি গ্রিন কিভাবে পান তা নিয়েই মিডিয়াতে একরকম ঝড় উঠে গেল। ফলে দল থেকে তিনিও কাটা পড়লেন। দলে নতুন স্পিনার হিসেবে যোগদান করলেন নাথান লিয়ন।

ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির পর স্মিথের উল্লাস

তবে ভাগ্য ভাল ছিল স্মিথের। ২০১৩ সালে ভারতের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে আরেকবার ডাক পেলেন তিনি। তবে এবার ডাক পেলেন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে। বোলিংটা রইল সেকেন্ডারি স্কিল হিসেবে। সুযোগ কাজেও লাগালেন দারুণভাবে। ভারতের মাঠে তাদেরই তিন স্পিনারের মুহুর্মুহু আক্রমণে পুরো অস্ট্রেলিয়া দল যখন ক্লান্ত সেখানে উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম হিসেবে নিজের কামব্যাক ম্যাচে ৯২ রানের দারুণ একটি ইনিংস খেলে ফেললেন সিডনিতে জন্ম নেয়া এই খেলোয়াড়। তবে তাঁর আসল স্কিল তিনি দেখিয়েছেন সে বছরেরই শেষ দিকে ইংল্যান্ডের মাঠে অনুষ্ঠিত অ্যাশেজে। সেই অ্যাশেজে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া কিন্তু শেষ ম্যাচে অপরাজিত ১৩৮ রানের দারুণ একটি ইনিংস খেলে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। এরপর ২০১৪ তে অস্ট্রেলিয়াতে অনুষ্ঠিত অ্যাশেজে তো রীতিমত নাকানিচুবানি খাইয়ে ছেড়েছেন ইংলিশ বোলারদের। ওই সিরিজ অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল ৫-০ তে আর স্টিভেন স্মিথ করেছিলেন দুইটি সেঞ্চুরি যেগুলো দলকে খাদের কোনা থেকে টেনে উঠিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে। পরবর্তীতে সাউথ আফ্রিকাতে গিয়েও এই ফর্ম ধরে রাখেন তিনি। ফলে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-১ এ সিরিজ জিতে টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে আবারও শীর্ষে উঠে অস্ট্রেলিয়া। আর এরপর বাকিটা শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর শীর্ষে উঠার ইতিহাস।

অস্ট্রেলিয়ার সেরা ক্রিকেট খেলোয়াড়ের পুরস্কার অ্যালান বোর্ডার মেডাল হাতে স্টিভেন স্মিথ।
অস্ট্রেলিয়ার সেরা ক্রিকেট খেলোয়াড়ের পুরস্কার অ্যালান বোর্ডার মেডাল হাতে স্টিভেন স্মিথ।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১৩ এর শেষের অ্যাশেজে ওই ১৩৮ রানের অপরাজিত ইনিংসের পর থেকে এখন পর্যন্ত আরও ১৮ মাস কেটে গেছে। আর এর মাঝে তিনি ১৫ টেস্টে ৭৩.২১ গড় নিয়ে ব্যাটিং করে গেছেন। একদিনের ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরিটি করেছিলেন শারজায় সেই ৭ই অক্টোবর, ২০১৪ তে পাকিস্তানের বিপক্ষে। আর এরপর থেকে একদিনের ক্রিকেটে ৬৭.৭৩ গড়ে খেলেছেন আরও ১৭ টি ইনিংস। আর এই সময়ের মধ্যে তিনি করেছেন ৬ টি হাফসেঞ্চুরি আর ৪ টি সেঞ্চুরি!

মিডল অর্ডার থেকে এখন তিনি দলের ৩ নম্বর ব্যাটসম্যান। রিকি পন্টিংয়ের চেনা পরিচিত সেই জায়গাটা দখলে নিয়ে ফেলেছেন তিনি। সেই সাথে যোগ করুন তাঁর নেতৃত্বগুণ। এইতো এবছরের শুরুতেই ভারতের বিপক্ষে বোর্ডার-গাভাস্কার টেস্ট সিরিজের শেষ ম্যাচে মাইকেল ক্লার্কের ইঞ্জুরিতে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ফলও হাতেনাতে পেয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচক প্যানেল। ম্যাচ ড্র হলেও দারুণ নেতৃত্বগুন প্রদর্শন করেছেন। সাথে চাপহীন ভাবে প্রথম ইনিংসে ১১৭ রানের একটি ইনিংস খেলার পর দ্বিতীয় ইনিংসে গিয়ে করেছেন ৭১! কজন তরুন পারে মাত্র ২৪ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার মত একটি দলের নেতৃত্বভার কাঁধে নিয়ে নেতৃত্বের অভিষেকেই অমন দুটি ইনিংস খেলতে?

ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর স্টিভেন স্মিথ
ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর স্টিভেন স্মিথ

নির্বাচকরা হয়ত হতাশ হতে পারেন এই ভেবে যে এবারও শেন ওয়ার্নের যোগ্য উত্তরসুরি নির্বাচনে তাঁরা রীতিমত ব্যর্থ। তবে তাঁদের খুশিরও অন্ত থাকার কথা না। স্টিভেন স্মিথ হয়ত শেন ওয়ার্ন হতে পারেননি তবে তিনি কিন্তু ঠিকই রিকি পন্টিং হয়ে উঠছেন। চোখধাঁধানো ব্যাটিং, দুর্দান্ত ফিল্ডিং এবং চমৎকার নেতৃত্বগুন। এই তিনের মিশেলে স্টিভেন স্মিথ যেন রিকি পন্টিংয়ের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন বারবার। আর তাইতো অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসের নেক্সট লেজেন্ডের তালিকায় তাঁর নাম এখন থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে বেশ জোরেশোরেই।

যাই হোক, গত কিছুদিনে নিজের জাত বেশ ভালভাবেই চিনিয়েছেন স্মিথ। ব্যাটিং টাকে একরকম ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলেছেন। অস্ট্রেলিয়া দলে এখন ব্যাটিং ‘ভরসা’র আরেক নাম যেন স্টিভেন স্মিথ। সামনে যে বোলিং অ্যাটাকই আসুক না কেন তা দুমড়ে মুচড়ে না দেবার আগ পর্যন্ত স্বস্তি পাননা তিনি। আর তাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালের আগে ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে সেঞ্চুরি করে আরেকবার ক্রিকেট বিশ্বকে জানান দিয়ে দিলেন যে তিনি প্রস্তুত। প্রস্তুত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলে তাদেরই ঘরে ৫ম বিশ্বকাপের শিরোপা ছিনিয়ে আনতে!

 

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × three =