তবে কি শীঘ্রই অবসান ঘটছে রিয়ালের দুরাবস্থার?

রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের জন্য সুখবর। মার্চের প্রথম সপ্তাহেই দলে ফিরছেন দলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ। খবর নিশ্চিত করেছেন মদ্রিচ নিজেই।

সাম্প্রতিক সময়ে রিয়াল মাদ্রিদের দুরাবস্থার অন্যতম কারন হিসেবে ধরা হচ্ছে এই ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডারের অনুপস্থিতিকে। গত নভেম্বরের মাঝামাঝি জাতীয় দলের হয়ে ইতালির বিপক্ষে ইউরো ২০১৬ কোয়ালিফায়ার ম্যাচ খেলতে গিয়ে উরুতে চোট পান এই মিডফিল্ডার। এরপর থেকেই মাঠের বাইরে তিনি।আর এই সময়টার মধ্যেই রিয়াল মাদ্রিদকে সবচেয়ে বেশী ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

মদ্রিচকে ছাড়া মাদ্রিদ ম্যাচ খেলেছে ১৮ টি। এরমধ্যে জয় ১৪ টি, ড্র ১ টি এবং হার ৩ টিতে। এই ম্যাচগুলোতে মাদ্রিদ গোল করেছে ৪৬ টি এবং গোল খেয়েছে ১৫ টি। এই পরিসংখ্যান অবশ্যই খারাপ বলা যাবে না। যদি একটি জয়ের জন্য ৩ পয়েন্ট আর একটি ড্রয়ের জন্য ১ পয়েন্ট করে দেয়া হয় তবে এই ১৮ ম্যাচে মাদ্রিদ প্রতি ম্যাচে গড়ে ২.৩৯ পয়েন্ট অর্জন করেছে যা মদ্রিচ থাকাকালীন অবস্থায় প্রতি ম্যাচের গড় পয়েন্ট (২.৩৫) থেকে বেশী। (মদ্রিচ থাকাকালীন অবস্থায় মাদ্রিদ ম্যাচ খেলেছিল ১৭ টি। এর মধ্যে জয় ১৩, ড্র ১ এবং হার ৩ টিতে)

তবে এসব কাগজে-কলমে লেখা পরিসংখ্যানের দিকে না তাকিয়ে আসুন একটু ভেতরে তাকাই। মদ্রিচ রিয়াল মাদ্রিদের খেলায় যে মান বা দক্ষতা নিয়ে আসতেন তা তাঁর ইনজুরির পর অনেকটাই মুহ্যমান। বিশেষ করে বড় ম্যাচগুলোয় যেমন, ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে লা লিগায় হার কিংবা কোপা দেল রে এবং লা লিগায় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে হারের ম্যাচগুলোয় মদ্রিচের অভাব খুব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়াও ছোট দলের বিপক্ষে ম্যাচগুলোয় মাদ্রিদের খেলায় আগের মত কোন চাপল্যতা লক্ষ্য করা যায়নি।

মাঝেমধ্যে ওইসব ম্যাচে মাদ্রিদের বর্বর কাউন্টার-অ্যাটাকের বলে মাদ্রিদ গোল করেছে, সাথে ম্যাচ প্রতিপক্ষের নিকট হতে ছিনিয়ে নিয়েছে ঠিক কিন্তু তবুও ওই ম্যাচগুলোয় শুরুর দিকে মাদ্রিদের খেলা খুব মন্থর মনে হয়েছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিপক্ষ দল তাদের উপর ছড়ি ঘুড়িয়েছে।

লুকা মদ্রিচ সম্পূর্ণ ভিন্নমানের খেলোয়াড়। সে গতিশীল, চঞ্চল এবং খেলোয়াড়ি দিক থেকে দারুণ রকমের দক্ষ। সে তাঁর এই দক্ষতা এবং চঞ্চলতা, তাঁর দুর্দান্ত দূরপাল্লার পাসের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে আতঙ্ক তৈরি করেন। সাথে আবার যোগ করুন দিন দিন ক্রমাগত বাড়তে থাকা ডিফেন্সে তাঁর দায়িত্ববোধ এবং দক্ষতা।

ক্রুস-মদ্রিচঃ মাদ্রিদের মিডফিল্ড ভরসা

এই সিজনের শুরুর দিকে মদ্রিচ আর ক্রুস মিলে মাদ্রিদের খেলার তাল নিয়ন্ত্রন করতেন। লা লিগায় একসাথে খেলা প্রথম ১০ ম্যাচে এই দুজন মিডফিল্ড মায়েস্ত্রো মিলে দলের মোট পাসের প্রায় ৩০ ভাগ বিলি করেছেন। ফলে মদ্রিচ চলে যাওয়াতে এই দায়িত্ব পুরোটাই ক্রুসের একার ঘাড়ে চেপে যায়। কাজটা বেশ ভালভাবেই করেছেন ক্রুস। মাদ্রিদের হয়ে পাঁচ পাঁচটি ম্যাচে তিনি একা পুরো দলের হয়ে রেকর্ড সংখ্যক পাস বিলি করেছেন। সাথে আরেকজনও কিছু দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন। তিনি ইস্কো অ্যালকারন।

মদ্রিচের অনুপস্থিতিতে ইস্কোর পাসগুলোর ধরন

তাঁর ক্যারিয়ারে, মদ্রিচের অনুপস্থিতিতে, তিনি সর্বোচ্চ ৬ বার পুরো দলের খেলায় রেকর্ড সংখ্যক পাস দিয়েছেন। এমনকি মদ্রিচের অনুপস্থিতিতে তাঁর পাসের ধরন এবং ছন্দেও অনেক পরিবর্তন এনেছেন তিনি। যদিও ইস্কোর এই কার্যক্রম প্রশংসার দাবিদার কিন্তু সত্যি বলতে তিনি যে পজিশনে খেলেন সেখান থেকে এই কাজের দ্বারা ক্রুস কতটুকু সাহায্য পেতে পারেন তা বোধহয় দুইবার ভেবে দেখতে হবে। কারন লেফট-অ্যাটাকিং মিডফিল্ড থেকে সামনে এবং পার্শ্বে উভয় দিকেই খেলার জায়গা কিছুটা কম থাকে। ফলে মদ্রিচ সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকে যে সুবিধাটা নিতে পারেন তা ইস্কো কখনই নিতে পারবেন না।

মদ্রিচের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেছেন ইস্কো

যুক্তি আরও আছে। লুকা মদ্রিচের আরেকটি বিশেষ গুন হল তাঁর গতি। সাথে যোগ করুন প্রতিপক্ষের গোলে আচমকা দুরপাল্লার শট। বলের নিয়ন্ত্রনের সাথে গতির মেলবন্ধন ঘটানোয় মদ্রিচের জুড়ি নেই। অনেক সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারই আছেন যারা মদ্রিচের মত পাস দিতে দক্ষ কিন্তু খুব কম খেলোয়াড়ই পারেন মদ্রিচের মত এত দ্রুত এবং ক্লান্তিহীনভাবে যেকোন দিকে একের পর এক পাস দিয়ে যেতে। তিনি যে দলের হয়ে খেলেন সে দলের খেলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা চাপল্যতা ফিরে আসে।

কার্লো অ্যানচেলত্তি একবার বলেছিলেন,

“তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হল বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। মদ্রিচ আমাদের (রিয়াল মাদ্রিদের) আক্রমণভাগের খেলার ছন্দই পরিবর্তন করে দিয়েছে”

কথাটা একবার লক্ষ্য করুন। একজনমাত্র খেলোয়াড়ের জন্য পুরো দলের খেলার ছন্দ পাল্টে যাচ্ছে! এখন আসুন কার্লোর কথার সত্যতা যাচাই করি। যারা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে রিয়ালের সর্বশেষ খেলা দেখেছেন তারা হয়ত লক্ষ্য করে থাকবেন যে পুরো ম্যাচে রিয়ালের প্রতিপক্ষের গোলে শট ছিল মাত্র ৪ টি! এর দ্বারা কি কিছু স্পষ্ট হল? রিয়াল মাদ্রিদের আক্রমণভাগ যে ছন্দে খেলে অভ্যস্ত সে ছন্দের কারিগর নেই বলেই তো আজ রিয়ালের অ্যাটাকের এই দুরবস্থা। হ্যাঁ এখন আপনি বলতে পারেন যে ছোট দলের বিপক্ষে তো রিয়াল মাদ্রিদ ভালই খেলেছে। তখন আমার যুক্তি হবে যে দলে বি বি সি আছে কি করতে? ছোট দলের বিপক্ষেও গোল না করতে পারলে এই ত্রয়ীর সার্থকতা কি?

মদ্রিচহীন বিবিসি যেন নখদন্তহীন বাঘ

তার মানে কি বড় দলের বিপক্ষে বিবিসি সম্পূর্ণ অকার্যকর? মোটেও না। বরং বড় দলের বিপক্ষে আপনার খেলায় সেই মানের ছন্দ থাকতে হবে, একটা তুরুপের তাস লাগবে যা না থাকলে আপনি আপনার প্রতিপক্ষের দুর্বলতা শাসন করতে পারবেন না। আর এখানেই রিয়াল মাদ্রিদ মদ্রিচের অভাববোধ করছে। কারন রিয়াল মাদ্রিদের তুরুপের তাস যে এই মদ্রিচই! সে রিয়াল মাদ্রিদের অদৃশ্য ট্র্যাম্প কার্ড। আর এই ট্র্যাম্প কার্ড না থাকাতেই আজ রিয়াল মাদ্রিদে এত এত দুর্দান্ত খেলোয়াড় থাকার পরও শুধুমাত্র সঠিক ছন্দের অভাবে বার বার খেই হারিয়ে ফেলছে। (তবে যারা এখনও বিবিসিকে নিয়ে সন্দিহান তাদের বলব গত মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন লিগের সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগের ম্যাচটা কষ্ট করে আরকবার দেখতে। আর হ্যাঁ ওই ম্যাচে মদ্রিচ মাঠে ছিলেন।)

কিছুদিনের ভেতর আবারও এমন দুর্দান্ত পাস দিতে দেখা যাবে এই ক্রোয়েশিয়ান জাদুকরকে

তবে যাই হোক দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এইতো আর কিছুদিনের মধ্যেই দলে ফিরছেন লুকা মদ্রিচ। খুব সম্ভভত মার্চের ১০ তারিখ চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শালকের বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে ইনজুরি-পরবর্তী সর্বপ্রথম মাদ্রিদের হয়ে মাঠে নামবেন এই ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডার। আর এরই মাধ্যমে হয়তো রিয়াল মাদ্রিদের সাম্প্রতিক দুর্ভাগ্যের দৌড়ের অবসান ঘটবে এমনটাই আশা এখন সকল মাদ্রিদিস্তার।

 

 

কমেন্টস

কমেন্টস