হেভিমেটালে হঠাৎ ছন্দপতন

ইয়ুর্গেন ক্লপ লোকটা সারাজীবন শীতের সময় ছুটিতে ম্যাচ না খেলে খেলে একরকম অভ্যস্ত। ইংলিশ লিগ ছাড়া মোটামুটি বাকী সব লিগে এইটাই হয়, এইসব বড়দিনের ছুটি, নিউ ইয়ার্স ইভ – এসবের মধ্যে খেলোয়াড়েরা ছুটিতে থাকে, আমোদ করে, খেলতে হয়না, ক্লাবের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা থাকেনা। জার্মান লিগে এতদিন ছুটি কাটিয়ে কাটিয়ে এখন তাই হয়ত বুঝছে না এই নিউ ইয়ার ইভ ক্রিসমাস ইভ এইসবের মধ্যে টানা ম্যাচ খেলা কি জিনিস। সারাজীবন মেইঞ্জ ডর্টমুন্ডে থেকে জানুয়ারি উইন্টার ট্রান্সফার উইন্ডোতে কাউরে না কিনে কিনে হয়ত সেই চিন্তা এসেছিল ইংলিশ লিগে লিভারপুলেও কাউরে না কিনেই মোটামুটি জানুয়ারি মাস টা পার করে দেওয়া যাবে। আফ্রিকান নেশনস কাপের জন্য সাদিও মানে চলে যাবে আর কোন রিপ্লেইসমেন্ট কিনা হবে না এত থিন একটা স্কোয়াড নিয়া মাস কাটানো হবে, এভাবে চলে না ক্লপ! বুঝলাম কুইন্সি প্রমেস, ক্রিস্টিয়ান পিউলিসিচের মত আপনার প্রথম পছন্দ খেলোয়াড় এবার জানুয়ারির দলবদলে পাননি দেখে এভাবে “ফার্স্ট টার্গেট পাইলে কিনুম না পাইলে সামার পর্যন্ত ওয়েট করুম তাও কাউরে কিনুমই না” এভাবে ভেবে খেলোয়াড় না কিনে আখেরে ক্ষতিটা দলেরই হচ্ছে, আস্তে আস্তে সব প্রতিযোগিতা থেকেই ক্লাব বাদ পড়ে যাচ্ছে। এরকম ভাবত ব্রেন্ডান রজার্স আর তার ট্রান্সফার কমিটি। এখন ক্লপও যদি এভাবে ভাবা শুরু করেন তাহলে ট্রান্সফার কমিটি থাকলেই কি আর না থাকলেই কি তাই না? এইটা ইপিএল। একটা মাস খারাপ খেললে পুরা সিজনের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। তার উপর ফরাসী ডিফেন্ডার মামাদু সাখোকেও খেলানো হচ্ছেনা। না খেলানো হোক, অ্যাটলিস্ট তাকে টোপ দিয়া ভালো একটা সেন্টারব্যাক কিনে দলের ভগ্নপ্রায় ডিফেন্সকে একটু ঠিক করাই যেত, যেখানে সাউদাম্পটন বসে আছে মামাদু সাখোকে কেনার জন্য। সাখোকে টোপ দিয়ে সহজেই সাউদাম্পটনের ডাচ সেন্টারব্যাক ভার্জিল ভ্যান ডাইককে কেনার চেষ্টা করা যেত হয়ত। যে ভ্যান ডাইকের উপর ম্যানচেস্টার সিটি থেকে শুরু করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি সবারই নজর আছে।

প্রিমিয়ার লিগে এত ছোট একটা স্কোয়াড নিয়ে প্রত্যেকটা কম্পিটিশানে সারভাইভ করা আসলেই কঠিন। লিভারপুলের রিজার্ভ দল বলে কিছুই নেই। রিজার্ভ দলে আনকোরা সব মুখের ছড়াছড়ি। ট্রেন্ট অ্যালেকজান্ডার আরনল্ড, ওভি এজারিয়া, বেন উডবার্ন, কেভিন স্টুয়ার্ট, কনর র‍্যানডাল, জ্যো গোমেজ – কারোর ট্যালেন্ট নিয়েই প্রশ্ন নেই হয়ত, কিন্তু প্রশ্ন আছে তাদের অভিজ্ঞতা ও “বিগ গেইম মেন্টালিটি” নিয়ে। হয়তোবা এইসব তরুণ তুর্কি নিয়েই ক্লপ একসময় কিছু না কিছু জিতবেন, কিন্তু অবশ্যই সেই সময়টা এখন নয়। পল স্কোলস, রায়ান গিগস, ডেভিড বেকহ্যামদেরও বেশ কয়েকবছর ঘষামাজা করতে হয়েছিল স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের, ১৯৯৯ তে ট্রেবল উইনার বানানোর জন্য।

মানের অভাব ভোগাচ্ছে লিভারপুলকে

আনকোরা মুখ, ছোট স্কোয়াড নিয়ে ম্যাচের পর ম্যাচ জেজেনপ্রেসিং এর মত ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জিং একটা ট্যাকটিক্স ম্যাচের পর ম্যাচ খেলানো হলে খেলোয়াড়দের ক্লান্তি-ইনজুরি ভর করবেই। যেটার মাশুল এখন দেওয়া লাগছে এফএ কাপ, ক্যাপিটাল ওয়ান কাপ থেকে বাদ পড়ার মাধ্যমে। নিজেদের মাঠে মাত্র এক সপ্তাহে তিন ম্যাচ হারতে হচ্ছে যে মাঠটাকে মোটামুটি গত এক বছর একটা দুর্গ বানানো হয়েছিল।

অ্যাটাক, অ্যাটাক এবং অ্যাটাক – আপাতদৃষ্টিতে এই ট্যাকটিক্স খুবই লোভনীয় হলেও এই ট্যাকটিক্সেরও একটা প্ল্যান বি থাকা লাগে। ক্লপের লিভারপুলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল ডি-বক্সের মধ্যে সেঁধিয়ে থাকা প্রতিপক্ষকে কোনভাবেই ঘায়েল না করতে পারা। আজকাল প্রতিপক্ষরাও এটা বুঝে গেছে, তাঁর সবচেয়ে বড় প্রমাণ সোয়ানসি, সাউদাম্পটন, উলভারহ্যাম্পটন – এই তিনটা ম্যাচই। পথটা দেখিয়ে গিয়েছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পোড় খাওয়া কোচ হোসে মরিনহো। অক্টোবরে কোনরকমে অ্যানফিল্ডে গোলশূণ্য ড্র করে উড়তে থাকা লিভারপুলকে মাটিতে নামিয়েছিলেন মরিনহো। তারপর থেকে লিভারপুলকে থামানোড় টোটকা মূলত এটাই হয়ে গেছে, প্রতিপক্ষের সবাই মোটামুটি ডি-বক্সে বসে থাকে, এমনকি কোন ফুলব্যাক বক্স ছেড়ে ওভারল্যাপ পর্যন্ত করেনা। ওদিকে সাদিও মানে না থাকার কারণে লিভারপুলের উইংও মূলত অকার্যকর, ক্যুটিনিও আর ফার্মিনিওকে কেন্দ্র করে মাঝখান থেকেই প্রায় সব আক্রমণ রচনা করতে হয় লিভারপুলকে। এটা কোব প্ল্যান বি হতে পারেনা। ক্লপের জেজেনপ্রেসিং-এ কোন প্ল্যান ‘বি’ নেই, এটা সবচেয়ে বড় হতাশার একটা বিষয়!

এফএ কাপ ও ক্যাপিটাল ওয়ান কাপ থেকে বাদ পড়ার পর এখন লিগই ভরসা। জানুয়ারির দুঃস্বপ্ন ঘুচিয়ে এই মৌসুম থেকে প্রাপ্তির খাতায় কিছু যোগ হবে নাকি, সময়ই বলে দেবে সেটা!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

10 + eighteen =