সেন্ট্রাল মিডফিল্ড সমস্যায় আর্সেনাল : দায়ী আর্সেন ওয়েঙ্গার?

সেন্ট্রাল মিডফিল্ড সমস্যায় আর্সেনাল : দায়ী আর্সেন ওয়েঙ্গার?

গতকাল আর্সেনাল বনাম ম্যানচেস্টার সিটির মধ্যকার কারাবাও কাপ (ইংলিশ লিগ কাপ) এর ফাইনাল ম্যাচে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে সিটির কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে আর্সেনাল। যারা খেলা দেখেছেন তারা আর্সেনাল এর এই হতোদ্যম অবস্থা তো দেখেছেনই, সাথে ম্যাচশেষের অনুষ্ঠানে ফুটবল পণ্ডিত, সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তী গ্যারি নেভিলের ম্যাচ নিয়ে কাটাছেঁড়া দেখে থাকলে বুঝবেন আর্সেনালের সাম্প্রতিক এই বাজে পারফরম্যান্সের কারণ কি।

নতুন বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত লিগে বোর্নমাথ, সোয়ানসি সিটি ও টটেনহ্যাম হটস্পারের কাছে হারা আর্সেনাল এফএ কাপে বাদ পড়েছে নটিংহ্যাম ফরেস্টের কাছে হেরে, আবার ইউরোপা লিগে নিজেদের মাঠেই পুঁচকে ওস্টেরসান্ডের কাছে হেরে বাজে ফর্মের ষোলকলা পূর্ণ করেছে তারা। সাথে কালকে সিটির কাছে লিগ কাপের ফাইনালে হেরে এই মৌসুমে যে একটা ট্রফি জেতার নূন্যতম সম্ভাবনা ছিল তাদের, সেটাও শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু আক্রমণভাগে অ্যালেক্সান্দ্রে ল্যাকাজেটের সাথে নতুন যোগ দেওয়া স্ট্রাইকার পিয়েরে এমেরিক অবামেয়াং, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে মেসুত ওজিলের সাথে মাত্র দলে আসা হেনরিক মিখিতারিয়ান – এত তারার মেলা থাকা সত্বেও কেন আর্সেনাল এত বাজে খেলছে?

গত দুই মাসে আর্সেনাল এর সমস্যাগুলোকে পাখির চোখ দিয়ে দেখলে সবচেয়ে মূল সমস্যা হিসেবে যা বের হয়ে আসে তা হল সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে পারফর্ম করার মত খেলোয়াড়ের অভাব। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেলানোর মত খেলোয়াড় বর্তমানে আর্সেনাল মূল দলে আছে সুইস মিডফিল্ডার গ্রানিত শাকা, ওয়েলশ মিডফিল্ডার অ্যারন র‍্যামসি, ইংলিশ মিডফিল্ডার জ্যাক উইলশেয়ার ও ক্যালাম চেইম্বার্স, মিশরীয় মিডফিল্ডার মোহামেদ এলনেনি।

এই পাঁচজনের খেলার স্টাইল বিবেচনা করলে খোলা চোখে যা পড়ে, তা হল – অ্যারন র‍্যামসি আর গ্রানিত শাকা দুইজনই মোটামুই বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার। প্রায়ই মাঝমাঠ থেকে উপরে উঠে প্রতিপক্ষের ডিবক্সে দেখা যায় তাদের। ক্যালাম চেইম্বার্সকে অনেকটা হ্যাভিয়ের ম্যাশ্চেরানোর কমদামী ইংলিশ ভার্সন বলা যেতে পারে যিনি মোটামুটি সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলার পাশাপাশি সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ও রাইটব্যাক হিসেবেও খেলতে পারেন, আর মোহামেদ এলনেনিকে আনাই হয়েছিল প্রথাগত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে, মিডফিল্ডে থেকে প্রতিপক্ষের পা থেকে ট্যাকল বা ইন্টারসেপ্ট করে বল কেড়ে নেওয়াই যার মূল লক্ষ্য। ওদিকে জ্যাক উইলশেয়ারের খেলার স্টাইল বাকী চারজনের থেকে অনেক বেশী শৈল্পিক। নিখুঁত পাস বা থ্রু বল দেওয়ার মাধ্যমে মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নিজেই গড়ে দেওয়ার ব্যাপারে বিশ্বাসী তিনি। কিন্তু র‍্যামসি আর উইলশেয়ার, দুইজনের ক্ষেত্রেই সমস্যা একটাই – দুজনই প্রচণ্ডরকমের ইনজুরিপ্রবণ আর অধারাবাহিক। র‍্যামসি আর উইলশেয়ারের ইনজুরি সমস্যাটা যে কত প্রকট সেটা বোঝার জন্য একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্ট – ২০১৫ সালের মে মাসের পর ১৫৪ ম্যাচের পরে কালকেই প্রথম সিটির বিপক্ষে একইসাথে মূল একাদশে উইলশেয়ার আর র‍্যামসি ছিলেন। অধারাবাহিক দোষটা আবার গ্রানিত শাকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উইলশেয়ার, র‍্যামসি, শাকা – তিনজনই নিজেদের দিনে বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডার ক্ষমতাও যেমন রাখেন, ফর্ম না থাকলে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য মিডফিল্ডার হতেও তাদের সময় লাগেনা।

সেন্ট্রাল মিডফিল্ড সমস্যায় আর্সেনাল : দায়ী আর্সেন ওয়েঙ্গার?
শাকার সাথে ওয়েঙ্গার

গত মৌসুমের শেষভাগ থেকে শুরু করে এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার পছন্দের ফর্মেশান হচ্ছে ৩-৪-২-১, যেখানে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেলবেন দুইজন। এখন এই দুই পজিশনে খেলানোর ক্ষেত্রে উইলশেয়ারের ক্রমাগত ফর্মহীনতা আর ইনজুরির কারণে ওয়েঙ্গারের পছন্দের খেলোয়াড় হলেন অ্যারন র‍্যামসি আর গ্রানিত শাকা। এ মৌসুমে তাই এই দুইজনই আর্সেনাল এর মূল সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলছেন। কিন্তু সমস্যা হল, দুইজনই মোটামুটি একই ধরণের মিডফিল্ডার, যা আগে বললাম, দুইজনই প্রায়ই সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকে উপরে উঠে গিয়ে আক্রমণে যোগ দিতে পছন্দ করেন, মাঝে মাঝে বক্সে উঠে গিয়ে প্রতিপক্ষের ডিবক্সের শট করতে পছন্দ করেন। দুজনের এই একই স্বভাব থাকার কারণে যে সমস্যাটা হয়, সময়মত প্রতিপক্ষের আক্রমণের সময়ে নিচে নেমে রক্ষণ করতে ভুলে যান তারা। হেলেদুলে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে নিজেদের পজিশানে ফিরে আসতে আসতেই দলের যা ক্ষতি হবার হয়ে যায়। সোয়ানসি সিটির বিপক্ষে আর্সেনাল এর হেরে যাওয়া সাম্প্রতিক ম্যাচটার দিকে লক্ষ্য করলেই এই কথাটার সত্যতা পাওয়া যায়। সোয়ানসি সিটির বিপক্ষে ম্যাচে সোয়ানসির প্রথম গোলে গ্রানিত শাকার রক্ষণকার্যে অনীহার কারণেই স্যাম ক্লুকাস গোল করে সোয়ানসিকে সমতায় ফেরান। বিষয়টা স্পষ্ট, ৩-৪-২-১ ফর্মেশানে খেলানো দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের মধ্যে একজনকে যে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজ করতে হয় (রক্ষণ আগে, আক্রমণ পরে, আক্রমণ না হলেও সমস্যা নেই) সে কাজে র‍্যামসি বা শাকা – কারোরই আগ্রহ নেই। তবে শাকার মত নিখুঁত পাস দিয়ে আক্রমণ শুরু করতে পারদর্শী একটা মিডফিল্ডার যে প্রথাগত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজ করতে সম্মত হবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। সে দোষটা বর্তায় আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের উপরে যিনি মাসের পর মাস দু’জন বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজ করে যেতে বলছেন। শাকা বা র‍্যামসি দুজনের কেউই আরেকজনকে উপরে উঠে আক্রমণে যোগ দেওয়ার সুবিধা করে দিতে নিজে ডিফেসিভ মিডফিল্ডারের কাজ করতে রাজী নন – আর এই সমস্যাটা ওয়েঙ্গারও বুঝতে নারাজ। যার ফলে নতুন বছরের শুরু থেকেই একের পর এক বাজে ফল থামিয়ে দিচ্ছে আর্সেনাল কে। প্রথাগত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে দলে যে মোহামেদ এলনেনি রয়েছেন, তিনিও চূড়ান্ত ফর্মহীন, ফলে চাইলেও শাকা বা র‍্যামসির জায়গায় এলনেনিকে খেলাতে পারছেন না ওয়েঙ্গার।

সেন্ট্রাল মিডফিল্ড সমস্যায় আর্সেনাল : দায়ী আর্সেন ওয়েঙ্গার?
র‍্যামসির সাথে ওয়েঙ্গার

মিডফিল্ডের এই সমস্যাটা মেটাতে হবে ওয়েঙ্গারকে। নাহয় আক্রমণভাগে ওজিল, অবামেয়াং, মিখিতারিয়ান বা ল্যাকাজেটের মত খেলোয়াড় থাকলেও লাভ হবেনা আর্সেনাল এর কোন।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

13 − 11 =