সে আগুন ছড়িয়ে গেলো সবখানে…

সাকিবের বলটাকে ঠেলে দিয়ে আফতাব আলম যাবো কি যাবনা ভাবতে ভাবতেই মুশফিকের হাতে বল। মুশফিক অপেক্ষা করলেন একটু, তারপর বেল উড়িয়ে দিয়ে হাসিমুখে দৌড় দিলেন সতীর্থদের উদ্দেশ্যে। আফতাব আলম তখন দৃশ্যপটেই ছিলেন না, তাকে দেখা গেলো কিছুক্ষণ পর, এমনভাবে যাচ্ছেন, মনে হচ্ছে তাকে জোর করে চলতে হচ্ছে, সুযোগ থাকলে এখানেই বসে বসে কিছুক্ষণ কাঁদতেন। তাদের সব স্বপ্ন যে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে মাশরাফি বাহিনী! যাতে বল হাতে আর নেতৃত্বগুণ দিয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আমাদের নড়াইল এক্সপ্রেস আর ব্যাট হাতে ভিতটা গড়ে দিয়েছিলো সাকিব আর মুশফিকের ম্যাচ বদলে দেওয়া শতক-জুটি। তাই শেষটা যখন মুশফিকের হাতে হয়, তখন বলতেই হয়-মধুরেণ সম্পায়েত! আর শেষ দৃশ্যে কোন আফগানের অনুপস্থিতি যেন বুঝিয়ে দিচ্ছিলো দুই দলের যোজন যোজন দূরত্বকেই।

206199

শিরোনাম দেখে অবাক হচ্ছেন? রবিঠাকুরের গানের লাইন ধার করে শিরোনাম করেছি, তার কারন, মোহাম্মাদ নবি! হ্যা, মোহাম্মাদ নবিই, বলা ভালো তার অতিকথন। ভারতের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচের আগে বলছিলেন, ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ ম্যাচের প্রস্তুতির কথা! তবে শুধু কথায় চিড়ে ভেজে না, তার প্রমাণ দেখাতেই কিনা তারা খড়কুটোর মতো উড়ে গেলো  ধোনি বাহিনীর কাছে। তার পরও মুখের জোর তাদের একটুও কমেনি। মনে হচ্ছিলো লাল সবুজের গর্জন থামানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। এসব দেখে মাশরাফির মনে কি একটুও আগুন জ্বলেনি? তা জ্বললেও মুখের কথায় না প্রমাণ করে কাজে প্রমাণ করলেন তিনি ও তার সতীর্থরা, আফগান গর্বকে ছারখার করে দিয়ে। ব্যবধান বেশি না- মাত্র ১০৫ রান।

 

বল হাতে শুরু থেকেই মাশরাফির এমন হিসেবি অগ্নিমূর্তি যে, ব্যাটিং ই ভুলে গেলেন আফগানরা। তাদের ম্যাক্সওয়েল নামে পরিচিত জাভেদ আহমদি গর্ডন গ্রিনিজের কথা মনে করিয়ে দিতে চাইলেন প্রথমেই,এক পা তুলে পুল করতে গিয়ে ফলাফল হলো, তিনি ফিরতি পথ দেখলেন বল আকাশে তুলে দিয়ে। জাজাই রুবেলের শিকার আর স্তানেকজাই মাশরাফির বলে খোঁচা দিয়ে মাহমুদউল্লাহ্‌র হাতে ধরা পড়লেন। স্কোরবোর্ড তখন অসাধারণ এক দৃশ্য দেখাচ্ছে- রানের ঘরেও তিন, উইকেটের ঘরেও তিন! এই বিপর্যয় থেকে আর মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি আফগানরা। কখনও মনে হয়নি, তারা জিততে পারে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার মতো চলেছে তাদের ইনিংসের চাকা। একশ রান পার হয়েছে ৩০ ওভারে এসে। এর মধ্যে রিয়াদের বলে রুবেলের অসাধারণ ক্যাচে একজন, আর সাব্বিরকে চ্যালেঞ্জ করে দুই রান নিতে গিয়ে আরেকজন ( সামিউল্লাহ সেনওয়ারি) ধরেছেন ফেরার পথ।এরপর এক আফগান ধরা পড়েছেন সাকিবের মায়াজালে, রিভিউ নিয়েও রুখতে পারেননি নিজের অগস্ত্য যাত্রা। মাশরাফির বলে সৌম্যর হাতে নবি ধরা পড়ার সময়ই যে সামান্য সংশয় ছিল, তাও উড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তরুণ গতিতারকা তাসকিনও উইকেট শিকারের উৎসবে যোগ দেন, আর আফগানরা থেমে যায় ১৬২ রানে।

মাশরাফি ছিলেন অসাধারণ। বল হাতে তো বটেই, অধিনায়ক হিসেবেও। তাকে পাকিস্তানি স্পিন জাদুকর আব্দুল কাদিরের মতো দাড়ির স্টাইলে মানিয়েছে ভালোই। তিনি এই তরুণ দলটার জন্য যেন নিয়ে এসেছেন অনুপ্রেরণার জাদুর কাঠি, যার ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে বাঘেরা।

 

206161

রুবেল হোসেন ছিলেন দুর্দান্ত, বল হাতে উইকেট নিয়ে তার ঐ উল্লাস ভালো জবাব ছিল ঝাঁকড়াচুলো সাপুর জাদরানের প্রতি, যিনি একটি উইকেট নিয়েছেন আর এমন উল্লাস করেছেন, যেন ম্যাচ জিতেছেন! শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থেকে ১০৫ রানের হার দেখা মনে হয় নিয়তির খেলা তার জন্য। তরুণ তুর্কি তাসকিনের গতি ভালোই ভুগিয়েছে আফগানদের, তার বাউন্সারের জবাবে এন্টেনার মতো সামিউল্লাহ সেনওয়ারির ব্যাট তুলে দেওয়া এই ম্যাচের অন্যতম প্রতীকী চিত্র।

টসে জিতে ব্যাট হাতে ২৬৭ করতে পারে টাইগাররা মূলত সাকিব আর মুশফিকের ১১৪ রানের জুটির জন্য। ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে সময়ের দাবি মিটিয়ে, আফগান বোলারদের পিটিয়ে এই দুজনের ৪৮ রান তোলাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের দিকে। মাত্র ৫৬ বলে ৭১ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে ম্যাচসেরা হয়েছেন মুশফিক, আর সাকিবও বলের সাথে পাল্লা দিয়ে রান তুলেছেন, বল হাতেও ছিলেন মিতব্যয়ী। সাকিব মুশফিকের জুটির আগে রানের জন্য হাঁসফাঁস করছিলো বাংলাদেশ। এক দুই নিয়ে খেলার অভ্যাস না করলে বড় দলের বিপক্ষে অনেক সমস্যা হবে। টপ অর্ডারে সবাই শুরু করেও টেনে নিয়ে যেতে পারেননি, এটাও চিন্তার বিষয়।

বিজয়ীর সব দোষ ক্ষমা করা যায়, এখানে কিন্তু একটু সাবধান হতেই হবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিনে অসিদের বিপক্ষে লড়াই। সেখানে এনামুলকে বসিয়ে দিয়ে সৌম্যকে শুরু করতে পাঠানো যেতে পারে, আর সাত নম্বরে খেলার মানুষ মুমিনুল না। তাকে হয় তিনে খেলাতে হবে, নয়তো দলে রাখা কেন? একটা যুক্তি হতে পারে, ব্যাটিং বিপর্যয়ের স্রোতে বাঁধ দেবার জন্য। আমাদের উইলোবাজদের অবস্থা দেখলে অবশ্য এ যুক্তিও ফেলনা নয় একেবারে।

ক্যানবেরার গ্যালারী ভরে উঠেছিলো লাল সবুজে। দিন শেষে মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটিয়েছে বাঘেরা,এটাই বড় তৃপ্তি। এবার আশা করি মোহাম্মাদ নবি নামের মুখরা মানুষটার মুখে তালা পড়বে!

Bangladesh v Afghanistan - 2015 ICC Cricket World Cup

লিখেছেন – নিশাত কাদের

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × two =