লোথার ম্যাথাউস : একজন সম্পূর্ণ মিডফিল্ডার

লোথার ম্যাথাউস : একজন সম্পূর্ণ মিডফিল্ডার
আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা। মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিল- পশ্চিম জার্মানি প্রীতি ম্যাচ। লাখো দর্শকের সামনে জুপ ডারোয়াল এর অধীনে অভিষেক হয় এক তরুণ জার্মান মিডফিল্ডারের। এর তিন দিন পর সেই তরুণ একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেন আর্জেন্টিনার সাথে। আর্জেন্টিনা দলে তখন এক কালজয়ী প্রতিভার আগমন বার্তা শোনা যাচ্ছে। নিয়তি এই তরুণ জার্মান ও আর্জেন্টাইন অমিত প্রতিভাকে মুখোমুখি করেছিল অনেক বার। এর মধ্যে বিশ্বকাপ ফাইনালেই দেখা হয়েছে দুইবার। দুইবারের বিজয়ী ছিলেন দুইজন। আরেক আর্জেন্টাইন অতিমানবের ফিফা বর্ষসেরা খেতাবের সংখ্যা হাতের এক আংগুলের কড়ায় গুণেও শেষ হয় না। আচ্ছা, এই ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাবটা প্রথম কার ঘরে গিয়েছিল, আমরা জানি কি?
উত্তর: যাকে নিয়ে এই লিখা, তার কাছে!
তিনি লোথার হারবার্ট ম্যাথাউস।
 
আজকের এই দিনে ১৯৫৫ সালে পশ্চিম জার্মানির ব্যাভারিয়াতে লোথার ম্যাথাউস এর জন্ম। পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরুটা হয় বরুশিয়া মনশেনগ্ল্যাডবাখের হয়ে। সেখানে তিন বছর কাটিয়ে যোগ দেন জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখে। এই মিউনিখেই প্রথম দফায় দুইবার বুন্দেসলীগা জিতেছিলেন তিনি। একবার ইউরোপিয়ান কাপও জেতা হয়ে যেত, যদি না ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও তার দল শেষ মুহূর্তে পোর্তোর কাছে দুই গোল না খেত। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে আবার তিনি বায়ার্নে ফিরে এসেছিলেন লোথার ম্যাথাউস। সেসময় তিনবার বুন্দেসলিগা ও একবার ইউয়েফা কাপ জিতেন তিনি। তবে ইউরোপিয়ান কাপ ( বর্তমান ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ) এ আবারো দুর্ভাগ্যের শিকার হন তিনি। ১৯৯৯ সালে ন্যু ক্যাম্পে আবারো পুনরাবৃত্তি ঘটে সেই ইঞ্জুরি টাইমের দুর্ভাগ্যের, জয়ী দলের নাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। বায়ার্ন মিউনিখের শেষ দফার পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এম এল এস এ যোগ দেন মেট্রো স্টার্স দলে। সেখানেই ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে লোথার ম্যাথাউস এর।
 
কিন্তু লোথার ম্যাথাউস এসবের কোনটির কথাই তেমন বলেন না সাক্ষাতকারগুলোয়। সেখানে বার বার ফিরে আসে ইন্টার মিলান আর পশ্চিম জার্মানী জাতীয় দলের কথা। বায়ার্ন এর দুই দফা এর মাঝে তিনি যোগ দিয়েছিলেন সিরি আ এর ইন্টার মিলানে। জার্মান দলের সতীর্থ আন্দ্রেস ব্রেহম ও ইউর্গেন ক্লিন্সম্যানকে নিয়ে গড়ে তুলেন এক বিধ্বংসী ত্রয়ী। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানে তখন জার্মানির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হল্যান্ড এর ত্রয়ী মার্কো ভ্যান বাস্তেন-রুড গুলিট-ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড এর জয়জয়কার। আবার আরেক দল ন্যাপলি কে প্রায় একাই টেনে তুলে ধরেছেন লেখার শুরুতে উল্লেখ করা সেই আর্জেন্টাইন জাদুকর ডিয়েগো ম্যারাডোনা। এই ন্যাপোলি এর সাথে লীগের শেষ ম্যাচ এ ফ্রি কিকে গোল করে ইন্টারকে লিগ জিতিয়েছিলেন লোথার ম্যাথাউস। সেই ইন্টারের হোম গ্রাউন্ড সানসিরোতেই ১৯৯০ এর বিশ্বকাপে জার্মানির ম্যাচ গুলোয় অধিনায়কত্ব করেন তিনি। এই বিশ্বকাপে লোথার ম্যাথাউস, জার্মান নিখুঁততা এবং ইটালিয়ান বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে হয়ে উঠেন এক সম্পূর্ণ মিডফিল্ডার। দূরপাল্লার শট, বক্স টু বক্স রান, গতিময় ড্রিবলিং, দুর্ধর্ষ ট্যাকলিং, ডিফেন্স চেরা পাস আর থ্রু – লোথার ম্যাথাউস কে বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল দিতে তাই দুইবার ভাবতে হয় নি কাউকে। চার গোল করে জার্মানিকে ফাইনালে তুলেন তিনি।
লোথার ম্যাথাউস : একজন সম্পূর্ণ মিডফিল্ডার
ইন্টারের দিনগুলি
 
ফাইনালে তার দেখা হয়ে যায় ডিয়েগো ম্যারাডোনার সাথে। সেই ম্যারাডোনা, যাকে আটকানোর দায়িত্ব ১৯৮৬ এর ফাইনালে পেয়েছিলেন তিনি। তবে এবার তাকে তা করতে হবে না, এই কাজ করবেন গুইদো বুচোয়াল্ড। আক্রমণ এর স্বাধীনতা পেয়ে লোথার ম্যাথাউস এর খেলা আরো খোলতাই হয়, তার থ্রু বল থেকেই রুডি ফোলারের ফাউল হওয়া এবং সেই ফাউলের বিনিময়ে পাওয়া পেনাল্টি থেকেই আসে জার্মানির তৃতীয় বিশ্বকাপ। ক্যারিয়ার শেষে কোচিং এর দিকে ঝুঁকে পড়েন লোথার ম্যাথাউস। তবে সাফল্য তাকে ধরা দেয়নি তেমন। র‍্যাপিড উইয়েন, পার্টিজান বেলগ্রেড, রেড বুল সালজবুর্গ, হাংগেরি ও বুলগেরিয়া জাতীয় দল, কোথাও ও তিনি তার নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেন নি। তবে এতে তার মাহাত্ম্য কমে না। যেখানে ডিয়েগো ম্যারাডোনা তার আত্মজীবনীতেই লিখেছেন, লোথার ম্যাথাউস তার বিপক্ষে খেলা সেরা খেলোয়াড়, এবং এই সর্বোচ্চ সম্মানই তিনি তাকে দিতে পারেন – সেখানে হতাশ করা কোচিং ক্যারিয়ার বা অস্থির পারিবারিক জীবন, কোন কিছুই তার সাফল্যের, তার দক্ষতার গায়ে আচড় কাটতে পারে না। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড এখনো এই লোথার ম্যাথাউস এরই (২২ টি)। সমসাময়িকদের থেকে গতি, স্কিল, টেকনিকে অনেক এগিয়ে থাকা এই জার্মান মিডফিল্ডারের জন্মদিনে থাকল অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five + sixteen =