সিটির নতুন নায়ক – নিকোলাস ওটামেন্ডি

২০০৭-০৮ সালের দিকে ম্যানচেস্টারের নীল অংশে যখন আরব তেলের স্রোত আসা শুরু করল, মোটামুটি সব পজিশানেই ম্যানচেস্টার সিটি পারফর্ম করতে পারে – এরকম কিছু খেলোয়াড় পেয়েছিলো। সেটা স্ট্রাইকে সার্জিও অ্যাগুয়েরো-এডিন জেকো-কার্লোস তেভেজ হোক বা মিডফিল্ডে ডেভিড সিলভা-ইয়ায়া ট্যুরে হোক। কিন্তু ভেবে দেখলে দেখা যায় বস্তা বস্তা টাকা খরচ করলেও যে একটা পজিশানে সিটি ভালো একটা পার্টনারশিপ গড়তে পারে নি, সেটা হল সেন্ট্রাল ডিফেন্স।

বর্তমান অধিনায়ক ভিনসেন্ট কম্পানিকে যোগ্য সাহচর্য দেওয়ার জন্য সেরকম সেন্টার ডিফেন্ডার সিটি কখনই পায়নি। সেটা জ্যোলেওন লেসকট হোক, বা মাতিয়া নাসতাসিচ। রিচার্ড ডান হোক বা জেরোম বোয়াটেং। স্টেফান সাভিচ হোক বা মার্টিন ডেমিকেলিস। সবাই মোটামুটি অধারাবাহিকই ছিলেন, বা আছেন। বড় বড় ঐতিহাসিক শিরোপাজয়ী ক্লাবের যেরকম কিংবদন্তীতুল্য সেন্টারব্যাক পার্টনারশিপ থাকে একটা ; ভিদিচ-ফার্ডিনান্ড, নেস্তা-মালদিনি, বারেসি-মালদিনি, লুসিও-স্যামুয়েল, টেরি-কারভালহো, রামোস-পেপে, পুয়োল-পিকে ; সিটির সেরকম কখনই ছিল না।

এই সমস্যার সমাধান করতেই গত মৌসুমে পোর্তো থেকে বিরাট অঙ্ক খরচ করে সিটিতে আসেন ফরাসী সেন্টারব্যাক এলিয়াক্যুইম মাঙ্গালা। কিন্তু সেরকম প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন কি? না। প্রায় ৩২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে সিটিতে আসলেও মূল একাদশে জায়গা পাওয়া নিয়ে এখনো লড়াই করতে হয় তাকে। এর কারণ একটাই – তাঁর অধারাবাহিকতা, তাঁর শিশুতোষ ভুল করার প্রবণতা। ফলাফল – এই মৌসুমে ২৯ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ভ্যালেন্সিয়া থেকে আর্জেন্টাইন সেন্টারব্যাক নিকোলাস ওটামেন্ডির আগমন।

এবং এই ওটামেন্ডির আসার মাধ্যমেই সিটিতে একটা প্রভাববিস্তারকারী সেন্টারব্যাক জুটির স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে ক্লাব সমর্থকেরা। এবং সেটা নিতান্তই অমূলকও নয়।

গত মৌসুমে স্প্যানিশ লিগের সেরা সেন্টারব্যাক ছিলেন এই ওটামেন্ডি। তাঁর উপর বর্তমানে জাতীয় দল আর্জেন্টিনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভিনসেন্ট কম্পানির মাঝে মাঝে আসা ইনজুরির প্রকোপ, আর সাথে এলিয়াক্যুইম মাঙ্গালার অধারাবাহিকতা মিলিয়ে সিটির চিলিয়ান কোচ ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি নিজের ডিফেন্সের ফাঁক সারাতে তাই বেশী খোঁজাখুঁজি করেননি, চোখ বন্ধ করে নিয়ে এসেছেন ওটামেন্ডিকে। ওটামেন্ডিও অপেক্ষাকৃত ধীর স্প্যানিশ লিগ ছেড়ে পাড়ি জমান দ্রুতগতির প্রিমিয়ার লিগে।

সিটিতে ওটামেন্ডির শুরুটাও একেবারে স্বপ্নের মত হয়েছে তাও কিন্তু বলা যায় না। “মাঙ্গালা-ব্যাধি” ধরেছিল তাকেও। লিগের দ্রুততার সাথে প্রথমে অত ভালোভাবে খাপ খাওয়াতে পারেননি নিজেকে। পরে এই কয় সপ্তাহে নিজেকে লিগের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। এখন অনায়াসেই বলা যেতে পারে এই আর্জেন্টাইন এখন প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার।

গত কয়েকটা ম্যাচ পর্যালোচনা করলেই বুঝা যায় ওটামেন্ডির পরিবর্তন। গত কয়েক ম্যাচের মধ্যে দুটো ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পারফরম্যান্স ত আর এমনি এমনি আসেনি। গতসপ্তাহেও নরউইচের সাথে প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটা ম্যাচে দলকে জিতিয়েছেন ২-১ গোলে, নিজে একটা গোল করেছেন, হয়েছেন ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। নরউইচের সাথে তাঁর হেডে গোল দেওয়াটা মনে করিয়ে দিয়েছে তাঁর গোল করার অল্পবিস্তর ক্ষমতাটাকেও।

01_01003943_ee0ce8_2544857a

সেট পিসে বলতে গেলে ভয়ঙ্করই বলা যেতে পারে ওটামেন্ডিকে। গত মৌসুমে লা লিগার ডিফেন্ডারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী গোল ছিল তাঁর, এবং বলা বাহুল্য, তার অধিকাংশই এসেছিল এই সেটপিস থেকেই। বলে রাখা ভালো, সিটি অধিনায়ক ও বর্তমানে ওটামেন্ডির সেন্ট্রাল ডিফেন্স-পার্টনার ভিনসেন্ট কম্পানিও কিন্তু সেট পিস থেকে হেডে গোল করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পটু।

দুইজনের মধ্যে মিল শুধু এখানেই শেষ না। কম্পানির মত ওটামেন্ডিও বল পজেশানে রেখে খেলতে পছন্দ করেন, পাসিং প্রশংসনীয়। যেটা পেলেগ্রিনির ট্যাকটিক্সের জন্য খুবই দরকারী। এবং এই একটা কারণেই পেলেগ্রিনির কাছে মাঙ্গালার চাইতে ওটামেন্ডি বেশী পছন্দের, কারণ ওটামেন্ডির মত মাঙ্গালা অতটা বল পজেশানে রেখে খেলতে পারেন না, মাঙ্গালার কার্যকারিতা বল কেড়ে নেওয়া, ট্যাকল বা ইন্টারসেপশানে তুলনামূলক বেশী। দর্শকেরা দেখে বুঝতে পারবেন, গাঁট্টাগোট্টা চেহারার ওটামেন্ডি শারীরিক দিক থেকেও যেকোন অ্যাটাকারের সাথে পাল্লা দিতে পারবেন, ফলে যেকোন চার্জ করতে পিছপা হন না তিনি।

Vincent.Kompany1-700x367
কম্পানির মত ওটামেন্ডিও আক্রমণাত্মক ডিফেন্ডার। আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা আগে থেকে জানবেন, ওটামেন্ডি কিন্তু প্রথমেই প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারকে/অ্যাটাকারকে চ্যালেঞ্জ করতে পছন্দ করেন, আক্রমণের অপেক্ষা না করে আগেই চ্যালেঞ্জ করতে চলে যান। প্রতিপক্ষের আক্রমণের অপেক্ষা করেন না অত। যে স্বভাবটা কম্পানির মধ্যেও আছে। ডিফেন্ডিং এর এই ধরণটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কার্ড খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশী, কিন্তু ঠিকমত করতে পারলে এইধরণের আক্রমণাত্মক ডিফেন্ডিংয়ের সুবিধা অনেক। গত সপ্তাহে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষেই যেমন, এই ধরণের ডিফেন্ডিংয়ের ফলেই ইউনাইটেড স্ট্রাইকার ওয়েইন রুনিকে পুরোটা সময় ধরে বলতে গেলে পকেটেই পুরে রেখেছিলেন তিনি।

CSLNgvfW0AAYNRH

মাঙ্গালার ইনজুরিতে সুযোগ পেয়েছিলেন দলে, সুযোগটা দুহাত ভরে নিচ্ছেন ওটামেন্ডি। মাঙ্গালাকে ইনজুরি থেকে এসে ভালোই কসরত করতে হবে মূল একাদশে ঢোকার জন্য!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 × 1 =