স্পার্সের ট্যাকটিকসের সাথে কিরকম মানিয়ে নেবেন সিসোকো?

দলবদলের শেষ দিনে হাজারো নাটক করে নিউক্যাসল ইউনাইটেড থেকে টটেনহ্যাম হটস্পারে নাম লিখিয়েছেন ফরাসী মিডফিল্ডার মুসা সিসোকো, ৩০ মিলিয়ন পাউণ্ডের বিনিময়ে। এভারটনে প্রায় যোগ দিয়ে ফেলা এই মিডফিল্ডারকে দলবদলের বাজার শেষ হবার মাত্র দুই মিনিট আগে দলে আনতে সক্ষম হয় মরিসিও পচেত্তিনোর দল। সাধারণত ২৫ বছরের উর্ধ্বে কোন খেলোয়াড়কে কেনার জন্য ১৫ মিলিয়ন পাউণ্ডের থেকে বেশী দিতে না রাজী থাকা স্পার্সরা এবার নিজেরাই নিজেদের এই নীতি থেকে সরে এসেছে, চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল লেভী একেবারে শেষ মুহূর্তে পূরণ করেছেন কোচ পচেত্তিনোর খায়েশ, ৩০ মিলিয়ন পাউণ্ডের বিশাল অংকে সিসোকো এসেছেন স্পার্সে। প্রশ্ন হল, আসলেই কি সিসোকো এত কাঠ-খড় পোড়ানোর মত যোগ্য কোন খেলোয়াড়?

শেষদিনে টটেনহ্যামে এসেছেন মুসা সিসোকো
শেষদিনে টটেনহ্যামে এসেছেন মুসা সিসোকো

বেশ কয়েকবছর ধরেই টটেনহ্যামে ভালো মিডফিল্ডারের কোন অভাব নেই। গত কয়েক বছরে রাফায়েল ভ্যান ডার ভার্ট, লুকা মডরিচ, গ্যারেথ বেল, ক্লিন্ট ডেম্পসি, স্কট পার্কার, গিলফি সিগুর্ডসনের মত ক্লাসি মিডফিল্ডাররা খেলে গেছেন, টটেনহ্যামের বর্তমান স্কোয়াডের মিডফিল্ডেও রয়েছে প্রতিভার ছড়াছড়ি। আছেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলে বর্তমানে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পজিশানে নতুন ভরসা এরিক ডায়ার,  আছেন আরেক নতুন প্রতিভা ডেলি আলি। সাথে বেলজিয়ান মুসা ডেম্বেলের মত প্রতিভাবান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ত আছেনই। আছেন পচেত্তিনোর তত্ত্বাবধানে একরকম নিজেকে খুঁজে পেয়ে প্রতিভার স্ফূরণ ঘটানো আর্জেন্টাইন উইঙ্গার এরিক লামেলা, আর ডেনমার্কের বর্তমানে সবচাইতে বড় সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন ত আছেনই। প্রশ্ন হল এদের মধ্যে কিভাবে লড়াই করে মুসা সিসোকো মূল একাদশে নিজের জায়গা করে নিতে পারবেন। বা, আদৌ পারবেন কি।

সিসোকোর প্রতিভা নেই, বলছিনা সেটা। তবে যে খেলোয়াড় ক্লাবের হয়ে গত মৌসুমে মাত্র এক গোল করেছেন, সেই খেলোয়াড়ের জন্য ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড পেয়ে নিউক্যাসলের মালিক মাইক অ্যাশলি যে সেইন্ট জেমস পার্কে আনন্দে উদ্বাহু হয়ে লাফাচ্ছেন না, সেই গ্যারান্টিই বা কে দিচ্ছে? তাও আবার ড্যানিয়েল লেভীর মত তুখোড় এক নেগোসিয়েটরের কাছ থেকে, যার কাছ থেকে বেশী মূল্যে খেলোয়াড় গছিয়ে দেওয়া একরকম অসম্ভবই বলা চলে!

moussa-sissoko

তবে ফুটবল শুধু গোলের খেলা নয়, সেটা বোঝেন পচেত্তিনো। বোঝেন বলেই বোধকরি শেষদিনে এতবড় একটা বাজী ধরার সাহস পেয়েছেন। গোল একটি হলেও, গত মৌসুমে নিউক্যাসলের হয়ে ৫৬ টি গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন সিসোকো – যা এভারটনের রস বার্কলি (৫৫), সতীর্থ জিওর্জিনিও ভাইনাল্ডাম (৪৮), ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ওয়েইন রুনি (৪২) ও ম্যানচেস্টার সিটির রাহিম স্টার্লিং (৩৫) এর থেকে বেশী। সিসোকোর বর্তমান সতীর্থ মুসা ডেম্বেলে যেখানে টেইক-অন করেছেন ৮৩ বার, সিসোকো করেছিলেন তাঁর থেকে একবার বেশী। গত তিন মৌসুমেরটা হিসাব করলে সিসোকো গোলের জন্য থ্রু বল দিয়েছেন ১৮ বার, যা কিনা চেলসির ইডেন হ্যাজার্ড (১৬) ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ওয়েইন রুনির (১৩) চাইতে বেশী। আর গত তিন মৌসুমে তাঁর ১৫ অ্যাসিস্ট ত ম্যানচেস্টার সিটির ইয়ায়া ট্যুরে (১৪), লিভারপুলের অ্যাডাম লালানা (১৪), চেলসির অস্কার (১৩), সোয়ানসি সিটির গিলফি সিগুর্ডসন (১২) ও আর্সেনালের থিও ওয়ালকটের চাইতে বেশী (৬)।

গত মৌসুমটা ক্লাবের হয়ে সেরকম ভালো না কাটার ফলে সিসোকো জানতেন, এবারের ইউরোতে যদি তিনি ভালো না করেন তবে তাঁর কপালে দ্বিতীয় বিভাগে সেই বার্নসলি, হাডার্সফিল্ড টাউন – এদের বিপক্ষে খেলাই আছে, পূরণ হবেনা চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার স্বপ্ন। তাই ইউরোটাকে নিয়েছিলেন নিজেকে প্রমাণ করার মঞ্চ হিসেবে, আর সেক্ষেত্রে তিনি শতভাগ সফল। ফ্রান্সকে ফাইনালে তোলার পেছনে সিসোকোর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। সতীর্থ দিমিত্রি পায়েত (৮৪%), পল পগবা (৮৮%) ও আতোয়াঁ গ্রিজমানের (৮২%) চেয়ে সফল পাস দেওয়ার হার ছিল তারই বেশী (৮৯%)। পর্তুগালের কাছে ইউরো হাতছাড়া হয়ে গেলেও এই সিসোকোই ছিলেন ফাইনালের ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। ইউরোর পারফরম্যান্স দেখে তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদের মত ক্লাবও। বলা হচ্ছিল, মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ নিজেই আগ্রহী সিসোকোকে দলে নিয়ে আসার জন্য।

ফাইনাল হারলেও পর্তুগালকে এরকম নাচিয়ে ছেড়েছিলেন সিসোকো
ফাইনাল হারলেও পর্তুগালকে এরকম নাচিয়ে ছেড়েছিলেন সিসোকো

যাই হোক, এবার চ্যাম্পিয়ন লীগ খেলছে স্পার্সরা। আর চ্যাম্পিয়নস লীগে খেলতে গেলে অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের খেলোয়াড় থাকা লাগে দলে, যাদের সাহায্যে ভিন্ন ভিন্ন ট্যাকটিকসে ম্যানেজার দল সাজাতে পারেন। এবং এই ক্ষেত্রেই সিসোকো টটেনহ্যামের অন্যান্য মিডফিল্ডারের তুলনায় আলাদা। ফরাসী ক্লাব তুলোঁতে যখন খেলতেন, পুরোদস্তুর ডেস্ট্রয়্যার সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন। খেলতে পারতেন বক্স-টু-বক্স সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবেও। কিন্তু নিউক্যাসলে আসার পর থেকেই ম্যানেজার অ্যালান পার্ডিউ তাঁকে রাইট উইঙ্গার বানিয়ে দেন, মিডফিল্ডের ডানদিকে খেলানো শুরু করেন। কিন্তু ঐ যে, মূলত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হলে যা হয়, খেলার মধ্যে একটা রক্ষণশীল একটা স্টাইল থেকেই যায়। সিসোকোকে তাই একটা মোটামুটি ডিফেন্সিভ উইঙ্গারই বলা যেতে পারে। দৌড়াতে পারেন অবিরাম, ফলে উইংয়ে যদি পচেত্তিনো তাঁকে খেলান তবে স্পার্সের রাইটব্যাক কাইল ওয়াকারের সামনে আরেকজন থাকবেন যে কিনা ওয়াকারকে ডিফেন্সের ক্ষেত্রেও সহায়তা করতে পারবেন রাইট উইংয়ে খেলার পাশাপাশি। আবার সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেললে মুসা ডেম্বেলের সাথে মুসা সিসোকোর জুটি গড়ার একটা সুন্দর অপশান থাকছে কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর সামনে। মুসা ডেম্বেলে হোক কিংবা ভিক্টর ওয়ানিয়ামা, স্পার্সের এই দুই মিডফিল্ডারই যথেষ্ট ধীরগতির। সেক্ষেত্রে মুসা সিসোকো ইঞ্জিনের মত অবিরাম ছুটে যেহেতু চলতে পারেন, সেহেতু সেটাও স্পার্সের গেইমপ্লে তে একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে।

টটেনহ্যামের স্কোয়াডে সিসোকোর আগমন কিরকম ফল বয়ে আনবে, সেটা দেখার জন্য তাই মৌসুম শেষ হবার অপেক্ষাই করতে হবে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

ten − 8 =