ক্রিস রজার্স – অন্তরালের মহানায়ক

স্যার আইজ্যাক নিউটন । সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন । মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ, গণিতের ইন্টিগ্র্যালের মত যুগান্তকারী আবিস্কারের পর তিনি হাত দিলেন ‘ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের’ কাজ । দীর্ঘ কয়েক বছর খেটে ডিসি থিওরীর উপর রচনা করলেন এক বিশাল পাণ্ডুলিপি ।
কিন্তু জলে গেল সবটাই । পাণ্ডুলিপি তৈরির কয়েকদিনের একদিন তার পোষা কুকুরটি এক কাণ্ড করে বসলো । টেবিলে লাফ দিতে গিয়ে হ্যারিকেনটি উল্টে ফেলে দেয় । ব্যস ! পাশে থাকা পাণ্ডুলিপিতে আগুন ধরে যায় নিমিষেই । নিউটনের মাথায় হাত । দীর্ঘ কয়েক বছরের সাধনা নিমিষেই ছাঁই !
ভেঙ্গে পড়া নিউটন অবশ্য দমলেননা । আবারও শুরু করলেন থিসিস লেখা । অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন আরও কয়েকটি বছর ।
নিউটনের মত এমন নিষ্ঠা, ধৈর্য্য আর অধ্যাবসায়ের গল্প ইতিহাসে অনেক আছে ।
গল্পগুলো একই । তবে নায়ক চরিত্র ভিন্ন ।
এই গল্পগুলোর এক নায়ক ক্রিস রজার্স ।
পুরো নাম ক্রিস্টোফার জন লেউইলেন রজার্স ।
১৯৭৭ সনে আগস্টের শেষ দিবসে জন রজার্সের ঘরে জন্ম নেন রজার্স জুনিয়র । রাজার ছেলে রাজা আর ধোপার ছেলে যখন ধোপা হয় তখন ক্রিকেটার রজার্সের পুত্র রজার্স জুনিয়রই ক্রিকেটারই হলেন । পিতার কাছে হাতেখড়ি ছোট রজার্সের ।
১৯ বছর বয়সে ক্রিস রজার্স ইংল্যাণ্ডে গেলেন তার ক্রিকেট জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে । ডেভন প্রিমিয়ার লীগে তার দল ছিল নর্থ ডেভন সিসি ।
লীগে রেকর্ড ১,২৭৩ রান করলেও ক্রিসের দল হেরে রেলিগেটেড হয়ে যায় ।
এরপর মাঝখানে বিরতি । বছর পাঁচেক পরে ২০০২ সালে আবারও ইংল্যাণ্ডে ডাক পান ক্রিস । সেই ডেভন লীগে । তবে এবারে তার দল এক্সটার ।
পরের বছরই শোর্পশায়ার লীগ, বার্মিহাম লীগেও খেলেন তিনি । তবে ইংল্যাণ্ডের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার অভিষেক ঘটে ২০০৪ সালে ডার্বিশায়ারের হয়ে । কাঁধের ইনজুরি নিয়েও মৌসুমটা দারুন কাটান তিনি । পরের বছর লিচেষ্টাশায়ারে যোগ দিয়ে নিজের জাত চেনান এই ওপেনার । অবিশ্বাস্য ৭০ গড়ে ক্রিসের রান সংগ্রহে ছিল এক দ্বিশতকও । ২০০৬ সালটাও পয়মন্ত ক্রিসের জন্য । নর্দাম্পটনশায়ারের হয়ে এক ম্যাচে ৩১৯ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন ।
আট বছরের ইংলিশ যাত্রা শেষে এবার ঘরে মনযোগ দেন ক্রিস । সে বছরের অক্টোবরে ঘরোয়া লীগে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মার্কস নর্থের সাথে গড়েন ৪৫৯ রানের এক তৃতীয় উইকেট রেকর্ড পার্টনারশীপ । ওয়াকায় ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে তার ব্যাট থেকে আসে ২৭৯ রানের এক চিত্তাকর্ষক ইনিংস ।
এই ইনিংস তাকে রেকর্ডের বুকে নাম লেখায় । জিওফ মার্শের পর ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিক বনে যান ক্রিস ।
১৯৮৯ সালে একই মাঠে জিওফ মার্শ খেলেছিলেন রেকর্ড ৩৫৫ রানের এক অনবদ্য ইনিংস ।
ক্রিসের ধারাবাহিক নৈপূণ্যর পুরস্কার আসে ২০০৭ সালে । অ্যালান বোর্ডার প্রেজেন্টেশনে ‘স্টেট প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জেতেন তিনি । পরের বছর আবারও ইংল্যাণ্ডে ডাক পান ক্রিস । মাহেলা জয়াবর্ধনের বিকল্প হিসেবে ডার্বিশায়ার আবারও দলে ভেড়ায় তাকে ।
সে বছরই স্বপ্নের জাতীয় দল থেকে ডাক আসে ।
জাস্টিন ল্যাঙ্গারের রিপ্লেসমেন্টে ভারত সফরে ক্রিস সুযোগ পান অস্ট্রেলিয়ার ৩৯৯ নম্বর ব্যাগি গ্রিন সদস্য হিসেবে ।
তবে এক ম্যাচ খেলেই বাদ পড়তে হয় তাকে । বাদ পড়াটা সাময়িক ছিলোনা ।
দলে আর ডাক পাওয়াই হলোনা তার । তবে দমলেননা এই ক্রিকেটার । ঘরোয়া লীগে এবার দল পাল্টালেন তিনি । ২০০৮/০৯ মৌসুমে যোগ দিলেন ভিক্টোরিয়াতে । সেই বছরই ইংল্যাণ্ড ডার্বিশায়ারের হয়ে ২৪৮ রানের অপরাজিত এক ইনিংস আসে রজার্সের ব্যাট থেকে । ইনিংসটির কল্যাণে আবারও রেকর্ড বইয়ে নাম ওঠে রজার্সের । ডার্বিশায়ারের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ও শেষ ৬২ বছরের সবচেয়ে বড় ইনিংস খেলেন তিনি ।
এই দ্বিশতকে আরেকটি মাইলস্টোনে পৌছেন এই পরিশ্রমী ওপেনার । নিজের অংশগ্রহণকৃত চারটি প্রথম শ্রেণির দলের হয়েই দ্বিশতক পান তিনি । ২০১১ তে মিডলেসেক্সে যোগ দিয়ে চারদিনের কাউন্টিতে অধিনায়কের দায়িত্ব পান ।
পরিশ্রম, অধ্যাবসায় আর জাতীয় দলের লক্ষ্যে ক্রিসকে ঘরোয়া সাফল্য দেয় দু হাত ভরে । ২০১৩ সালে আবারও দ্বিশতক হাঁকান তিনি ।
কিন্তু এতসব সাফল্যেও যেন তৃপ্ত নন ক্রিস্টোফার রজার্স । দৃষ্টি তার জাতীয় দলে । যে স্বপ্নের জাতীয় দলে তার অভিষেক স্মৃতি মোটেই সুখকর ছিলোনা ।
২০০৮ এর ভারত সিরিজে তার অভিষেক হয়েছিল ইনজুরি আক্রান্ত ম্যাথু হেইডেনের কল্যাণে ।
দুই ইনিংসে মাত্র ১৯ রান করে শুধু দল থেকেই বাদ পড়েছিলেন না, সে বছরই তার সাথে চুক্তি বাতিল করে জাতীয় বোর্ড । ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্রিস তখন বলেছিলেন, ‘didn’t see it comin, i’ll have to accept it and try to get back in.
২০০৩ থেকে ২০০৮ এর ধারাবাহিক পারফর্মেন্স রজার্সকে একটি মাত্র আন্তর্জাতিক ম্যাচ উপহার দিলেও সেটি নিয়ে হয়ত খুব বেশি অভিমান ছিলোনা ক্রিসের । কারণ তখনও অজি দল কিংবদন্তীতে ঠাসা । তবে ভেঙ্গে পড়েননি তিনি । জানতেন সময় একদিন আসবেই ।
পরিশ্রমের পুরস্কার একদিন ঠিকই তার ব্যাটে ভর করে আসবে । বিশ্বাস হারাননি তিনি । আইজ্যাক নিউটনের ন্যয় খেটেছিলেন পুনরায় । খেটেছেন আরও পাঁচ পাঁচটি বছর । Feb 10th, 7:01pm ওদিকে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল করলেও অন্য অনেক অজিম্যানের মত লাইমলাইটের অন্তরালেই থাকতেন রজার্স । উপরন্তু বয়সটা ত্রিশের কোঠা ছাড়িয়ে যাচ্ছে । মনুষ্য জীবনে ৩০ বছর বয়স হিসেবে যুবক তকমা পেলেও একজন পেশাদার খেলোয়ারের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি উল্টো । ক্রীড়া জগতে ত্রিশোর্দ্ধদের ওল্ডম্যান বিবেচনা করা হয় । তাই রজার্সের ফেরার সম্ভাবনা খোদ রজার্স ছাড়া অন্য কেউ দেখেছে বলে মনে হয়না । তবে ক্রিকেটের গুরুস্থান অস্ট্রেলিয়ায় এমন ক্রিকেট শ্রম বৃথা যাবে তা কি হয় !
প্রকৃতি তাই এবার অজি নির্বাচকদের দৃষ্টি প্রসারিত করে দিলেন ।
দিনটি ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল । অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে অ্যাশেজ সফরে ।
সফরে ঘোষিত হলো ১৬জনের নাম ।
বিস্মিত অনেক পুরোনো অজিভক্তই চমকে গেলো একটি নামে ।
Cris Rogers !
নয়া অজি ভক্তরা তো ভেবেই নিলো এই বুড়ো বয়সে অভিষেক হতে যাচ্ছে রজার্স নামক এক ওপেনারের ।
রজার্স আবারও দলে এলেন ।
সেই স্বপ্নের জাতীয় দল । যার জন্য তার এত পরিশ্রম, এত অধ্যাবসায় ।
যার জন্য তাকে খাটতে হয়েছে ওশেনিয়া থেকে ইউরোপে । যার জন্য তাকে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে ক্রিকেটের জন্মস্থান ও শিক্ষাঙ্গনে ।
তবে এবারের পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন । প্রথমবার যখন দলে এসেছিলেন তখন দলে অভিজ্ঞ আর কিংবদন্তীদের ভীড় । তখন পন্টিং, লী, গিলিরা থাকলেও এ আর এ যাত্রায় দু চারজন অভিজ্ঞ ছাড়া বাকিরা সবাই তরুন । অবশ্য বয়সে অগ্রজ হলেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় রজার্স সর্ব অনুজই বলা চলে ।
রজার্সের অন্তর্ভুক্তিতে অনেকে অবাক হলেও তারা বিশ্বাস রেখেছিল তার উপর । ভক্তরা জানতো এই পয়ত্রিশে এসে অজি ভক্তরা কাউকে এক্সপেরিমেন্টের জন্য দুর্ধর্ষ অ্যাশেজ সফরে পাঠায়নি ।
আস্থার প্রতিদানটা দিয়েই দিলেন পরিশ্রমের মূর্ত প্রতীক ক্রিস্টোফার রজার্স । সফরের চতুর্থ টেস্টের প্রথম ইনিংসেই পেয়ে গেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতক । তাও আবার চিরাচরিত ইংলিশ সিমিং কণ্ডিশন রিভারসাইড স্টেডিয়ামে ।
সিরিজে ৪০.৭৭ গড়ে রজার্সের ব্যাট থেকে এলো ৩৬৭ রান । যা কিনা সফরে তৃতীয় অস্ট্রেলিয়ান সর্বোচ্চ । এই এক সফরই রজার্সের জায়গা পাকাপোক্ত করে দিল । ফিরতি অ্যাশেজে ইংল্যাণ্ডকে আতিথ্য দিলো অজিরা । এবার সঙ্গী হিসেবে ডেভিড ওয়ার্নারকে পাকাপাকিভাবে পেলেন রজার্স ।
এক সময়ের অভিমানী রাজপুত্র, সহিঞ্চুতার বিরল দৃষ্টান্ত রজার্সের ব্যাট এ সিরিজেও হাসলো । সে হাসি রীতিমত অট্টহাসি । সেই সিরিজেই জন্মভূমিতে প্রথম টেস্ট শতকের দেখা পেলেন ক্রিস । এমসিজিতে বক্সিং ডে টেস্টের সেই লক্ষ্যে তাড়া করা জয়ে প্রধান ভূমিকা রাখেন এই ওপেনার । পরের টেস্টেও রান উত্‍সবে মাতে তার ব্যাট । সিডনিতে তিনি খেলেন ১১৯ রানের এক চমত্‍কার ইনিংস । অজিরা সিরিজ জেতে ৫-০ তে । ৪৬.৩০ গড়ে ৪৬৩ রান করে সিরিজে আবারও অজিদের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হোন তিনি । ইংল্যাণ্ড সফর ও ঘরের মাঠের সাফল্য এবার তাকে দক্ষিণ আফ্রিকা দলেও জায়গা করে দেয় । দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় ম্যাচেই ফেরেন ক্রিস । পোর্ট এলিজাবেথে ১০৭ রানের এক সহিঞ্চু ইনিংস খেলে নিজের টেস্ট যোগ্যতার প্রমাণ দেন ।
rogers-540x367
সিরিজে অবশ্য তার গড় ত্রিশের ঘরে থাকে ।
এরপর আরব আমিরাতে পাকিস্থানের বিপক্ষে দুই ম্যাচের সিরিজে মরুভূমির ধুলোয় যেন হারিয়ে যান তিনি । সফরে তার ব্যাট থেকে আসে মাত্র ৮৮ রান ।
কিছুটা ব্যাকফুটে থাকা রজার্স ফিরলেন এবার ঘরের মাটিতে । ২০১৪/১৫ মৌসুমে ভারতকে আতিথ্য দেয় তার দল । আর সেখানে চলে রজার্সের অদ্ভুত এক শাসন । চার ম্যাচ সিরিজে একটিও শতক না পেলেও ৫২.১২ গড়ে তার ব্যাট থেকে আসে ৪১৭ রান !
সিরিজের অর্ধশতকের বাণিজ্য করে ছাড়েন এই জাত টেস্ট খেলুড়ে । সিরিজের শেষ ছয় ইনিংসেই অর্ধশতক হাঁকান তিনি ।
সফল ভারত সিরিজ শেষে দলের সাথে ক্যারিবিয়ান সফরে যান ক্রিস । তবে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের আগেই দল থেকে ছিটকে পড়েন । নেট অনুশীলনে বল তার মাথায় আঘাত করলে দর্শক হয়েই থাকতে হয় তাকে । ফিরতি অ্যাশেজে ইংল্যাণ্ডকে আতিথ্য দিলো অজিরা । এবার সঙ্গী হিসেবে ডেভিড ওয়ার্নারকে পাকাপাকিভাবে পেলেন রজার্স ।
এক সময়ের অভিমানী রাজপুত্র, সহিঞ্চুতার বিরল দৃষ্টান্ত রজার্সের ব্যাট এ সিরিজেও হাসলো । সে হাসি রীতিমত অট্টহাসি । সেই সিরিজেই জন্মভূমিতে প্রথম টেস্ট শতকের দেখা পেলেন ক্রিস । এমসিজিতে বক্সিং ডে টেস্টের সেই লক্ষ্যে তাড়া করা জয়ে প্রধান ভূমিকা রাখেন এই ওপেনার । পরের টেস্টেও রান উত্‍সবে মাতে তার ব্যাট । সিডনিতে তিনি খেলেন ১১৯ রানের এক চমত্‍কার ইনিংস । অজিরা সিরিজ জেতে ৫-০ তে । ৪৬.৩০ গড়ে ৪৬৩ রান করে সিরিজে আবারও অজিদের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হোন তিনি । ইংল্যাণ্ড সফর ও ঘরের মাঠের সাফল্য এবার তাকে দক্ষিণ আফ্রিকা দলেও জায়গা করে দেয় । দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় ম্যাচেই ফেরেন ক্রিস । পোর্ট এলিজাবেথে ১০৭ রানের এক সহিঞ্চু ইনিংস খেলে নিজের টেস্ট যোগ্যতার প্রমাণ দেন ।
সিরিজে অবশ্য তার গড় ত্রিশের ঘরে থাকে ।
এরপর আরব আমিরাতে পাকিস্থানের বিপক্ষে দুই ম্যাচের সিরিজে মরুভূমির ধুলোয় যেন হারিয়ে যান তিনি । সফরে তার ব্যাট থেকে আসে মাত্র ৮৮ রান ।
কিছুটা ব্যাকফুটে থাকা রজার্স ফিরলেন এবার ঘরের মাটিতে । ২০১৪/১৫ মৌসুমে ভারতকে আতিথ্য দেয় তার দল । আর সেখানে চলে রজার্সের অদ্ভুত এক শাসন । চার ম্যাচ সিরিজে একটিও শতক না পেলেও ৫২.১২ গড়ে তার ব্যাট থেকে আসে ৪১৭ রান !
সিরিজের অর্ধশতকের বাণিজ্য করে ছাড়েন এই জাত টেস্ট খেলুড়ে । সিরিজের শেষ ছয় ইনিংসেই অর্ধশতক হাঁকান তিনি ।
সফল ভারত সিরিজ শেষে দলের সাথে ক্যারিবিয়ান সফরে যান ক্রিস । তবে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের আগেই দল থেকে ছিটকে পড়েন । নেট অনুশীলনে বল তার মাথায় আঘাত করলে দর্শক হয়েই থাকতে হয় তাকে । এরপর আবারও অ্যাশেজ রণ সঙ্গীত বেঁজে ওঠে । দ্রিম দ্রিম সেই আওয়াজের ভয়াবহতা ছাপিয়ে যায় অবসরের ঘোষণায় । এই অ্যাশেজের পরই নিজের ব্যাট, প্যাড উঠিয়ে রাখার ঘোষণা আসে রজার্সের কাছে থেকে ।
STS1316S3_547267k
যে ইংল্যাণ্ডে তার পুনর্জন্ম, যে ইংল্যাণ্ডে ক্রিকেট বেড়ে ওঠা সেই ইংল্যাণ্ডই এবার বিশ্রামের মঞ্চ ক্রিস রজার্সে । ইংল্যাণ্ড তার বড্ড পরিচিত জায়গা । এই পরিচিত ভূখণ্ডেই তিনি পণ করলেন বিদায়টা আরও মহিমান্বিত করতে হবে । কার্ডিফে সিরিজের প্রথম টেস্টেই এবার আন্তর্জাতিক টেস্ট বইয়ে নাম লেখান তিনি । টানা সপ্তম অর্ধশতক আসে তার উর্বশী ব্যাট থেকে । পরের ম্যাচে আরও ঘাতক হয়ে উঠলেন । ঐতিহাসিক লর্ডসে খেললেন ক্যারিয়ার সেরা ১৭৩ রানের কালজয়ী এক ইনিংস । ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসেও পেয়ে যেতেন অর্ধশতক, এমনকি শতকটাও । কিন্তু ৪৯ রান করে তাকে সাজঘরে ফিরতে হয় রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে । এতসব অর্জনেও অবশ্য সিরিজে তার দল হেরে যায় ২-৩ এ । তবে জিতে যায় রজার্স । এবার আর তৃতীয় তৃতীয় খেলা নয় । এককভাবে সিরিজের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হোন তিনি । পাক্কা ৬০ গড়ে তার ব্যাট থেকে আসে ৪৮০ রান ।
ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে তাকে তাই উঠতেই হয় পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে ।
ইংল্যাণ্ড সিরিজ জিতলেও সিরিজ সেরার মুকুট ওঠে ৩৮ বছর বয়সী ক্রিস রজার্সের মাথায় । যে রজার্সের শুরুটা ছিল অত্যান্ত সাদামাটা আর অবহেলায়, সেই রজার্সেরই বিদায় ঘটলো জাকজকমপূর্ণ এক বিশেষ সম্মাননায় ।
আবেগটা ছিলই । তবে অতিমাত্রায় ভদ্র ও ব্যক্তিত্ববান রজার্স তা যেন লুকালেন সবার অলক্ষ্যে ।
প্রেজেন্টেশন সেরিমনির পর যখন দল তাকে গার্ড অফ অনার দিতে প্রস্তুত ঠিক তখনই দৌড়ে সেই লাইনে ঢুকে পড়লেন ক্রিস ।
সেদিন ছিল আরেক গ্রেটের বিদায় দিবস । বয়সে ছোট হলেও অর্জন ও অভিজ্ঞতায় তাই মাইকেল ক্লার্ককে হাততালি দিয়ে সম্মান জানালেন এই ভদ্রলোক । সতীর্থরাও অবশ্য সম্মান জানায় তার কাজকে । সেই সাথে ক্লার্কের পরপর রজার্সকেও দেওয়া হয় উষ্ণ গার্ড অফ অনার ।
ক্যামেরার চোখ তখনও রজার্সের উপর । আস্ত আস্তে এক সময় ড্রেসিংরুমে হারিয়ে গেলেন তিনি । সেই সাথে অবসরের গহব্বরে হারিয়ে গেল আরেক অজি নায়ক । ক্রিকেট মহাকাশ থেকে ডুবে গেল আরেক ক্রিকেট নক্ষত্র । এক সময়ের দোর্দান্ত প্রতাপে থাকা অজি দল অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে তাদের কিংবদন্তীদের একের পর এক বিদায়ে ।
এক সময় টেস্ট দলে ওপেনিং করতেন ম্যাথু হেইডেন ও জাস্টিন ল্যাঙ্গার । হেইডেন স্বভাবসূল আগ্রাসী থাকলেও ঋষি-মুনির ন্যয় স্থির ছিলেন গ্রেট ল্যাঙ্গার । অজিরা পরবর্তীতে ডেভিড ওয়ার্নারে হেইডেন আগ্রাসন দেখলেও দীর্ঘ ৭ বছর ল্যাঙ্গারের ছায়াও দেখা হয়নি তাদের । ক্রিস রজার্সের দ্বিতীয় জন্মটা সেই আক্ষেপটা অনেকখানি পুষিয়ে দিয়েছিল ।
আগ্রাসন যেন ছিল রজার্সের চির শত্রু । তাইতো টেস্ট ছাড়া আর কোন সংস্করণের পোষাক ওঠেনি তার গায়ে । স্থিরতা আর সহিঞ্চুতায় প্রতিপক্ষ বোলাররা বিরক্ত হয়েছে বরাবরই ।
তার বল আকাশে উঠবেনা এটা জানতো সবাই ।
মাঠের সীমানার সঙ্গে তার প্রেম ছিল মাটি ও ঘাস দর্শনে । আকাশ দর্শনে তার আন্তর্জাতিক সীমানা প্রেম বিশ্ব দেখেছে একবারই । ক্যারিয়ারের শেষ সিরিজে এসেছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম, শেষ ও একমাত্র ছক্কাটি । সে সময় ধারাভাষ্যকর মজা করলেও শ্রদ্ধাভরেই স্বরণ করেছে তার টেস্ট টেম্পারমেন্ট । ক্যারিয়ারে সঙ্গী হিসেবে ওয়ার্নারকেই বেশি পেয়েছেন ক্রিস । এ জুটি কম দেয়নি দলকে । নয়টি শতরানের জুটি উপহার দিয়েছিলেন তারা । ক্রিসের সহিঞ্চুতার ফলেই অনেকটা নির্ভার হয়ে আগ্রাসন চালাতেন ডেভ ওয়ার্নার ।
মাত্র দুই বছরের ক্যারিয়ারে ক্রিসের অর্জন নেহায়েত কম নয় । ৪২.৮৭ গড়ে ২,০১৫ রান এসেছে তার ব্যাট থেকে । ৫টি শতকের সাথে ছিল ১৪টি অর্ধশতক । মাত্র দুই বছরে ভক্ত ও সতীর্থদের কম ভালবাসা ও শ্রদ্ধা পাননি তিনি ।
অথচ এই ভদ্রলোকটিই এক সময় ফেলনা বস্তু হয়ে গিয়েছিলেন । কালার ব্লাইণ্ড ছিলেন রজার্স । তবে এটি তার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি । তীক্ষ্ন অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই নীরবে বোলারদের শাসন করে গেছেন তিনি ।
অন্যদের মত তার অবসরও মেনে নিতে পারেনি ভক্তকূল । তবে ৩৮ বছর বয়সী রজার্সকে বিদায় তো জানাতেই হত । আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই-আড়াই বছর হলেও ক্রিকেট অঙ্গনে তো আর তিনি কম সময় দেননি । সেই ১৭ থেকে খেলছেন, থামলেন ৩৮ এ ।
বয়সের ধকল আর পরিবারের কথা ভেবে ভক্ত হৃদয় তাই কৃত্তিম হাসিতেই বিদায় জানালো তাদের দুই বছরের রাজাকে । বিদায় জানালো সাম্প্রতিককালে অজিদের সবচেয়ে বড় পর্দার অন্তরালের মহানায়ককে ।
19ChrisRogersGuard
বিদায় জানালো এক নিপাট ভদ্রলোককে । ক্রিস্টোফার রজার্সের ক্যারিয়ার তামামী :
টেস্ট : ২৫
ইনিংস : ৪৮
নট আউট : ০১
রান : ২০১৫
গড় : ৪২.৮৭
স্ট্রাইক রেট : ৫০.৬০
অর্ধশতক : ১৪
শতক : ০৫
সর্বোচ্চ : ১৭৩
চার : ২৬৮
ছক্কা : ০১
ক্যাচ : ১৫

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 × 1 =