শ্রদ্ধা জানাই পরিশুদ্ধ প্রতিপক্ষকে

ফুটবলটা সার্বজনীন খেলা । এখানে আমার, আপনার সমর্থিত দল-খেলোয়াড় ভিন্ন হতেই পারে । তবে দিনশেষে আমরা সবাই একই দলে, অর্থাৎ ফুটবল প্রেমী । ফুটবল সব সময়ই ভ্রাতৃত্বের বার্তা দেয় । যেকোন ফুটবল যজ্ঞে বৈষম্যর পাশাপাশি ভ্রাতৃত্বের শ্লোগান থাকে অত্যান্ত আন্তরিকতার সাথে ।

দেখুন, এল ক্ল্যাসিকোর মত হাই ভোল্টেজ ক্ল্যাশে সার্জিও রামোস ব্যর্থ স্লাইড ট্যাকলে কার্ড খাচ্ছে । আবার ঠিক পর মুহুর্তেই সুয়ারেজের সঙ্গে হাত মেলায় ।

খেলার মাঠে হাতাহাতি হওয়ার পরও কার্লেস পুয়োল পরবর্তীতে এটিকে ‘তেমন কিছু না’ বলে মন্তব্য এবং রামোসকে ভাই বলে আখ্যায়িত করে । উত্তেজনাকর এক ম্যাচ শেষে ইনিয়েস্তা রোনালদোর কোমর চেঁপে গল্পে মেতে ওঠে ।

মাদ্রিদ ডার্বির রণক্ষেত্রে ফিলিপ্পে লুইজ ইস্কোকে অন্যায় ট্যাকল করে জিহ্বায় কামড় দেয়, হাত বাড়িয়ে টেনে তোলে ব্যাথায় কাঁতরানো ইস্কোকে ।

তথাকথিত অহংকারী রোনালদো প্রতিপক্ষের বুটের ফিতা বেঁধে দেয় । কোপা দেল রে জিতে পরাজিত দলের মেসিকে বুকে টেনে স্বান্তনা দেয় । ব্যালন ডি’অরে গিয়ে নিজ উদ্যেগে ইংরেজী না জানা প্রতিপক্ষ নেইমারের দোভাষী বনে যায় ।

চির প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের নেইমারের সাথে ঠিকই সেরা বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলে লিও মেসি ।

এসব ফুটবল ভাতৃত্বের স্বাক্ষর ।

কিন্তু কথায় বলে, চাঁদেরও কলন্ক আছে ।

ফুটবলেরও আছে । আছে কলন্ক, আছে লজ্জ্বা ।

গতকাল থেকে একটি টুইট ও ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ফুটবল বিশ্বে বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে । সাবেক বার্সা অধিনায়ক
হ্রিস্টো স্টইচকভ একটি ছবিতে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের জার্সি হাতে পোঁজ দিয়েছেন । এটা দোষের নয় । উচলের ফাইনালে চির প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের পরাজয় কামনায় তিনি এটিএমকে সমর্থন জানাতেই পারেন ।

কিন্তু কলন্কটা ছবির নিচ অংশে ।

তার কালো শ্যু’র তলায় রিয়ালের ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সিটি মাড়িয়ে রেখেছেন তিনি ।

ছবিটি দেখে মাদ্রিদ ভক্তরা তো অগ্নিশর্ম আর খোদ শুদ্ধ বার্সা ভক্তরা বিব্রত ।

বলা চলে একদিকে ক্ষোভের আগুনে মাদ্রিদিস্তারা, অন্যদিকে লজ্জ্বায় কিউলরা ।

রিয়াল-বার্সার রাইভালী চরম উত্তেজনার জন্ম দেয় প্রতিটি শতাব্দীতে, প্রতিটি যুগে, প্রতিটি বছরে, প্রতিটি মাসে, প্রতিটি দিবসে, প্রতিটি ঘন্টায়, প্রতিটি মুহুর্তে ।

এই রাইভালি অনাকাংখিত অনেক দৃশ্য আর কথার কাঁদা ছোড়াছুড়ির জন্ম দিলেও তা ফুটবলের অংশ মেনে হজম করে দুটি শিবিরই ।

এইতো কয়েকদিন আগে লিও মেসি তার এক সাক্ষাত্‍কারে অকপটে বললেন “বার্সার লোকজন সর্বদা রিয়াল মাদ্রিদকে শিরোপা শূন্য দেখতে চায় “।

আমি মেসি এবং বার্সার সেই চাওয়াকে কটাক্ষ করিনি । কারণ প্রতিপক্ষের পরাজয় কামনা সবাই করে ।

তবে ব্যতিক্রম আছে । আছেন একজন রাউল গঞ্জালেস ।

বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার পর রাউল বলেছিলেন বার্সা স্প্যানিশ দল তাই তাদের এই অর্জনে তিনিও খুশি ।

আছেন একজন নেইমার । যে কিনা ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ ফাইনালে সমর্থন জানায় তার দেশের আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে ।

আমি তখনও রাগ করিনি যখন দেখেছি সদ্য লা লীগা জেতা বার্সার শিরোপা উদযাপনে রোনালদোর ‘ক্যালমা সেলিব্রেশন’ নিয়ে পিকের ব্যঙ্গভঙ্গি ।

লা মাসিয়া প্রোডাক্ট পিকের এমন ভাঁড়ামি এখন গা সওয়া হয়ে গেছে ।

তবে হতাশ হয়েছি । যেখানে মাদ্রিদ অধিনায়ক বার্সাকে লীগ জেতায় অভিনন্দন জানিয়েছেন সেখানে নিজেদের সাফল্য উদযাপনে এমন বাঁদরামী না করলেও পারতেন জেরার্ড পিকে । আমি তখনও চুপ থেকেছি যখন সম্প্রতি বার্সা প্রেসিডেন্ট বার্তেমিউ বলেন উয়েফার উচিত ইউসিএলটা এটিএমকে দিয়ে দেওয়া । ঠিক কোন যৌক্তিক যুক্তিতে এটা তিনি বলেছেন তার সদুত্তর তার দলীয়রাও পারবেনা । আপাতত এটিকে হিংসার চরম বহিঃপ্রকাশ ধরে নিচ্ছি ।

তবে আমি চুপ থাকতে পারিনি আমার প্রাণ প্রিয় দলের জার্সিটির অসম্মানে । আমি ক্ষোভে অন্ধ হয়ে যাই যখন দেখি
হ্রিস্টো স্টইচকভ টুইটারে একদল শুকরের গায়ে মাদ্রিদ জার্সি লাগিয়ে বলেন মাঠে অনুশীলন লা লীগার ২য় দল ।

একজন মানুষ কতটা নিকৃষ্ট হলে এমন কাজ করতে পারে তার প্রমাণ এই সাবেক কিউল ।

কতটা অসভ্য আর কুরুচিপূর্ণ হলে এতটা নিচে নামা যায় তা এই দ্বিপদী জানোয়ারকে না দেখলে বুঝতামনা ।

হোসে মরিনহো একদা বলেছিলেন, বার্সায় সবার আগে শেখানো হয় মাদ্রিদকে ঘৃণা করা । জানিনা কথাটি কতটুকা সত্য । তবে পিকে, আলভেজ, আলবাদের দেখে আঁচ করেছি কিউলদের বড় একটা অংশ পেশাদারিত্বের অপমান করে থাকে । আজ একজন মাদ্রিদিস্তা হিসেবে
হ্রিস্টো স্টইচকভ এর প্রতি একরাশ ঘৃণা আর কয়েক গ্যালন থুথু বরাদ্ধ করলাম ।

তবে ঐ যে বললাম দিনশেষে আমরা সবাই ফুটবল প্রেমী । ঠিক সেই জায়গাটি থেকে আমি, আমরা লজ্জ্বিত । কারণ শ্রদ্ধা শেখানো, ভাতৃত্ব গড়ানো ফুটবল একদা তার কোলে ঠাঁই দিয়েছিল হ্রিস্টো স্টইচকভ নামক এক নির্লজ্জ্ব, অসভ্য, বর্বর, নিম্ন শ্রেণির ইতরকে ।

আসুন, ভালবাসি নিজ দলকে ।

শ্রদ্ধা জানাই পরিশুদ্ধ প্রতিপক্ষকে ।

ফুটবলের শিক্ষায় ভাতৃত্বের জয়গান গাই সকল অসভ্যতা আর নোংরামীকে পদদলিত করে ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

3 × 5 =