সোলমেট!

“You will never find the right person,if you never let go of the wrong one”.
অনেকক্ষণ খানাতল্লাশি করার পরে নামবিহীন এই কহন খুজে পেলাম। ক্ষণস্থায়ী জীবনের কিছুটা হলেও চলে যায় দ্যা রাইট ওয়ানের পর্যেষণাতে।ক্রিকেটারদের জীবনসঙ্গিনী বাদেও আরেকজন মনের-প্রাণের সত্ত্বা থাকে। সেই দুজনের সৃজনে হয় অনেক ট্যাংগো।

উপজেলা শহরগুলোতে ২০০০ সালের গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যা মানে লোডশেডিং। প্রপঁচিত আকারের লোডশেডিং। বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে থাকা হতো সরকারি কোয়ার্টারে। এই বাসাগুলোর একটা প্রাতিস্বিক বৈশিষ্ট্য ছিলো বিশাল এক বারান্দা। অনায়াসে ছোটোখাটো পরিসরের লৌকিকতাবর্জিত আটপৌরে এক-দুটো ক্রিকেট ম্যাচ চাইলেই খেলা যেত। সকালবেলায় শুরু হওয়া স্কুল মাঝে দুপুরে মায়ের বকুনি-প্রহারের ভয়ে বা সুকৌশলে চোখের পাপড়ি আখোলা অবস্থায় আবশ্যকীয় নিদ্রার পরে আসতো মাহেন্দ্রক্ষণ। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে সবচেয়ে শ্রেয় সময় বিকাল,আরো সুস্পষ্ট করে বললে ক্রিকেট খেলার বিকাল। প্রাত্যহিক বিকালে এরোপ্লেন বলের উপরে ওসাকা সাদা রঙ্গের টেপ মোড়ানো আমাদের নতুন বলে সবসময় করতে চাইতাম পাঁড়ার ক্রিকেটের প্রথম ওভার। নিজেকে শোয়েব আখতার বা অ্যালান ডোনাল্ড ভাবাই যার একমাত্র হেতু। বিপক্ষ দলের আসাদ ভাই আমার দুর্দান্ত কোনো ইয়র্কার বা আমার সহপাঠী অপুর নেয়া অপার্থিব ক্যাচে আউট হবার পরে গালিগালাজের সহিত সব দোষ দিতেন তারই বন্ধু রিয়াজ ভাইয়ের কয়েকদিন আগে কেনা ‘কোকাবুরা’ ব্যাটের। একাজ যে শুধু উনিই করতেন না কিন্তু নাহ। মাঠের পাশের বিল্ডিংয়ের তিনতলায় বেড়াতে আসা ইলা আপুকে নিজের ক্রিকেটীয় নৈপুণ্য দেখাতে বা নিতান্তই আবেগের বশিভূত হয়ে ক্রিজ থেকে বেরিয়ে ছক্কা হাকাতে গিয়ে বাউন্ডারি লাইন থেকে অন্তত দশ-পনের হাত ভিতরে ক্যাচ আউট হতাম। এরপর যে কাজটা সবার আগে করতাম সেটি ছিলো তিনতলার বারান্দায় তাকানো।আকাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তি দাড়িয়ে থাকলে গলার সব জোর দিয়ে বলতাম ব্যাটটাতে হিটিংপেপার নাই, নাইলে এই বল নিশ্চিত ছক্কা হয়। হিট পেপার নেই বলে যতদোষ ব্যাটঘোষ উপাধি পাওয়া উইলোটি কিন্তু আমার নিজেরই ভীষণ আবেগের এমআরএফ।শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের ব্যাট।এই ব্যাট হাতে নিয়ে ক্রিজে দাঁড়ালেই তো শচীনের ফ্লিক,স্ট্রেইট ড্রাইভ আর হেনরি ওলোঙ্গাকে মারা দর্শনীয় ছক্কাগুলোর ত্তজস্বিতা আধিদৈবিকভাবে আমার হাতে চলে আসার কথা। এ ধরনের কিছুই ঘটেনি সেদিন,আসলে ঘটে কোনোদিনই।কিন্তু একটা জিনিস ছিল নিত্যকার ব্যাপার,সেটা হলো একবারের জন্যে হলেও আউট হবার কারণে ব্যাটটিকে গালি দেয়া।
ব্যাট আমাদের জন্যে বিশেষ একটা জিনিস।সেটা পাঁড়ার ক্রিকেটের ওপেনার থেকে শুরু করে অভিজাত দলের এগারো নাম্বার বা সেঞ্চুরি হাঁকানো টু-ডাউনে নামা ক্লাসি ব্যাটসম্যানের জন্যে পানি-টানা খেলোয়াড়টির জন্যেও সমান আবেগের।এমনই নিগূঢ় জ্ঞাতিত্ব আমাদের মধ্যে।খেলা চলাকালীন তো বটেই, বাউন্ডারি লাইনের পাশে বসে কত আলাপালোচনা এই ব্যাটকে নিয়ে।ফাইন্ডিং দ্যা রাইট ওয়ান।
আচ্ছা ক্রিকেট ব্যাটটাকে যদি ব্যাটসমানদের সোলমেট বলি তাইলে কি অন্যায় হবে? না অনেকক্ষণ স্বগোতক্তির পরে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম যে ব্যাট অবশ্যই সোলমেট।আর এই বিশেষ সোলমেটের খোঁজে ক্রিকেটাররা পেশাদার জীবনের কম সময় ব্যয় করে নাহ।কেউ দ্রুতই পেয়ে যায়, কারো বা লাগে কিঞ্চিৎ বেশি সময়।ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি রিকি পন্টিং মানেই কোকাবুরা। ক্যারিয়ার শেষও করেছেন কোকাবুরাতেই।তাইলে এই কোকাবুরা ব্র‍্যান্ডের ব্যাটই পান্টারের সোলমেট।পান্টার খুজেও পেয়েছেন ক্রিকেটীয় জীবনের শুরুতেই।আমাদের সাকিব আল হাসানের হাতে চেপেছে পাকিস্তানি এএস,সিএ আর এখন এসজি।এএস,সিএতে বেশ কিছু স্মরনীয় ইনিংস খেলেছেন বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার।আমরা তো বটেই খোদ সাকিবের কাছেই সবচেয়ে প্রিয় ব্যাট কোনটি? ২০১৯ বিশ্বকাপ মাতানো এসজি! যেটিকে নিলামে তুলেছেন করোনায় আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে।এমন প্রিয়, আবেগী জিনিস নিলামে তুলতে বড়ো মনের মানুষ হতে হয়।আচ্ছা শচীনকে যদি জিজ্ঞাসা করি কাকে বেশি ভালোবাসেন;অঞ্জলি নাকি এমআরএফ?হলফ করে বলতে পারি অঞ্জলি শচীনের অর্ধাঙ্গী হলেও সোলমেট কিন্তু এমআরএফই।কী করেননি লিটল মাস্টার এই জীবনে। তার প্রত্যেকটি রেকর্ডের অংশীদার এই ব্যাট।এমন জিনিসটাকে নিয়মিত পূজো করা যায়।
আচ্ছা ব্রায়ান লারা যে ব্যাট দিয়ে ৩৭৫ এবং ৫০১* করেছিল সেই গ্রে-নিকোলস কি তার সোলমেট নাকি এমআরএফের ৪০০ করা ব্যাট!!এর উত্তর স্বয়ং লারা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়।

ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরাতন ব্যাটটি ১৭২৯ সালের। লন্ডনের দ্যা ওভাল স্টেডিয়ামের সেন্ডহ্যাম রুমে গেলে দেখা মিলবে এই পৌরাণিক নিদর্শনের। হকি স্টিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন আকৃতি-আয়তন-ওজনের পরিবর্তনের ফসল হচ্ছে ক্রিকেট ব্যাট।ডন ব্র‍্যাডম্যান-বিজয় মার্চেন্ট-ওয়ালি হ্যামন্ড বিংশ শতাব্দীর এই তিন বিখ্যাত ক্রিকেটারের ব্যাট ছিল অনেকটা একই রকম,ওজনে হয়েছিল হালকা হেরফের। এ্যাভারেজ ব্যাটের ওজন ছিল ২ পাউন্ডের থেকে কিঞ্চিৎ বেশি।বিলি পনসফোর্ড আবার ২.৯ পাউন্ডের “বিগ বার্থা” ব্যাট ব্যবহার করেছেন। ১৯৬০ এর দিকে ক্লাইভ লয়েড,গ্রায়েম পোলাকরা আবার ৩ পাউন্ডের বেশি ওজনের ব্যাটে ছড়িয়েছে রানের বন্যা।যদিও ভারী ব্যাটে শট খেলাটা একটু কঠিন।কিন্তু ক্লাইভ লয়েড আর গ্রায়েম পোলাক তো সবার মতোন নন। ৯০ দশকের মাঝামাঝি ক্রিকেট ব্যাটে আসলো নতুন বিপ্লব।কাশ্মীরি ব্যাট জনপ্রিয় হতে থাকলো ভারতীয় উপমহাদেশে। এর আগ পর্যন্ত উইলো মানেই ব্রিটিশ। ব্রিটিশ উইলো থেকে কাশ্মীরের উইলো ছিলো বেশ হালকা, শট খেলতে সুবিধে হলেও ব্রিটিশ উইলোর মতোন টেকসই নয়। কালের বিবর্তনের সাথে সাথে হরেকরকম রেজকিতে কাশ্মীরি ব্যাটের জনপ্রিয়তা হতে লাগলো আকাশচুম্বী। পাকিস্তানি সিএ,ভারতীয় এসএস,এসজি,ব্রিটিশ জিএম & গ্রে নিকোলস বা অস্ট্রেলিয়ান কোকাবুরা এসব ব্যাটের রাজত্বই সবসময় দেখেছে ক্রিকেট। কোন ব্যাট সবার থেকে আলাদা বা সেরা সে উত্তর খোঁজা আজকের অভিপ্রায় নয়।
ব্যাটকে যেহেতু ব্যাটসম্যানদের সোলমেট বলে আখ্যা দিয়েই ফেলেছি তাই না চাইলেও রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি,ব্রেন্ডন ম্যাককালামদের প্রসঙ্গটা এসেই যায়।রিবকে ক্যারিয়ার শুরু করা মিডিওকোর রোহিত শর্মাকে সীমিত ওভারের ক্রিকেট শাসক হতে সাহায্য করেছে তার নতুন ব্র‍্যান্ডের ব্যাট। নাইকির ব্যাট থেকে এমআরএফে আসা বিরাট কোহলি বা এমআরএফ নিয়ে বলার কিছু নেই।আফটার অল এটা শচীন টেন্ডুলকারের ব্যাট।টি-২০ আসার আগেই যাদের আক্রমণাত্মক খেলা আমাদের মন ছুঁয়ে যেতে তাদের মধ্যে অন্যতম ডুয়ো হচ্ছেন গিলি আর ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। দুইজনেই যথাক্রমে কোকাবুরা এবং গান & মুর মানে জিএমে শুরু করলেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব অমোঘ ওষুধ পেয়েছেন পুমা ব্যাটে।এরকম অনেক নজির রয়েছে ক্রিকেটবিশ্বে।প্রদোষকালে এসে হলেও সোলমেটের দেখা পেয়েছেন ব্যাটসম্যানরা।
নিজের পছন্দসই ব্যাট খুজে পাওয়া ভালো জীবনসঙ্গিনী খুজে পাওয়ার থেকে কোনো অংশে কম নাহ।জীবন মানেই না জি-বাংলা না।জীবন মানে ক্রিকেট। ক্রিকেটেই জীবনের সব আনন্দ-বেদনা,হাসি-কান্না।আর আপনি এই মুদ্রার কোন পাশে মানে আনন্দ-হাসি নাকি বেদনা-কান্নায় থাকবেন তা নির্ভর করে কীসের উপর!!হ্যাঁ,ঠিক ধরেছেন, ভালো জীবনসঙ্গিনী।ক্রিকেটীয় পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাটসম্যানদের দৃষ্টিতে ভালো জুতসই ব্যাটই তার জীবনের মুদ্রার এপিট-ওপিট নির্ধারণ করে দেয়।

শুরুতে ফিরে যাই, গ্রীষ্মের লোডশেডিংময় এক সন্ধ্যায় বিশাল আকারের সেই বারান্দার রেলিং এ দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে আমার বন্ধু রনির ‘ব্ল্যাকক্যাট’ ব্যাটটি নিয়ে আশ্লেষণ-বিশ্লেষণ করেই যাচ্ছি।সেদিন বিকেলেই খ্যাপ খেলতে গিয়ে এই ব্যাটেই করেছিলাম ৮০ রানের মতোন। তবে কি পেয়েই গেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যাট।না আমি কোনো ক্রিকেটার নই। পাড়ার ক্রিকেট ছাড়া কোথাও আমার খেলা হয়ে উঠেনি।জীবনের সেরা ক্রিকেট সাফল্য বলতে ছিল স্কুল ক্রিকেটে দলের নেতৃত্ব দেয়া এবং এক ম্যাচে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ হওয়া।আমিও ঠিকই পেয়েছিলাম আমার সোলমেটের সন্ধান। যার কাহিনি শুধু রয়েছে আমার অরচিত কোনো গদ্যে বা অলস মস্তিষ্কের এক কোণে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five + five =