সুপার লিগের ষড়যন্ত্র ও উয়েফাকে বোকা বানানোর কেচ্ছা : ফুটবল লিকসের বোমা – ১

সুপার লিগের ষড়যন্ত্র ও উয়েফাকে বোকা বানানোর কেচ্ছা : ফুটবল লিকসের বোমা - ১

ইউরোপীয় ফুটবলের সাথে আমাদের সম্পর্কটা অনেক পুরনো, অনেক আবেগের। দেশের অনেকেই ফুটবলকে ভালোবাসার দরুন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, স্প্যানিশ লা লিগা, জার্মান বুন্দেসলিগা, ইতালিয়ান সিরি আ এর নানান ক্লাবকে সমর্থন দেয়, লিগ গুলো দেখে। বড় বড় ক্লাবের মধ্যকার ম্যাচগুলো ছাড়াও কখনো কখনো ছোট দলগুলোও অপ্রত্যাশিতভাবে বড় ক্লাবগুলোকে হারিয়ে দিয়ে অঘটনের সৃষ্টি করে। ২০০৪ সালে পোর্তোর চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়, ২০১৬ সালে লেস্টার সিটির প্রিমিয়ার লিগ জয়ের রূপকথা, কয়েক বছর আগে রিয়াল-বার্সার দ্বৈরথের মধ্যে অ্যাটলেটিকোর নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া – এসব মহাকাব্যগুলো রচিত হয় কেননা ফুটবল বিশ্বে এখনো বড় ও ছোট ক্লাবগুলোর মধ্যে এই সাম্যতাটা রয়েছে। এ লিগ গুলো যদি হঠাত করে বন্ধ হয়ে গিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের রাঘব-বোয়ালদের নিয়ে যদি নতুন একটা লিগ শুরু হয়, তাহলে কেমন হবে ব্যাপারটা? ফুটবলের যে রোমান্টিসিজম, সে বিষ্যটা কি থাকবে আর? এমনই এক ‘ষড়যন্ত্র’ করতে গিয়ে ‘ফুটবল লিকস’ এর কাছে ফেঁসে গেছেন উয়েফার সাবেক ও বর্তমান সভাপতি মিশেল প্লাতিনি ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো,  রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ

প্রায়ই ফুটবল খেলার হাঁড়ির গোপন খবর ফাঁস করে দিয়ে আলোচনায় আসে ফুটবল লিকস। এবার তাদের প্রতিবেদনে ফেঁসেছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সহ তথাকথিত বড় বড় সব ক্লাব। নিজেদের দেশের লিগ আর চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলা বাদ দিয়ে ইউরোপের সেরা সেরা ক্লাবগুলো নিজেদের নিয়ে “উয়েফা সুপার লিগ” খেলার পাঁয়তারা করছে, এমনই বোমা ফাটিয়েছে ফুটবল লিকস!

ভেবে দেখুন তো, কেমন হবে যদি স্প্যানিশ লা লিগা তে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার কেউই যদি না খেলে? বা জার্মান লিগে যদি না খেলে বায়ার্ন মিউনিখ? ইংলিশ লিগ থেকে যদি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, আর্সেনালের মত ক্লাবগুলো বেরিয়ে চলে আসে? সিরি আ তে যদি না খেলে তাদের সফলতম দুই ক্লাব জুভেন্টাস আর এসি মিলান? আপনি দেখবেন সেই লিগের খেলা? বা ভেবে দেখুন, এসব ক্লাবগুলো যদি চ্যাম্পিয়নস লিগও না খেলে? সেই প্রতিযোগিতা দেখার আগ্রহ থাকবে তো আপনার? এমনই এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে বলে দাবি করেছে ফুটবল লিকস, প্রায়ই ফুটবলের ভেতরকার গুমর ফাঁস করায় যারা বিখ্যাত। রিয়াল-বার্সা সহ ইউরোপের বড় বড় লিগে খেলা বড় ক্লাবগুলো নিজেদের নিয়ে ‘উয়েফা সুপার কাপ’ আয়োজন করার ষড়যন্ত্র করছে, এমন বোমাই ফাটিয়েছে তারা। এমনটা যদি হয়, তাহলে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় থাকবে ইউরোপের বিভিন্ন বড় বড় লিগ, বন্ধ হয়ে যেতে পারে চ্যাম্পিয়নস লিগও!
সেই ২০১৬ থেকে হালকা-পাতলা এই পরিকল্পনা সম্পর্কে শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু এত বিস্তারিতভাবে এবারই প্রথম এই ঘটনা ফাঁস হল। শোনা যাচ্ছে, ঘটনার মূল কুশীলব ইউরোপের সেরা ১১ ক্লাব – স্প্যানিশ লিগের রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, আর্সেনাল, লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার সিটি, জার্মান লিগের বায়ার্ন মিউনিখ, ইতালিয়ান লিগের জুভেন্টাস আর এসি মিলান, ফরাসি লিগের প্যারিস সেইন্ট জার্মেই। প্রস্তাবিত ১৬ সদস্যের ‘উয়েফা সুপার লিগ’ এর বাকি পাঁচ সদস্য হবে আমন্ত্রিত পাঁচ ক্লাব – জার্মানির বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, ইতালির ইন্টার মিলান আর এএস রোমা, ফ্রান্সের অলিম্পিক মার্শেই, স্পেনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। আর কোনোভাবে এই লিগ যদি শুরু হয়ে যায়, তাহলে হয়তো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের আর কোন অস্তিত্বই থাকবে না!
অনুমান করা হচ্ছে, ধনী ও বড় ক্লাবগুলোকে আরও ধনী ও মাঝারি-ছোট ক্লাবগুলোকে আরও শুষে নেওয়ার এই মহাপরিকল্পনা সেই ২০১৬ সালে বের হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের চার্লি স্টিলিটানোর মাথা থেকে, আমেরিকার মেজর লিগ সকারের ক্লাবগুলোর সঙ্গে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর মধ্যে প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করার ব্যবস্থা করেন যিনি। আর এই পরিকল্পনাকে সামনে রেখেই পুরো ব্যাপারটা বাস্তবায়ন করতে উঠেপড়ে লেগেছেন রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ, বায়ার্নের চেয়ারম্যান কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগের মত ইউরোপীয় ফুটবলের রাঘব-বোয়ালরা। ওদিকে ‘উয়েফা সুপার লিগ’ এর পরিকল্পনাটা বহুদিন ধরেই বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের প্রধান নির্বাহী হান্স-জোয়াকিম ওয়াতজকে। যদিও ফুটবল লিকসের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজেদের ভূমিকা অস্বীকার করেছেন রুমেনিগে। রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের বক্তব্য এখনো জানা যায়নি এই ব্যাপারে। বায়ার্ন ও রুমেনিগে ব্যাপারগুলো অস্বীকার করলেও, যা শোনা যাচ্ছে তাতে বোঝা যায় বায়ার্নের ভূমিকা এক্ষেত্রে আরও এককাঠি সরেস। এর মধ্যেই কিভাবে বুন্দেসলিগা থেকে আইনসিদ্ধ উপায়ে বের হয়ে আসা যায়, কিভাবে জার্মানি জাতীয় দল থেকে আইনসিদ্ধ উপায়ে বায়ার্নের খেলোয়াড়দের বের করে আনা যায়, যাতে তারা আর জাতীয় দলের হয়ে না খেলে শুধুই বায়ার্নের হয়ে খেলে, এ বিষয়ে বেশ খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে দিয়েছে রুমেনিগে ও তাঁর দল!
ফুটবল লিকসের প্রতিবেদনে আরও বেরিয়ে এসেছে, এই মূল ১১ ক্লাব একটা কোম্পানি গঠন করে স্প্যানিশ শেয়ার বাজারে নিবন্ধন করাবে, বিভিন্ন ভাগে যে কোম্পানির মালিকানা থাকবে ওই ১১ ক্লাবের কাছে। এই কোম্পানির সবচেয়ে বড় শেয়ার থাকবে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে (১৮.৭৭%), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শেয়ার থাকবে বার্সেলোনার কাছে (১৭.৬১%), তৃতীয় ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শেয়ারের মালিকানা থাকবে যথাক্রমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (১২.৫৮%) ও বায়ার্ন মিউনিখের (৮.২৯%) কাছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই অক্টোবরেই রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের কাছে এই সংক্রান্ত একটা ই-মেইল আসে, যেখানে ১৬ সদস্যের এই উয়েফা সুপার লিগের একটা খসড়া পরিকল্পনা পাঠানো হয়। ১১ দল থাকবে এই সুপার লিগের মূল হোতা (রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, প্যারিস সেইন্ট জার্মেই, জুভেন্টাস, লিভারপুল, এসি মিলান), বাকী ৫ ক্লাবকে আমন্ত্রণ দিয়ে নিয়ে আসা হবে এই লিগ খেলার জন্য। খসড়া পরিকল্পনায় আমন্ত্রিত ক্লাবের তালিকায় আছে জার্মানির বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, ইতালির ইন্টার মিলান আর এএস রোমা, ফ্রান্সের অলিম্পিক মার্শেই, স্পেনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। মূল ১১ ক্লাবের থাকবে না কোন অবনমিত হবার ভয়, অন্তত ২০ বছরের সদস্যপদ পাবে এই ১১ ক্লাব, অর্থাৎ ১৬ দলের এই লিগে উক্ত ১১ ক্লাবের কোন ক্লাব যদি সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থেকেও লিগ শেষ করে, তবুও তারা অবনমিত হবে না, অবনমিত হবে আমন্ত্রিত ক্লাবের মধ্যে কেউ না কেউ। আবারও নতুন মৌসুমে উক্ত অবনমিত ক্লাবের জায়গায় নতুন কোন ক্লাবকে আমন্ত্রণ দিয়ে আনা হবে এই সুপার লিগ খেলার জন্য।

এখন দেখা যাক, ফুটবল লিকসের এই বোমার পরে উয়েফা ও ফিফা তাদের সবচেয়ে বড় ক্লাব প্রতিযোগিতা ও লিগ গুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কি ব্যবস্থা নেয়!

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “সুপার লিগের ষড়যন্ত্র ও উয়েফাকে বোকা বানানোর কেচ্ছা : ফুটবল লিকসের বোমা – ১

মন্তব্য করুন

17 + 2 =