শুভ জন্মদিন, ইয়ান রাইট!

::: আহসানুল হক :::

তার বয়স যখন মাত্র ১৮ মাস তখন বাবা তার মাকে ছেড়ে চলে যান। মা আবার বিয়ে করলে তার ঠিকানা হয় সৎবাবার ঘর। যে কিনা তাকে একদমই সহ্য করতে পারত না। মা ছিলেন ঝগড়াটে এবং ফুটবল পাগল ছোট ছেলেটাকে সব সময়ই বলতেন “ফুটবল খেলা সময় নষ্ট করা ছাড়া কিছুই না।”দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত অন্যান্য অনেক লন্ডনি কিশোর এর মতোই তারও জীবন অপরাধের কানাগলিতে ঢুকে যেতে পারত। কিন্তু শিক্ষক  Mr Pigden তার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তার উৎসাহ, সমর্থন এবং সহযোগিতায় ফুটবল খেলায় মনোনিবেশ করতে পেরেছিলেন ইয়ান রাইট। হ্যা আমি ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফিনিশার, বিস্ফোরক স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট এর কথাই বলছি।

COCA COLA CUP

রাইট এর পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয় একটু দেরিতে ২২ বছর বয়সে ১৯৮৫ তে ক্রিস্টাল প্যালেস এ যোগ দেয়ার মাধ্যমে। ঈগলস দের হয়ে ২৭৭ ম্যাচে ১১৭ গোল করেন। ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর এ আর্সেনাল এর তখনকার ক্লাব রেকর্ড ২.৫ মিলিওন পাউন্ড দিয়ে সাইন করায় তাকে। বাকিটা ইতিহাস..

লিস্টার এর সাথে হ্যাট্রিক করে গানার হিসেবে অভিষেক। তার সহজাত ফিনিশিং দক্ষতা এবং বৈচিত্র্যময় গোল উদযাপন দ্রুতই তাকে হাইবুরির প্রিয়পাত্র বানিয়ে তোলে। ওই মৌসুমে সব মিলিয়ে আর্সেনাল এর জার্সি গায়ে করেন ২৬ গোল(৩৩ ম্যাচ)। মৌসুমের শেষ ম্যাচে হ্যাট্রিক করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব জিতে নেন। এর পর টানা ছয় মৌসুম টানা আর্সেনাল এর সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। বল জালে পাঠানোর কাজটা যেন খুবই সহজ ছিলো তার কাছে।১৯৯৩ সালে আর্সেনাল এর হয়ে লিগ কাপ এবং এফএ কাপ ডাবল জয় করেন তিনি। লিগ কাপের সেমিফাইনালের দুই লেগ আর এফএ কাপের ফাইনালে গোল করেন তিনি।

১৯৯৪ সালে আর্সেনাল এর ইউরোপা লীগ জয়ের পথে দলের সর্বোচ্চ গোল দাতা ছিলেন. যদিও সাসপেনশন এর খাঁড়ায় ফাইনাল খেলতে পারেন নি। কোপেনহেগেন এ জিয়োঙ্ফ্রাঙ্কো জোলার পারমার সাথে ১-০ গোলে জয়লাভ করে আর্সেনাল। মেজাজি এই ফরোয়ার্ড ৮ নাম্বার জার্সী গায়ে ক্রমাগত প্রতিপক্ষের ডিফেন্স কে নাচিয়ে গিয়েছেন। ১৯৯৫ ইউরোপা লীগে প্রত্যেককটি ম্যাচেই গোল করেছিলেন ফাইনাল ছাড়া। ফলাফল ফাইনালে রিয়াল জারাগোজার কাছে শেষ মুহুর্তের গোলে ১-২ এ হার।

ডেনিস বার্গক্যাম্প এর আগমন এর পর তার সাথে জুটি বেধে আরো দুর্দান্ত হয়ে ওঠেন তিনি। ডাচ মায়েস্ত্রো  কার্যকরি সঙ্গি হয়ে উঠেন প্রতিপক্ষ কে ব্যতিব্যাস্ত করে রাইট এর দৌড় গুলোকে নিখুঁত মাপা পাসে গোল বানিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে।গোল করেই চলে ছিলেন রাইট.. সুইনডন টাউনের সাথে অবিস্বাস্য লব… শ্বাসরুদ্ধকর জাগলিঙ এর পর আলতো চিপ এ করা এভারটনের সাথে সেই গোল.. কিংবা বাঁ পায়ে কামানের গোলার মত শটে অজেরে এর সাথে করা গোল এর মতই আরো অনেক অনেক দৃষ্টিনন্দন গোল।

বার্গক্যাম্প এর সাথে দুই মৌসুম জুটি বেধে খেলার পর অবশেষে তার খেলায় বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করে।১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে ইনজুরির কারনে সব মিলিয়ে মাত্র ২৮ ম্যাচ অংশগ্রহন করেন। তবে ওই মৌসুমের ১১ গোলের মধ্য আলাদা হয়ে থাকবে বোল্টনের সাথে করা জোড়া গোল। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ এ হাইবুরিতে বোল্টনের সাথে জোড়া গোল করে শুধু জয়ই নিশ্চিত করেন নি.. ক্লিফ বাস্তিন-এর ছয় দশক পুরোনো ১৭৮ গোলের ক্লাব রেকর্ড ও ভেঙে দেন তিনি। যেই রেকর্ড এর পুনরাবৃত্তি হতে দরকার পড়েছিল বিশেষ কিছু…থিয়েরি অঁরিকে।

সেই মৌসুমেই ৩৪ বছর বয়সে এসে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ মেডেল গলায় ঝোলানোর সুযোগ হয় তার। আর্সেনাল এর হয়ে এটাই ছিল তার শেষ মৌসুম। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ এই সাতবছরে আর্সেনাল এর হয়ে ২৮৮ টি ম্যাচ(এর মধ্যে ৯ ম্যাচে বদলি হিসেবে) খেলে ১৮৫ টি গোল করেছেন। জিতেছেন- ইপিএল (১৯৯৭-৯৮); এফএ কাপ (১৯৯৩ এবং ১৯৯৮); লীগ কাপ (১৯৯৩); ইউরোপা লীগ  (১৯৯৪)

ian-wright-2

ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ৩৩ ম্যাচ(১৬ ম্যাচেই বদলি হিসেবে) খেলে করেন ৯ গোল। আশ্চর্য জনক ব্যাপার ছিলো ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কোচরা কেউই তার ওপর ভরসা করতে পারেন নি। ১৯৯১-৯২ মৌসুমের লীগে সর্বোচ্চ স্কোরার হয়েও ১৯৯২ ইউরো এর ইংল্যান্ড স্কোয়াডে জায়গা হয়নি তার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড কোয়ালিফাই করতে পারে নি। ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ইউরোতে স্বাগতিক দলের স্কোয়াডেই ছিলেন না সেই মৌসুমে ২৩ গোল করা রাইট। ১৯৯৮ এর বিশ্বকাপে খেলা হয়নি ইনজুরির কারনে…

ইয়ান রাইট এর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এই  আক্ষেপ থেকেই গেছে যে ইংল্যান্ড এর জার্সি গায়ে বড় কোন টুর্নামেন্ট খেলা হয় নি। তবে আর্সেনাল এর ভক্ত সমর্থকদের কাছে ইয়ান রাইট সবসময়ই থেকে যাবেন অনুপ্রেরনার উৎস হয়ে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 − 1 =