হাভিয়ের মাশচেরানো – এক ও অনন্য

আচ্ছা সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় কখন?
হ্যাঁ অবশ্যই সেইদিন নিজের দল কোনো শিরোপা জিতে। নর্থ-ওয়েস্ট ডার্বি কিংবা সুপারক্লাসিকো জয়ী দল ও তাদের সমর্থকদের আনন্দের সীমা তখন মাউন্ট এভারেস্টের থেকেও উঁচুতে।আর একটি ব্যাপারও সমর্থকদের দেয় সাংঘাতিক তৃপ্তি। সেটি হলো নিজের অভিমতের সমীচীন প্রকাশ এবং তারই মানানসই প্রতিক্রিয়া।আমাদের হিরোরা যোগ্য সম্মানের দাবিদার। আর আমরা তাদের হয়ে কথার লড়াইয়ে নেমে পড়ি।তাদের সশ্রদ্ধতার উত্তুঙ্গ আসন নিশ্চিত করতে পারা যেকোন দেশ বা ক্লাব এর সমর্থকদের অন্যতম খুশির কারণ। আমরা চাই সবাই তাদের স্মরণ করুক। দেশ,ক্লাব এবং নির্দিষ্ট কোনো প্রজন্মের উপর তাদের প্রভাব কেউ অবহেলা করবে এটা কিছুতেই মেনে নেয়া চলে না।

সর্বকালের সেরা কে এই নিয়ে বাগ-বিতন্ডার শেষ নেই। বাস্কেটবলে মাইকেল জর্ডান,কোবি ব্রায়ান্ট নাকি লেব্রন জেমস। টেনিসে রজার ফেদেরার নাকি রাফায়েল নাদাল। ফুটবলে একসময় ছিলো ম্যারাডোনা নাকি পেলে আর এখন মেসি নাকি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। নাকি ভবিষ্যতে আসবে অন্য কেউ! কিন্তু মাঝেমধ্যে এমন কিছু ফুটবলার আসে যাদের প্রভাব এবং সামগ্রিক দীর্ঘস্থায়ী আপিল মাপাটা আমাদের ফেলে দেয় ব্যাপক বিপদে। তাদেরকে হয়তো কখনোই গ্রেটদের কাতারে রাখা হয় না, তারা আবার কোনো এভারেজ প্লেয়ারও নন। তাদেরও থাকে কিছু ক্লাসিক মুহূর্ত, তাদের স্পর্শেও খেলায় এসেছে প্রাণবন্ততা।

হাভিয়ের মাশ্চেরানো যাকে সবাই চিনে “এল হেফেসিতো” নামে। স্প্যানিশ শব্দ ‘হেফে’ মানে হচ্ছে ‘বস’ আর ‘হেফেসিতো’ মানে ‘ছোট বস’। তাইলে বড়ো বসটা কে? লিওনার্দো আস্ট্রাডা যিনি রিভারপ্লেটের ইতিহাসের এবং আর্জেন্টাইন ফুটবলের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। তার খেলার ধরনের সাথে মিল দেখেই মাশ্চেরানোর নাম হেফেসিতো।

সময়টা ২০০৮।

রিকুয়েলমে,মেসি,তেভেজ এবং আগুয়েরো তখনকার সময়ে দলের সবচেয়ে “গিফটেড & মার্কেটেড” সুপারস্টার। ল্যাতিন বিচক্ষণতাসম্পন্ন ফুটবলার যারা প্রতিপক্ষের রক্ষনে আনতে পারে “ফ্যাটম্যানের” মতোন বিধবংসী বোমার আঘাত। দলে মেধাবী ফুটবলারদের ছড়াছড়ি এরপরেও আর্জেন্টিনা দলের তখন খুবই বাজে অবস্থা। কনমেবল অঞ্চলের ২০১০ বাছাইপর্বে টানা ৫ ম্যাচে জয়ের দেখা পায়নি আকাশি-সাদারা। পুরো ২০০৮ সালে জয়বিহীন আর্জেন্টিনা। এই অবস্থায় উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ। আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে রাইভালরিকে নিয়ে দুইদেশেই থাকে চরম উত্তেজনা। এই প্রাচীন দক্ষিন আমেরিকান লড়াইটা আর্জেন্টিনার জন্যে একেবারে একটি “মাস্ট উইন গেইম”। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বাজে অবস্থা কিংবা এতিহ্যের দাম্ভিকতা রক্ষা যেকোন হেতুই হোক জয় চাই উরুগুয়ানদের বিরুদ্ধে। এই ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিখ্যাত আর্জেন্টাইন স্পোর্টস চ্যানেল টিওোয়াইসি(TyC)এর ম্যাচ প্রিভিউ প্রোগ্রামে এসেছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং বর্তমান আর্জেন্টাইন দল নিয়ে তাকে করা প্রশ্নের জবাবে তার উত্তর আর্জেন্টাইন ফুটবল ফোকলোরে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। “ইউ দিগো কোয়ে মাশচেরানো ওয়াই দিয়েজ মাস”, যেটির বাংলা দাঁড়ায় “মাশ্চেরানো এবং বাকী ১০ জন”। সর্বকালের অন্যতম সেরার চোখে শুধু মাশ্চেরানোই দলে অপরিহার্য এবং দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ব্যাপারটা একেবারেই স্পষ্ট কীভাবে এল ডিয়েগো মনে রাখবেন স্বদেশি এল হেফেসিতোকে।

অনেকেই জানতেন মাশ্চেরানো আলবিসিলেস্তেদের জন্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তখনকার লিভারপুল মিডফিল্ডার যে এতটা মূল্যবান সম্পদ হবে সেটা কেউ ভুলেও ভাবেননি। মার্সিসাইডের হয়ে নিয়মিত খেলতে থাকা মাশ্চেরানো নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন খুবই ভালো ডিফেন্সিভ মিড হিসেবে এবং হ্যাঁ আর্জেন্টাইনদের মনে  রিভারপ্লেটের বিখ্যাত লাল স্যাশড জার্সিতে একজন প্রমিসিং তরুনের প্রাণবন্ত পারফর্ম্যান্স এখনো গেথে আছে। তবু মাশ্চেরানোকে নিয়ে ডিয়েগো ম্যারাডোনার মন্তব্যে আর্জেন্টাইনরা যেন দুইভাগে বিভক্ত।


“আমি সবসময়ই বলে আসছে মেসি সেরা তাই আমি এল ডিয়েগোর কথা মানতে পারিনি”। আন্দ্রে ব্রেনার নামের ২৫ বছর বয়সী যুবকের সরল স্বীকারক্তি। সে এটাও বলেছে যে অনেকেই ম্যারাডোনার সাথে একমত।আবার অনেকে তো এই কথা হাসির ছলে উড়িয়ে দিলো কারণ সে যাহাই হোক কহন কহিয়েছেন ম্যারাডোনা।

এর কয়েক সপ্তাহ পরে আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন চেয়ারম্যান হুলিও গ্রান্দোনা আকাশি-সাদাদের দীক্ষাগুরু হিসেবে ঘোষনা করলো ম্যারাডোনার নাম।বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে চিলির কাছে ০-১ গোলে হারার পরে জাতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেন আলফিও বাসিলে।ম্যারাডোনার প্রথম কয়েকটি কাজের একটি ছিলো নিজের কথার সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে এল হেফেসিতোকে দলের আর্মব্যান্ড তুলে দেয়া।মাশ্চেরানোর বল-উইনিং দক্ষতা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ না থাকলেও দলের অধিনায়কত্ব করা ব্যাপারটা নিয়ে ভ্রু কুচকেছেন অনেকেই।

এমন সিদ্ধান্তে চমকে যাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি।ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে মাশ্চেরানো সেরা হলেও অধিনায়ক হিসেবে তার ভালো করার সম্ভাবনা অনেকটা জর্জ বুশের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সফল হবার মতোনই।এমনই মন্তব্য করেছিলেন ব্লিচার রিপোর্টের ব্লগার আমিন মালিক।
মালিকের মাশ্চেরানো সম্পর্কে মন্তব্য একটু পাগলাটে ধরনের হলেও তার জর্জ বুশের অ্যানালজিটা কোচ ম্যারাডোনার সাথে একদমই পারফেক্ট।আফ্রিকা বিশ্বকাপে কোয়াটার ফাইনালে জার্মানির কাছে ০-৪ গোলের অসহায় আত্মসমর্পন তারই প্রমান দিয়েছিলো।প্রায় সব আর্জেন্টাইনদের সমালোচনার মুখে পড়েন কোচ এবং তার শিষ্যরা।“ইউনিভিশন” এর আর্জেন্টাইন-আমেরিকান সাংবাদিক নিকোলাস কান্টরের মতে এমন বাজে পারফর্ম্যান্সের পরেও দুজন ছিলেন যারা বুক চিতিয়ে লড়ে গেছেন,নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিয়েছেন।ম্যারাডোনার মন্তব্যের সাথে মিল রেখে বলতে গেলে মাশ্চেরানো & তেভেজ এবং বাকী নয় জন।অধিনায়ক হিসেবে মাশ্চেরানো মাঝেমধ্যে সমর্থন পেলেও তার অধিনায়কত্ব নিয়ে হাসাহাসি হয়েছিল অনেক।২০১০ বিশ্বকাপের পরে তাদের প্রায় সবারই মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।এর চার বছর পরের ব্রাজিল বিশ্বকাপে নতুন কোচ আলেহান্দ্রো সাবেলার নতুন অধিনায়ক হয়েছিলেন মেসি।টুর্ণামেন্টের শেষের দিকে মানে ফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হবার আগমুহূর্ত পর্যন্ত মাশ্চেরানোই ছিলেন ডি ফেক্টো লিডার,মেসি আর্মব্যান্ড পড়লেও এই ব্যাপারের কোনো হেরফের হয়নি।ম্যারাডোনার ওই মন্তব্যে হাসার লোক এখন একজনও পাওয়া যাবে না।২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার “ভয়েজ অফ দ্যা লিডার” যে এল হেফেসিতোই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না,এই বিশ্বকাপটাই তার ক্যারিয়ারের “ ম্যাগনাম অপাস”।

লিওনার্দো আস্ট্রাডা যখন ২০০৪ সালে রিভার প্লেট থেকে চলে যান তখনই তার জায়গা পুরোপুরি নিজের করে নেয় মাশ্চেরানো।মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া ফুটবলার যেনতেন কেউ নন সেটি বুঝতে বাকী নেই রিভারপ্লেট ভক্তদের।ক্লাবের হয়ে মাত্র ৪৬ ম্যাচ খেলেছেন তিনি,জিতেছেন একটি মাত্র শিরোপা কিন্তু প্লেয়ার মাশ্চেরানো যে দলের নিভ্রবিন্দু এবিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিলো না।এমনকি তাকে নিয়ে ভক্তদের বানানো গানও ছিলো।|
“Bring 11 Mascheranos to win the world cup”

রিভারপ্লেটের হয়ে ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছিলেন মাশ্চেরানো।যার কারণেই তাকে ১৫ মিলিয়ন ডলারে দলে টেনে নেয় সক্রেটিস,রিভেলিনো,নেকো,ক্লদিয়োদের ক্লাব করিন্থীয়ান্স।করিন্থীয়ান্সের হয়ে মাশ্চেরানোর পুরো সময়টা কমবেশি কেটেছে ইঞ্জুরিতে।বেশ ভালো ফর্ম নিয়ে গেলেও তা মাঠে কাজে লাগানোর সুযোগ হয়ে উঠেনি।যার কারণে ২০০৬ সালে তাকে ওয়েস্ট হামের কাছে বিক্রি করে দেয় ব্রাজিলিয়ান ক্লাবটি।সান লরেঞ্জোর তরুণ ছেলেটি আজ লন্ডনে।যদিও আপটন পার্ক(ওয়েস্টহামের গ্রাউন্ড) নয় এল হেফেসিতো তার জাত বুঝাতে বেছে নিলেন অ্যানফিল্ড।“ওয়ার্ল্ড ফুটবল ইন্ডেক্স” এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক এবং লিভারপুল সমর্থক জেমস নাল্টনের দৃষ্টিতে মাশ্চেরানোর জন্যে লিভারপুলের মূল একাদশে জায়গা পাওয়া  একেবারে অসম্ভব ছিলো।জাভি আলোনসো এবং স্টিভেন জেরার্ডের সাথে তখন মিডফিল্ডে ছিলেন “ইংক্রিজিংলি ইম্প্রেসিভ” মমো সিসোকো।কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাপারটা একদম পরিষ্কার হয়ে যায় কেন লিভারপুল মাশ্চেরানোর জন্যে প্রায় বিশ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছিল।লিভারপুলের লাল জার্সিতে মোট ১৩৯ ম্যাচ খেলেছেন মাশ্চেরানো।ডিফেন্স লাইনের অটল প্রহরী,অসাধারণ ট্যাক্লিং এবং ব্যাকলাইন অঞ্চল থেকে ভালো পাস সরবরাহকারী;এসব গুনে সর্বত্র খোশনামী এল হেফেসিতো,অ্যানফিল্ডও যার ব্যতিক্রম নয়।


“In only his 11th game, he was Liverpool’s best performer in the Champions League final against Milan in Athens

– LFCHistory.net.

এই ব্যাপারটা মাশ্চেরানোর অল রেডসদের হয়ে জেমস নাল্টনের বলা “immediate impact” এর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

মিলানের সাথে সেই ফাইনাল ছিলো অত্যন্ত কঠিন এক ম্যাচ।ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থাকা কাকা সাথে ইনজাগি,পিরলো,সিডর্ফদের নিয়ে গড়া মিলান অতিশয় বিপজ্জনক দল।শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে ম্যাচও জিতে ইতালিয়ান দলটি।হারলেও  মাশ্চেরানোর পারফর্ম্যান্সে যথেষ্ট খুশি স্কাউজারসরা এবং লিভারপুল ওয়েবসাইটে তাদের ভোটে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ হন মাশ্চে।

এখনো মাঝেমধ্যে মনে হয় যে মাশ্চেরানো অনেক আন্ডারএপ্রিসিয়েটেড একজন ফুটবলার।লিভারপুল ইকো স্পোর্টস এর সাংবাদিক ক্রিস্টিয়ান ওয়ালশ এই ব্যাপারে একবার লিখেছিলেন।তার কিছু অংশ সরাসরি তুলে দেয়া হলো।


Is Mascherano one of the most underrated players of the past decade? He was at Liverpool. Alonso was the orchestra, Gerrard was the star; what purpose, then, did the Argentine serve in Rafa Benítez’s midfield? He did not have the class of Alonso, nor the transcendental nature of the captain. He brought something else though. A tenacity, a desire, a consistency. If the forward players of Benítez’s meticulous system had been breached, Mascherano was a formidable barrier ahead of the defence

২০১০ সালে মাশ্চেরানোর কাতালান শহরে চলে যাওয়াটা অনেক লিভারপুল সমর্থক সহজে মেনে নিতে পারেনি।দুর্ভাগ্যজনকভাবে যথেষ্ট ভালো খেলার পরেও মার্সিসাইডের এইপাশের হয়ে কোনো শিরোপা জিততে পারেননি তিনি।বার্সেলোনার হয়ে অনেক কিছু জিতেছেন এবং দেশের হয়ে ফুটবলের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার জেতার একদম কাছে গিয়ে হেরেছেন।

২০১৪ বিশ্বকাপ ক্যাম্পেইন শুরু হবার আগ পর্যন্ত বার্সার হয়ে মাশ্চেরানোর মোট শিরোপার সংখ্যা আটটি।সবার মতোন আর্জেন্টিনার বহুদিনের অপেক্ষিত অধরা বিশ্বকাপ আনতে মরিয়া তিনিও।আর্জেন্টিনার হয়ে দুটো অলিম্পিক গোল্ড মেডেল ছাড়া আর কিছুই নেই।যদিও ১৯৬৮ সালের পরে দেশের হয়ে দুটো গোল্ড মেডেল পাওয়া ফুটবলার শুধুই এল হেফেসিতো।

মাশ্চেরানোর স্টেয়ারওয়ে টু হেভেন

 আগেই বলেছি ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ মাশ্চেরানোর ম্যাগনাম অপাস। এই বিশ্বকাপের সেরা সিডিএম,এ ব্যাপারে কারো সন্দেহ থাকার কোনো অবকাশ নেই।ফাইনালে মেসির নেতৃত্বে টিম আর্জেন্টিনা মাঠে প্রবেশ করলেও মাশ্চেরানোর অতিঅসাধারণ ডিফেন্ডিং,লিড-বাই-এক্সামপল অ্যাটিটিউডই ফাইনালে নিয়ে গেছে দলকে।গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচ থেকেই আর্জেন্টিনা চেষ্টা করেছে চারবছর আগে জার্মানির কাছে ০-৪ গোলের লজ্জাকে ভুলতে।অনেক কঠিন এবং দীর্ঘ ছিলো পথটি আর আর্জেন্টিনাও কখনোই নিজেদের ল্যাতিন ছন্দে ছিলো না।“লা নুয়েস্ট্রা(আর্জেন্টিনার এতিহ্যবাহী ছান্দসিক ফুটবলের নাম,মানে আমাদের ধরন বা ছন্দ)” তো মরে গেছে সেই ১৯৫৮ সালেই,৫৮ বিশ্বকাপে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে ১-৬ গোলে হারা।যার কারণেই লা নুয়েস্ট্রা বাদ দিয়ে স্পিনেত্তো-জুবেলদিয়া-বিলার্দোদের হাতে আসলো অ্যান্টি-ফুটবল।সে গল্প হবে অন্য কোনোদিন।আজকে শুধু স্যান লরেঞ্জো থেকে আসা যোদ্ধা মাশ্চেরানোর স্তুতি।সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচটি যায় অতিরিক্ত সময়ে।এই অতিরিক্ত সময়ের আগে পাওয়া ছোট্ট বিরতিতে মাশ্চেরানো পুরো দলকে উদ্দেশ্য করে ফুটিয়েছেন ‘উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা’ এর তুবড়ি যেখানে ক্যাপ্টেন মেসি দাঁড়িয়েছিলেন পিছনে।লিটল জিনিয়াস মেসির নিজের স্বকীয় ধরণ আছে কথা বলার আর তার বা-পায়ের সুরের চেয়ে জোরে কথা অন্য কিছুতেই নেই।কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট স্টেজে মাশ্চেরানোর ‘ভোকাল অ্যাপ্রোচ’ এর গুরুত্ব অপরিহার্য।

 “I was sick of eating crap”

বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে টিম বৈঠকে মাশ্চেরানোর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের আন্ডারপারফর্ম্যান্স নিয়ে

সরল স্বীকারক্তি।আবারো মাশ্চেরানো টোটকায় অনুপ্রাণিত হয়ে টিম আর্জেন্টিনার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেলজিয়ামের সাথে ১-০ ব্যবধানে জয়।সেমিফাইনালে ডাচদেরকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ফাইনালে উঠলো আলবিসিলেস্তিরা।শুটআউটে যাবার রাস্তায় অবশ্য তুলে দিয়েছেন এল হেফেসিতোই।

ইঞ্জুরি টাইমের খেলা চলছে।মাশ্চেরানো নেদারল্যান্ডের একটি আক্রমন পর্যবেক্ষন করছেন।সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকে আসছে একটি পাস,মাশ্চেরানো কুড ফিল ইট।অবশ্যই পাসটি এসেছে এবং তা আরয়েন রোবেনের প্রতি।রক্ষণ ভেদকারী দৌড় ডাচ উইঙ্গারের,ছোঁ মারা মনোভাব নিয়ে মাশ্চের রোবেন থামাও পশ্চাদ্ধাবন।বা-পাশে সরে গিয়ে রোবেন চালালেন গুলি,মাশ্চেরানোর সিগনেচার স্লাইডিং ট্যাকেলরূপি শীল্ড এবং শীল্ডে আটকে গেলো গুলি আর্জেন্টিনা চলে গেলো বিশ্বকাপ ফাইনালের কিঞ্চিত কাছে।শেষ মুহূর্তে তরী ডুবার হাত থেকে দলকে বাঁচালেন একেবারে এল হেফেসিতো স্টাইলে।

অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হারলেও এই বিশ্বকাপে তার প্রয়াস,অবদান,গুরুত্ব আজীবন মনে থাকবে সকল আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মনে।এইটিই মাশ্চেরানোর স্টেয়ারওয়ে টু হেভেন মুহূর্ত।এই তোরণ দিয়েই ফুটবল অমরত্বে প্রবেশ করলেন এল হেফেসিতো।

২০১৮ এর রাশিয়া বিশ্বকাপ নিয়ে কিছু বলার নেই।অনেক কষ্টে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে এমবাপে,পাভার্ডদের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে।পুরো টিম ছিল খাপছাড়া,আর কোচ নিজে তো নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছেন,দলকে টেনে তুলবেন কী!!কেমন ছিল এল হেফেসিতোর রাশিয়া বিশ্বকাপ,আসুন দেখা যাক বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক জোনাথান উইলসন কী বলেন তাকে নিয়ে!

Javier Mascherano’s legs may have gone but his heart has not.He has spent much of the past week looking beat up. He had a black eye as he gave a deeply necessary press conference last Saturday that helped stabilize Argentina, and finished Tuesday’s game against Nigeria with blood pouring from a cut eye and a scratched cheek. While his performance then had little to do with stability, his presence was still vital. If Mascherano was Argentina’s unacknowledged captain at the last World Cup, it has felt at times here that he has been their unacknowledged coach”.

ক্রোয়েশিয়ার কাছে  ০-৩ গোলে হারার পরে ট্যাক্টিস,ফর্মেশন,শৃঙ্খলা সবকিছু মিলিয়েই আর্জেন্টিনার অবস্থা ছিলো করুণ।এই ম্যাচের পরে মাশ্চেরানো কোচ সাম্পাওলিকে গিয়ে ৪ ডিফেন্ডার নিয়ে পরবর্তী ম্যাচ খেলানোর জন্যে রাজী করান।খুববেশি ভালো ফুটবল না খেললেও অতীব গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট ঠিকই পেয়ে যায়।

গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে “ব্যাড ভাইব” দূরে থাকার জন্যে মেসিকে একটি “ক্যাবালিস্টিক চার্ম” এর “লাল সুতো” উপহার দেয় সাংবাদিক রামিরো পানতোরোতো,আসলে যে ‘লাল’ আর্জেন্টিনাকে অনুপ্রাণিত করেছিলো সেটি ছিলো মাশ্চেরানোর ‘গন্ডদেশ’।

এই দশকের আশেপাশে সময়ে অবসরে যাওয়া সবচেয়ে সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের নাম বললে গাত্তুসো,এডগার ডেভিস,ম্যাকলেলেদের নাম আসবে।কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে মাশ্চেরানো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের জন্যে একজন রোল মডেল।ব্যাক লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি যা করতেন তা একজন সিডিএম বানানোর বেঞ্চমার্ক।

“Give Mascherano a rifle and he alone will take back the Falkland Islands,” 

ঠাট্টার স্বরে বললেও অনেক আর্জেন্টাইনের চোখে মাশ্চেরানো তাদের  ভালোবাসার জাতীয় মানবমূর্তি।আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরাদের একজন।

এল হেফেসিতো স্তবগান শেষ করবো ব্রায়ান ক্লফের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে।

“In the end nobody ever says thank you”.


Thank you El Jefecito

Thank you for everything.

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

12 − 5 =