দুঃখিত সাউথগেট, এভাবে বিশ্বকাপ জেতা যায় না!

দুঃখিত সাউথগেট, এভাবে বিশ্বকাপ জেতা যায় না!

এবার বিশ্বকাপে প্রথম থেকেই ভাগ্যের সহায়তাটা বেশ ভালোই পেয়েছিল ইংল্যান্ড। ফর্ম বিবেচনায় এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে খারাপ দুই দল পানামা আর তিউনিসিয়ার সাথে এক গ্রুপে পড়ায় মোটামুটি ইংল্যান্ডের মধ্যে এই বাস্তবিক ধারণাটা চলে আসে যে মোটামুটি নিজেদের খেলাটাই খেলে যেতে পারলে এই বিশ্বকাপে বেশ ভালো একটা ফল আনা যাবে, কে জানে, বিশ্বকাপটাই হয়তো জিতে যাওয়া যাবে!

প্রত্যেকেই জানত ইংল্যান্ডের যে দল, তাতে তাঁদের পক্ষে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব না। জানত ইংল্যান্ডও। এ জন্য প্রথম থেকেই বেশ সাবধানী আর কৌশলী ছিল যেন তারা। প্রত্যাশামাফিক তিউনিসিয়া আর পানামাকে হারিয়ে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচের আগেই দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করে ফেলে ইংল্যান্ড, গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হবার লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় এই দুই দল। কিন্তু আসলেই কি সেই ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন হতে চেয়েছিল তাঁদের মধ্যে কেউ?

বিশ্বকাপের ঘটনাপ্রবাহ দেখে এইখানেও নিজেদের কৌশলী মস্তিষ্ক খাটিয়ে ইংল্যান্ড আর বেলজিয়ামের দুই দলই জানতে পারে, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে আসলে লাভ নেই সেরকম, কেননা তাহলে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে হবে! তাই ম্যাচটা জিতার থেকে হারাটাই বেশী ফলদায়ক। ঐ যে, ট্রফিটা না জিততে পারলেও যদ্দুর পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয় আরকি!

এখানেও মোটামুটি একটা ভাগ্যের ছোঁয়া পেয়ে ম্যাচটা হেরে যায় সাউথগেট। ফলে নকআউট পর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডে কলম্বিয়া ও কোয়ার্টার ফাইনালে সুইডেনকে পায় তারা! ব্রাজিল, ফ্রান্স – এসব পরাশক্তিদের পাওয়ার থেকে সুইডেন-কলম্বিয়া পাওয়া তো তুলনামূলকভাবে বেশ ভালো ব্যাপার, তাই না?

হিসাব করে দেখুন এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড যাদের সাথেই জিতেছে, তাঁদের কাউকেই আপনি সম্ভাব্য বিশ্বচ্যাম্পিয়নের তালিকাতে রাখবেন না। আর এই বিশ্বকাপে যেসব সম্ভাব্য বিশ্বচ্যাম্পিয়নেরই মুখোমুখি হয়েছে ইংল্যান্ড, তাঁদের সাথেই হেরেছে! প্রথমে বেলজিয়াম, আর এখন ক্রোয়েশিয়া!

গ্রুপপর্বে দুর্দান্ত খেললেও সেই হ্যারি কেইনকে পরে আর হ্যারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাঁচটা গোলের মধ্যে একটা পিছনে বাড়ি লেগে হওয়া, আর বাকী তিনটা গোল পেনাল্টিতে। এটাকে ভাগ্য বলবেন না তো কি বলবেন?

বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের একটু “চ্যাম্পিয়নস লাক” কাজ করে বটে, কিন্তু তাই বলে সেটা কি এত যে ম্যাচের পর ম্যাচ সাধারণ মানের খেলোয়াড় খেলিয়ে ও তাঁর থেকেও সাধারণ মানের ট্যাকটিকসের উপর ভরসা করে বিশ্বকাপ জিতে নেওয়া যাবে? এটা ভেবে থাকলে আপনি ভুল ভেবেছেন সাউথগেট!

পুরো ইংল্যান্ড দলে কেউ অসাধারণ মানের হয়ে থাকলে তিনি একজনই – অধিনায়ক হ্যারি কেইন। হয়তোবা কিয়েরান ট্রিপিয়েরকেও বলা যেতে পারে এই বিশ্বকাপের পর। কিন্তু তাই বলে বাকী সব সাধারণ মানের খেলোয়াড়দের ট্যাকটিকাল ব্রিলিয়ান্সকে সাউথগেট এতটাই উন্নতমানের ভেবে নিলেন যে এই দলের খেলোয়াড়দের দিয়ে ৩-৪-৩, ৩-৫-২ ইত্যাদি জটিল ফর্মেশনে খেলানো শুরু করলেন। সাউথগেটের পৃথিবীতে রাইটব্যাক কাইল ওয়াকার হয়ে গেলেন সেন্টারব্যাক, আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার ডেলে আলি আর হেসে লিনগার্ড হয়ে গেলেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, পুরোদস্তুর স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনকে বানিয়ে দিলেন অনেকটা স্ট্রাইকার (নাম্বার নাইন) ও সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার (নাম্বার টেন) এর হাইব্রিড। ওদিকে রাহিম স্টার্লিং কে খেলানো শুরু করলেন কেইনেরও উপরে, অর্থাৎ কেইনের থেকেও গোল করার চাপ তাঁর উপর বেশী।

দুঃখিত সাউথগেট, এভাবে বিশ্বকাপ জেতা যায় না!
gollachhut.com

আজকের ম্যাচটার কথাই চিন্তা করে দেখুন। কেইন পুরো ম্যাচেই প্রথমে স্টার্লিং আর পরে র‍্যাশফোর্ডকে উপরে তুলে নিজে নিচে খেলেছেন। স্টার্লিং যেন পুরো টুর্নামেন্টেই গার্দিওলার স্টার্লিং না হয়ে ব্রেন্ডান রজার্সের স্টার্লিং হয়ে গিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবছর আগে লিভারপুলের কোচ রজার্স স্টার্লিংকে ফলস নাইন হিসেবে খেলানো শুরু করেছিলেন। দলে তখন লুইস সুয়ারেজ নেই, চলে গিয়েছেন বার্সেলোনাতে, ড্যানিয়েল স্টারিজ ইনজুরিতে ইনজুরিতে জর্জরিত, স্ট্রাইকারের অভাব ঘোচাতে স্টার্লিং তখন লিভারপুলের স্ট্রাইকার হয়ে খেলা শুরু করলেন। ফিনিশিং জঘন্য হবার কারণে সেই এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল হয়েছিল ভয়াবহ। সাউথগেটের অধীনে যেন সেই স্টার্লিংই ফিরে আসলো। বল ঠিকমত কন্ট্রোল করতে পারেন না, রিসিভে সমস্যা, বল পেয়েই পড়িমরি করে আগপিছ না ভেবে ছুট লাগান সামনের দিকে, এভাবে কি গোল পাওয়া যায়? এদিকে স্টার্লিংকে খামোকা উপরে খেলানোর মূল্য পরিশোধ করলেন কেইন নিজে। ডিবক্সের মধ্যে সেই ভীতিজাগানিয়া কেইনকে দেখা গেল না আর, সেই অসাধারণ ফিনিশিংগুলোও আর দেখা গেল না। সাউথগেট কেইনের গোল করার ক্ষমতার চেয়ে বল পায়ে রেখে খেলা বানিয়ে দেওয়ার গুণটাকেই বেশী প্রাধান্য দিলেন। কেইনও বাধ্য ছাত্রের মত কোচের এই তুঘলকি আবিষ্কারকে মেনে নিলেন মাথা নত করে। ফলে ভুগলো ইংল্যান্ড। কেইনকে নিচে খেলানোর আরেকটা কারণ হতে পারে, ইংল্যান্ডের অতি সাধারণ মানের মিডফিল্ড। দেলে আলি, হেসে লিনগার্ড, জর্ডান হেন্ডারসনরা প্রতিভাবান হলেও সেরকম মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করে কেউই খেলতে পারেন না ,দলের খেলার ছন্দটা গড়ে দিতে পারেন না বল পায়ে রেখে। তাও হয়তোবা তারা মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করে খেলতে পারতেন, যদি সহজ কোন ছকে সাউথগেট দলকে খেলাতেন, ৪-৪-২ বা ৪-২-৩-১ এরকম কোন ফর্মেশনে। তা না করে আন্তোনিও কন্তে, ম্যাসিমিলিয়ানো আলেগ্রি ও মরিসিও পচেত্তিনোদের থ্রি-ম্যান ডিফেন্সের কারিকুরিতে মুগ্ধ হয়ে সাউথগেট ভাবলেন তাঁর দলেও ঐ উঁচুমানে ট্যাকটিকাল ক্ষমতাসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। ৩-৫-২ তে সাধারণ মানের খেলোয়াড় দিয়ে খেলার কারণে যে জিনিসটা হল, মিডফিল্ড থেকে স্ট্রাইকের মাঝেমধ্যেই যোগাযোগটা নেই হয়ে গেল, যে কারণে কেইনকে নিচে নেমে এসে খেলতে হল। আজকে ইংল্যান্ডে উঁচুমানের কোন মিডফিল্ডার থাকলে কি এই সমস্যা হত? এইসব ফাবিয়ান ডেলফ, রুবেন লফটাস চিক-সর্বস্ব বেঞ্চ দিয়ে কি আদৌ কিছু জেতা যায়?

একটা রাইটব্যাককে ধরে বেঁধে ৩ জন সেন্টারব্যাকের একজন বানিয়ে দিলেন সাউথগেট। লক্ষ্য একটাই, দলে থাকা দুইজন ভালোমানের রাইটব্যাক ওয়াকার ও ট্রিপিয়েরের পূর্ণ সদ্ব্যবহার। তাই যদি করতে হত, তাহলে কি স্বাভাবিক ৪-৪-২ ফর্মেশনে ইংল্যান্ডকে খেলাতে পারতেন না সাউথগেট? যেখানে ডিফেন্সের ডানদিকে তাঁর পরিচিত জায়গায় থাকতেন ওয়াকার, আর “নতুন বেকহ্যাম” নামে খ্যাত কিয়েরান ট্রিপিয়েরকে বেকহ্যামের জায়গাতে তথা রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে খেলানো হত! খামোকা মূল একাদশ লিনগার্ড-স্টার্লিংকে দিয়ে বোঝাই না করে ৪-৪-২ ফর্মেশনে উপরে দুই স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন আর জেইমি ভার্ডিকে একটু একসাথে খেলিয়ে দেখা যেত না দলটা কিরকম করছে? প্রথম ম্যাচে এই কাইল ওয়াকারের জন্যই একটা পেনাল্টি হজম করে ইংল্যান্ড। এমনকি ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আজকের ম্যাচটাতেও বেশ থরহরিকম্পমান অবস্থাতেই দেখা গিয়েছে তাঁকে। ক্লাবে যে হেসে লিনগার্ড আর ডেলে আলিরা ডিবক্সের আশেপাশে খেলতে অভ্যস্ত তাদেরকে বলা হল সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হয়ে খেলে পুরো মাঠ দৌড়িয়ে মিডফিল্ডের সাথে আক্রমণের সংযোগ স্থাপন করার জন্য! যে কোচের ট্যাকটিকসের এই অবস্থা, তারা ফাইনাল খেলার আশা করে কিভাবে? ভাগ্যের উপরে ভর করে আর কত?

ভাগ্যক্রমে কিয়েরান ট্রিপিয়েরের মধ্যে একজন সেটপিস বিশেষজ্ঞ পাওয়াটাও ইংল্যান্ডের জন্য বেশ ক্ষতির কারণ হয়েছে। কর্নার, ক্রস, ফ্রি-কিকে বর্তমানে কিয়েরান ট্রিপিয়েরের মত ভালো ও কার্যকরী খেলোয়াড় খুব কমই আছে। ফলে যেটা হল, সাউথগেট এই ট্রিপিয়েরের সেটপিস দক্ষতার উপরেই চূড়ান্তমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন। হিসাব করে দেখুন, এবার হ্যারি কেইনের পেনাল্টিগুলো বাদ দিলে ইংল্যান্ডের অধিকাংশ গোলই কোন না কোন ভাবে ট্রিপিয়ের-নির্ভর। প্রথম ম্যাচে হ্যারি কেইনের দুই গোলে দুটো চোখজুড়ানো কর্নার আর ক্রসটাও তারই করা, দ্বিতীয় ম্যাচে জন স্টোনসের দুই গোলের প্রথমটার বলও এসেছে তাঁর কর্নার থেকেই, স্টোনসের দ্বিতীয় গোলের আগেও ফ্রিকিকটা ট্রিপিয়েরেরই নেওয়া। এমনকি ঐ ম্যাচের প্রথম পেনাল্টিতে হেসে লিনগার্ড যে ডি-বক্সে পড়ে গেলেন, লিনগার্ডকে আক্রমণমুখী ও ক্রসটাও ট্রিপিয়েরই দিয়েছিলেন! আর কালকে তো দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে নিজেই গোল করলেন একটা। একটা খেলোয়াড়ের সেটপিসের উপর এত নির্ভর করলে আর দলের বাকী সমস্যাগুলোর সমাধান না করলে কিভাবে ম্যাচের পর ম্যাচ এভাবে জেতা যায়?

দুঃখিত সাউথগেট, ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জিতলে হয়ত আপনাকে নাইটহুড দেওয়া হত, কিন্তু সেটা কোনভাবেই আপনাকে কৌশলী ট্যাকটিকসের কোন কোচ হিসেবে প্রমাণ করতে পারত না।

তবে একটা জিনিসের সুনাম করতেই হবে – সেটা হল সাউথগেটের ম্যান-ম্যানেজমেন্ট। সাউথগেটই এই ইংল্যান্ড স্কোয়াডের প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের মধ্য থেকে ঈর্ষা, আত্মগরিমা, স্বার্থপরতা – এটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে সক্ষম হয়েছেন, যা ইংল্যান্ডের তথাকথিত সোনালি প্রজন্মের আগের কোন কোচ (সভেন গোরান এরিকসন, ফ্যাবিও ক্যাপেলো, স্টিভ ম্যাকলারেন, রয় হজসন) করতে পারেননি। সোনালি প্রজন্মের অন্যতম কান্ডারি রিও ফার্ডিনান্ড নিজেও কটা দিন আগে স্বীকার করেছেন এই কথা। দলে থাকা ফার্ডিনান্ড, জেরার্ড, ল্যাম্পার্ড, টেরি, রুনি, কোল, স্কোলস, নেভিলদের মধ্যে আত্মম্ভরিতা এতটাই বেশী ছিল যে তারা নিজেদের ক্লাব-স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে জাতীয় দলের হয়ে ভালো খেলতে পারেননি। আর এই বিষাক্ত ভাইরাসটাই একদম সমূলে উৎপাটন করেছেন সাউথগেট।আর নতুন দিনের ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সফলতাটা এখানেই।

এখন এই সফলতাকেই ভিত্তি করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে ইংল্যান্ডকে। হয়তোবা সাউথগেট নয়, অন্য কোন ক্ষুরধার মস্তিষ্কের কোচ পেলে এই ইংল্যান্ড যে বিশ্বকাপে সফল হবে না, তার গ্যারান্টি কে দিচ্ছে?

আরও পড়ুন –

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seventeen + sixteen =