সময় শেষ রজার্সের

সকল প্রতিযোগিতা মিলিয়ে গত ১৭ ম্যাচে লিভারপুলের জয় মাত্র ৪টি, ড্র সাতটা ও পরাজয় ৬টাতে। এই সময়ে গোল করেছে তারা ১৭টি, খেয়েছে ২৬টি। এই সময়ের মধ্যে লিগে স্টিভেন জেরার্ডের শেষ ম্যাচে স্টোক সিটির কাছে তারা বিধ্বস্ত হয়েছে ৬-১ গোলে, হেরেছে ক্রিস্টাল প্যালেস আর ওয়েস্টহ্যামের মত ক্লাবের কাছে, যে নরউইচ সিটিকে আগে ৫-৬-৭ গোল ছাড়া তারা দিতই না, সে নরউইচের সাথেও কোনরকমে ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে তারা। ইংলিশ তৃতীয় বিভাগের দল কার্লাইল ইউনাইটেডকে নির্ধারিত সময়ে হারাতে পারেনি, পেনাল্টি পর্যন্ত যাওয়া লেগেছে – কোনরকমে উঠেছে কার্লিং কাপের পরবর্তী রাউন্ডে। ইউরোপা লিগের শেষ পাঁচ অ্যাওয়ে খেলায় সুইজারল্যান্ডের যে এফসি সিওন ২০ খেয়েছে, হেরেছে ৫টি ম্যাচেই, সেই সিওনের সাথেও কোনরকমে ড্র করতে হয়েছে লিভারপুলকে। এই মৌসুমে লিগে ৩০ পয়েন্টের মধ্যে পেয়েছে ১৪ পয়েন্ট। ২০১২ সাল থেকে রজার্সের আসার পরে ২৯১ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে ট্রফিশূণ্য থাকার তথ্যটা নাহয় বাদই দিলাম।

এত নেতিবাচক ফলাফলের পরেও কিভাবে লিভারপুলের মত একটা বড় ক্লাবের ম্যানেজারের চাকরি ব্রেন্ডান রজার্স ধরে রাখেন তা একটা গবেষণার বিষয়ই বটে। তবে বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, চাকরি এ যাত্রায় আর ধরে রাখতে পারছেন না বর্তমানে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা ২০ টি দলের কোচগুলোর মধ্যে আর্সেন ওয়েঙ্গারের পর সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে দায়িত্বে থাকা রজার্স। বাজছে বিদায়ঘন্টা।

এই সপ্তাহে এভারটনের সাথে মার্সিসাইড ডার্বিতে লিভারপুল জিতুক-হারুক-ড্র করুক, যাই করুক না কেন, চলে যেতে হচ্ছে রজার্স কে। এই সপ্তাহে এভারটন ম্যাচের পরেই দুই সপ্তাহের দিবানিদ্রায় চলে যাচ্ছে ক্লাব ফুটবল, আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য। এই সময়টাতেই নির্ধারিত হবে রজার্সের ভাগ্য, কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে এই সময়ের মধ্যেই চলে যাবেন রজার্স, আসবেন নতুন কোন কোচ।

শোনা যাচ্ছে, দুই সপ্তাহ আগে ওয়েস্টহ্যামের সাথে পরাজয়ের পরেই মূলত লিভারপুলের মালিকপক্ষ ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ রজার্সকে তার ছাঁটাইয়ের খবর জানিয়ে দিয়েছিল। মালিক জন ডব্লিউ হেনরি, চেয়ারম্যান টম ওয়ার্নার অপেক্ষা করছেন এখন উপযুক্ত সময়ের, যখন অফিসিয়ালি ঘোষণাটা দেওয়া যায়। কারণ তারা চাননি ডার্বির মত একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ম্যানেজারকে ছাঁটাই করে খেলোয়াড়দের ফোকাসটা নাড়িয়ে দিতে। এই জন্যই ইন্টারন্যাশনাল ব্রেকের দুই সপ্তাহ সময়টাকে কাজে লাগানো। এই কারণেই বোধহয় রজার্সও আর সিওনের সাথে ড্র করার পর মালিকপক্ষের কাছে নিজের চাকরি নিয়ে আর কোন নিশ্চয়তা চাননি। জেনে যেহেতু গেছেনই যাই হোক না কেন ছাঁটাই হতে যাচ্ছেনই, খামোকা নিশ্চয়তা চেয়ে আর কি লাভ!

কে আসবেন? সবচে বেশী জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে তিনটি নাম। এসি মিলান, চেলসি, প্যারিস সেইন্ট জার্মেই, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাসের সাবেক কিংবদন্তী কোচ কার্লো অ্যানচেলত্তি ; বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ ; আয়াক্সের বর্তমান কোচ ফ্র্যাঙ্ক ডি বোর। এই তিন কোচের কেইস স্টাডি করে দেখা যাক কার ক্ষেত্রে কতদূর এগিয়েছে লিভারপুল!

=> কার্লো অ্যানচেলত্তি

গতসপ্তাহে কার্লো অ্যানচেলত্তির ফেইসবুক ও টুইটার প্রোফাইল থেকে একটা ছবি পোস্ট করা হয়েছিল। বর্তমানে আমেরিকায় ছুটি কাটানো এই কোচ দেখা করেছিলেন বর্তমানে মেজর লিগ সকারে খেলা দুই মহীরুহ, আন্দ্রেয়া পিরলো আর ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের সাথে। বলা হচ্ছে যে লিভারপুলের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ইয়ান আয়রে তখনই আমেরিকার নিউ ইয়র্কে গিয়ে কার্লো অ্যানচেলত্তির সাথে লিভারপুলের ম্যানেজার হবার ব্যাপারে কথা বলে এসেছেন।

MADRID, SPAIN - JUNE 26:  Carlo Ancelotti holds a press conference after he was presented as Real Madrid's new head coach at Estadio Bernabeu on June 26, 2013 in Madrid, Spain.  (Photo by Denis Doyle/Getty Images)

এবং লিভারপুলের কোচ হবার ব্যাপারে অ্যানচেলত্তিও যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে মাত্র একটা সমস্যাই হতে পারে, সেটা হল অ্যানচেলত্তির বেতন। কিন্তু সেটাও লিভারপুলের কোন সমস্যা হওয়া উচিত না। যদি লিভারপুল যথারীতি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে অন্যান্য ক্লাবের মত বর্তমানের ব্যাপারে উচ্চাশা দেখায়, বর্তমানে কিছু জেতার আগ্রহ পোষণ করে। যে ক্লাব বেতন দিয়ে জ্যো অ্যালেন, দেয়ান লভরেন, কোলো ট্যুরে, হোসে এনরিককে রাখতে পারে তাদের পক্ষে একটু বেশী বেতন দিয়ে অ্যানচেলত্তিকে রাখাটা কষ্টের কিছু না। থাকা চাই শুধু উচ্চাশা।

=> ইয়ুর্গেন ক্লপ

লিভারপুল ফ্যানদের অধিকাংশই চাচ্ছেন ডর্টমুন্ডের সাবেক এই ড্যাশিং কোচকে নিজেদের কোচ হিসেবে পেতে। ডর্টমুন্ডের হয়ে দুইবার লীগ, দুইবার সুপারকাপ, একবার জার্মান কাপ ও একবার চ্যাম্পিয়নস্লীগ রানার্স আপ হওয়া, এখন স্বেচ্ছাবসরে থাকা এই কোচ ইংল্যান্ডে কোচিং করাতে আগ্রহী বলেও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু লিভারপুল ফ্যানদের জন্য বিরক্তিকর হলেও সত্য ওদিকে বায়ার্ন মিউনিখও পরবর্তী মৌসুমে নিজেদের কোচ হিসেবে পেপ গার্দিওলার বদলে ক্লপকেই চাচ্ছে। সেক্ষেত্রে গার্দিওলা চলে আসবেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। এদিকে লিভারপুলের মালিকপক্ষও ক্লপ সম্বন্ধে অতটা এখন আগ্রহী নন। এদিকে ক্লপও শোনা যাচ্ছে ইংল্যান্ডে এসেছেন বিভিন্ন ক্লাবে ট্রেইনিং সেশান পর্যবেক্ষণ করতে। কে জানে, কোন ক্লাব পছন্দ হয়ে গেলে সেখানে যোগ দিয়েও দিতে পারেন – ওয়েঙ্গার, মরিনহো, রজার্স ; কেউই ত চাকরিতে এখন সেরকম নিশ্চিত নন!

2

লিভারপুলের ক্লাব সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো, ট্রান্সফার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো ম্যানেজার ব্রেন্ডান রজার্স ছাড়াও পাঁচজনের হাতেই মূলত ন্যস্ত থাকে। তাঁরা হলেন – মূল মালিক জন ডব্লিউ হেনরি, চেয়ারম্যান টম ওয়ার্নার, চিফ ডিরেক্টর মাইক গর্ডন, চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ইয়ান আয়রে, হেড অফ অ্যানালাইসিস মাইক এডওয়ার্ডস। শোনা যাচ্ছে হেনরি, ওয়ার্নার আর গর্ডন ক্লপকে চাইলেও চাচ্ছেননা এডওয়ার্ডস আর আয়রে। কেন চাচ্ছেননা সেটাও একটা বিশাল কাহিনী। ইয়ান আয়রের আগে লিভারপুলের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ছিলেন ড্যামিয়েন কমোলি। অ্যান্ডি ক্যারল, স্টুয়ার্ট ডাউনিং, দোনি, চার্লি অ্যাডাম সহ ফ্লপের পর ফ্লপ সাইনিং সব এই কমোলির আমলেই করা। কমোলি এসেছিলেন টটেনহ্যাম হটস্পার থেকে, আর সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন ভিডিও অ্যানালিস্ট মাইক এডওয়ার্ডস কে। এখন এই কয় বছরে এডওয়ার্ডস খুব বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছেন মালিক জন ডব্লিউ হেনরির কাছে – বিশেষত লিভারপুল কাকে দলে আনবে কাকে আনবে না তাদের সম্বন্ধে পরিসংখ্যানভিত্তিক পর্যালোচনা করে হেনরির অনেক পছন্দের মানুষ হয়ে উঠেছেন এই এডওয়ার্ডস, হয়ে গিয়েছেন ক্লাবের চিফ অ্যানালিস্ট। হেনরির ফ্লোরিডার বাসাতেও যথেষ্ট সময় কাটান এই এডওয়ার্ডস, এমনকি রয় হজসনকে ছাঁটাই করার পরেও কাকে আনতে হবে সে বিষয়ে এডওয়ার্ডসের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট।

এই এডওয়ার্ডস বেসবল খেলার ট্রান্সফারের মডেলের অনুরূপ (যেহেতু ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ আবার বোস্টন রেড সক্স বেসবল দলেরও মালিক) “গ্রাহাম মডেল” এর মাধ্যমে পর্যালোচনা করেন কোন খেলোয়াড় লিভারপুলে আসবে কে আসবে না। ব্রেন্ডান রজার্স, বা দলের কোন স্কাউট বা এজেন্ট কর্তৃক পছন্দ খেলোয়াড়দের বিভিন্ন তথ্য গ্রাহাম মডেলের মাধ্যমে কম্পিউটারে পর্যালোচনা করেন তিনি, সব বিবেচনা করে ফলাফল যদি ‘না’ হয়, তাহলে সেই খেলোয়াড়কে লিভারপুল আর দলে কিনতে পারে না। ট্রান্সফার সম্পর্কিত এইধরণের আজগুবি সিদ্ধান্তের উপরেই এতকাল চলছে লিভারপুল। এবং এর জন্যই দলে এসেছেন লভরেন, অ্যালেন, মার্কোভিচ, অরিগি, লালানা, ল্যাম্বার্টের মত খেলোয়াড়। পছন্দ হওয়া সত্বেও রজার্স দলে আনতে পারেননি তৎকালীন রেড বুল সালজবার্গে খেলা সেনেগালিজ উইঙ্গার সাদিও মানে কে। এই মানে এখন সাউদাম্পটনের হয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছেন।

এখন এই মডেলের উপর নির্ভর করেই এডওয়ার্ডস চাচ্ছেন ক্লপ যাতে লিভারপুলে না আসেন! ভাবা যায়?

=> ফ্র্যাঙ্ক ডি ব্যোর

তালিকার সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় নাম। কিন্তু কার্যকারিতার দিক দিয়ে ক্লপ বা অ্যানচেলত্তির চেয়ে খুব বেশী পিছিয়েও কিন্তু নন তিনি। মার্টিন ইয়লকে ২০১০ সালে আয়াক্স যখন ছাঁটাই করে ব্যোরকে আনলো, তারপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাননি ব্যোর। জিতেছেন টানা চারটি লিগ শিরোপা। গত মৌসুম থেকেই আর্সেনাল, নিউক্যাসল, টটেনহ্যাম, বার্সেলোনা সহ অনেক বড় বড় ক্লাবের নজর আছে তার দিকে। গত মৌসুমে পার্ডিউ যখন নিউক্যাসল ছেড়ে ক্রিস্টাল প্যালেসে যোগ দিলেন, কিংবা টিম শেরউড যখন টটেনহ্যাম থেকে চলে গেলেন, উভয়ক্ষেত্রেই ব্যোর ছিলেন প্রথম পছন্দ, যদিও পরে জন কারভার আর মরিসিও পচেত্তিনো ক্লাবগুলোর দায়িত্ব নেন। তা যাই হোক, গতকাল লিভারপুলের কোচ হবার ব্যাপারে ব্যোর নিজে থেকে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আর ফ্র্যাঙ্ক ডি ব্যোর সম্বন্ধে লিভারপুল এমনিতেও বহুদিন থেকেই আগ্রহী। গত ডিসেম্বরে ব্যোর ও তার এজেন্টের সাথে এই নিয়ে কথাও বলে এসেছে লিভারপুলের মালিকপক্ষ। কিন্তু এখানেও কথা আছে। ব্যোর মূলত মাঝ-মৌসুমে ক্লাব ছেড়ে আসতে চান না, ঠিক এই কারণেই নিউক্যাসল বা টটেনহ্যামে যোগ দেননি তিনি। কিন্তু এবার যেহেতু নিজে থেকেই লিভারপুলের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, মতিগতি পাল্টালেও পাল্টাতে পারে!

de-boer-frank-liv

এখন দেখা যাক ক্লপ, অ্যানচেলত্তি না ব্যোর – লিভারপুলের কান্ডারি কে হন। কিন্তু যেহেতু অ্যানচেলত্তি বা ক্লপের মত হাই প্রোফাইল ম্যানেজার এখনো চাকরিহীন আছেন, লিভারপুলের জন্য এটাই সুযোগ বড় কোন একটা নাম নিজেদের দলে নিয়ে আসার। ব্যোরের প্রতি অসম্মান জানিয়ে বলছি না, কিন্তু টানা চারবার লিগ জেতার পর ব্যোরের ট্যাকটিক্সেও এখন অনেক খুঁত ধরা পড়ছে, এবার মনেহয়না ফিলিপে কোকুর পিএসভির কাছে ডাচ লিগে পেরে উঠতে পারবেন তিনি। কেননা, তাঁর ট্যাকটিক্স এখন অনেকটাই গৎবাঁধা হয়ে গেছে, যে ট্যাকটিক্স তাঁকে টানা চারটা লিগ শিরোপা এনে দিয়েছিল সে ট্যাকটিক্স এখন বহুলচর্চিত হয়ে গেছে, ফলে এই মৌসুমে সুবিধাজনক ফল পাচ্ছেনা আয়াক্স। আশা করি নতুন ম্যানেজার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এসব বিষয়গুলো আমলে নেবে ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ।

রজার্স চলে যাচ্ছেন এটা নিশ্চিত। এখন ক্লপ আসবেন, না অ্যানচেলতিই আসবেন, না ব্যোর আসবেন ; নাকি সবাইকে অবাক করে দিয়ে নতুন “জি-হুজুর” টাইপ কোন ম্যানেজার নিয়ে আসবে ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ, ক্লাবে আসবেন স্যাম অ্যালার্ডাইস, গ্যারি মঙ্কের মত তুলনামূলক চূড়ান্ত মাঝারি মানের কেউ – সে প্রশ্নটা নাহয় সময়ের কাছেই তোলা রইল!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × five =