শিখে এসো, ওয়ান্ডার বয়!

৩টি টি-টোয়েন্টি আর ৪টি একদিনের ম্যাচ। সপ্তাহ দুয়েকের থাকা। বোলিং নিয়ে শেখার সুযোগ সামান্যই। তবে মুস্তাফিজ শিখবে আরও অনেক কিছু। পরিচয় হবে সত্যিকারের পেশাদারীত্বের সঙ্গে। আরও ভালো করে শিখবে ডিসিপ্লিন, হবে আত্মনির্ভরশীল। দু সপ্তাহ পর মুস্তাফিজ যখন ফিরবে, তখন আরেকটু পরিণত হবে। আরেকটু বেশি জানবে নিজেকে।

ইমরান খানের কথা এই প্রসঙ্গে বারবার বলা যায়। সবসময়ই চাইতেন তরুণ ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই কাউন্টিতে পাঠাতে। কারণ ওখানে যা শিখবে, সেসব অমূল্য। একজন তরুণ ক্রিকেটার যদি নিজের ভেতরে গেঁথে নিতে পারে, সামনে এগিয়ে চলায় সেসব হয় অমূল্য পাথেয়। নতুন শতাব্দীতে, বিশেষ করে গত ৮-১০ বছরে ক্রিকেট অনেক বদলে গেছে, কিন্তু কাউন্টির এই বাস্তবতা-উপযোগিতা বদলেছে সামান্যই।

মুস্তাফিজ সেই অর্থে কাউন্টি ক্রিকেট খেলতে যাচ্ছেন না। মানে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশীপে নয়। খেলবেন ৫০ ওভার, ২০ ওভারের ম্যাচ। বোলিং নিয়ে শেখার ঘাটতিটা তাই থাকবে। তবে পেশাদারিত্বের স্বাদ এই সময়টুকুতেই পেয়ে যাবেন। কাউন্টি দলে খেলতে যাওয়া মানে শুধু মাঠের ক্রিকেট নয়। একটা অ্যাপার্টমেন্টে নিজের মত করে থাকা। একাকী চলতে শেখা। রান্না করে খাওয়া। সময়মত অনুশীলনে যাওয়া, ম্যাচের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। বলা হতো, কাউন্টিতে গেলে বয়েজরা ম্যান হয়ে ওঠে।

মুস্তাফিজের এসব অভিজ্ঞতা টুকটাক হবে। ইংল্যান্ডে বাঙালির অভাব নেই, তাদের সৌজন্যে হয়ত নিজের রান্না বা খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ভাবতে হবে না মুস্তাফিজের। একাকীত্বও হয়ত খুব থাকবে না। তার পরও যতটুকু নিজের মত থাকতে পারে, ততই ভালো করে জানবে নিজেকে। আইপিএলের সময় কদিন পরপরই খবর হতো যে মুস্তার জন্য দোভাষী রাখা হয়েছে, অমুক তাকে সঙ্গ দিচ্ছে, তমুক দিচ্ছে। মুস্তা নিজেই পরে আমাদের বলেছে যে ওসব খবর ভুয়া। সে নিজের মতোই ছিল। বাংলা জানা দু-একজন তাকে মাঝেমধ্যে হেল্প করেছে, এই তো। ইংল্যান্ডেও আশা করি নিজের মত থাকার সুযোগ পাবে। তাতে তারই উপকার, আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ হবে আরও।

আরেকটা বড় ব্যাপার, সম্মান। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ কিছু করতে পারলে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট মহলে যে সম্মান-সমীহ সে পাবে, আরও অনেক কিছুতে, অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভালো করেও সেটা পাবে না। সেটা উচিত কি উচিত নয়, সেটা অন্য বিতর্ক। তবে এটাই বাস্তবতা। ওয়াসিম আকরাম ল্যাঙ্কাশায়ারে জীবন্ত কিংবদন্তী, ওদের হয়ে ১০ বছর দুর্দান্ত সার্ভিস দিয়েছে বলে। নাম হয়ে গিয়েছিল ‘কিং’। তার সেই সময়ের সতীর্থরা অনেকে এখনও ‘কিং’ বলেই ডাকে তাকে। ওয়াকার ইউনিসকে নিয়ে সারেতে অনেক রূপকথা চালু হয়ে গিয়েছিল। কাউন্টি মাতিয়ে বিদেশী ক্রিকেটারদের সম্মান পাওয়ার একরম উদাহরণ যুগে যুগে আরও অনেক অনেক।

আইপিএল থেকে ফেরার পর থেকেই যখন টানাপোড়েন, খুব করে চাইছিলাম মুস্তাফিজ এবারই যাক ইংল্যান্ডে। অবশ্যই চোট নিয়ে নয়। ফ্যাটিগ নিয়ে বা মনে কোনো অস্বস্তি, খারাপ লাগা নিয়ে নয়। পুরোপুরি ফিট হতে, মানসিক ক্লান্তি-শ্রান্তিটা দূর করতে সময় নেওয়ার সিদ্ধান্তটাও সঠিকই ছিল। তাছাড়া এবারই শেষ নয়, কেবল তো শুরু। কাউন্টি খেলার সুযোগ সামনে আরও অনেকবার আসবে। তবু চাইছিলাম, অন্তত মাসখানেকের জন্য হলেও এবার ইংল্যান্ডে খেলে আসুক। কারণ আইপিএল!

প্রথমবার দেশের বাইরে লিগে খেলেছে এসেছে মুস্তাফিজ আইপিএলে। চেয়েছিলাম, সেই অভিজ্ঞতাটা তরতাজা থাকতেই সে ইংল্যান্ডে খেলে আসুক। দেখে আসুক, দেশের বাইরে লিগে খেলা মানেই বিনোদনের জোয়ার আর সার্কাস নয়। ক্রিকেট মানে আরও গভীর কিছু। বেশির ভাগ সময় ক্রিকেটের শিক্ষা কাজে লাগে জীবনে, জীবনের শিক্ষা ক্রিকেট মাঠে। সত্যিকারের ক্রিকেট সবসময়ই স্পর্শ করে জীবনের সীমানা। সেই গভীর বোধের শিক্ষাগুলো মুস্তাফিজ পাবে ইংল্যান্ডে গিয়ে। কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশীপে খেলতে পারলে আরও ভালো হতো অবশ্যই। তবে ক্যারিয়ারের অঙ্কুরে অন্তত কাউন্টি দলে খেলার সুযোগও কম নয়।

কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশীপেও খেলার সুযোগ আসবে। হয়ত সামনের মৌসুমেই। কিংবা আরেকটু পরে। টি-টোয়ন্টি লিগগুলো তো তাকে পাওয়ার জন্য টোপ ফেলে আছেই। মুস্তাফিজ অল্পেকটু মুখ খুললেই গিলিয়ে দেবে। এটা সময়ের বাস্তবতা, মানতেই হবে। মুস্তাফিজের নিজেকে, তার অভিভাবক, পরামর্শকদের তাই ঠিক করতে হবে তাকে কোনটা খেলানো হবে, কোনটা নয়। আইপিএলে যেমন, সামনের মৌসুমে হয়ত চোখধাঁধানো কোনো অঙ্ক তাঁর অপেক্ষায়। আইপিএলকে উপেক্ষা করা কঠিন। কিন্তু অন্য গুলোর মধ্যে যেন কাউন্টিকে সামনে বেছে নেওয়া হয়। টাকার অঙ্কে টি-টোয়েন্টি লিগগুলোর চেয়ে কম হবে অবশ্যই, তবে শেখা আর অভিজ্ঞতার অঙ্কে কাউন্টির পাল্লা থাকবে অনেক ভারী।

মুস্তাফিজের ইংল্যান্ড যাত্রায় তাই সবচেয়ে বড় চাওয়া, সে এই ব্যাপারগুলো উপলব্ধি করে আসুক। ইংলিশ ক্রিকেটের প্রেমে পড়ে আসুক। যেন সে নিজেই প্রতিজ্ঞা করে যে জাতীয় দলের খেলা না থাকলে সামনের মৌসুমে আর সবকিছু বাদ দিয়ে হলেও কাউন্টি খেলবে!

দু সপ্তাহে মুস্তাফিজ কিছুটা শিখে আসুক। অনেক জেনে আসুক। বিশদ বুঝে আসুক। শুভ কামনা, ওয়ান্ডার বয়!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

8 + 15 =