এবার তাহলে ইস্কো-যুগের সূচনা?

দিনটি ছিল ১৫ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৫। মাদ্রিদের হয়ে স্পেনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি শহর কাদিজ-এ এমিলিও বুত্রেগুয়েনো নামের এক খেলোয়াড়ের অভিষেকে সেদিন পুরো স্পেন কেঁপে উঠেছিল। সেদিন ছেলেটি মাদ্রিদের হয়ে ২ গোল করেছিল। মাদ্রিদের রেটাইরো অঞ্চলে জন্ম নেয়া ছেলেটি এর ঠিক দুই বছর পর স্পেনের মানুষের কাছে হয়ে গিয়েছিল ফুটবল বিস্মেয়র জ্বলন্ত প্রতীক যখন সে ১৯৮৭ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ডেনমার্কের বিপক্ষে স্পেনের হয়ে একাই ৪ গোল করেছিল।

তিনদশক পর স্পেনের মানুষের ভরসার নতুন প্রতীক হয়ে এলেন ইস্কো।

এরপর প্রায় তিনদশক পার হয়ে গেছে। ঠিক একইরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন আরেকজন স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় ইস্কো অ্যালকারন। গত রবিবার এলচের মারটিনেজ ভ্যালেরো স্টেডিয়াম সেদিন তাদের চোখের সামনে তাদের দলকে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ২-০ গোলে হারতে দেখেও প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড়কে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ঠিকই দিয়ে গেছে। খেলোয়াড়টি হলেন ইস্কো অ্যাল্কারন। তাঁর খেলায় মুগ্ধ হয়ে সেদিন এলচের গ্যালারী “ইস্কো, ইস্কো” রবে মুখরিত হয়ে যায়। এমনকি খেলার ৮৯ মিনিটে মাঠ ছাড়ার সময় পুরো এলচের গ্যালারী তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়।

একটু পিছনে ফিরে তাকাই। ইকার ক্যাসিয়াস ২০১০ বিশ্বকাপের পর হঠাৎই বলে বসেছিলেন যে, “ভবিষ্যতে ইস্কো হবে স্পেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়” তবে কি এবার তাঁর কথাই ফলতে শুরু করল?

ইকারের বিশ্বাস একদিন ইস্কো হবেন স্পেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়

ইস্কোর কাজটা করার জন্য আগে কিন্তু স্পেনে আরকজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি হলেন বার্সার প্রানভোমরা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ২০১০ বিশ্বকাপ ফাইনালে হল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করার পর পুরো স্পেন তাঁকে রাজার আসনে বসিয়েছিল। তবে ২০১৪ বিশ্বকাপের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর বোধকরি তাঁর ব্যাটনটা এখন ইস্কোর হাতে চালান দেবার সময় হয়ে গেছে। শুধুমাত্র এ সিজনেই ইস্কোর নামে লেভান্তে, গ্রানাদা আর আল্মেরিয়ার স্টেডিয়াম স্তব করেছে! তবে যেখানে প্রথম তাঁর নাম নিয়ে সরব মাতামাতি শুরু হয়েছিল তা কিন্তু ওই কাদিজ-য়েই। সার্বিয়ার বিপক্ষে স্পেন অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলার সময় সেদিন পুরো গ্যালারী “ইস্কো, ইস্কো” রব তুলেছিল। ঠিক ৩১ বছর আগে বুত্রেগুয়েনোকে নিয়ে তারা যেভাবে রব তুলেছিল, ঠিক সেভাবেই ইস্কোকে নিয়ে ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই তারা স্তব করা শুরু করেছিল।

ব্যাটন পরিবর্তনের সময় বুঝি চলে এল।

গত রবিবারের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে সবাই বলা শুরু করেছে যে ইস্কো এখন রিয়াল মাদ্রিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়। তাঁকে নিয়ে পুরো স্পেনের এই উল্লাসে তিনি নিজেও বিষয়টা বুঝতে পারছেন। আর তাই এলচের বিপক্ষে ম্যাচের পর তিনি বলেন, “বর্তমানে আমি আমার ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটাচ্ছি”। কার্লো অ্যানচেলত্তিও একমত। ম্যাচশেষে মাদ্রিদ বস সেদিন বলছিলেন, “বর্তমানে ইস্কো দারুণ খেলছে। সে দলে কোয়ালিটি এবং প্রখর তীব্রতা নিয়ে এসেছে”

কোচের চোখেও তিনি এখন দলের অন্যতম এক ভরসা।

তবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে প্রথম মৌসুমে কিন্তু অনেক বাঁধার সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। সাবেক এই মালাগা খেলোয়াড় গত মৌসুমে বেশীরভাগ সময়ই বেঞ্চে কাটিয়েছেন। সিজন শেষে তো গুজব উঠেছিল যে তিনি ক্লাব ছাড়ছেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে ডি মারিয়া রিয়াল থেকে ম্যানইউতে যোগ দিলে ইস্কোর রাস্তা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু এই মৌসুমেই রিয়ালে যোগ দেয়া হামেস রদ্রিগেজের কারনে তবুও দলে ঠিক নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে মদ্রিচের হঠাৎ ইঞ্জুরিতে ভাগ্যের চাকা খুলে যায় এই স্প্যানিশ বিস্ময় বালকের। এরপর থেকে রিয়ালের হয়ে খেলার যতক্ষণ সুযোগ পেয়েছেন ততক্ষনই নিজের ১১০ ভাগ দিয়ে গেছেন। আর সপ্তাহখানেক আগে হামেসের ইঞ্জুরিতে তো দলের মিডফিল্ডের অন্যতম ভরসাতেই পরিণত হয়েছেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।

দলের প্রয়োজনে এখন ডিফেন্সেও সহায়তা করেন ইস্কো।

এপ্রিলের ২১ তারিখে তেইশের কোঠায় পা রাখবেন ইস্কো; তার মানে তাঁর ক্যারিয়ারে কোন বাঁধা ছাড়া উন্নতির এখনও অনেক সুযোগ আছে। তিনি এই মৌসুমে ইতোমধ্যে ১৮৪ বার প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়েছেন, মাঠকে রীতিমতো ক্যানভাসে পরিনত করেছেন, চোখধাঁধানো ড্রিবলিং-এর সাথে পুরোটা সময় ক্লান্তিহীনভাবে দলের প্রয়োজনে যেকোন পজিসনে খেলে গেছেন। ফলে স্পেনবাসীরা সুপারম্যানের আদলে তাঁর নাম দিয়েছে ইস্কোম্যান!

রনালদোর পর ইস্কোই যেন এখন দলের মধ্যমণি।

এখন কথা হল গিয়ে তিনি কি পারবেন এই উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে? সবাই বলছে পারবেন। অনেকে তো ইতোমধ্যে তাঁকে বর্তমান ফুটবলবিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারের খেতাবও দিয়ে দিয়েছেন। তবে তাঁকে নিয়ে সবচেয়ে মনকাড়া কথাটি লিখেছেন মার্কার সম্পাদক রুবেন জিমেনিজ। তাঁর মতে,

“রিয়াল মাদ্রিদ নামক মরুভূমিতে ইস্কো এখন একটি মরূদ্যান। মৌসুমের শুরু থেকেই সে এমন এক খাঁটি খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে যে কিনা যেকোন দলের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম হতে পারে। বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদ ইস্কো ছাড়া কিছুই না। দলের বর্তমান সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতে ইস্কো যেন নির্মল বাতাসে এক চিলতে প্রাণখোলা নিঃশ্বাস নেবার মতই স্বস্তির একটি নাম। সে যেন ঘন অন্ধকারে মুহ্যমান রিয়াল মাদ্রিদের জন্য তীব্র একটি আলোকরশ্মি। পুরো বার্নব্যু যে ইস্কোকে রাজ সিংহাসনে বসিয়েছে, তাঁর এত এত প্রশংসা করছে তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। রিয়াল মাদ্রিদের সর্বকালের অন্যতম ভয়ঙ্কর সঙ্কটের ঝড়ে আজ যখন পুরো দলকে সবাই শিস দিচ্ছে, তখন ইস্কো নামের পবিত্র এক আদর্শই যেন পুরো দলের একমাত্র আশ্রয়স্থল”

 

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty + 11 =