সৌম্যকে নিয়ে কি একটু বেশীই বাড়াবাড়ি করে ফেলছি না আমরা?

ওয়ানডে এর হিসাবে আসি আগে। কারণ আমরা এমনিতেই টেস্ট খেলি কালেভদ্রে। সদ্যসমাপ্ত ইংল্যান্ড সিরিজের আগে আমাদের শেষ কয়েকটা ওয়ানডে সিরিজ ছিল আফগানিস্তান, জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে।

সবার প্রথমে পাকিস্তান সিরিজ। প্রথম দুই ম্যাচে আশানুরূপ পারফর্ম করতে পারলেন না ওপেনার সৌম্য সরকার। তিন চারে ৩৬ বলে ২০ রান করে ওয়াহাব রিয়াজের থ্রোতে রানআউট হয়ে সাজঘরে ফিরে যান তিনি, দ্বিতীয় ম্যাচে দুর্দান্ত শুরু করলেও ১১ বলে ৪ চারে ১৭ রান করেই থামতে হয় তাঁকে জুনাইদ খানের বলে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়ে। পরের ম্যাচেই দুর্দমনীয় সৌম্য। হাফিজ, রিয়াজ, গুল, জুনাইদদের কচুকাটা করে ১৩ চার আর ৬ ছক্কায় ১১০ বলে সাজানো ১২৭ রানের ইনিংসটায় দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়লেন।

এইবার দেশে আসলো ভারত। আমাদের দেশের অনেক কন্সপিরেসি থিওরিস্টদের বর্তমানে অন্যতম পছন্দের থিওরী হল কলিকাতার দাদাবাবুদের সন্তুষ্ট করার জন্য সৌম্যকে দলে রাখা হয়, “ফর্ম না থাকা” সত্বেও, হিন্দু কোটায় কাউকে রাখতে হবেই তাই সৌম্য আছে দলে। তা যাই হোক, সৌম্যকে যদি সেই কোটাতেই দলে সুযোগ দেওয়া হত তাহলে নিজের “প্রিয়” ভারতের বিপক্ষে ত তাঁর কোন রানই করার কথা না। প্রথম ম্যাচে যেন সেই আগের ফর্মই ধরে রাখলেন, সুরেশ রায়নার থ্রো তে রানআউট হবার আগে খেললেন ৪০ বলে ৫৬ রানের ঝড়ো আরেক ইনিংস। দ্বিতীয় বা তৃতীয় ম্যাচে ফিফটি বা সেঞ্চুরির দেখা পেলেও ৩৪ বা ৪০ রানের ইনিংসগুলোও কিন্তু তাঁর ফর্মে থাকারই ইঙ্গিত বহন করে। কনস্পিরেসি থিওরিস্টরা কি বলবেন এখন?

ভারত গেল, আসলো প্রোটিয়ারা। প্রথম ম্যাচে ২৭ রানের ইনিংস খেললেন সৌম্য, সাকিব নাসির আর তিনি ছাড়া গোটা দলই সেই ম্যাচে যাচ্ছেতাই খেলে ১৬০ রানে আউট হয়েছিল, তাই সেই ইনিংসটাকেও খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই। পরের দুই ম্যাচেই আবার দুর্দমনীয় সৌম্য। দুই ম্যাচেই সামান্যর জন্য মিস করলেন সেঞ্চুরি, দুই ম্যাচেই স্ট্রাইকরেট একশ’র উপরে রেখে মরকেল, রাবাদা, তাহিরদের উপরে কি অথরিটির সাথে ছড়ি ঘুরিয়েছেন তিনি!

যেই খেলোয়াড়টার শেষ কয়েকটা ম্যচেই এরকম দুর্দান্ত কিছু ইনিংস আছে, কিভাবে আমরা তাঁর নামে ঘন্টার পর ঘন্টা কোন ধরণের লজিক ছাড়াই সমালোচনা করে যেতে পারি আমার জানা নেই। প্রোটিয়া সিরিজের পরেই একটা বিশাল গ্যাপের পর আফগানিস্তানের সাথে খেলেছি আমরা। মাঝের জিন্মবাবুয়ে সিরিজটায় সৌম্য খেলেননি। মানুষ পারলে আফগানিস্তান সিরিজের দল থেকেই সৌম্যকে বাদ দিয়ে দেয়। কেন? সর্বশেষ ম্যাচগুলোতে তাঁর ৮৮,১২৭,৯০,৫৪ রানের ইনিংসগুলো কি তাঁর যোগ্যতা ও ধারাবাহিকতার মাপকাঠি নয়? এরপর আফগান সিরিজে খারাপ করলেন সৌম্য, মানুষ ত এবার নিজেদের ক্লেইমের পক্ষে যুক্তি পেয়ে গেল যে হ্যাঁ, আসলেই সৌম্যর বাদ পড়ার সময় হয়েছে! কেন? ম্যাচের পর ম্যাচ আপনারা সেঞ্চুরি আর ফিফটির ফুলঝুরি চান সৌম্যর কাছ থেকে? এরকম ত মনেহয় বিরাট কোহলি কিংবা স্টিভেন স্মিথ কিংবা হাশিম আমলাদেরও সামর্থ্য নেই! কই এক ম্যাচ খারাপ খেলার পর তাদের নিয়ে ”গেল গেল” রব ওঠে?

বলতে পারেন, আফগান সিরিজের আগে সৌম্য সবশেষ ওয়ানডে খেলেছে ১৩ মাস আগে। বাংলাদেশ দলও কিন্তু সবশেষ ওয়ানডে খেলেছে ৯ মাস আগে আফগানিরা আসার আগে। এটা কি এখন সৌম্যর দোষ না আমাদের ম্যানেজমেন্টের দোষ? আফগান সিরিজের আগে ওয়ানডেতে তামিম ও সৌম্য মাত্র ১০ ইনিংস ওপেন করেছেন। এতেই ৩টি সেঞ্চুরি জুটি। জুটির গড় ৫৪। অবশ্যই সবটুকু ত তামিম একা করেননি তাই না? তাহলে সৌম্যকে নিয়ে এত কাটাছেঁড়া কেন? মোটামুটি নিয়মিত পারফর্ম করে যাওয়ার পরেও যদি চব্বিশ ঘন্টা সমালোচনার কাঁচির নিচে থাকা লাগে, কনফিডেন্স লেভেল নামতে কতক্ষণ? আর কনফিডেন্স লেভেল নামলে (যেটা কিনা আফগান সিরিজেই দেখা গেছে সৌম্যর ক্ষেত্রে) সেটার দায় কি সৌম্যর, না যারা চব্বিশঘন্টা কারণে অকারণে তাঁকে সমালোচনার টেবিলে রাখেন তাদের? সারাক্ষণ সমালোচনা হতে থাকলে আপনি নিজে রেগুলার পারফর্ম করতে পারতেন ত? এত বেশী সমালোচনা, এত বেশি প্রশ্ন তুললে যা হয়, ওই ব্যাটসম্যানের নিজের মনেও সংশয় ঢুকে যায় অনেক সময়। বাজে ফর্ম নিয়ে টানা প্রশ্ন শুনতে শুনতে সৌম্যর মনেও হয়ত নিজেকে নিয়ে সংশয়ের বীজ ঢুকে গেছে। যেটা খুব ভালো কিছু নয়!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eleven − 5 =