হাভিয়ের মাশ্চেরানো – হার না মানা যোদ্ধার উপাখ্যান!

হাভিয়ের মাশ্চেরানো - হার না মানা যোদ্ধার উপাখ্যান!

বাস্কেটবলে মাইকেল জর্দান, কোবে ব্রায়ান্ট এবং লেব্রন জেমস হচ্ছেন সেরা…হকিতে হচ্ছেন ওয়েন গ্রেটজকি অথবা মারিও লেমিউক্স…এবং অবশ্যই, ফুটবলে সেরা হচ্ছেন ডিয়াগো ম্যারাডোনা, পেলে, লিওনেল মেসি সহ অনেকে।
কিন্তু প্রায়ই, নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড় এমনভাবে খেলে যে খেলায় তাদের অবদান কিছুতেই ভোলা যায়না… তাদেরকে প্রায়ই সর্বসেরা খেলোয়াড়ের তালিকায় গণ্য করা হয়না, কিন্তু আমরা সবাই জানি তারা সাধারণ খেলোয়াড় নয়…তারা অন্যদের থেকে আলাদা, খেলায় তাদেরও অনেক অতুলনীয় মুহুর্ত আছে…।।।

২০০৮ সালে লিওনেল মেসি, জুয়ান রোমান রিকুইলেমে, সার্জিয়্য আগুইরো এবং কার্লোস তেভেজকেই আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সবচেয়ে প্রতিভাধর এবং অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলেই মানা হতো…ল্যাটিন নৈপুণ্যের চারজন খেলোয়াড়, যারা যেকোন ডিফেন্ডারের ভয়ের কারণ ছিলো
প্রতিভার এতো প্রাচুর্য সত্ত্বেও মাঠের পারফরমেন্স ছিলো হতাশাজনক

২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং এর নবম রাউন্ডে আর্জেন্টিনা দল যখন পুরো ২০০৮ সালে মাত্র একটি ম্যাচ জিততে সক্ষম হয়, তখন পরবর্তী ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিলো উরুগুয়ে

দক্ষিণ আমেরিকার চির প্রতিদ্বন্দ্বী এই দলের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিলো আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জন্য বাঁচা মরার লড়াই

ম্যারাডোনা জিজ্ঞেস করা হয় উনি বর্তমান জাতীয় দল নিয়ে কি ভাবছেন

তখন ম্যারাডোনা বলেছিল আমার কাছে বর্তমান জাতীয় দল হলো “একজন মাশ্চেরানো আর ১০ জন খেলোয়াড়”

সাদা আর আকাশী স্ট্রাইপ জার্সি পরা ১১ জনের মধ্যে একজন খেলোয়াড়ের খেলাই অসাধারণ লেগেছিল

অনেকেই জানতো জেফেসিটো অনেক গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়, কিন্তু তারা কখনোই ভাবেনি পরবর্তী লিভারপুলের এই মিডফিল্ডারই সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় হবে তাদের জন্য…এটা ঠিক যে, রিভারপ্লেটে থাকাকালীনই মাশ্চেরানো খুব ভালো একজন ডিফেন্ডার এ পরিণত হয়েছিলো; তার প্রতি ম্যাচের উপস্থিতির মাধ্যমে এবং আর্জেন্টাইনদের অনেকের মনেই তার অনেক অবিস্মরণীয় স্মৃতি আছে, তবুও তারা এই তরুণ খেলোয়াড়কে তাদের সেরা খেলোয়াড় মানতে রাজী ছিলো না…তাই ম্যারাডোনার এমন মন্তব্যের পরে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছিলো

“আমি সবসময়ই বলি মেসি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়, তাই আমি তার সাথে একমত হইনি” বলেছিলো বুয়েন্স আয়ার্স এর ২৫ বছর বয়সী ডাটা এনালিস্ট এন্ড্রে ব্রেনার; “কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম তিনি কেন এই কথা বলেছিলেন এবং অনেকেই কেন তার সাথে একমত হবে” ম্যারাডোনার মন্তব্যের পর তিনি এই কথাগুলোই বলেছিলেন… ব্রেনার একা ছিলোনা…তার মতো অনেকেই ম্যারাডোনার এই কথায় হাসাহাসি করেছিলো ; তখন এটা শুধুই ম্যারাডোনাকে আরেকটি বিতর্কিত মন্তব্যে জড়িয়ে দিয়েছিলো

দুই সপ্তাহ পরে ম্যারাডোনা যা মন্তব্য করেছিলো তাই ঠিক হয়েছিলো, এএফএ চেয়ারম্যান জুলিও গ্রন্দোনা ম্যারাডোনাকে হেড কোচের দায়িত্ব দিলো ; কারণ জাতীয় দলের কোচ আলফিও বাসিলে বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং ম্যাচে চিলির কাছে ১-০ তে হারের ফলে পদত্যাগ করেছিলেন

তিনি “এল জেফেসিটো” মাশ্চেরানোকে জাতীয় দলের অধিনায়ক ঘোষণা করলেন…স্বভাবতই, মাশ্চেরানো প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় থেকে বল জয় করা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিলো, সেখানে তাকেই জাতীয় দলের অধিনায়ক ঘোষণা দেয়ায় নতুন বিতর্কের জন্ম হলো

“ম্যারাডোনা আজকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অধিনায়ক ঘোষণা করেছেন, সত্যি বলতে, আমি বিশ্বাসই হচ্ছে না” বলেন ব্লেচার রিপোর্ট এ প্রকাশিত ব্লগ পোস্টের ব্লগার আমিন মালিক…মালিক আরো বলেন, “আমার মতে, হ্যাভিয়ের মাশ্চেরানো, বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার,

কিন্তু আমি মনে করি মাশ্চেরানো আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়ক থেকেও জর্জ বুশের ফ্রিস্টাইল র‍্যাপ ব্যাটেল জয় করা বেশী সহজ অথবা ইউনাইটেড স্টেটস এর প্রেসিডেন্ট হওয়া…।।।”

সাউথ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ তে হেরে বিদায় নেয়…।।।
সবাই আর্জেন্টাইন দলের এই পারফরমেন্স এ হতাশ হয়ে কোচ এবং অধিনায়কের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ইউনিভিশন এর আর্জেন্টাইন-আমেরিকান সাংবাদিক নিকোলাস ক্যান্টর মাশ্চেরানো এবং তেভেজের পক্ষ নিয়েই কথা বলেন…তার মতে অন্য খেলোয়াড়দের পারফরমেন্স যাচ্ছেতাই হলেও এই দুইজন তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন খেলায় ফিরে আসার জন্য

২০১৪ বিশ্বকাপ ব্রাজিল ক্যাম্পেইনে, আর্জেন্টিনা স্কোয়াডে কিছু পরিবর্তন করা হয়; নতুন কোচ নিয়োগ দেয়া হয় এবং মেসিকে অধিনায়ক বানানো হয়…কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার এবং আর্জেন্টিনা ফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হওয়ার পূর্বে, বস্তুত জেফেসিটো ছিলো দলনেতা…মেসি আর্মব্যান্ড পরিধান করলেও দলনেতা পরিবর্তন হয়নি

একটি ফাইনাল, যেখানে অফিসিয়ালে মেসিই আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়ক… কিন্তু ফাইনাল পর্যন্ত আসা সম্ভব হয়েছে মাশ্চেরানোর মূলনীতি, চমৎকার ডিফেন্ডিং এবং নেতৃত্ব দেয়ার মনোভাবের কারণে…আর্জেন্টিনা মরিয়া ছিলো চার বছর আগে জার্মানিরর কাছে ৪-০ গোলের লজ্জাকর হারের কথা বিশ্বকে ভুলিয়ে দিতে, কিন্তু রাস্তাটি ছিলো অনেক কঠিন এবং আর্জেন্টিনা কে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘপথ…।।।

মাশ্চেরানো নেতৃত্ব বিকাশ লাভ করে রাউন্ড অফ ১৬ এর সুইজারল্যান্ড এর সাথে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের কিছু আগে মাশ্চেরানো যেখানে দলের সবাইকে উজ্জীবিত করছিলো মেসি তখন তার স্বল্পভাষী স্বভাব নিয়ে পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলো….
এই লিটল জিনিয়াসের ব্যক্তিত্বই এমন যে, সে কথার জবাব কথা দিয়ে না উচ্চভাবে জবাব দেয় তার বাম পায়ের মাধ্যমে; কিন্তু নক আউট পর্বের এমন পর্যায়ে মাশ্চেরানোর কথার সান্নিধ্য সবার জন্য অত্যাবশ্যক ছিলো…।।।

সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় নেদারল্যান্ডের…ইনজুরি সময়ের আগে মাশ্চেরানো নেদারল্যান্ডের আক্রমণ ভাগ নিয়ে পরীক্ষা করেন…

ডাচদের মূল মধ্যমাঠ থেকে একটি পাস আসছিলো, মনে হচ্ছিল মাশ্চেরানো এটা আগেভাগেই বুঝে গেছেন…ঠিক ঠিক পাসটি এসেছিলো এবং এটা ছিলো আর্জেন রোবেনের কাছে; মাশ্চেরানো অসাধারণ দক্ষতার সাথে রোবেনের শটটি পরাস্ত করেন… এই মুহুর্তের মাশ্চেরানো তার দেশবাসীর চোখে ছিলো দেবতুল্য…মাশ্চেরানোর শেষ মুহুর্তে আর্জেন্টিনা কে রক্ষা করে তার প্রতীক Jefecito স্টাইলে…।।।

অবশেষে, আর্জেন্টিনা ফাইনাল ম্যাচের ওভারটাইমে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে পরাজয় বরণ করে…কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে মাশ্চেরানো প্রচেষ্টা এবং পারফরমেন্স আর্জেন্টাইনরা চিরকাল গর্বের সাথেই মনে রাখবে…।।।
এটাই ছিলো মাশ্চেরানোর স্বর্গের সিঁড়িতে পা দেওয়ার মুহুর্ত; এটাই ছিলো তার বিশ্ব ফুটবলের অমরত্বের জগতের প্রবেশদ্বার… অনেক আর্জেন্টাইন এবং ক্লাব সমর্থককে যখন অবসরের পরে মাশ্চেরানো কিভাবে স্মরণ করবে এই প্রশ্ন করা হয়েছিলো, প্রায় সবাই বিশ্বকাপের কথাই বলেছিলো

যখন আপনি সমসাময়িক এবং সবসময়ের সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের কথা স্মরণ করবেন, জেনেরো গাত্তুসো, এডগার ডেভিডস এবং ক্লাউদে মাকেলেকে এমন কিছুই নাম আসবে আপনার মনে…কিন্তু যখন মাসকেরানো অবসর নিবে,
এল জেফেসিটো ই যে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের আদর্শ হবে এতে কোন সন্দেহ নেই…এভাবেই, আমাদের মতো অনেকেই তাকে স্মরণ করবে, সে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না, কিন্তু অবশ্যই তার প্রাপ্য সম্মান প্রত্যাশা করে, তার সমালোচনাকারী দের কাছ থেকেও

যখন ওইদিন আসবে, যেদিন হ্যাভিয়ের মাশ্চেরানো তার বুট জোড়া খুলে রাখবেন, বিদায় নিবেন বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে; সুনিশ্চিত ভাবেই তাকে আর্জেন্টিনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবেই সবাই স্মরণ করবে…

জন্মদিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইলো এল জেফেসিটো

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × four =