রুম নাম্বার ৩৪৬

এই শতকের একদম শুরুর দিককার ঘটনা।

দক্ষিণ আফ্রিকা এসেছে ভারতবর্ষে, দুই টেস্ট আর পাঁচ ওয়ানডের সিরিজ খেলতে। মাত্র এক বছর আগের বিশ্বকাপে হৃদয়বিদারক ‘টাই’ ঘটনার শিকার হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা তাঁদের ক্যারিশমাটিক অধিনায়ক ওয়েসেল ইয়োহাননেস ‘হানসি’ ক্রনিয়ের অধিনায়কত্বে নিজেদের অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছে। ক্রনিয়ের অধিনায়কত্বে টানা চৌদ্দ টেস্ট জেতা দলটা মাত্র আগের সিরিজে নাসের হুসেইনের ইংল্যান্ডের কাছে একটি টেস্ট হেরেছে।

দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ক্যালিস-গিবসদের সামনে টেস্ট সিরিজে নিজের মাটিতে শচীন টেন্ডুলকারের ভারত সেরকম পাত্তা পেল না উদ্যমী প্রোটিয়াদের কাছে। যদিও অনিল কুম্বলে ম্যান অফ দ্য সিরিজ হয়েছিলেন সেই টেস্ট সিরিজে।

ওয়ানডে সিরিজের সময় হলো। একে তো টেস্ট সিরিজে হারতে হয়েছে, নিজেদের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জেতার জন্য বদ্ধপরিকর শচীন-সৌরভ-কুম্বলেদের ভারত। পুরো সিরিজে কোণঠাসা বাঘের মতো খেলল ভারতীয়রা, ফলও পেল হাতেনাতে। নিজেদের মাটিতে নিজেদের দেশের পাগলাটে দর্শকদের সামনে নিজেদের মান রক্ষা করল ৩-২ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ জয় করে।

কিন্তু যদি বলা হয়, ভারতীয়দের সম্মান রক্ষা করার পেছনে শচীন-সৌরভ নয়, এক আফ্রিকানেরই হাত ছিল? তখন? যদি বলা হয়, দলটার সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দলের প্রধানতম আফ্রিকানটারই অবদান ছিল?

বলা হচ্ছে প্রোটিয়া অধিনায়ক ক্রনিয়ের কথাই। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি, ক্রিকেট ইতিহাসে তখন পর্যন্ত এক রকম ‘ডেমি-গড’ বা মানবরূপী ঈশ্বরের মর্যাদা পাওয়া এই ক্রিকেটারই অগোচরে নিজের গায়ে লাগাচ্ছিলেন কলঙ্কের কালিমা। জেনেবুঝেই।

দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লুমফন্টেইনে ক্রিকেটার বাবা এউই ক্রনিয়ে আর মা সান-মারি ক্রোনিয়ের ঘর আলো করে আসা ধার্মিক ও ক্রিকেটপাগল এই ছেলেটি নিজের প্রদেশ ও কলেজের হয়ে সমানতালে খেলতেন ক্রিকেট আর রাগবি, ছিলেন নিজের কলেজের হেড বয়। আস্তে আস্তে ক্রিকেটকে ধ্যানজ্ঞান করে নেওয়া এই ছেলেটি জাতীয় দলের অভিষেকের হয়ে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই অধিনায়কত্বের মুকুটটা নিজের করে নেন। এমনই দ্রুতগতির উত্থান ছিল তাঁর।

দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধিনায়ক তিনি। ১৩৮ ওয়ানডের মধ্যে ৯৯ ওয়ানডেতেই নেতৃত্ব দিয়ে দলকে জয়ের বন্দরে ভেড়ানো এই অধিনায়ক এখন পর্যন্ত একমাত্র ক্রিকেটার যিনি অধিনায়ক হিসেবে টানা ১০০ ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন। সব মিলিয়ে খেলেছিলেন টানা ১৬২ ম্যাচ, যা দক্ষিণ আফ্রিকার রেকর্ড।

তার পরেই সেই আলোচিত-নিন্দিত ভারত সফর।

দিল্লির বিখ্যাত তাজ প্যালেস হোটেলে তখন দিল্লি পুলিশ ফোনে আড়িপাতার ব্যবস্থা রেখেছিল। সেই হোটেলে আড়ি পাততে গিয়েই পুলিশের হাতে আসে এক চাঞ্চল্যকর ফোনকলের রেকর্ড। তাজ প্যালেসে তখন সফরকারী দক্ষিণ আফ্রিকা অবস্থান করছিল, যার ৩৪৬ নম্বর রুমে ছিল অধিনায়ক হানসি ক্রনিয়ের অবস্থান।

একটা বেনামি নম্বর থেকে ক্রোনিয়ের ফোনে কল আসে ধুরন্ধর জুয়াড়ি সঞ্জয় চাওলার। আগেই ৩-১ এ সিরিজ হেরে বসা দক্ষিণ আফ্রিকাকে শেষ ম্যাচটাও হারতে অনুরোধ করে চাওলা। দিল্লি পুলিশ অবিশ্বাসের সঙ্গে শুনতে থাকে সেই কথোপকথন, বিশেষ করে ক্রনিয়ের কথাগুলো –

‘আমি এই হোটেলের ৩৪৬ নম্বর রুমে আছি, চেষ্টা করব আরও কয়েকজনকে রাজি করাতে…’

দিল্লি তাজ প্যালেসের ৩৪৬ রুম থেকেই ক্রিকেটের অন্যতম কালিমাময় অধ্যায়ের সূচনা হলো।

সঞ্জয় চাওয়ার দাবি ছিল সে ওয়ানডেতে প্রথমে ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অবশ্যই ২৫০ রানের বেশি করতে হবে, তবে ২৭০ পার করা যাবে না। ক্রনিয়ে রাজি হলেন। পরের দিন সকালে চলে গেলেন তরুণ পেসার হেনরি উইলিয়ামসের কক্ষে, বললেন তাঁর পরিকল্পনার কথা। উইলিয়ামসকে বলা হলো তিনি যদি ১০ ওভারে ৫০ এর বেশি রান দেন তাহলে তাঁকে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার দেওয়া হবে। একই ধরনের প্রস্তাব নিয়ে দলের মারকুটে ওপেনার হার্শেল গিবসের দ্বারস্থ হলেন ক্রনিয়ে। বলা হলো, গিবস যদি ২০ রানের মধ্যেই আউট হয়ে যান তবে তাঁকেও এ রকম একটা অঙ্কের ‘সম্মানী’ দেওয়া হবে।
বাজ পড়ল যেন গিবস আর উইলিয়ামসের মাথায়। এত দিন ধরে যার অধিনায়কত্বে খেলে আসছেন তারা, যাকে এত দিন ধরে আর দশটা দক্ষিণ আফ্রিকান ছেলের মতো আইডল মানতেন, তার মুখে এ কি কথা? এও কি সম্ভব?

দুজনের প্রত্যেকে ক্রোনিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। গিবস তো রেগেমেগে চড়াও হলেন ভারতীয় বোলারদের ওপর, ৫৩ বলে ১৩ চার আর ১ ছক্কায় প্রায় ১৪০ স্ট্রাইক রেটে ৭৩ করে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন। দক্ষিণ আফ্রিকাও করল ২৭০ রানের বেশি, ৩২০।

ওদিকে বোলিংয়েও উইলিয়ামস ১.৫ ওভারের বেশি করতেই পারলেন না চোটের কারণে। জুয়াড়ি সঞ্জয় চাওয়ার দেওয়া একটা শর্তও পূরণ হলো না, এক টাকাও পেলেন না ক্রনিয়ে।
ঘটনার শুরু কিন্তু এখান থেকে নয়। তার জন্য পেছনে ফিরে যেতে হবে, সেই ১৯৯৬ সালে।

কীভাবে সঞ্জয় চাওলার মতো জুয়াড়িরা চিনলেন হানসি ক্রনিয়েকে? কান টানলে যেরকম মাথা চলে আসে, এখানে ক্রনিয়েকে টানলে চলে আসবেন ভারতের সাবেক কিংবদন্তি অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন!

তিনিই এসব জুয়াড়িদের সঙ্গে ক্রনিয়ের পরিচয় করিয়ে দেন। তবে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যমতে ১৯৯৯ সাল থেকেই সক্রিয়ভাবে ম্যাচ পাতানো শুরু করেন ক্রনিয়ে।

১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যায় পাঁচ টেস্টের এক সিরিজ খেলার জন্য। টেস্টে আফ্রিকানরা তখন অপ্রতিরোধ্য। টানা ১৪ টেস্ট জেতা আফ্রিকানরা সিরিজের পঞ্চম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২৪৮ করে ইনিংস ঘোষণা করে। মেঘাচ্ছন্ন সেঞ্চুরিয়ানের আকাশ এরপর টানা দুদিন বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দেয় খেলা।

পঞ্চম দিনে আকাশ আবার পরিষ্কার, শেষ দিনের খেলা শুরু হয় যথারীতি। সবাই ধরে নিয়েছিল ম্যাড়মেড়ে ড্র-ই লেখা আছে ম্যাচটার ভাগ্যে।

কিন্তু ক্রনিয়ে তাঁদের দলে ছিলেন না। আগের রাতে বৃষ্টি থামার সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসের হুসেইনের কাছে দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়ক গিয়েছিলেন একটা প্রস্তাব নিয়ে। প্রস্তাবটা ছিল – যেসব দর্শক টাকা দিয়ে ম্যাচ দেখতে আসবেন পরের দিন, তাদের ম্যাড়মেড়ে ড্র উপহার না দিয়ে একটা রোমাঞ্চকর সমাপ্তি উপহার দিতে। ইংল্যান্ড তাঁদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে না নেমেই ইনিংস ঘোষণা করবে, একই কাজ করবে দক্ষিণ আফ্রিকাও, তাঁদের দ্বিতীয় ইনিংসে। ফলে শেষ দিনে নিজেদের দ্বিতীয় ও ম্যাচের শেষ ইনিংসে ২৪৯ রান করতে হবে ইংল্যান্ডকে জয়ের জন্য। নাসের হুসেইন প্রথমে না-না করলেও, পরে রাজি হলেন।

ক্রিকেট দেখল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। দুই উইকেট হাতে রেখেই একেবারে শেষ মুহূর্তে সেই টেস্ট জিতল ইংল্যান্ড। ক্রনিয়ের সাহসী সিদ্ধান্তের প্রশংসা করল সবাই। প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন প্রতিপক্ষ অধিনায়ক নাসের হুসেইনও।

কিন্তু নাসের কি আর জানতেন এর পেছনেও ক্রোনিয়ের চাল ছিল?

মারলন অ্যারনস্ট্যাম নামের এক জুয়াড়ি ক্রনিয়েকে পঞ্চাশ হাজার ডলার সেধেছিলেন এই ম্যাচের ফল বের করার জন্য। বৃষ্টিতে টেস্টের দুদিন ভেসে যাওয়ার পর সবাই যখন ধরে নিয়েছিল ড্র-ই টেস্টের নিয়তি, তখনই নিজের ক্ষুরধার ক্রিকেট মস্তিষ্ক থেকে এই বুদ্ধি বের করেন ক্রনিয়ে।

ম্যাচ শেষে অ্যারনস্ট্যাম তিপ্পান্ন হাজার ডলার আর একটা লেদার জ্যাকেট দেন ক্রনিয়েকে। অতিরিক্ত তিন হাজার ডলার দেওয়ার কারণ, অ্যারনস্ট্যামের আশা ছিল, সামনের ম্যাচগুলোতে দলের সকল তথ্য দিয়ে অ্যারনস্ট্যামকে সাহায্য করবেন ক্রনিয়ে! ১৯৯৯ সালের সেই দক্ষিণ আফ্রিকা-ইংল্যান্ড সেঞ্চুরিয়ন টেস্ট এখন ‘দ্য লেদার জ্যাকেট টেস্ট’ নামে পরিচিত।

তবে বেশি দিন ম্যাচ পাতাতে পারেননি ক্রনিয়ে। ব্যক্তিগত জীবনে প্রচণ্ড ধার্মিক থাকার কারণেই কি না, দিল্লি পুলিশ যখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করল, প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে নিজের বিবেকের কাছে হার মেনে তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান আলী ব্যাখারের কাছে স্বীকার করলেন, তাকে যেরকম নিজের দেশে ক্রিকেট ঈশ্বর মানা হয়, সেরকম তিনি নন!

পরের কাহিনি সবারই জানা। ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয় একটা জেনারেশনের আইডল এই ক্রিকেটারকে। নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন করতে চাওয়া ক্রনিয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স শেষ করে জোহানেসবার্গে ২০০২ সালে যোগ দেন স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত এক কোম্পানিতে, অর্থ ব্যবস্থাপক হিসেবে। ক্রনিয়ে সপ্তাহজুড়ে থাকতেন জোহানেসবার্গেই, আর সপ্তাহের শেষে ফিরতেন জর্জে, স্ত্রী বার্থা ক্রনিয়ের কাছে। এমনই একবার ফেরার পথে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান ক্রনিয়ে।

আসলেই কি সেটা নিছক দুর্ঘটনা ছিল? উত্তরটা চলে গেছে ৫১ বছর আগে আজকের এই দিনে জন্ম নেওয়া ক্রনিয়ের সঙ্গেই।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 × two =