রোনালদো নামা!

রোনালদো নামা!
একজন মদ্যপ গরিব মালী। বাগান-টাগান করেন। যৎসামান্য উপার্জন করেন। উপার্জন যা করেন, তার থেকে খরচ বেশী, দিনশেষে মদ গিলতে হবে তো। স্ত্রী তাঁর তিন সন্তানের দেখভাল করেন, পড়াশোনার খরচ জোটাতে অন্যদের ঘরবাড়ি পরিষ্কারের কাজ করেন। এমন এক টানাপড়েনের সংসারে, আবার গর্ভবতী হয়ে পড়লেন স্ত্রী ।
 
তিনজন কে নিয়েই সামলে উঠতে পারেন না, চতুর্থ জন? একটা গালভরা নাম আছে জিনিসটার – এবোরশন – সেটাই করবেন বলে মনস্থির করলেন।
 
কিন্তু সৃষ্টিকর্তার হিসেব তো আলাদা! হলো না এবোরশন। পৃথিবীতে জন্ম নিল আরেকটি শিশু। মদ্যপ গরীব লোকটির চতুর্থ সন্তান।
 
তিন দশক পরের ঘটনা। স্যান্তিয়াগো বার্নাবিউতে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা। স্টেডিয়ামে তিলধারণের জায়গা নেই। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ার্টার ফাইনাল। আগের লেগ ছিল জার্মানির মাটিতে। জার্মানির অপয়া মাটি। মান সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে, প্রতিপক্ষের দুই গোলের বিনিময়ে গোলশূন্য। কোন এওয়ে গোলও নেই। জিততে হলে করতে হবে কমপক্ষে ৩ টি গোল ।
 
রিয়াল মাদ্রিদের যে খেলোয়াড়টির কথা বলছি – অনেকের ভাষ্যমতে যিনি নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম খারাপ একটি মৌসুম কাটাচ্ছিলেন- শিকারি নাম্বার নাইনের দক্ষতায় টিমমেটের লো ক্রসে পা ছুইয়ে দিলেন, ১-০ ।
 
মহান স্ট্রাইকাররা কখনো হেড দেয়ার জন্য বল কাছে আসার অপেক্ষা করেনা , তারা নিজেরাই বলের কাছে যান। সতীর্থ খেলোয়াড়ের লফটেড কর্নার থেকে অনেকখানি দৌড়ে, স্পেস বের করে বাস্কেটবল প্লেয়ারদের মত জাম্প, মাথার কোণাকুণি একটা মাপা টোকা। ২-০। জ্বি হ্যাঁ, আগের জনই। উন্মত্ত গর্জনে ছুটে গেলেন সাইডলাইনের দিকে। চোখমুখে ঠিকরে বেরুচ্ছে আবেগ। বার্নাবিউ তখন উন্মাতাল।
 
যা হোক , যার কথা বলছিলাম, অনেকদিন ধরেই কথা হচ্ছিল – ফ্রিকিক নিতে ভুলে গিয়েছেন। ম্যাচের অন্তিম মুহুর্তে বক্সের সামনে ডান দিকে পেলেন একটি ফ্রিকিক। ৩০-৩৫ গজের মধ্যে। স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন কিপারের দিকে। রেফারি বাঁশি বাজানোর পর, খুব আস্তে একটি নিঃশ্বাস ছাড়লেন। ধীরপায়ে রান আপ নিয়ে শট টি নিলেন। ৩-০ । রিয়াল মাদ্রিদ টু সেমিফাইনাল।
 
”ইউনাইটেডের ইতিহাসের সেরা দুজন খেলোয়াড় জর্জ বেস্ট এবং ডেনিস ল। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, তাদের দুজনের থেকে ভাল খেলোয়াড়।” – ইয়োহান ক্রুইফ, এপ্রিল, ২০০৮।
 
কিছু বুঝলেন?
 
ইয়োহান ক্রুইফ শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড় নন। একজন ফুটবল বিশ্লেষক, একজন গেইম রিডার, একজন নতুন যুগের স্রষ্টা। নেদারল্যান্ডের টোটাল ফুটবলের মুল কারিগরটি ছিলেন তিনিই – তার নিন্দুকেরাও স্বীকার করতে বাধ্য। খেলোয়াড়ি জীবনেও – তার মত করে ট্যাকটিকসটা দুনিয়ার অন্য কোনও খেলোয়াড় বুঝেনি – বেকেনবাওয়ার ছাড়া।
 
সেই বেকেনবাওয়ারকে তিনি ট্যাকটিকাল দক্ষতায় ছাড়িয়ে গিয়েছেন নব্বইয়ের দশকে এসে। বার্সার ল্যাতিন ঘরানার পাসিং ফুটবলের জমিতে, টোটাল ফুটবলের বীজ বপন করে – তিকিতাকা নামক ফসলের জন্ম দিয়ে ।
 
সেই ইয়োহান ক্রুইফ যখন বলে বসেন, রোনালদো ডেনিস ল আর বেস্ট থেকে ভালো – তখন সেটাকে ফু দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। আসুন দেখি,আমরা কতটা কি করতে পারি নিজেদের যুক্তি-বিশ্লেষণ দিয়ে।
 
রোনালদোর স্বাভাবিক পজিশন কি?
 
লেফট বা বাম উইং।
 
কিন্তু বছর দশেক আগে অবস্থাটা এমন ছিলনা। খেলাটা শুরু করেছিলেন রাইট উইঙ্গার হিসেবে। কিন্তু ডান পায়ের খেলোয়াড় হিসেবে কাট ইনসাইডে পারদর্শী হওয়ায়, স্পোর্টিং লিসবনে তাকে মাঝে মাঝেই লেফট উইংয়ে নিয়ে আসা হত। ২০০৩ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে সেই ম্যাচের পর, সেই ম্যাচ – যেখানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রাইটব্যাক জন ও’শিয়া অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন হঠাৎ হাফটাইমে – ফার্গির শিষ্যরা একপ্রকার সুপারিশ করেই ক্রিস কে দলে ভেড়ায় ।
 
বাকিটা ইতিহাস ।
 
কিন্তু সব ইতিহাসের একটা মেইকিং থাকে । রোনালদোরও ছিল ।
 
রোনালদোকে প্রথম প্রথম ডানে খেলালেন ফার্গি । দেখলেন, ১৭ বছরের তরুণটি, প্রতিপক্ষের লেফট ব্যাককে গতিতে পরাস্ত করে ডান প্রান্তে চলে যাচ্ছে – যে জায়গাটা একজন ডান পায়ের খেলোয়াড়ের জন্য ক্রসের আদর্শ জায়গা। কিন্তু নাম্বার ৭ এর ক্রসে মন নেই। সে উল্টো ওই এংগেল থেকেই পায়ের কারিকুরি করে বক্সে ঢুকে বুলেট গতিতে শট নিচ্ছে, নাহয় ড্রিবলিং করে ঢোকার চেষ্টা করছে, না হয় বল হারাচ্ছে ।
 
বিচক্ষণ জহুরী ফার্গির রত্ন চিনতে ভুল হয়নি ।
 
৩-৪ ম্যাচ বাদেই নাম্বার ৭ কে খেলালেন, লেফট উইঙ্গার হিসেবে, গিগসের স্বাভাবিক পজিশনে।
 
ওটা ছিল শুধু একটা ধাপ আরকি। এরপর ক্রিস্টিয়ানো যা শুরু করলেন সেটা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ অনেকদিন হলো দেখেনি ।
 
প্রথাগত উইঙ্গার – ধারণাটার সকল প্রথা ভেঙ্গে দিয়ে ইউনাইটেডের বামপ্রান্তে দেখাতে লাগলেন ডেভিড কপারফিল্ডের জাদু। ইউনাইটেডের প্রতিটি ম্যাচ, একেকটি নিশ্চিত ম্যাজিক শো প্যাকেজ। কি নেই সেখানে! একজন প্লেয়ারকে হয়তো গতিতেই পরাস্ত করছেন, তো সামনের জনকে কাটাচ্ছেন ৩৬০ দিয়ে,আর তার পরেরজনকে দুর্বার গতির স্টেপ ওভারে বোকা বানিয়ে ট্র্যাক চেইঞ্জ করে সেন্টারে ঢুকছেন, কখনো কর্নার ফ্ল্যাগের গজখানেকের মধ্যে ইলাস্টিকোর যথার্থ প্রয়োগে বক্সে ঢুকছেন। মাঝেমধ্যে হয়তো প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে স্টেপওভার কি , কাকে বলে, কতপ্রকার ও কি কি উদাহরণ সহ শেখাচ্ছেন। এত স্কিলসম্পন্ন ড্রিবলার, এর আগে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখেছে কি না – সেটা নিয়েই হৈ চৈ পড়ে গেল । প্রায় প্রতি ম্যাচেই চলতে লাগলো এরকম। এক মৌসুম পরেই আসল ইউরো ০৪।
 
রোনালদো ততদিনে পর্তুগালের ”নতুন ফিগো” খেতাব জুটিয়ে নিয়েছেন। পর্তুগাল তাদের সোনালি প্রজন্ম নিয়ে অংশ নিল সেই ইউরোতে। ফিগো, রুই কস্তা, নুনো গোমেজ, ম্যানিশ, রিকার্ডো, কুটো, ডেকো, তিয়াগো, পেতিত আর নতুন ফিগো ”ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো”।
 
প্রথম ম্যাচেই গোল। সারা ম্যাচ গ্রিসের রক্ষণ কাঁপিয়ে দিয়ে একটি গোল করেও দলকে জেতাতে পারলেননা। তবে ভেঙ্গে পড়েননি। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই খেললেন দুর্দান্ত। দুর্দান্ত গতি আর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং এর মিশেলে, পর্তুগালের বাম প্রান্ত উজ্জ্বল করে রাখলেন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই। সেমিতে হল্যান্ডের বিপক্ষে করলেন গুরুত্বপূর্ণ আরেক গোল, দল উঠলো ফাইনালে।
 
ফাইনালে পর্তুগাল হারার পরে, ১৯ বছরের রোনালদোর বাচ্চার মত কান্না কাঁদিয়েছে বহু দর্শককে। তবে পার্ফর্মেন্সের পুরস্কার ঠিকই পেলেন – টুর্নামেন্টের সেরা একাদশে জায়গা করে নিয়ে।
 
১৯ বছরের একজন তরুণের কাছ থেকে আর কি চাইতে পারেন আপনি?
 
যা হোক, বাধ্য হয়ে ফার্গুসন, গিগসের মতন সিনিয়র প্লেয়ারের পজিশন বদলে ডানপ্রান্তে নিলেন – দলের তরুণ তারকাকে নিয়মিত খেলানোর জন্য।
 
এক মৌসুম পর প্যাট্রিস এভরা আসলেন দলে – এই সলিড ব্যাক আপ টুকুই দরকার ছিল রোনালদোর। এভরা-ক্রিস্টিয়ানো জুটি এখনও প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের অন্যতম সেরা উইং জুটি।
 
এরই মাঝে ২০০৬ এর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮ গোল করে পর্তুগালের বাছাইয়ে অবদান রাখলেন। বিশ্বকাপে, ফিগোর সাথে তার জুটি ছিল ওই বিশ্বকাপের সেরা উইং জুটি। ”রুনির লাল কার্ড” ঘটনার কারণে, ইংলিশ ফ্যানদের নেগেটিভ অসংখ্য মেইল – তাকে অল্পের জন্য টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরষ্কার জিততে দেয়নি।
 
০৬-০৭ মৌসুমে রোনালদো করলেন ২২ গোল, প্রিমিয়ার লিগের তরুণ সেরা খেলোয়াড়ের জন্য বরাদ্দ সব পুরস্কারই জিতলেন ।
 
পরের মৌসুমে জর্জ বেস্টের রেকর্ড ভেঙ্গে করলেন ৪২ গোল, জিতলেন জীবনের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা।
 
মৌসুম শেষে এল পরম আরাধ্য পুরষ্কার – ফিফা প্লেয়ার অব দা ইয়ার এবং ব্যালন ডি অর।
 
এই দু বছরে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বিশ্বকে নতুন করে ফুটবল শেখালেন। দেখালেন, একজন প্রথাগত স্ট্রাইকার না হয়েও, কিভাবে গোলবন্যা বইয়ে দেয়া যায়। কিভাবে একজন উইঙ্গার হয়েও দলের মূল গোলস্কোরার হয়ে ওঠা যায়। বিশ্ব চিনলো এক নতুন মহাতারকা কে।
 
গোলস্কোরার হিসেবে রোনালদো যে পথচলাটা শুরু করেছিলেন, সেটা এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু পরিবর্তন হয়েছে তার দল (রিয়াল মাদ্রিদ), আরও শাণিত হয়েছে আক্রমণের ধার।
 
ইনজুরি জর্জরিত একটা দল নিয়ে, বিশ্বকাপ ১০ এর গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচেই হলেন ম্যাচ অব দা ম্যাচ।
 
পরের তিন মৌসুমে, লা লিগা এবং মাদ্রিদের রেকর্ডের খাতা ছিন্নভিন্ন করে ফেললেন। তেলমো জারার রেকর্ড ভাঙলেন, পিচিচি ট্রফি জিতলেন, প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে লা লিগার সকল দলের বিপক্ষে গোল করলেন – তিনি স্ট্রাইকার নন, একজন উইংগার।
 
দলের সেন্টার ফরোয়ার্ড না হয়েও দলের মুল গোলস্কোরার – মোটামুটি ভাবে একটা ধারার সুচনা করেছেন সর্বপ্রথম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
 
একটা পরিসংখ্যান দেই,
 
রিয়ালের হয়ে ৩৬৮ ম্যাচে ৩৮১ গোল রোনালদোর। এবং, তিনি আক্রমণভাগের বাম প্রান্তে খেলেন (এখন প্রেক্ষাপট আলাদা, ক্রিস্টিয়ানো বামপ্রান্তে ম্যাচ শুরু করলেও আস্তে আস্তে মাঝে চলে আসেন ) – রাউল, রোনালদো, ডি স্টেফানো, স্যানচেজ, জারা – এদের মত প্রথাগত স্ট্রাইকার নন। কিন্তু রিয়ালের হয়ে তার গোল করার হার এদের সবার থেকে অনেক ভাল।
 
আপনি যে বলবেন সে লা লিগা সহজ পেয়ে মুড়ি মুড়কির মত গোল করে – বিষয়টা তা না।
 
ইউরোপের সবচাইতে কঠিনতম লিগ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেও ৩৪ গোল আছে এক মৌসুমে তার। শেষ ৫ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে করেছেন ৬৫ গোল, অর্থাৎ প্রতি মৌসুমে ১৩ টি করে!
 
আগে বলতাম রোনালদো ছাড়িয়ে যাবেন রাউল, ডি স্টেফানো কে। সত্যিই তিনি তাই করেছেন। রিয়ালের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। পর্তুগালের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
 
২০০৪ ইউরো, ২০০৬ বিশ্বকাপ, ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ, ২০১২ ইউরো, ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৬ ইউরো – টানা ৭ টি টুর্নামেন্টে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড়।
 
কিন্তু রোনালদো আমাদের মনে কিন্তু তার এইসব পরিসংখ্যান দিয়ে থাকবে না !
 
ক্রিস্টিয়ানো আমাদের মনে থাকবে সম্পূর্ণ আলাদা একটা অনুভূতি নিয়ে। কি নাম দিব তার? ফিনিক্সিজম? বারবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েও আবার বিধ্বংসী রুপে ফিরে আসা?
 
”Your love makes me Stronger. Your hate makes me unstoppable.”
 
আমি জানিনা। প্রথমবার ফিফা বর্ষসেরা হওয়ার পর, গুণে গুণে টানা চারটি মৌসুম মেসি ব্যালন ডি অর জিতলেন। স্বয়ং তাঁর ভক্তরাই ক্রিস্টিয়ানোর ব্যালনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যে ক্রিস্টিয়ানো! কিসের কি! ফিরে এলেন দোর্দন্ড প্রতাপে! টানা দুই বছর জিতলেন ব্যালন ডি অর । আর এখন তো মেসি – রোনালদো উভয়েরই চারটা করা বিশ্বসেরার খেতাব!
 
প্রথম বছর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সব রেকর্ড ছিড়েখুড়ে ফেললেন। বায়ার্নকে তাদের মাঠেই ৪-০ গোলে হারিয়ে আসলেন। দলকে একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন ফাইনাল পর্যন্ত। রিয়াল জিতল পরম আরাধ্য “লা দেসিমা”।
 
দ্বিতীয় বছর , লা লিগা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মিলিয়ে গোলের বন্যা বইয়ে দিলেন – দল যদিও জিতেনি কিছুই। আগের মৌসুমের রেশ ধরে জিতলেন ব্যালন ডি অর। মেসির সাথে ব্যবধান ৪-২।
 
পরের বছর , মাদ্রিদকে জেতালেন এগারতম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। যখন যেভাবে দরকার, সেখানেই ত্রাতা হিসেবে হাজির। হোক সেটা ন্যু ক্যাম্পে বার্সার বিপক্ষে, হোক ভলফসবুর্গের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে। রোনালদো মানে, ১০ জনের দল নিয়েও বাঘের মত লড়াই করে আর “করিয়ে” ন্যু ক্যাম্পে বার্সাকে হারিয়ে আসা। আর ০-২ এ পিছিয়ে থেকে, হ্যাট্ট্রিক করে দলকে সেমিতে তোলা! কোয়ার্টার থেকে প্রায় নিজের হাতে টেনে রিয়ালকে নিলেন ফাইনালে। বাকিটুকু মাদ্রিদের সোনালি সাফল্যে প্লাটিনামের প্রলেপ, লা উনদেসিমা জয়।
 
এরপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ইউরো ২০১৬। পর্তুগালের যখন যেখানে দরকার, ঠিক সেখানে সেখানে কন্ট্রিবিউট করলেন। পর্তুগালের ৬ টি গোলই হয় রোনালদোর করা, নাহয় “করানো” (এসিস্ট)। ইউরো ফাইনাল। দিমিত্রি পায়েতের সাংঘাতিক ট্যাকলে পেলেন অসহনীয় আঘাত। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেন। পড়ে গেলেন মাটিতে। এমনকি ঘোরতর শত্রুরও মনটা খারাপ হলো । না, ছেড়ে দেন নি। আবার চোয়াল শক্ত করে উঠে দাঁড়ালেন। জিততে হবে। জেতাতে হবে দেশকে।
 
কদম বিশেক দৌড়েই আবার বসে পড়লেন। ব্যথায় কুঁচকে উঠল মুখ। হাতের ইশারায় মেডিকেল টিম ডাকলেন। স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার আগে দুঃখ ভারাক্রান্ত নয়নে নানি কে পরিয়ে দিলেন অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড।
 
না। ফুটবল বিধাতা নিরাশ করেননি তাকে। পর্তুগালের একমাত্র মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা উঠলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাতে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ডস স্যান্তোস এভেইরো – ম্যাদেইরার “জন্ম না হতে পারত” শিশুটি ।
 
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে, বাকি সব “গ্রেট” প্লেয়ার থেকে আলাদা করে রাখে একটা জিনিস। তার ধারাবাহিকতা। ২০০৬ , ২০০৭, ২০১১…২০১৬… স্টিল গোইং। টানা দশ বছর একটা প্লেয়ার একই ছন্দে সেরা ফর্মে খেলে যাচ্ছেন। কখন উইঙ্গার হয়ে উসাইন বোল্ট হয়ে স্প্রিন্ট দেন, কখনো বক্সে বাকি সবাইকে বামন বানিয়ে মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ক্লোনিং করেন, কখনো ব্রাজিলিয়ান রোনালদোর ট্রেডমার্ক স্টেপওভার ফিরিয়ে আনেন, ফিনিশিং এ কিংবা ওয়ান অন ওয়ান এ, কখনো রবার্তো কার্লোস হয়ে ফ্রি কিকে ভয় ধরান, কখনো কখনো মনোযোগী মনের উইংব্যাকের কাজও করতে দেখা যায় দলের প্রয়োজনে, নেস্তার পার্ফেক্ট স্লাইড ফিরিয়ে আনেন মনোযোগী ছাত্রের মত।
 
সুপারম্যান থিং। ভুল বলেছি। জাস্ট রোনালদো থিংস।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fifteen + 19 =