সেরা ইউরো একাদশ – গোল্লাছুটের চোখে

পর্তুগীজ রাজপুত্র ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাতে শিরোপা ওঠার সাথে সাথে পর্দা নামলো ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ইউরো ২০১৬ এর। ২৪ দলের এই টুর্নামেন্টে অনেক প্লেয়ার খেলেছেন প্রত্যাশামাফিক, আবার অনেক প্লেয়ারের জন্য টুর্নামেন্টটা কেটেছে দুঃস্বপ্নের মত। বেজেছে অনেক নতুনের আগমনী দামামা, বিশ্ব দরবারে নিজেদের আগমনী-বার্তাও প্রকাশ করেছেন অনেকেই। ২৪ দল, ৫৫২ খেলোয়াড় – এতকিছুর মধ্যে সেরা একাদশ বেছে নেওয়াটা আসলে অনেক কষ্টের। তার উপর পারফরম্যান্সের কথা মাথায় রেখে দল সাজাতে গেলে অনেক সময় ফর্মেশান ও পজিশানের কথা ভুলে গিয়ে দল সাজানো লাগে ; লেফটব্যাক পজিশানে দেখা গেল কোন রাইটব্যাককে রাখতে হয়েছে, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে হয়তোবা জায়গা হয়েছে কোন উইঙ্গারের। সবকিছু মাথায় রেখে মোটামুটি এবারের ইউরোর সেরা যে একাদশটা আমাদের কাছে মনে হয়েছে তা হল –

  • রুই প্যাট্রিসিও

ম্যাচপ্রতি ২.১২টা করে গোল হওয়া এই টুর্নামেন্টে গোলরক্ষকদের দেখানোর ছিল অনেক কিছুই। বেশ নামীদামী অনেক গোলরক্ষক পেয়েছেন ক্লিনশিট। জার্মানির গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার ত বলতে গেলে সেমিফাইনালে বাদ যাওয়ার আগে ওপেন-প্লে থেকে কোন গোলই খাননি। ওদিকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হতে দেখা যায়নি ইতালির জিয়ানলুইজি বুফনকেও। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে বের হয়ে যাওয়ার আগে ওপেন-প্লে থেকে বুফন গোল খেয়েছিলেন মাত্র একটা, গ্রুপপর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে আইরিশ উইঙ্গার রবি ব্র্যাডির কাছে, ক্লিনশিট রেখেছেন তিনটা। তিনটা ক্লিনশিট রেখেছেন বেলজিয়ামের থিবো কোর্তয় ও ফাইনালিস্ট ফ্রান্সের হুগো লিওরিসও। তবুও আমি এই ইউরোর সেরা গোলরক্ষক হিসেবে আমার একাদশে রাখবো চ্যাম্পিয়ন রুই প্যাট্রিসিওকে। পুরো টুর্নামেন্ট মোটামুটি আন্ডারডগের মত খেলে ফাইনালে রোনালদোবিহীন এক পর্তুগালকে যেভাবে তিনি আর পেপে মিলে গ্রিজম্যান-পগবাদের তোপ সামলে আগলে রাখলেন, সেটা যথেষ্টই প্রশংসার যোগ্য। টানা ৭২০ মিনিট খেলে টুর্নামেন্টে আর যেকোন খেলোয়াড়ের থেকে সবচাইতে বেশী খেলেছেন এই প্যাট্রিসিওই। ফাইনালে ফ্রান্সের ১৮ টি আক্রমণ বলতে গেলে তিনি নিজেই রক্ষা করেছেন বুক চিতিয়ে।

Rui+Patricio+Poland+v+Portugal+Quarter+Final+r0GUWn3ihX5l

  • পেপে

টুর্নামেন্টে পর্তুগালের অন্যতম আনসাং হিরো। মাথা গরম রেসলার হিসেবে পরিচিত এবার পেপে হলুদ কার্ডই দেখেছেন মাত্র একবার গোটা টুর্নামেন্টে, লাল কার্ড ত দূরে থাক। ফাইনালে তাঁর ঠান্ডা মাথার অসাধারণ পারফরম্যান্সই আটকে রাখে পায়েত-গ্রিজম্যানদের। ১২টা ক্লিয়ারেন্স করে ফাইনালের ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ ত এমনি এমনিই হন ন, তাই না? অনেকে বলবেন এই ইউরোতে পর্তুগাল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা, কেননা মূল নব্বই মাত্র একটা ম্যাচই জিতেছে তারা গোটা টুর্নামেন্টে সেমিফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে, একবার যেতে হয়েছে পেনাল্টি শুটআউটে (পোল্যান্ড), দুইবার জিতেছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে (ক্রোয়েশিয়া, ফ্রান্স)। হাঙ্গেরী ম্যাচটা ছাড়া একটা ম্যাচের যে একাধিক গোল হজম করলো না পর্তুগাল, তাঁর কৃতিত্বটা ত পেপে আর তাঁর ডিফেন্সিচ পার্টনার হোসে ফন্টে কে দেওয়াই লাগে।

101703819_epa05391138_pepe-sport-large_trans++gsaO8O78rhmZrDxTlQBjdEbgHFEZVI1Pljic_pW9c90

 

  • অ্যাশলি উইলিয়ামস

যে ওয়েলসের কথা টুর্নামেন্টের আগে কেউ মোটামুটি গোনাতেই ধরেনি, সেই ওয়েলসের সেমিফাইনালের পিছনে আসার পেছনে যে কয়েকজনের সম্মিলিত অবদান আছে, তাঁর মধ্যে অধিনায়ক অ্যাশলি উইলিয়ামসের নাম থাকবে অবশ্যই। গ্রুপপর্বে রাশিয়ার বিপক্ষে ক্লিনশিট, নকআউট রাউন্ডে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ক্লিনশিট, সুপার-ফেভারিট বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাত্র একটা করে গোল হজম করা – এগুলো মূলতঃ ওয়েলসের ডিফেন্সিভ স্ট্যাবিলিটির কথাই প্রকাশ করে জোরেশোরে। আর তাঁর পেছনে কারিগর হিসেবে অবশ্যই রয়েছেন উইলিয়ামস, চেস্টার, গান্টাররা। পুরো টুর্নামেন্টে ডিফেন্সের সর্বংসহা হয়ে থাকা বলুন, কিংবা বেলজিয়ামের বিপক্ষে ইঞ্জুরিগ্রস্থ হয়েও পেইনকিলার খেয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বুলেট-গতির হেডারের সমতাসূচক গোলটির কথা বলুন, অ্যাশলি উইলিয়ামস টুর্নামেন্টে নিজের জাত চিনিয়েছেন ভালোমতই। খেলেছেন টুর্নামেন্টে প্রত্যেকটা ম্যাচ, ৫৪০ মিনিট, আক্রমণ ‘ব্লক’ করেছেন সাতবার, ক্লিয়ারেন্স করেছেন ৪৩ বার।

56f825ea79777_GettyImages517450642

  • জ্যেরোম বোয়াটেং

সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে গ্রিজম্যানের দুই গোলে হারার আগে ওপেন-প্লে থেকে একটাও গোল খায়নি জার্মানি (ইতালির বিপক্ষে বোনুচ্চির দেওয়া গোলটা পেনাল্টি ছিল), এটাই প্রমাণ করে এবার নয়্যার-বোয়াটেং-কিমিচ-হুভেডেস-হেক্টরদের নিয়ে গড়া জার্মান ডিফেন্স কতটা শক্তিশালী ছিল। আর ইনজুরির কারণে ম্যাটস হামেলসের ছিটকে যাওয়ার পর যেরকম কর্তৃত্ব নিয়ে জার্মানির ডিফেন্সকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বোয়াটেং, তা যথেষ্টই প্রশংসার দাবিদার। কারণ জোনাস হেক্টরের এটা প্রথম বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট, জোশুয়া কিমিচ মাত্র একজন উঠতি সুপারস্টার, আর হুভেডেস অভিজ্ঞ হলেও এখনো জার্মান ডিফেন্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি।

Germany Slovakia Soccer

  • লিওনার্দো বোনুচ্চি

পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র দুই গোল খাওয়ার পেছনে ইতালির ডিফেন্স ‘বিবিসি’র (বোনুচ্চি-বারজাগলি-কিয়েল্লিনি) এর ভূমিকার কথা নতুন করে বলে দেওয়ার কিছু নেই। বোনুচ্চির কথা আলাদা ভাবে বলতে হচ্ছেই, কেননা এই ইউরোতে নিজের ডিফেন্সিভ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কেন তাঁকে ইতালির “ডিফেন্সিভ পিরলো” বলা হয় সেটার প্রমাণ দিয়েছেন বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে ইম্যানুয়েলে জ্যাকেরিনির গোলের সহায়তা করে, তাও সেই ডিফেন্স থেকে লম্বা উড়ন্ত এক পাস দিয়ে। জার্মানির বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ সমতাসূচক পেনাল্টি গোলটার কথাও কি ভুললে চলে?

FBL-EURO-2016-MATCH10-BEL-ITA

  • রেনাটো স্যানচেস

টুর্নামেন্টের শ্রেষ্ঠ তরুণ খেলোয়াড়। হিসাব করে দেখুন, রেনাটো স্যানচেস ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে তাঁর ঐ অ্যাসিস্ট কিংবা পোল্যান্ডের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ঐ গোলটা (এবং কি অসাধারণ সেই গোল!) না করলে আজকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা পেপেও কি পারতেন পর্তুগালকে এতদূর নিয়ে আসতে? টুর্নামেন্টের এক এক রাউন্ড চলে গিয়েছে, আর রেনাটো স্যানচেস কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছেন টুর্নামেন্ট শুরু আগে বায়ার্ন মিউনিখ তাঁকে দলে নিয়ে কতবড় দাঁও মেরে দিয়েছে ইতোমধ্যে!

hi-res-f3b877380c66f9e0839adab15d03f839_crop_north

  • অ্যারন র‍্যামসি

হলুদ কার্ডের খাঁড়ায় পড়ে সেমিফাইনালে না খেলতে পারলেও বাকী টুর্নামেন্ট জুড়ে র‍্যামসির অ্যাটাকিং প্রতিভার ঝলক না দেখা গেলে মনে হয়না ওয়েলস এতদূর আসতে পারত। গোটা টুর্নামেন্টে একটা গোল ও চার-চারটা অ্যাসিস্ট করা অ্যারন র‍্যামসির অনুপস্থিতি সেমিফাইনালে ওয়েলসকে যে ভালোই ভুগিয়েছে, সেটা বোঝা গেছে প্রতি মুহূর্তে। কোয়ার্টার ফাইনালে ত বলতে গেলে একাই ধসিয়ে দিয়েছেন সুপার-ফেভারিট বেলজিয়ামকে। সেটা অ্যাশলি উইলিয়ামসের গোলের জন্য নেওয়া সেই দুর্দান্ত কর্নারের জন্য হোক, কিংবা হাল-রবসন কানু ও স্যাম ভোকসের গোলসহায়তাতে হোক।

aaron-ramsey-cropped-2vxprnfylt3e1n7d8w25551lz

  • দিমিত্রি পায়েত

পুরো টুর্নামেন্টে তিন গোল ও দুই অ্যাসিস্ট। জিনেদিন জিদানকে মনে করিয়ে দেওয়া। নিজে গোল করে রোমানিয়া ও আলবেনিয়ার বিপক্ষে দলের মহাগুরুত্বপূর্ন দুটি জয় নিশ্চিত করা। ইউরো ২০১৬ তে ওয়েস্টহ্যাম অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের আগমনী-বার্তা ঘোষিত হয়েছে অনেক জোরেশোরেই। পুরো টুর্নামেন্টে সবচাইতে বেশী গোলের সুযোগও সৃষ্টি করেছেন এই পায়েত – ২৪টি। প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্টের পুরষ্কার ত তাঁর হাতেই মানায়!

download

  • গ্যারেথ বেল

ডিফেন্সে যদি অ্যাশলি উইলিয়ামস ওয়েলসের কাণ্ডারি হয়ে থাকেন, মিডফিল্ডে ছড়ি যদি অ্যারন র‍্যামসিই ঘোরান, তাহলে নিশ্চিতভাবেই এই টুর্নামেন্টে ওয়েলসের আক্রমণের একমাত্র পুরোধা ছিলেন গ্যারেথ বেল। গ্রুপপর্বে প্রত্যেকটা ম্যাচে গোল করে রাশিয়া-স্লোভাকিয়াকে হটিয়ে ওয়েলসকে গ্রুপপর্ব উৎরাতে সাহায্য করা বেলের অ্যাসিস্টও আছে একটা। পর্তুগালের বিপক্ষে সেমিফাইনাল হেরে গেলেও ম্যাচজুড়ে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করে গেছেন বেল, অনেকের মতে রোনালদোর থেকেও ভালো খেলেছেন ঐদিন বেল, তিন মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোলই বেলের সব চেষ্টায় পানি ফেলে দেয়।

Wales-v-Slovakia-Euro-2016-Group-B

  • আতোয়াঁ গ্রিজম্যান

টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ছয়টি গোল করে গোল্ডেন বুটজয়ী গ্রিজম্যান হাসতে পারেননি শেষ হাসিটা। এক ইউরোতে সবচেয়ে বেশী গোল করার তালিকায় স্বদেশী মিশেল প্লাতিনির (৯ গোল) পিছে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করা এই ফরোয়ার্ডের কৃতিত্বের সাথে যোগ করুন আরো দুটি অ্যাসিস্ট। সেমিফাইনালে বিশ্বকাপজয়ী জার্মানিকে বলতে গেলে একাই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছেন, যেমনটা একাই ছিটকে দিয়েছিলেন আয়ারল্যান্ডকে, রাউন্ড অফ সিক্সটিন থেকেই।

antoine-griezmann

  • ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

পর্তুগালের ম্যান-মারভেলাস। গ্রুপপর্বে হাঙ্গেরির বিপক্ষে বাঁচামরার লড়াইয়ে রোনালদো দুই গোল না করলে পর্তুগাল কি আদৌ গ্রুপপর্ব পার হতে পারত? অনেকের অভিযোগ থাকতে পারে গোটা টুর্নামেন্টে রোনালদো রোনালদোর মত খেলতে পারেননি। কিন্তু সেমিফাইনালে যতক্ষন তিনি নিজের মত খেলা দিলেন, তাতেই ঝলসে গেল ক্লাব-সতীর্থ গ্যারেথ বেলের স্বপ্ন। এতশত অভিযোগের পরেও গোটা টুর্নামেন্টে তাঁর তিন গোল, তিন অ্যাসিস্ট। ফাইনালে ইনজুরিগ্রস্থ হয়ে মাত্র একুশ মিনিট খেললেও বিশ্ব তখন দেখেছে এক নতুন রোনালদোকে। অধিনায়ক যে কতটা অনুপ্রেরণাদায়ী হতে পারেন, সতীর্থদের উপরে একজন সফল অধিনায়কের কতটা প্রভাব থাকতে পারে, সাইডলাইন থেকে রোনালদো মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন তা প্রতিনিয়ত। পর্তুগালকে ইতিহাসের প্রথম বৈশ্বিক কোন শিরোপা এনে দেওয়া রোনালদো নিজের নামও কি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠদের তালিকায় লেখালেন না? অবশ্যই!

3624D91000000578-3683749-image-a-35_1468225348184

সাবস্টিটিউট

– হুগো লিওরিস (গোলরক্ষক, ফ্রান্স)

– ক্রিস গান্টার (রাইট উইংব্যাক, ওয়েলস)

– লরাঁ কসিয়েনি (সেন্টারব্যাক, ফ্রান্স)

– রাফায়েল গেরেইরো (লেফটব্যাক, পর্তুগাল)

– জ্যো অ্যালেন (সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, ওয়েলস)

– টনি ক্রুস (সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, জার্মানি)

– অলিভিয়ের জিরু (স্ট্রাইকার, ফ্রান্স)

1470096_Torquay_United

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nine − 5 =