শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে বাংলাদেশ

Prothom Alo

অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম ঘোষণা দিয়েছিলেন সেমিতে না উঠতে পারলে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেবেন, জাহিদ হাসান এমিলি আরও এককাঠি সরেস হয়ে ইঙ্গিত করেছিলেন অবসরের। বাংলাদেশী সমর্থকদের হাঁফ ছেড়ে বাঁচিয়ে তাঁদের কাউকেই এরকম কিছু করতে হয়নি, শ্রীলঙ্কাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে নিশ্চিন্তে উঠে গেছে স্বাগতিক বাংলাদেশ।

Prothom Alo
বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে বাংলাদেশ

এ আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে উভয় দলই মালয়েশিয়ার কাছে হার দিয়ে শুরু করে। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কাছে ০-১ গোলে পরাজিত হয়। আর শ্রীলঙ্কা নিজেদের প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করে। কাজেই এই ম্যাচে বাংলাদেশ ড্র করলেও গোল গড়ে সেমিতে উঠতই। কিন্তু ডি ক্রুইফের শিষ্যরা শুধুমাত্র ড্রয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন কেন?

ম্যাচের শুরু থেকেই যেন এক ভিন্ন বাংলাদেশকে দেখতে পায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের দর্শকেরা। একের পর এক আক্রমণে দিশেহারা হয়ে ছিল লঙ্কান মিডফিল্ড ও ডিফেন্স। কিন্তু সেই চিরাচরিত সমস্যা, গোলপোস্টের সামনে এসে গোল করতে ভুলে যাওয়াটা যেন এই ম্যাচে আরও বেশী প্রকট হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডদের কাছে। ম্যাচের স্কোরলাইন দেখে মনে হতে পারে ম্যাচটি আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ভরপুর ছিল, কিন্তু আসলে তা না, ফরোয়ার্ডদের বারংবার ভুলের জন্য বলতে গেলে হাফ ডজন গোলে জিততে পারেনি আজ উজ্জীবিত বাংলাদেশ। বল ম্যাচের অধিকাংশ সময়েই বলতে গেলে শ্রীলঙ্কান অর্ধেই ছিল।

সমর্থকদের একাংশ
সমর্থকদের একাংশ

কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ এই ম্যাচে আগের ম্যাচের গোলরক্ষক রাসেল মাহমুদ লিটনকে বসিয়ে শহীদুল ইউসুফ সোহেলকে সুযোগ করে দেন গোলবার রক্ষা করার জন্য, কিন্তু ম্যাচের প্রথম থেকেই তিনিও কিছুটা নিষ্প্রভ ছিলেন, চাপের জন্যই বোধকরি। ডিফেন্ডার রায়হান হাসান, ইয়াসিন খান, নাসির, ইয়ামিন মুন্নারা খেলেছেন দুর্দান্ত, সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে খেলা জামাল ভুঁইয়াকে বল সরবরাহ করে গেছেন অবিরত। এই মৌসুমে ডেনমার্কের তৃতীয় বিভাগ থেকে বাংলাদেশের শেখ জামালে নাম লেখানো জামাল ভুঁইয়ার নাম আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়। বিপক্ষ খেলোয়াড়দের জটলা থেকে বল বের করে আনা, দারূণ সব লং বল উইংয়ে পাঠিয়ে জাহিদ-সোহেল রানাদেরকে বলের যোগান দেওয়ার কাজটা করে গেছেন নিয়মিত। বরং অধিনায়ক মামুনুলই অন্যান্য ম্যাচের তুলনায় আজ ছিলে কিছুটা নিজের ছায়া হয়ে, লোডভিক ডি ক্রুইফ তাঁর তিন মিডফিল্ডারের মধ্যে যাকে যথারীতি ফ্রি রোমিংয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। বক্স-টু-বক্স নিরন্তর দৌড়ে গিয়ে শ্রীলঙ্কান রক্ষণভাগে বারবার আতঙ্ক ছড়িয়েছেন মিডফিল্ড-ত্রয়ীর আরেকজন – হেমন্ত ভিনসেন্ট বিশ্বাস, যার দুর্দান্ত এক শটের গোলেই এসেছে আজ বাংলাদেশের জয়। ম্যাচের ৪১ মিনিটে শ্রীলঙ্কার ডি-বক্সের একেবারে মাথায় বাম প্রান্ত থেকে সোহেল রানার আড়াআড়ি ফেলা বলটি বুক দিয়ে সামনে ঠেলেন এমিলি। একটু দূর থেকে দৌড়ে এসে ডিবক্সের ধার থেকে দুর্দান্ত এক রাইটফুটেড হাফভলিতে লঙ্কান গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন হেমন্ত। নিঃসন্দেহে বলতেই হবে, বাংলাদেশের ইতিহাসের স্মরণকালের অন্যতম সেরা গোল এটি।

হেমন্ত ভিনসেন্ট বিশ্বাস
হেমন্ত ভিনসেন্ট বিশ্বাস

দ্বিতীয়ার্ধে যেন আরও বেশী উজ্জীবিত হয়ে নামে বাংলাদেশ। কিন্তু যথারীতি ডিবক্সের সামনে এসে হেমন্ত জাহিদ এমিলিরা সুযোগের পর সুযোগ মিস করেছেন। ৫৫ মিনিটে হেমন্তের জোরালো শট আটকে দেন লঙ্কান গোলরক্ষক। ৮৪ মিনিটে সেই হেমন্তই গোলরক্ষককে ওয়ান-অন-ওয়ান পেয়েও ড্রিবল করে কাটাতে গিয়ে হেলায় হারিয়েছেন ম্যাচের সহজতম সুযোগটি, কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন শ্রীলঙ্কা রক্ষণের এক খেলোয়াড়। হেমন্ত বঞ্চিত হন অসাধারণ প্রতিভাদীপ্ত এক গোল পাওয়া থেকে।

এর মধ্যেই স্রোতের বিপরীতে ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি পেয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। পুরো ম্যাচজুড়েই নড়বড়ে থাকা বাংলাদেশের গোলরক্ষক শহীদুল ইউসুফ সোহেল ডিবক্সের কিনারায় এক দৃষ্টিকটু ফাউল করেন প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার স্ট্রাইকারকে। যার দরূণ তাকে হলুদ কার্ডও দেখতে হয়। স্তব্ধ হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম।

কিন্তু শহীদুল নিজের ভুল শোধরান দারুণ পেনাল্টিটি অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে। ফিরতি বলেও শহীদুল দ্বিতীয়বারের মতো রুখে দেন শ্রীলঙ্কার ম্যাচে ফেরার সুবর্ণ সুযোগটি। কানফাটা চিৎকারে মেতে ওঠে গ্যালারি।

পেনাল্টি ফেরানোর পর বাংলাদেশ দল যেন আরও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে গোলের সংখ্যা বাড়ানোর। কিন্তু ফরোয়ার্ডদের আক্রমণকে গোলে পরিণত করার দুর্বলতায় ভেস্তে যেতে থাকে সব প্রয়াসই। এই পর্যায়ে যে খেলোয়াড়ের কথা না উল্লেখ করলেই নয়, তিনি ১১ নম্বর জার্সি পরিহিত সোহেল রানা। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের দর্শক বহুদিন লেফট ফ্ল্যাঙ্কে এরকম গতি, চাতুরি, ড্রিবল দেখেনি – তা বলাই বাহুল্য।

ম্যাচসেরা
ম্যাচসেরা

তবে গোটা স্টেডিয়ামের দর্শকদের আবার হতাশ করেছেন দেশসেরা স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলি, তিনি মাঠে ছিলেন বলে একবারের জন্যেও মনে হয়নি, নষ্ট করেছেন সহজ থেকে সহজতর সব ট্যাপ-ইন। একজন স্ট্রাইকারের মধ্যে যে গতির আশা করে সবাই, এমিলির মধ্যে আজ তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি, খেলেছেন অত্যন্ত মন্থরভাবে। মূলত, ঘরোয়া লিগে দেশীয় স্ট্রাইকারদের নিয়মিত না খেলার মাশুলই দিয়েছে আজ বাংলাদেশ, মাত্র এক গোল করার মাধ্যমে, নূন্যতম ব্যবধানে ম্যাচ জয়ের মাধ্যমে।

ম্যাচের বাকি সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ঘরের মাঠে খেলতে নামা বাংলাদেশ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seven − 2 =