স্প্যানিশ ফুটবল ও পেশাদারিত্ব

স্প্যানিশ ফুটবল ও পেশাদারিত্ব
::: মোহাম্মদ নওশাদ আইয়ুব :::
আমি ৫ বারের বিশ্বকাপ নেওয়া ব্রাজিলকে দেখেছি। নিজে আর্জেন্টিনার পাঁড় সমর্থক হওয়ায় খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছি তাদের মন জুড়ানো নান্দনিক ফুটবল। জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর জার্মান আর আজ্জুরিদেরও বিশ্বকাপ হাতে তুলতে দেখেছি। কিন্তু স্প্যানিশ ফুটবল টিমটা আমার মনে আলাদা করে এক আঁচড় কেটে রাখবে।
 
কেন?
 
যতটা না তাদের মনভুলানো টিকিটাকা ফুটবলের জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি তাদের পেশাদারিত্বের জন্য। হয়তো বা ভবিষ্যতেও এর বেশি কিছু দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে এরকম বা এর চেয়ে বেশি ফুটবল ইতিহাস আর দেখেছে কি না তা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিসরের একদমই বাইরে।
২০০৮ থেকে ২০১২ – এই সময়ের মধ্যে স্প্যানিশ ফুটবল দলটা ছিল সর্বজয়ী। সহজ বাংলায় বলতে গেলে অন্য যে কোন দলের কাছে তারা ছিল অজেয়। এমনটা হবেই বা না কেন সে সময়কার স্প্যানিশ দলটা ছিল রিয়াল – বার্সার খেলোয়াড়ে ঠাসা। ঐ দুটো দলই তখন ক্লাব ফুটবলে পুরো বিশ্বে ছড়ি ঘুরাচ্ছে। কিন্তু “অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট” বলে একটা থেকেই যায়। এক্ষেত্রে তৎকালীন স্পেন বস ভিসেন্তে দেল বস্ককে আমি পুরো কৃতিত্বটা দেই। এত এত তারকায় ভরা দলটাকে তিনি ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। তার প্রমাণ পর্যায়ক্রমে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের আসর তথা ইউরো, এরপর বিশ্বকাপ এবং এরই ধারাবাহিতায় ফ্রান্সের মতো ইউরো – বিশ্বকাপের পর আবারও ইউরো জয়।
 
প্রশ্নটা এখন আসতেই পারে যে, পেশাদারিত্বের কথাই যদি বলব তবে ফুটবলীয় সাফল্য নিয়ে এত কথা কেন? এই বিষয়টা তো অন্যভাবেও দেখিয়ে দেওয়া যেত। হুম, তা যেত বটে। তবে সেক্ষেত্রে যে প্রশ্ন উঠতে পারত যে একটা ফুটবল টিম যদি ট্রফিই না পেল হাতে এসব পেশাদারিত্ব কি তবে মুড়ি – মুড়কি বানিয়ে ভেজে খাওয়ার জন্য। তাই তাদের সাফল্য নিয়ে এতটা কথা বলা।
 
যে রিয়াল – বার্সার খেলোয়াড়দের এখন তাদের ত্রাতা বলে মনে হচ্ছে তারাই আবার হতে পারত বুমেরাং। যে সময়টাতে স্প্যান বিশ্বকাপ জিতল মানে ২০১০ এর কথা বলছি আমি। তখন এল ক্লাসিকোতে ফুটবল হতো কম আর আর কুস্তি হত বেশি। বার্সার ম্যানেজার তখন পেপ (জোসেফ) গার্দিওলা। অন্যদিকে রিয়ালের হোসে মরিনহো – দি স্পেশাল ওয়ান। প্রতিটা এল ক্লাসিকোতে পায়ের খেলা ফুটবলের চেয়ে হাতের খেলা কুস্তিই বেশি চোখে পড়ত। রামোস-পিকে-পুয়োলদের ঐ সময়কার ধস্তাধস্তির ব্যাপারটা তখন ফুটবলপ্রেমীদের নিত্যদিনের হাসির খোরাক। ঠিক এমন একটা সময় বিশ্বকাপের বাঁশিটা বেজে উঠল। স্পেন দলেও তখন দলীয় কোন্দলের গুঞ্জন।
 
তারপর?
এর পরের কাহিনীটা কেবল দিগ্বিজয়ী হওয়ার। এই সাফল্যের অন্যতম নিয়ামক তাদের ঐ “পেশাদারিত্ব”। তার ছাপ পাওয়া বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সার্জিও বুসকেটস এর কণ্ঠে, “ডন (আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা) যখন অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে এসে গোলটা দিল ঠিক তখনই সবাই পাগলের মতো ছোটাছুটি শুরু দিল। আমি অনেকটা নিচের দিকে খেলছিলাম। বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে কি করব। পেছন ফিরে দেখলাম যে ইকার একাই হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছে। আমি তাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম আর সেও আমাকে।” এটা নিছকই ঐ মুহূর্তের বিশ্বকাপ জয়ের উন্মাদনা – এমনটা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, আমি বলব পেশাদারিত্বই সেই জাদু যা তাদের মন – মগজে বদ্ধমূল ছিল। তাদের বুঝতে শিখিয়েছিল যে দেশের স্বার্থে, দলের স্বার্থে তাদের এক হওয়া উচিত। ফুটবলটা তাদের পেশা। পেশার নিমিত্তেই তাদের এটা করে দেখাতে হবে দল হিসেবে, অন্তরের রেশকে দূরে ঠেলে।
 
এখানেই শেষ?
 
না…
 
কাতালুনিয়ায় আন্দোলন শুরু হল, স্বাধীকার আন্দোলন। গণভোট হল তাদের স্বাধীনতার জন্য, অধিকার আদায়ের জন্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্যাম্প ন্যুতে বার্সার খেলা হল কিউলদের ছাড়াই। মানে গ্যালারি পুরোপুরি খালি রেখেই। এর কিছুদিন পরই ছিল স্পেন এর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের খেলা। পিকে – রামোসরা আবারও একসাথে অনুশীলনে। ক্লাব ফুটবলে যাদের দ্বন্দ্বের কথা সবারই জানা। অলিখিত চিরশত্রু তারা একে অপরের। অনুশীলন রাখা হল মাদ্রিদে। অনুশীলনে পিকেকে দুয়ো দিল দর্শকেরা । কিন্তু এবার তাদের জন্য কাল হয়ে দাড়ালেন স্বয়ং রামোস। সাফ জানিয়ে দিলেন, পিকে তার সতীর্থ। যে পিকের শত্রু সে তারও শত্রু। আবারও ঐ “পেশাদারিত্ব”। যেটা তাকে বুঝতে শিখিয়েছে যে ফুটবলটাই তার পেশা। আর ওটা একটা দলীয় খেলাও বটে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই তা খেলা লাগে। এ জায়গায় এককভাবে কিছু পাওয়াটা যেমন কঠিন ঠিক তেমনটাই বেমানান।
ভালো ফুটবল তো অনেকের কাছ থেকেই দেখলাম। তারা শিখালো ফুটবলটা কিভাবে খেলতে হয়। কিন্তু স্প্যানিশরা? ওরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে এই প্রজন্মকে শিখিয়ে দিয়ে গেল কিভাবে ফুটবলটাকে একটা পেশা হিসেবে নিতে হয়। শিখাল কিভাবে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে মানুষের মনোরঞ্জন করে নিজের লক্ষ্যটাও অর্জন করে নেওয়া যায়। কুর্নিশ করলাম স্পেন কে, তাদের ফুটবলকে, তার চেয়েও বেশি তাদের পেশাদারিত্বকে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

19 − fifteen =