৯২ এর মত বিশ্বকাপ ফিরল অস্ট্রেলিয়ায়ঃ মিসবাহ কি ইমরান খান হতে পারবেন ? পাকিস্তান দলঃ শক্তি-সম্ভাবনা-দুর্বলতা …

পাকিস্তান; মিসবাহ-উল-হক (অধিনায়ক), আহমেদ শেহজাদ, মোহাম্মদ হাফিজ, সরফরাজ আহমেদ, ইউনিস খান, হারিস সোহেল, উমর আকমল, শোহেব মাকসুদ,শহীদ আফ্রিদি, ইয়াসির শাহ, মোহাম্মদ ইরফান, এহসান আদিল, সোহেল খান, ওয়াহাব রিয়াজ।
(ইনজুরির কারণে ছিটকে পড়েছেন বাঁহাতি পেসার জুনায়েদ খান)

ক্রিকেট, ফুটবল, রাগবি,হকি, বেসবল,ভলিবল-সব খেলায় একটা সাধারণ গোল্ডেন রুল আছে । তা হলো, খেলায় যত টুইস্ট, ততো মজা । ক্রিকেটের টুইস্ট ক্রিকেটের মজা । ক্রিকেটের আপসেট ক্রিকেটের মজা । ক্রিকেটের নাটকীয়তা ক্রিকেটের মজা । আর ক্রিকেটের টুইস্টগুলোর মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত কয়েকটি টুইস্টের জন্মদাতা পাকিস্তান ! আনপ্রেডিক্টেবল পাকিস্তান ! রঙিন পোশাকে প্রথম বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান ।

১ যুগ আগে ফিরে যাবো । ২০০৩ সাল । বিশ্বকাপ দক্ষিণ আফ্রিকায় । সেবারের পাকিস্তান দলটা ছিলো তারকায় ঠাসা । ঠিক তার আগের বিশ্বকাপের রানার আপ। দলে ওয়াসিম আকরাম,ওয়াকার ইউনিস আর ইনজামাম উল হকের মত অভিজ্ঞরা । সাথে আব্দুল রাজ্জাক, আজহার মেহমুদ, শোয়েব আখতার, সাকলাইন মুশতাক, মোহাম্মদ ইউসুফ আর শহীদ আফ্রিদির মত ম্যাচ উইনারেরা । কন্ডিশন, অভিজ্ঞতা , শক্তি আর সামর্থ্য বিচারে পুরো বিশ্বকাপের সবচাইতে শক্তিশালী স্কোয়াডগুলোর একটা । দলটির দৌঁড় ? থেমে যায় প্রথম রাউন্ডেই ।

ঠিক ১ যুগ পর । আরেকটা বিশ্বকাপ ক্রিকেটভক্তদের হাতছোঁয়া দুরত্বে। এবারের পাকিস্তানের চিত্র ভিন্ন। পাকিস্তান দল মাঝের কয়েকটা বছর গিয়েছে একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে । একটা জেনারেশনএকটু একটু করে খেলা ছেড়েছে। একজন একজন করে আস্তে আস্তে ক্রিকেট থেকে সরে গেছে । যার শুরু বোধহয় ২০০৩ বিশ্বকাপের পর ওয়াসিম আকরামের অবসর নেওয়া দিয়ে আর শেষ হয়তো হয়েছে ইনজামামের রিটায়ারমেন্টে। ২০১৫ সালের দলে তারকা বলতে যা বোঝায়, তা কেবলমাত্র শহীদ আফ্রিদি আর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আর নেতৃত্ব বিচারে নিলে সাথে মিসবাহ উল হকের নামটাও হয়তো আপনি বলবেন ।

পাকিস্তানের মূল দুই ভরসা মিসবাহ উল হক এবং শহীদ আফ্রিদি
পাকিস্তানের মূল দুই ভরসা মিসবাহ উল হক এবং শহীদ আফ্রিদি

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই দুইজন হেঁটেছেন সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে । নিজের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসেই ৩৭ বলে সেঞ্চুরি করে শহীদ আফ্রিদিকে তারকাখ্যাতিতে পিছনে তাকাতে হয় নি কখনোই । তার ক্যারিয়ারের সবচাইতে বাজে সময়গুলোতেও সমালোচনায় বিদ্ধ হয়ে মিডিয়ার আলোচনার বড় অংশে ছিলেন আফ্রিদি । সব সময় সবাই তার কাছে মানুষ আশা করত খুব ভালো কিছু , কিংবা খুব খারাপ কিছু । আর মিসবাহ উল হক বরাবরই আশ্চর্য রকমের শান্ত আর মুখচোরা স্বভাবের । দলের নেতৃত্বভার পেয়েও পাকিস্তানের আগের ক্যাপ্টেনদের মত বিতর্ককে আমন্ত্রণ করেন নি । বরং পাকিস্তানকে উপহার দিয়েছেন অফ দ্যা ফিল্ড অত্যন্ত স্থিতিশীল একটি দল। শহীদ আফ্রিদির মত দ্রুত জিততে পারেন নি মিডিয়া ফোকাস । বরং তার সমবয়সীদের অনেকে যখন ধারাভাষ্য আর কোচিং এ ঝুঁকছে, মিসবাহ যেন সব পেলেন একদম শেষে এসে । তারপরেও গেল কয়েক বছরের পাকিস্তানের সবচাইতে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যানের নাম মিসবাহ উল হক। পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচাইতে স্থিতিশীল আর ক্লিন ইমেজের নেতাদের মধ্যে একজন মিসবাহ উল হক ।

তবে একটা জায়গা তাদের মিলিয়ে দেয়। একটা ম্যাচ ! বিশাল ম্যাচ ! পাকিস্তান – ভারত সেমিফাইনাল, ২০১১ বিশ্বকাপ, মোহালি । আফ্রিদি আজও হয়তো জবাব খুঁজে ফেরেন হরভজনের ঐ নিরীহ দর্শন ফুলটসটি কিভাবে আকশে উঠে গেল আর মিসবাহর আশ্চর্যরকমের ধীর ব্যাটিং এর বিস্ময়ের ঘোর হয়তো পাকিস্তানিদের আজও কাটে না । বিশ্বকাপ থেকে তাই কিছু না নিয়ে যেতে পারলে কিছু হিসাব অমীমাংসিতই থেকে যাবে মিসবাহ উল হক আর শহীদ আফ্রিদির ।

শেহজাদ ও হাফিজ পাকিস্তানের টপ অর্ডারের ভরসা
শেহজাদ ও হাফিজ পাকিস্তানের টপ অর্ডারের ভরসা

সাঈদ আনোয়ার যাবার পর পাকিস্তান প্রতিনিয়ত স্থিতিশীল একটা ওপেনিং পেয়ারের খোঁজ করে গেছে । তেমন স্থিতিশীল এবং লম্বা রেসের ঘোড়া তেমন কাউকেই পায় নি পাকিস্তান । মোহাম্মদ হাফিজ খেলছেন অনেকদিন, তার সাথে আহমেদ শেহজাদও মোটামুটি পাকিস্তান দলে ওপেনার হিসাবে ফার্স্ট চয়েজ । ওপেনার দুজনের ব্যাপারে পরিসংখ্যানগত তথ্য হলো, হাফিজের এভারেজ ৩৪ আর শেহজাদের ৩০ । আহামরি বলা যাবে না ওপেনার হিসাবে। আর ব্যাটিং লাইনে আর আছেন ইউনিস খান, উমর আকমল, শোহেব মকসুদ,মিসবাহ উল হক,সরফরাজ আর শহীদ আফ্রিদি । উমর আকমল আর শোহেব মাকসুদের ব্যাপারে বলতে হবে, দুজনই ভালো ওয়ানডে প্যাকেজ । সময়মত রান তুলতে পারেন । আরো স্পেসিফিকালি যদি বলতে চাই, ভালো স্লগ ওভার প্যাকেজ। সাথে শহীদ আফ্রিদি তো আছেনই । এই তিনজনেরই স্ট্রাইকরেট ৮০ এর উপরে স্পেশ্যালি স্লগ ওভারের ভালো পিঞ্চ হিটারের প্রাচুর্য পাকিস্তানের সবসময়ই ছিলো । এবং এটাও তাদের ম্যাচের ফলাফলগুলোর আনপ্রেডিক্টাবিলিটির একটা বড় কারণ ।

মিডল অর্ডারে স্থিতির প্রতীক ইউনিস ও মিসবাহ
মিডল অর্ডারে স্থিতির প্রতীক ইউনিস ও মিসবাহ

তারপর মিডল অর্ডারে মিসবাহ উল হকের সাথে অভিজ্ঞ ইউনিস খানের থাকাটা ব্যাটিং অর্ডারে স্থিতি বাড়াবে অনেকাংশে । তবে পাকিস্তান ব্যাটিং লাইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এই লাইন আপটার কোনো ডি ভিলিয়ার্স বা কুমার সাঙ্গাকারা টাইপের ফিয়ার ফ্যক্টর নেই যারা নিজেদের একটা ইনিংস দিয়ে রান তোলার সাথে সাথে প্রতিপক্ষের বোলিং লাইনের মনোবল একদম দুমড়ে মুচড়ে দেবার ক্ষমতা রাখে । এক কথায় যা বলতে চাচ্ছি, বিশ্বকাপে কোন দলকে বহুদূর যেতে হলে কাউকে ২০০৭ বিশ্বকাপের ম্যাথু হেইডেন হতে হবে কিংবা ২০১১ এর তিলকরত্নে দিলশান বা শচীন টেন্ডুলকার হতে হবে । সেই ব্যাটসম্যানটাই পাকিস্তানের লাইনআপে একদম সোজাভাবে খুঁজে পাচ্ছি না ।

আজমল ও জুনায়েদের অভাব পাকিস্তানকে ভোগাবে বেশ
আজমল ও জুনায়েদের অভাব পাকিস্তানকে ভোগাবে বেশ

এটা লেখার সময়ও আইসিসি ওয়ানডে র্যা ঙ্কিং এর এক নম্বর বোলারের নাম সাঈদ আজমল । কন্ডিশন যাই হোক, সাঈদ আজমলের অভাবটা ভালোভাবেই টের পাবে পাকিস্তান । কারণ কিছু স্পিনার বলটাকে টার্ন করানোর একদম সহজাত ক্ষমতা নিয়ে আসেন । সাঈদ আজমল অনেকটা সেই কোয়ালিটির স্পিনার ছিলেন । আর অজি কন্ডিশনে পাকিস্তানের জন্যে দ্বিতীয় আঘাত হয়ে আসে বিশ্বকাপের দিন কয়েক আগে ৪৮ ম্যাচে ৭৫ উইকেট পাওয়া বাঁহাতি পেসার জুনায়েদ খানের ফিটনেস টেস্টে ব্যর্থ হওয়া । প্রথম পাওয়ারপ্লেতে মুভমেন্ট কাজে লাগিয়ে যেকোন দলের টপ অর্ডারকে ছেঁটে দেওয়ার সব রকমের ক্ষমতাই ছিলো জুনায়েদ খানের । প্রথম পাওয়ারপ্লেতে তাকে মিস করবে পাকিস্তান ।
বোলিং লাইনটার অনভিজ্ঞতার পরিচয় পাবেন দুটি দিকে তাকালে ।

প্রথমত, মাত্র ৪৭ ওয়ানডে খেলা ওয়াহাব রিয়াজ হলেন পাক লাইন আপের সবচেয়ে অভিজ্ঞ বোলার । দ্বিতীয়ত, ৫টি বা তার কম ওয়ানডে খেলা বোলার আছে লাইনআপে ৩ জন । ১ ওয়ানডে খেলা ইয়াসির শাহ, ৫ ওয়ানডে খেলা সোহেল খান, আর ৩টি ওয়ানডে খেলা এহসান আদিল । তবে ম্যাচসংখ্যা দেখে এদের একদম নতুনের কাতারে ফেলে দেবেন না । এহসান আদিল ছাড়া বাকি দুজনেরই বয়স ২৫ এর উপরে । সে অর্থে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট সমৃদ্ধ । ৫০ টির উপরে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলেছেন ইয়াসির শাহ এবং সোহেল খান দুজনেই ।

পাকিস্তানের বড় শক্তি হতে পারে আফ্রিদির স্পিন
পাকিস্তানের বড় শক্তি হতে পারে আফ্রিদির স্পিন

আর গেলো বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি শহীদ আফ্রিদি তো আছেনই । স্পিনার হয়েও আফ্রিদির গতি, স্পেল বাই স্পেল ঠিক চ্যানেলে বল ফেলে যাওয়া আর অভিজ্ঞতাও হতে পারে পাকিস্তানের বোলিং লাইন আপের বড় শক্তি । একশনের কারণে হাফিজ আর আজমল নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের স্পিন বিভাগের ব্যাটনটা থাকবে এই বর্ষীয়ান অলরাউন্ডারের হাতেই।
আর ওয়াহাব রিয়াজ চাইবেন গেল বিশ্বকাপের সেমিতে মোহালিতে ভারতের সাথে ৫ উইকেট নিয়ে যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখানেই আবার শুরু করতে । মিসবাহ হাতে পাচ্ছেন এমন একটি বোলিং লাইন যাদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার অভাব আছে, তবে বয়স এবং ফার্স্ট ক্লাস অভিজ্ঞতার কারণে অতোটা অপরিপক্ক হবার কথা নয় পাকিস্তানের বোলিং লাইনআপটার ।

পাকিস্তান খুব সম্ভবত ক্রিকেট বিশ্ব একমাত্র দল যাদের বড় আসরে সমস্যাগুলো একই থেকেছে । অলস ফিল্ডিং সাইড, ধারাবাহিকতার বড্ড অভাব আর বড় আসরে সবসময়ই আশ্চর্যজনকভাবে কোন না কোন দলীয় সমস্যা জন্ম নেওয়া । তবে বোলারদের শারিরিকভাবে এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর বোলারদের চাইতে এগিয়ে থাকা আর চিরন্তন অননুমেয়তা- চোখটা আপনাকে রাখতেই হবে পাকিস্তানের দিকে ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

8 + 13 =