৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৮

সাল ১৯৫৮। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্যার ম্যাট বাসবির অধীনে তখন ইংল্যান্ডের সফলতম দলগুলোর একটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ১৯৪৮ এবং ১৯৫৭ সালের এফএ কাপ চ্যাম্পিয়নরা  প্রথম ইংলিশ ক্লাব হিসেবে অর্জন করে ইউরোপিয়ান কাপে খেলার গৌরব।

Busby_babes_1955

শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলতে থাকা বাসবি বেবসরা সহজেই উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ যুগোস্লাভিয়ার দল রেডস্টার বেলগ্রেড। ওল্ড ট্রাফোর্ডে প্রথম লেগে ২-১ এ জয় পায় রেড ডেভিলরা। বিপত্তি বাঁধে পরবর্তী লেগে যুগোস্লাভিয়া যাওয়া নিয়ে। প্রথম রাউন্ডের খেলায় বর্তমান চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগ থেকে ফেরার  পথে, বিশাল চড়াই উতরাই পার হতে হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে। ইংল্যান্ডের ঘন কুয়াশার জন্য সেবার ফেরি আর ট্রেনে করেই ম্যানচেস্টারে ফিরতে হয়েছিলো পুরো দলকে! আর সেই ক্লান্তিতেই কিনা পরের লীগ ম্যাচে বারমিংহাম সিটীর সাথে ৩-৩ এ ড্র করেই সন্তুষ্ট হতে হয়েছিল তাদের। বলে রাখা ভালো, ঠিক এখনকার মত তখনও মিড-উইকে ইউরোপ আর উইক-এন্ডে ঘরোয়া লীগ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো।

৫ ফেব্রুয়ারি। পরবর্তী লেগের খেলা ৩-৩ গোলে ড্র হলে, সেমিফাইনালের টিকেট নিশ্চিত হয় যোগ্য দলটির। স্বভাবতই, ঝামেলা এড়াতেএবার একটি   প্লেন ভাড়া করা হলো। সেমিফাইনালে ওঠার আনন্দ নিয়ে তরুন দলটি রওনা করে বেলগ্রেড থেকে। দুপুর ১.১৫ মিনিটে জার্মানির মিউনিখ বিমান বন্দরে পৌছায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পুরো দল বহনকারী এয়ারস্পিড এম্বাসেডর ২ উড়োজাহাজটি। প্রচন্ড তুষার ঝড়ে তখন লন্ডভন্ড রানওয়ের। গোটা মিউনিখ তখন বরফে ঢাকা এক শহর। যাত্রা বিরতি দিয়ে মিউনিখ থেকে ফেরার পথে, পর পর দুবার উড়োজাহাজটিকে নিয়ে ওড়ার  ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালান পাইলট। ৩য় বারে সফল হলেন তিনি।

 

প্লেনটি কয়েক ফিট উপরে উড়তে শুরু করলো। বিকল ইঞ্জিন সাথে দুর্যোগ আবহাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো প্রচন্ড ঝাকুনি। সে ঝাকুনি এমনি যেন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে প্লেনটি। পাইলট সম্পূর্ণ রূপে  নিয়ন্ত্রণ হারালেন। টেবিলের ওপর রাখা তাসের কার্ড থেকে মদের কাচের বোতল সবই যেন তুষারের চেয়েও প্রবল বেগে পড়তে শুরু করলো। দুর্দান্ত সাহসী তরুন দলটি, স্যার ম্যাট বাসবি, আর স্টাফরা কেউই সেদিন ভাগ্যের অফসাইড ফাঁদ এড়াতে পারলেন না। আসলে অফসাইডে পড়লো পুরো ফুটবল, পুরো বিশ্ব।

কয়েক সেকেন্ডেই ধংসস্তুপে পরিনত হলো প্লেনটি। ৪৪ জন যাত্রীর ২১ জন মারা গেলেন। হতভাগা ২০ জনের সর্বশেষ দলে নাম লেখালেন ৭ জন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের  খেলোয়াড়। ৩ জন কোচিং স্টাফ, ৭ জন সাংবাদিক। নিথর, নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইলো   মিউনিখ বিমানবন্দর। লবিতে রেখে যাওয়া গরম চায়ের কাপ গুলো ঠান্ডা হবারও সময় পেলো না, ছাইয়ে মিশে নিভে গেলো ডানকান এডওয়ার্ডস, এডি কোলম্যানের ফেলে যাওয়া আধ খানা জ্বলন্ত সিগারেট।

The Munich air disaster 4

এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন ম্যাট বাসবি। তবে প্রাণে বাঁচেন তিনি,  বেঁচে যান স্যার ববি চার্লটন সহ আরও ৮ প্লেয়ার, বাঁচে স্বপ্ন। সেইদিনের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা আর দুর্বিষহ ভয় দূর করে ঠিক তার ১০ বছর পর প্রথম কোন ইংলিশ দল হিসেবে স্যার ম্যাট বাসবির অধীনেই ইউরোপিয়ান কাপ ঘরে নেয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। সেদিনও যেমন কেউ ভুলে যায়নি, মিউনিখে হারানো বীরদের, আজও  ইংল্যান্ডের সবচেয়ে সফল আর বিশ্বের অন্যতম সফল ক্লাব হয়েও ফিকে হয়ে যায়নি মিউনিখ ডিজাস্টারের দিনটি। দ্যা ফেমাস বাসবি বেবস। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, যেখানে সম্ভবের বিপরীত শব্দও সম্ভব।

munich-clock-hublot

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × 4 =