সম্ভাবনাময় তিন মুখ

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে মনে ধরেছে অনেককেই। তবে মনে গেঁথে গেছে ৩টি নাম…
১. সরফরাজ খান
নাম প্রথম শুনেছিলাম ২০০৯ সালে। মুম্বাইয়ের স্কুল ক্রিকেটে যখন রেকর্ড ৪৩৯ রান করেছিলেন। তখন ছিল ১২। এরপর ডেভেলপমেন্ট কিছুটা দেখলাম গত আইপিএলে। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মত তারার হাটে থেকে তার বয়নের একজনের একাদশে সুযোগ পাওয়াই অনেক। সরফরাজ একটা ম্যাচে ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছিলেন। এবার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ডেভেলপমেন্টটা দেখলাম আরও ভালো করে।
যুব বিশ্বকাপ খেলেছে, কিন্তু আসলে সে যুব বিশ্বকাপের ক্রিকেটার নন! এই বিশ্বকাপে খেলা সেরা ব্যাটসম্যান বলতে পারি অনায়াসেই। কিন্তু অন্যদের সঙ্গে তুলনাই করতে চাই না। সে যোজন যোজন এগিয়ে বাকি যে কারও চেয়ে! বয়সের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। টেকনিক, টেম্পারমেন্ট, মাঠের সব দিকে এবং সব ধরণের শট খেলার সামর্থ্য, এসব তো আছেই। আমার সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তার ‘অথোরিটি।‘ যেভাবে ব্যাট করেছে। ২২ গজে তার রাজসিক বিচরণ, প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে উঠেছে সে ডিফারেন্ট লেভেলের, ডিফারেন্ট লিগের। নিজের খেলাটা জানেন, তাই এটাও জানেন, কোনো কিছুই তার সামনে সমস্যা না! এমনকি ফাইনালে সবুজাভ উইকেটে সবাই যেখানে ধুঁকেছে, সরফরাজ একই অ্যাসিউরিটি, একই অথোরিটি নিয়ে ব্যাটিং করেছে। একটাই খামতি এবং তার মানের এককজনের কাছ থেকে হতাশার, একটাও সেঞ্চুরি নেই। ৫ ফিফটির ২-৩টিকে সেঞ্চুরি পর্যন্ত নেওয়া উচিত ছিল!
উঠে আসার এই সময়টাতেই অবশ্য কয়েকবার মাঠের বাইরে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে জরিমানা গুণেছেন। ঠিক পথে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আরেকটি ব্যাটিং রত্ন পাচ্ছে ভারত।
২.আলজারি জোসেফ
‘দর্শনদারী’ তে মুগ্ধ, ‘গুণবিচারী’ তে অভিভুত। লম্বা, শক্তপোক্ত। দারুণ গড়ন। সেই স্বর্ণ সময়ের ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলরারদের মতোই, যাকে দেখলে পিলে চমকে উঠবে ব্যাটসম্যানদের। গতি তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই বয়সেই ১৪০ কিমির আশেপাশে বোলিং করছেন। সময়ের সঙ্গে আরও বাড়ারই কথা। গতির সঙ্গে মানানসই আগ্রাসন, বোলিংয়ে ও শরীরী ভাষায়। সহজাত লেংথটা দারুণ, ব্যাটসম্যানের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়ার মত। শর্ট বলটা একদম সময়মত ব্যবহার করতে পারেন, আবার হুটহাট ইয়র্কারে চমকে দেন। সব মিলিয়ে রোমাঞ্চকর প্যাকেজ। দেখার জন্য অসাধারণ। সামনের পথচলায় মূল প্রশ্ন, ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট সিস্টেমের সামর্থ্য আছে কিনা তাকে ধারণ করার ও গড়ে তোলার। সব ঠিকঠাক থাকলে আমার ধারণা, এই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবার আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলবেন জোসেফই।
৩. মেহেদি হাসান মিরাজ
৩ বছর ধরেই ওকে নিয়ে বলা ও লেখা হচ্ছে। গত দেড় বছরে অনেক লেখা হয়েছে, অনেক বলা হয়েছে। নতুন করে বলার আছে সামান্যই। সবসময় সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়ে আসছে ওর ম্যাচিউরিটি নিয়ে। মিরাজের কৃতিত্ব এখানেই, প্রত্যাশার চূড়ান্ত থাকার পরও ম্যাচিউরিটি দিয়ে নতুন করে বিস্ময় ছড়াতে পেরেছেন। ম্যাচের পর ম্যাচ যেভাবে দলকে খাদেরা কিনারা থেকে টেনে তুলেছেন, বল হতে নানা পরিস্থিতিতে যেভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন এবং অতি অবশ্যই যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেমিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বোলিং চেঞ্জ আর ফিল্ড প্লেসিং নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু ছেলেটার বয়স ভুলে গেলে চলবে না! এই বয়সেই তার ক্রিকেটিং ক্যাপ্টেন্সির ফাইনার পয়েন্টস নিয়ে আমরা কথা বলছি, মানে এখনই বেসিক ব্যাপারগুলো সব দারুণ!
মাঠের বাইরের ক্যাপ্টেন্সি নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। এই বয়সেই সে নিজ বয়সীদের নেতা হয়ে উঠেছে, বন্ধু হয়েও সবার শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছে, হয়ে উঠেছে আস্থা-ভরসার জায়গা। এরপর আর বলার কিছু থাকে না।
সমস্যা হলো, আমাদেরই ‘দায়িত্বশীল’ মিডিয়া তাকে ‘পরবর্তী মাশরাফি’ বানিয়ে দিয়েছে বেশ আগেই। গত কিছুদিন ধরে দেখছি তারাই আবার মিরাজকে নিয়ে ‘পরবর্তী সাকিব’ রব তুলেছে। তাদের এই স্বভাবজাত অতিরঞ্জনে শঙ্কা জাগে, আমরা মিরাজকে ‘মিরাজ’ হয়ে উঠতে দেব তো! যদ্দুর দেখেছি ওকে, যতটুকু বুঝেছি, এসবকে এক পাশে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিক দৃঢ়তা, প্রতিজ্ঞা, ইচ্ছাশক্তি ও ক্রিকেটীয় সামর্থ্য ওর আছে। কিন্তু আমরা কেন ছেলেটার ওপর এই অন্যায় ভার চাপিয়ে দেব! (কেন তাকে মাশরাফি বা সাকিব হতে হবে, বা একজনকে কেন আরেকজনের মত হতে হবে, সেটাও আমি ঠিক বুঝি না)…
***অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে দারুণ সম্ভাবনাময় থেকে পরে কিছু করতে না পারার অনেক উদাহরণ আছে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তেমন কিছু করতে না পারে ভবিষ্যতে উজ্জ্বল হওয়র অসংখ্য উদাহরণও আছে। সবার জন্যই তাই শুভকামনা।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five + 17 =