হিদেতোশি নাকাতা : এশিয়ার ফুটবলের সামুরাই

হিদেতোশি নাকাতা : এশিয়ার ফুটবলের সামুরাই

২০০২ বিশ্বকাপের আগে এশিয়ার ফুটবলকে একরকম বিশ্ববাসী ভুলেই গিয়েছিল। মূলত ইউরোপিয়ান কোন ভালো ক্লাবে এশিয়ান কোন খেলোয়াড় না খেলা, দ্বিতীয়ত এশিয়ার মার্কেটে ফুটবলের তেমন একটা ভ্যালু ছিল না। যদিও সে বছর এশিয়ার দু দেশ জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম বারের মত বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ হয়। কোরিয়ার জায়ান্ট কিলার প্যারফরম্যান্স ইতিহাসে প্রথম বারের মত তাদের সেমিতে জায়াগা করে দেয়। এছাড়াও এশিয়ার আরেক দেশ জাপান বিশ্বকাপের মঞ্চে অনেকটা উজ্জল ছিল তুর্কির সাথে শেষ ১৬ ম্যাচে হারার আগে। আর জাপানকে শেষ ১৬ তে তুলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল হিদেতোশি নাকাতা নামের এক খেলোয়াড়ের।

১৮ বছর বয়সে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন হিদেতোশি নাকাতা, স্বদেশী ক্লাব বেলমারি হিরাসটোস্কাতে ৪ বছর খেলে নিজেকে প্রমাণ করেন নাকাতা । এমনকি ১৯৯৬ সালে বেলমারি হিরাসটোস্কাকে এশিয়ান কাপের শিরোপা জেতান নাকাতা। এবং সে বছর এশিয়ান প্লেয়ার অফ দ্যা পুরষ্কার জেতেন জাপানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা -এ খেলোয়াড়। জাপান জাতীয় দলে ক্লাবের মত অনেকটা উজ্জ্বল ছিলেন নাকাতা। কোয়ালিফাই পর্বে তার ৫ গোলের সুবাদে জাপান ১৯৯৮ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। ক্লাব এবং জাতীয় দলের হয়ে দারুণ প্যারফরম্যান্স দেখানোর সুবাদে ইউরোপিয়ান অনেক নামাদামী ক্লাবের নজরে পড়েন নাকাতা। যদিও পরে যোগ দেন ইতালিয়ান ক্লাব পেরুজিয়াতে। ইতালিয়ান এ ক্লাবের হয়ে প্রথম মৌসুমে ১০ গোল করে হৈচৈ ফেলে দেন ২২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার। সে সেময় ইতালিয়ান লিগে একজন মিডফিল্ডার হয়ে ১০ গোল করা তেমন সহজ ছিল না। আর সেই কাজটি করেছিলেন নাকাতা এবং সে বছর ফিফা প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার এবং ব্যালন ডি অরের জন্য নমিনেশন পান তিনি। জাপানি এই তারকা তার পারফরম্যান্স এবং ফ্যাশন সচেতনতার জন্য এশিয়ার গন্ডি পেরিয়ে পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। অনেকে তো থাকে ইংলিশ তারকা ডেভিড বেকহ্যামের সাথে তুলনা করতো, এমনকি একটা জিরিপ দেখা গিয়েছিলো ফ্যাশনের জন্য বেকহ্যামের পরেই ছিল তার নাম। অবশেষে পেরুজিয়াতে ১৮ মাস খেলে ২১.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে যোগ দেন ইতালিয়ান জনপ্রিয় ক্লাব এএস রোমাতে। রোমাতে যোগ দেয়ার পর জুভেন্টাসের সাথে ম্যাচে অবিশ্বাস্য প্যারফরম্যান্স এর মাধ্যমে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান নাকাতা। সে ম্যাচে রোমা ২-০ তে পিছিয়ে ছিল জুভেন্টাসের সাথে, এবং বিরতির পর রোমার সম্রাট ফ্র্যানসেস্কো টট্টির বিকল্প হিসেবে মাঠে নামেন জাপানি এ তারকা এবং মাঠে নেমেই তার ত্রিশ গজ দূর থেকে করা অবিশ্বাস্য এক গোল রোমাকে ম্যাচে ফেরায়। শেষ দিকে মন্টেলার গোলে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে রোমা ( এ গোলে ছিল তার পরোক্ষ অবদান) এবং ৬ পয়েন্ট লিড নিয়ে তৃতীয় বারের মত ইতালিয়ান লিগ জেতে রোমা। যদিও রোমার শক্তিশালী স্কোয়াডের কারনে পুরো মৌসুম তেমন একটা সুযোগ পাননি নাকাতা। তাই প্লেয়িং টাইমের জন্য যোগ দেন ইতালিয়ান আরেক ক্লাব পারমায়। রোমার হয়ে তেমন একটা সুযোগ না পেলেও সে বছর নিজ দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে জাপান জাতীয় দলের হয়ে সুযোগ পান নাকাতা। নাকাতা সহ আরো ৪ জন ফুটবলার জাপান জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন যারা ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে খেলতেন। গ্রুপে পর্বে নাকাতার দারুন প্যারফরম্যান্সের উপর ভর করে শেষ ১৬ তে জায়গা করে নেয় জাপান। যদিও তুরস্কের সাথে হেরে শেষ ১৬ তে থেকেই শেষ হয় নাকাতা দের যাত্রা। জাপানের হয়ে ২০০৬ বিশ্বকাপ খেলে ২৯ বছর বয়সেই জাতীয় দল থেকে অবসর নেন নাকাতা। জাতীয় দল থেকে অবসর নেয়ায় আগে জাপানের হয়ে ৭৭ টি ম্যাচ খেলে ১১ টি গোল করেন নাকাতা।

নাকাতার ব্যক্তিগত সাফাল্য –

#নমিনেশন ব্যালন ডি অর – ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০১

#ফিফা ওয়াল্ড প্লেয়ার অফ দ্যা সিজন নমিনেশন – ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০১, ২০০২

এখন অবধি কোন এশিয়ান খেলোয়াড়ের এমন কৃতিত্ব আছে কি না তা আমার জানা নেই কিন্তু এশিয়ান ফুটবলের যদি সর্বকালের সেরা চার্ট করা হয় পার্ক জি সুং, মাজিদ আব্দুলাহদের সাথে নাকাতার নাম উপরের সারিতে থাকবে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

12 + twenty =