সাকিবের সাথে বাকিরাঃ দূরের দেশে কতোটা শক্ত বাংলাদেশের স্পিন ?

১৯৯৯,২০০৩,২০০৭,২০১১,২০১৫- ৫ম বারের মত বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ । ৯৯ এ বাংলাদেশের জন্য টুর্নামেন্টটা যতোটা না পেশাদার ক্রিকেটের সবচাইতে বড় আসর ছিলো, তার চাইতে বেশি ছিলো উপভোগ করার টুর্নামেন্ট । এত বড় মঞ্চে নিজেদের নামটি দেখে উচ্ছ্বসিত হবার টুর্নামেন্ট । টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার পর দিনকে দিন জটিল হয়েছে হিসাব নিকাশ । প্রতি বিশ্বকাপে খেলতে যাবার আগে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয় বাংলাদেশ দলের শক্তি ,দুর্বলতা আর সম্ভাবনা নিয়ে । কন্ডিশন, ফ্ল্যাট উইকেট , সবুজ উইকেট এসব জটিল জটিল শব্দে জড়িয়ে পড়ে আমাদের আশা প্রত্যাশার অঙ্কগুলো ।

১৯৯৯ এর বিশ্বকাপ ছিলো শুধুই উপভোগের বিশ্বকাপ
১৯৯৯ এর বিশ্বকাপ ছিলো শুধুই উপভোগের বিশ্বকাপ

একটা জিনিস একদম পরিষ্কার রাখা ভালো । গেল এক যুগের ইতিহাসে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাফল্য বলতে যা কিছু এসেছে , তাতে সবচাইতে বড় কন্ট্রিবিউশন স্পিনারদের । আরো ছোট করে বলতে গেলে , বাঁহাতি স্পিনারদের। সেকালের রফিক আর এনামুল হক মণি থেকে শুরু করে একালের সাকিব , রাজ্জাক আর আরাফাত সানি- বাংলাদেশের ক্রিকেটের বোলিংয়ের হাইলাইটস এরাই । এর দায়টা কিছু অংশে বর্তায় ক্রিকেট সূচির উপরেও । উপমহাদেশের বাহির বলতে আমরা বুঝি দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়াকে । ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেট অনেকাংশে আমাদের মত স্লো, আবার কোনটাতে বল টার্নও করে খুব ভালো । ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের শেষ ওয়ানডে সিরিজটা কবে জানেন ?

গেল বিশ্বকাপেরও আগে ! সেই ২০১০ সালে । বিশ্বকাপের সহ আয়োজক নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ওয়ানডে সিরিজ খেলে সেই ২০০৯-১০ মৌসুমে । আর বিশ্বকাপের মূল আয়োজক অজিদের সাথে তাদের ডেরায় গিয়ে বাংলাদেশের ওয়ানডে সিরিজ খেলা তার চাইতেও আগে । ২০০৮ সালে । সেই ২০০৮-০৯ মৌসুমেই প্রোটিয়াদের সাথে শেষ ওডিআই সিরিজ খেলে বাংলাদেশ । তারমানে ব্যাপারটা কি দাঁড়াল ? আজ থেকে আরো ৫ বছর আগে ২০১০ সালে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডে খেলে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজ । আর সেটাই তাদের সবুজে খেলা সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজ । এই পুরোনো কাঁসুন্দি ঘাটার যৌক্তিকতা হলো শুধুমাত্র এই মেসেজটা দেওয়া যে, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে খারাপ খেলার দায় আপনি যতোটা সাকিব-তামিমদের দিচ্ছেন , তার চাইতে কিছু অংশে কম দিতে পারেন না বোর্ড কর্তাদের । জিম্বাবুয়ের সাথে চিরচেনা মিরপুর আর জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ওয়ানডে খেলে অমন একটা বড় টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি ঠিক কতোটা হয় , তা আমার জানা নেই ।

উপরের কাঠখোট্টা ইতিহাসের সাথে যোগ করুন দেশের ক্রিকেটের অবকাঠামোর কথা । আমাদের এখানে জাতীয় দলের পেসারেরা দল পায় না লীগে- এমন নজিরও পাওয়া যায় । তাহলে পেসার হওয়া কেন ? দিনের শেষে ক্রিকেটটা খেলোয়াড়দের কাছে রুটি রুজিরও হাতিয়ার ।

বাংলাদেশের বোলিংটাকে অনেকদিন সার্ভিস দিয়েছেন রফিক
বাংলাদেশের বোলিংটাকে অনেকদিন সার্ভিস দিয়েছেন রফিক

সেদিক থেকে অস্ট্রেলিয়াতে বিশ্বকাপ খেলতে গেলেও আমাদের দলটা আমাদের বানাতে হয় সাকিব আল হাসানের বাইরে আরাফাত সানি আর তাইজুল ইসলামের মত দুজন বাঁহাতি স্পিনারকে নিয়ে । কারণ আমাদেরকে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনের সাথে বিবেচনায় রাখতে হয়েছে বছরের পর বছর আমরা কীভাবে খেলেছি বা আমাদের জয়গুলো কীভাবে এসেছে সে ব্যাপারটাও। তাইজুল জিম্বাবুয়ের সাথে শেষ ওয়ানডেটায় করে ফেললেন হ্যাট্রিক।

তার বদৌলতে পেয়ে গেলেন অস্ট্রেলিয়ার টিকিট । কিন্তু দেশের মাটিতে অন্যদের খাবি খাওয়ানো বোলারেরা বাইরে কতোটুকু কী করতে পারেন ? তাইজুল অস্ট্রেলিয়া গিয়ে প্রথম ম্যাচে দিলেন ৭ ওভারে ৫৬ রান আর তার পরেরটায় ২ ওভার বল করেই তাইজুলের খরচা ১৯ রান । বোঝাই যাচ্ছে উড়ন্ত সূচনা পাওয়া তাইজুলের জন্য বিশ্বকাপটা পিকনিক হবে না মোটেই !
আর আরাফাত সানি জিম্বাবুয়ের সাথে প্রথম ৩ ম্যাচেই নিলেন ১০ উইকেট । সানির বোলিংটায় তাইজুলের চাইতে ফ্লাইট কম, কিন্তু আটোসাঁটো , বলের গতিটাও তাইজুলের চাইতে বেশী । আরাফাত সানির শুরুটা ভালোই বলতে হবে তাইজুলের সাথে তুলনা করলে । ক্লার্কের ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের সানি বল করলেন ৬ ওভার । তাতে দিলেন ২১ রান । তবে বাস্তবের জমানাটা তারও দেখা হয়ে গেলো পাকিস্তানের সাথে ৪ ওভার বল করে তাতে ওভারপ্রতি রান দিলেন প্রায় ৮ করে ।

ক্রিকেটীয় ব্যবচ্ছেদে গেলে আমি বলবো ২৩ বছর বয়সী তাইজুলের মূল ভরসা ফ্লাইট । তাই উইকেটে স্পিন তেমন না থাকলে বেধড়ক পিটুনি খাবার সম্ভাবনাটা থেকে যায় ভালোমতোই ।আর ৬২টা ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ আর ৭০টা লিস্ট এম্যাচ খেলা আরাফাত সানি তাইজুলের তুলনায় ১৫ থেকে ৩৫ এই মাঝের ওভারগুলোতে বলটা ফেলার জায়গাটা ভালো চেনেন । গতি আছে , সাথে যোগ করুন কিছু কিছু ডেলিভারি গতি বাড়িয়ে ভিতরের দিকে ঠেসেও দিতে পারেন ।

একটা কথা আগেই বলে নিচ্ছি স্থানীয় দুটো দলের সাথে প্রস্তুতিম্যাচ দেখে খুব সিরিয়াসলি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর রেজাল্ট লিখে ফেলার মত বোকা এই জগত সংসারে কমই আছে । তবে পুরো ইউনিটের পারফরম্যান্স একসাথে নেমে গেলে তাকে মাথাব্যাথার কারণ হিসেবে ধরতে দোষের কিছুর দেখি না ।

সাকিবের পাশাপাশি চোখটা থাকবে সানি আর তাইজুলের দিকেও
সাকিবের পাশাপাশি চোখটা থাকবে সানি আর তাইজুলের দিকেও

সবচাইতে বড় নামটা নিয়ে এখনো কথা বলা হয় নি । তার নাম সাকিব আল হাসান ।
যেকোন কন্ডিশনে দলের সবচাইতে ইকোনোমিকাল বোলার । যেকোন কন্ডিশনে দলের সবচাইতে বড় উইকেট টেকারের নামও সাকিব আল হাসান । তার সবচাইতে বড় গুণ হলো তার কন্ডিশন বোঝার ক্ষমতা আর সে অনুযায়ী নিজেকে প্রতিনিয়ত বদলে ফেলার ক্ষমতা । যে সাকিব আল হাসান মিরপুরে তার আর্মার দিয়ে দুনিয়ার যে কাউকে বোকা বানিয়ে দিতে পারেন , সেই একই সাকিব আল হাসান অস্ট্রেলিয়ায় বিগব্যাশের মত ধুমধারাক্কা টুর্নামেন্টেই একদম নতুন বলটা নিজের হাতে তুলে নেবার সাহসটা করতে পারেন । বিগব্যাশে পাওয়ারপ্লেতে আল হাসান বল করেছেন মোট ৩ ওভার । তাতে ওভারপ্রতি সাকিবের সাড়ে ৫ রানের মত খরচা ।

বিগব্যাশে সাকিব আল হাসান ৪ ম্যাচে সম্ভব সর্বোচ্চ ১৬ ওভারই বল করেছেন । সেখানে ৭ উইকেট নেওয়াতে সাকিবকে দিতে হয়েছে ৯৭ রান । সাকিব ঠিক সময়মত তার খেলাটা খেলে দেবেন । কারণ ক্যারিয়ারের প্রথম থেকেই নিজের করণীয়টা জেনে সাকিব প্রথম দিকের ওভারগুলোতে অফ আর মিডলে বল করতে পারেন , আবার স্লগ ওভারে বলটা পেলে বাইরে ব্লকহোলে ফেলে ব্যাটসম্যানকে ১ রান আর ২ রানে থামিয়ে রাখার কায়দা কানুনটা ভালোই জানেন ।

তবে আসল ফোকাসটা তার উপরেই
তবে আসল ফোকাসটা তার উপরেই

তিনজন ফুলটাইমারের সাথে আছে চারজন পার্টটাইমার । মাহমুদুল্লাহ , নাসির, সাব্বির আর মমিনুল ।
এর মধ্যে গেল কয়েকমাসে বল হাতে মাহমুদুল্লাহর সার্ভিসের কথা বিবেচনায় নিলে তাকে পার্টটাইমার বলাটা পাপ হবে । ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইট ওয়াশ করা হোম সিরিজ থেকে শুরু করে গেল জিম্বাবুয়ে সিরিজ সবসময়ই দারুন সব ব্রেকথ্রু এনে দিয়েছেন দলকে । তবে মাহমুদুল্লাহর যে জায়গাটায় ভ্রু কুঁচকাতে হয় সেই জায়গাটা সম্ভবত সবারই জানা । টানা ভালো বল করতে থাকা মাহমুদুল্লাহ আকস্মিক দিয়ে বসেন আলগা বল । সেই বাউন্ডারি খাওয়া আলগা বলটার অভিশাপে রিয়াদের ইকোনোমিটা দিনশেষে সাকিবের লেভেলে থাকে না । তবে ভালো খারাপ সবকিছু মাথায় নিয়েই পার্টটাইমারদের মধ্যে তো বটেই , পুরো দলেই সাকিবের পরে সবচাইতে ভালো ওয়ানডে স্পিনারের নাম মাহমুদুল্লাহ । স্পেশ্যালাইজড কোন স্পিনার (তাইজুল বা আরাফাত সানি) নিয়ে না খেলার প্ল্যান থাকলে সাকিবকে সবচাইতে ভালো সঙ্গটা দেবার ক্ষমতাটা মনে হয় মাহমুদুল্লাহরই সবচাইতে ভালো ।
কারণ জিজ্ঞাসা করলে আমি অবশ্যই মাহমুদুল্লাহর মুভমেন্টের কথা বলবো । কারণ মডার্ন ক্রিকেটে স্পিনারের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে । স্পিনার মানে এখন আর শুধু বড় ফ্লাইট আর বড় টার্ন নয় । স্পিনার মানে এখন আর মাঝের দিকের ওভারে বল করা নয় । স্পিনারকে এখন নতুন বলটাও সাহস করে হাতে নিতে হয় , আবার মাঝে মাঝে ক্রমাগত একটা ভালো জায়গায় বল ফেলে ব্যাটসম্যানের ধৈর্যের পরীক্ষাটাও সফলভাবে নিতে হয়।

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আনবেন আক্রমণে বৈচিত্র্য
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আনবেন আক্রমণে বৈচিত্র্য

দলের কম্বিনেশনটা কয়জন স্পিনার আর কয়জন পেসারের হবে সে ঝামেলাটা না হয় থিঙ্কট্যাঙ্কের হাতেই থাকুক । তবে একটা কথা বোঝার জন্যে ক্রিকেট পন্ডিত হতে হয় না । স্পিনারেরা তাদের জায়গা থেকে সবটুকু দিয়ে এই কন্ডিশন থেকে পুরোটা বের না করতে পারলে দিনশেষে আফসোসই সঙ্গী হবে বাংলাদেশের ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

14 − 5 =