মৃত্যুক্ষুধার শেষ বিকেল : হুয়ান বেলমন্তের উপাখ্যান

একটা ভয়ানক হিংস্র ষাঁড়। একজন ম্যাটাডোর।এক টুকরো লাল কাপড়। মাটিতে ক্ষুর ঠোকার চাপা শব্দ। খুনের উৎসব !

স্প্যানিশ ভাষায় —‘করিদা দে তোরোস’। পর্তুগিজে—‘তাউরোমাকুইয়া’। ইংরেজিতে ‘বুলফাইটিং। খেলাটি অনেকের চোখেই, পশুহত্যার উত্সব! অনেকে মনে করেন, বুলফাইটিং ধর্মীয় আচরণবিধি পালনের সমগোত্রীয়। খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ অব্দে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মহাকাব্য ‘এপিক অব গিলগামেশ’। এটা নাকি পৃথিবীর প্রথম সাহিত্যকর্মও! যেখানে, দেবী ঈশতারের পাঠানো ‘স্বর্গীয় ষাঁড়’-কে কৌশলে পরাভূত করেন গিলগামেশ। কয়েক ঘন্টা লড়াই করেও ষাঁড়টির সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না উরুক রাজ্যের কর্ণধার। উপায় না পেয়ে শুরু করেন নাচ! ষাঁড় লড়াই ভুলে মন্ত্রমুগ্ধ! সেই সুযোগে কৃপাণ চালিয়ে ষাঁড়ের ভবলীলা সাঙ্গ করেছিলেন গিলগামেশের বন্ধু এনকিদু। আখ্যানটিকে ধরা হয় বুলফাইটের শেকড় হিসেবে।

রোমের সঙ্গে সংযুক্তি থাকলেও বুলফাইটিংয়ের উদ্ভাবক গ্রীকরা। পরিপূর্ণতা পায় স্পেনে। রোডস বা ক্রীট দ্বীপ থেকে আগত ষাঁড়ের বংশধরেরা আজকের দিনের আন্দালুসিয়ান দৈত্য—‘রোঁণ ষাঁড়।’ বংশপরম্পরায় এসব রোঁণ ষাঁড় একেকটি ‘কিলিং মেশিন’। খুন করা বা খুন হতেই তাদের জন্ম। অভিজাত স্প্যানিয়ার্ড র‍্যাঞ্চ ‘হাসিয়েন্দো’তে লালন করা হয় এসব ষাঁড়। গ্রীক পুরাণে ষাঁড় নিয়ে মিথের অভাব নেই। ষাঁড়কে বশ মানানো নিয়ে মিনোয়ান যুগের ‘ফ্রেসকো’গুলো এখনো শোভা পাচ্ছে ক্রীট দ্বীপপুঞ্জে। রোমান সাম্রাজ্যে মানুষ-পশুতে লড়াইয়ে মরণখেলা ছড়িয়ে পড়েছিল আফ্রিকা-ইউরোপ-এশিয়াজুড়ে। কিংবদন্তি বলে, তখনকার ‘হিসপানিয়া’ (ইবেরিয়ান উপদ্বীপের রোমান নাম) অঞ্চলে সর্বপ্রথম বুলফাইটিংয়ের প্রচলন করেন রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস। রোমের কলোসিয়ামে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ছিল ‘গ্লাডিয়টর’ লড়াই। বিকল্প হিসেবে বুলফাইটিংয়ের প্রচলন করেন ক্লডিয়াস।

মধ্যযুগের স্পেনে বুলফাইটিং ছিল অভিজাত বংশীয়দের খেলা। খোলাসা করে বললে, শুধু ধনীরাই এ খেলাটিতে অংশ নিয়ে থাকতো। কারণ পশুদের রক্ষণাবেক্ষণে তাদের কোনো অসুবিধে হতো না। তখন, ঘেরাও করা ছোট্ট একটি জায়গায় ষাঁড়কে ছেড়ে দেয়া হতো। লড়াইয়ে অংশ নেয়া ব্যক্তি আসতেন ঘোড়ায় চড়ে। হাতে থাকতো ‘ল্যান্স’ (বর্শা)। ঘাঁড়ে ল্যান্স বিদ্ধ হয়ে ষাঁড়টি হয় মারা যেতো, নয়তো শিকারিই পরিণত হতো শিকারে। কথিত আছে, রোমান সম্রাট শার্লিমেন, স্পেনের রাজা আলফেনসো এক্স দ্য ওয়াইজ এই খেলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। নিজেরাই আবার কখনো কখনো বুলফাইটিংয়ে অংশ নিয়েছেন! মধ্যযুগের স্পেনে বুলফাইটিংয়ের সেরা পারফরমার ছিলেন কমান্ডার রদ্রিগো ডায়াজ দি ভিভার। স্পেনের মুসলিম রাজবংশ ‘মুর’দের কাছে তিনি ছিলেন – ‘এল সিড’ (দ্য লর্ড)। কিন্তু বুলফাইটিংয়ের শিল্পী হওয়ায় খ্রিস্টানরা তাকে ডাকতো—‘এল ক্যাম্পেদোর’ (দ্য চ্যাম্পিয়ন)।

সতেরোশ’ শতকের গোড়া পর্যন্তও ঘোড়ায় চড়ে বুলফাইটিংয়ে অংশ নেয়ার প্রচলন ছিল স্পেনে। নিজের হাঁটু দু’খানাকে সম্বল করে ক্রোধান্ধ ষাঁড়ের মুখোমুখি হওয়ার সাহসটা প্রথম দেখিয়েছিলেন ফ্রান্সিসকো রোমেরো। ১৭২৬ সালের সেই বিকেলটির আগ পর্যন্ত স্পেনে শুধু অভিজাত বংশীয়রাই ঘোড়ায় চড়ে বুলফাইটিংয়ে অংশ নিতো। লড়াইয়ের কিছুক্ষণ পর (ঘোড়া ব্যতীত) ষাঁড়টির ভবলীলা সাঙ্গ হতো অন্য কারো হাতে। শুধু নিজের দু’খানা পা’কে সম্বল করে তাকে ময়দানে প্রবেশ করতে হতো। সেদিন বিকেলের লড়াইয়ে রোমেরোরও সম্বল বলতে ছিল— নিজের দুখানা পা, একখানা লাল বনাত ও কৃপাণ। নিজ হাতে ষাঁড়কে হত্যা করার অনুমতি লাভের পর ময়দান ছেড়েছিলেন রোমেরো। পেছনে পড়েছিল কৃপাণবিদ্ধ মৃত ষাঁড়। তবে রোমোরোকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বেঁচেছিলেন মাত্র ৬৩ বছর। স্প্যানিশদের চোখে এই ‘ম্যাটাডোর’ আজও—লাল বনাতের জাদুকরি শিল্পি, ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের সাথে একা লড়াইয়ের পথ প্রদর্শক, স্পেনে বুলফাইটিং সাম্রাজ্যের জনক!

কিন্তু সর্বকালের সেরা নন !

খুব অল্প খেলাতেই মৃত্যূর সঙ্গে গোল্লাছুট খেলতে হয়। ছুঁয়ে দিলেই সর্বনাশ। শিং বাগিয়ে তেড়ে আসা ষাঁড়ের চোখ দুটো একবার কল্পনা করুন। বুলফাইট ওই শিং এড়িয়ে মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে ‘ছি বুড়ি’ খেলতে শেখায়! এক্ষেত্রে হুয়ান বেলমন্তে বরাবরই পুরোধা। ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের শিং দুটো যেন তাকে টানতো চুম্বকের মতো ! ফাঁসাতে পেরেছে খুব কমই। উল্টো ষাঁড়কেই মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার দুরত্বের আক্ষেপে পোড়াতেন বেলমন্তে। স্প্যানিশদের চোখে হুয়ান বেলমন্তেই সর্বকালের সেরা ম্যাটাডোর। বুলফাইটিংয়ে আধুনিক ঘরানার জনক।

হুয়ান বেলমন্তে

‘মৃত্যু’কে কেন্দ্র করে এ খেলার জন্য বাছাই করা হয় সত্যিকারের ষাঁড়। এজন্য রয়েছে টেস্টিং গ্রাউন্ড। পালের প্রত্যেকটি ষাঁড়কেই এ পরীক্ষা দিতে হয়। সেদিন নির্ধারিত হয় ক্ষুদে দানবটির মৃত্যুর কলকাঠি আর জায়গা। ম্যাটাডোরের কৃপাণ নাকি কসাইখানা? এদিন আবার প্রত্যেক হাসিয়েন্দোয় উৎসবের দিন। পরী্ক্ষা নেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ ম্যাটাডোর। ক্ষুদে দানবটি যদি পিকাডরের তাড়া খেয়ে সরাসরি কাপড়টির (কেপ) পানে ধেয়ে আসে, যদি আক্রমণ করে-তবে সে আক্রমণ থামানো হয় কাঁধে বল্লম বিঁধিয়ে। আহত ষাঁড়ের যতটা না পরিচর্যা করা হয়, তার থেকেও বেশি খেয়াল রাখা হয় তার অন্ডকোষে ! খুন হওয়ার আগে বংশধর রেখে গেলে মানুষের তো দু পয়সা লাভ বৈ ক্ষতি হয় না।

যদি ক্ষুর দিয়ে মাটি খোঁড়ে। হাঁক দেয়। শিং বাগিয়ে ভয় দেখায়। কিন্তু তেঁড়ে-ফুঁড়ে আসার নাম নেই। ম্যাটাডোর নীরবে সরে যান সামনে থেকে। অপেক্ষামান কসাইয়ের দল ষাঁড়টির দায়িত্ব নিয়ে নেয়। সত্যিকারের সাহসী ষাঁড় কখনো ধোঁকা দিতে জানেনা। খুন করা কিংবা খুন হয়ে যাওয়ার আগে ম্যাটাডোর মেতে ওঠে এক টুকরো কাপড় তথা কেপ দিয়ে দানবীয় শক্তিকে নিয়ন্ত্রনের খেলায়। মৃত্যুক্ষুধার এ খেলায় শেষ অঙ্কটা নির্ধারিত। হয় ম্যাটাডোরের তলোয়ারে ষাঁড়টির ভবলীলা সাঙ্গ হয়, নয়তো ম্যাটাডোরকে শিংয়ে ঝুলিয়ে অ্যারেনা ছাড়ে ‘তরো’। স্প্যানিশ এ শব্দটার আভিধানিক অর্থ ষাঁড়। প্রায়োগিক অর্থে, যে শেষতক লড়ে যায়। কিংবা লড়াইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র। ষাঁড়টিকে হত্যাকারী ব্যক্তিকে ডাকা হয় ‘ম্যাটাডোর’।

বুলফাইটিংয়ের বিপক্ষে পশুপ্রেমীরা বরারবরই সোচ্চার। তাদের দাবী এটা স্রেফ পশুহত্যার উত্সব। পক্ষাবলম্বীরা বলেন, বটে! কসাইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে কেমন শোনায় কথাটা! ২০১২ সাল থেকে স্পেনের কাতালান অঞ্চলে বুলফাইটিং নিষিদ্ধ। পর্তূগালে খেলাটি চলে রক্ত না ঝরিয়ে। ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল, লাতিন আমেরিকার কিছু দেশেও চলে বুলফাইটিং। মেক্সিকো কলম্বিয়া ইকুয়েডর পেরুতে এক অ্যারেনায় খেলা চলে একের অধিক। স্পেনে সাধারণত বিকেল বেলায় এ খেলার আয়োজন করা হয়। সেখানকার গ্রামবাসিদের মুখে বুলফাইটিংয়ের ডাকনাম তাই—‘শেষ বিকেলের মৃত্যূ’।

হুয়ান বেলমন্তে

‘শেষ’ শব্দটা ছেঁটে ফেললে ইংরেজিতে কথাটি দাঁড়ায়—‘ডেথ ইন দ্য আফটারনুন।’ বইপোকাদের কাছে নামটা কি পরিচিত লাগছে ? তাহলে একটা গল্প শুনুন—‘গুয়ার্নিকা’র স্রষ্টা পাবলো পিকাসো, স্বৈরাচারী ফ্রাঙ্কোর হাতে নিহত স্প্যানিশ কবি ফ্রেদরিকো গার্সিয়ার মতো আরও একজন বিখ্যাত মানুষ বুলফাইটিংয়ের ভক্ত ছিলেন। সময়টা ১৯২৩ সাল। ঘরে সন্তানসম্ভবা স্ত্রী। অনাগত উত্তরাধিকারের কথা ভেবে বায়ু পরিবর্তন আবশ্যিক ছিল। প্যারিস থেকে তাই স্পেনের প্যাম্পেলোনায় চলে আসেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল—স্ত্রী বুলফাইটিং উপভোগ করলে সন্তানের ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু ঘটলো তার উল্টো। তিনি নিজেই বুলফাইটিংয়ের প্রেমে পড়ে যান ! সে এমনই প্রেম, ৬১ বছরের জীবনে আরও আটবার ঢুঁ মারেন প্যাম্পেলোনার অ্যারিনায়। এর মধ্যে ১৯৩২ সালে যেবার প্যাম্পেলোনায় যান, সেবার উদ্দেশ্য ছিল—বুলফাইটিংয়ের ওপর এস্কয়ার ম্যাগাজিনের প্রকাশ করা একটি ইশতেহার নিয়ে গবেষণা করা। পরবর্তীতে ‘বুলফাইটিংয়ের বাইবেল’ হিসেবে মর্যাদা পাওয়া সে ইশতেহারটির নাম ছিল—‘ডেথ ইন দ্য আফটারনুন।’ প্যাম্পেলোনা থেকে ফেরার পর ওই বছর তিনি একটি ভ্রমণ সাহিত্য লেখেন, যার নামকরণ করা হয় ইশতেহারটির নামে —‘ডেথ ইন দ্য আফটারনুন।’ এ বইটির অন্যতম চরিত্র ছিলেন হুয়ান বেলমন্তে!

স্পেনের সর্বকালের সেরা ম্যাটাডোর শিল্পিটি ছিলেন সে ইশতেহার লেখকের নিকটতম ইয়ারদের একজন। ১৯২৬ সালে তার লেখা ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’—বইয়েও বাস্তবের বেলমন্তেকে কলমে ধারণ করেছেন সেই লেখক। এবার নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন ব্যক্তিটি—আর্নেষ্ট মিলার হেমিংওয়ে। নোবেলজয়ী এ মার্কিন লেখক ১৯৬১ সালে মাথায় শটগান ঠেকিয়ে আত্নহত্যা করার পর তার ডেস্কের ড্রয়ার ঘেঁটে দুটি টিকিট আবিষ্কার করা হয়। প্যাম্পেলোনা বুলফাইটিংয়ের আগামি মৌসুমের টিকিট ! একটা না হয় কিনেছিলেন নিজের জন্য, কিন্তু অপরটি? ইতিহাস আজও এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পায়নি।

তবে একটা যোগূসত্র আছে— বুলফাইটিং থেকে বেলমন্তে তার শরীরে উপহার পেয়েছিলেন, ২৪টি স্থায়ী আঘাতের চিহ্ন! ভুগছিলেন অনেক দিন ধরেই। এর পাশাপাশি তাকে আরও দুর্বল করে দেয় হেমিংওয়ের প্রস্থান। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ বেলমন্তে সেইবার ৬৯ বছর বয়সে নিজের শেষ বসন্তে, লংঘন করেন ডাক্তারের হুঁশিয়ারি। অনেকদিনের বিশ্বস্ত সহচর ‘মারাভেল্লা’র পিঠে চড়ে নিজের র‍্যাঞ্চেই দাপিয়ে বেড়ান কিছুক্ষণ। কিন্তু এতে কি আর হারানো যৌবন ফিরে আসে? আনা যায়?

বেলমন্তে সেদিনই জানতে পারেন, ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে তার ফুসফুসে। ঘোড়ায় পিঠে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর নিজের র‍্যাঞ্চে ফিরে আসেন তিনি। এরপর স্টাডিরুমের ড্রয়ার থেকে হাতে তুলে নেন সাড়ে ছয় মিলিমিটারের পিস্তল। বাকিটুকু হেমিংওয়ের মতোই। আত্নহত্যা বিশেষজ্ঞদের মতামত—হেমিংওয়ের ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্নের জবাবটা ‘কপিক্যাট সুইসাইড’-এর মাধ্যমে দিয়েছেন বেলমন্তে। বলতে চেয়েছেন—‘ওয়েল ডান’ !

লেখা : মেহেদি হাসান রোমেল

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nineteen + 14 =