লেস্টারের ইঞ্জিনরুম : এনগোলো কান্তে

ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, আর্সেনাল, চেলসি, টটেনহ্যাম হটস্পারের মত দলকে টেক্কা দিয়ে এবারের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপাজয়ী হতে পারে লেস্টার সিটি – যারা মোটামুটি প্রিমিয়ার লিগ অনুসরণ করেন তাঁদের কাছে অবিদিত নয় কথাটি। মাত্র দুই মৌসুম আগেও চ্যাম্পিয়নশিপ খেলা, এক মৌসুম আগে রেলিগেশানের সাথে লড়াই করা দলটা আজ ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ ক্লাব হবার লড়াইয়ে সমানতালে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে উক্ত ক্লাবগুলোর সাথে – রূপকথার চেয়ে কোন অংশে কম নয় এই কাহিনী।
hi-res-250f590575f4862d75faffc3e4e4a49a_original

প্রত্যেক রূপকথার গল্পেই এক বা একাধিক নায়ক চরিত্র থাকে, তা এই কাহিনীতেও থাকবে না কেন? সমস্যা হচ্ছে, লেস্টারের এই উত্থানের জন্য সবাই মূলতঃ ধন্য ধন্য করছেন এই মৌসুমে টানা এগারো ম্যাচে গোল করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তী স্ট্রাইকার রুড ভ্যান নিস্টলরয়ের রেকর্ড ভেঙ্গে দেওয়া ইংলিশ স্ট্রাইকার জেইমি ভার্ডিকে, কিংবা পুরো মৌসুম ধরে মেসি-রোনালদোসুলভ ঝলক দেখিয়ে যাওয়া অ্যাসিস্ট-মাস্টার আলজেরিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রিয়াদ মাহরেজকে।

hi-res-db6a11949223589c60415b51fb716832_crop_north
ভার্ডি-মাহরেজের কৃতিত্ব ত আছে অবশ্যই, তাই বলে একাদশের অন্যান্য খেলোয়াড়দেরও যদি যোগ্য প্রশংসা না করা হয় জিনিসটা একপ্রকার অন্যায্যই হয়। গোলরক্ষক ক্যাসপার শ্মাইকেল থেকে শুরু করে সাবেক চেলসি-ফ্লপ ডিফেন্ডার রবার্ট হাথ, কিংবা অধিনায়ক ওয়েস মরগান থেকে শুরু করে মিডফিল্ডার ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটার – কৃতিত্বের দাবিদার সকলেই।

 

একজনের কথা না বললেই নয়। বলা যেতে পারে তাঁর কথা না বললে, তিনি না থাকলে ভার্ডি-মাহরেজের দুর্ধর্ষ কাউন্টার অ্যাটাকগুলোও হত না, দুইজনের মুড়িমুড়কির মত গোল দেওয়ার হত না। হত কিভাবে, পুরো দলটাকেই ত মোটামুটি চালাচ্ছেন তিনি সেন্টার মিডফিল্ডে বসে থেকে!

 

তিনি এনগোলো কান্তে। জাতীয়তা ফরাসী। এমনিতেই ফুটবলে স্ট্রাইকার-অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারদের কাছে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের অতটা পাত্তা বা দাম থাকেনা গড়পড়তা ফুটবলমোদীদের কাছে, তাঁর উপর রাফ অ্যান্ড টাফ ট্যাকলিং-ইন্টারসেপশানে আগ্রহী গোল করায় অনীহাগ্রস্থ ডেস্ট্রয়্যার সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হলে ত কথাই নেই। শুধুমাত্র সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের দোষ দিয়ে কি লাভ? রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের কথাই চিন্তা করুন, প্রথম গ্যালাকটিকো বানানোর সময় বিশ্বের তাবৎ সুপারস্টার পরিচিত ফুটবলারদের নিয়ে এসেছিলেন এক বার্নাব্যুর ছাদের তলায়। পজিশন-টজিশন ফর্মেশানের বালাই নাই, সেইসময় যেসব ফুটবলারদের নাম সবার মুখে মুখে ঘুরত, চোখ বন্ধ করে তাঁদের নিয়ে এসেছিলেন তিনি রিয়াল মাদ্রিদে, ফলে এমনও হয়েছে, রাইট মিডফিল্ড পজিশানে তখন বিশ্বের সেরা দুই খেলোয়াড় লুইস ফিগো আর ডেভিড বেকহ্যাম চলে এসেছেন রিয়ালে, এখন প্রায় একজনকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য অন্যকে অন্য উইংয়ে খেলতে হত। আরও হাস্যকর বস্তু হচ্ছে, এই বেকহ্যামকে আনার জন্য আবার পেরেজ বিক্রি করে দিয়েছিলেন ফ্রান্সের প্রবাদপ্রতিম সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ক্লদ ম্যাকেলেলে কে। যা সম্বন্ধে মাদ্রিদের আরেক গ্যালাকটিকো জিনেদিন জিদানের উক্তি উল্লেখ না করলেই নয়, “নিজের বেন্টলি গাড়িতে আরেক পরত সোনার পেইন্ট (ডেভিড বেকহ্যাম) দেওয়ার দরকার কি যদি গাড়ির গোটা ইঞ্জিনটাই (ক্লদ ম্যাকেলেলে) না থাকে?” পরবর্তীতে রিয়াল মাদ্রিদ অচ্ছুৎ এই ম্যাকেলেলে চেলসিতে এসে কি করে গেছেন, সেটা বোধহয় নতুন করে বলার কিছু নেই।

 

যাই হোক, কি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কোথায় চলে গেলাম। আসলে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের কাজটাই এইরকম, থ্যাঙ্কলেস জব। কাজ করে যেতে হয় নীরবে-নিভৃতে। কাজ করলে কেউ বুঝবে না আপনার গুরুত্ব, কিন্তু কাজ না করলে ঠিকই বোঝা যাবে কোথাও একটা না একটা সুর কেটে গেছে। এই কারণেই আমাদের আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাদের কথা একটু বেশী মনে থাকে সার্জিও বুসকেটসদের থেকে, কিংবা রোবেন-শ্নাইডারদের কথা বেশী মনে থাকে মার্ক ভ্যান বোমেলদের থেকে, হুয়ান রিকেলমেদের কথা বেশী মনে থাকে ফার্নান্দো রেডোন্ডোদের থেকে, রোনালদিনহোদের কথা বেশী মনে থাকে জিলবার্তো সিলভাদের থেকে। এনগোলো কান্তে হচ্ছেন এই বোমেল-রেডোন্ডো-ম্যাকেলেলে প্রজাতিরই আপাতত সর্বশেষ সংযোজন।

 

অ্যাটাক করার শুরুটা কিন্তু হয় প্রতিপক্ষের পা থেকে ট্যাকলের সাহায্যে ইন্টারসেপশানের মাধ্যমে বল কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে, যে কাজটা লেস্টার সিটির হয়ে এই মৌসুমে নিরলসভাবে করে আসছেন কান্তে। প্রতি ম্যাচে গড়ে ৪.৪টা ট্যাকল ও ৪.২টা ইন্টারসেপশান তাঁর করা হয়ই, এইভাবেই লিগের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছুঁয়েছেন ১০০ ইন্টারসেপশান করার মাইলফলক। ইন্টারসেপট করে দ্রুত সামনের চ্যানেলে বা ফাঁকা জায়গায় দৌড়ে সামনে থাকা জেইমি ভার্ডি বা রিয়াদ মাহরেজকে বল পাঠিয়ে তিনি নিচে নেমে আসেন নিঃশব্দে। দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ওয়েস মরগান ও রবার্ট হাথের সামনে এনগোলো কান্তের এইরকম নিশ্ছিদ্র অবস্থান প্রতিপক্ষের ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডারদের মাঝখান দিয়ে আক্রমণ করার পথ বলতে গেলে একরকম বন্ধই করে দেয়। হাথ আর মরগান দুইজনই মোটামুটি পাহাড়সম ধীরগতির ডিফেন্ডার, ফলে হঠাৎ আসা প্রতিপক্ষের থ্রু বল বা ওয়ান-টাচ মুভমেন্টে তাঁদের খেই হারিয়ে ফেলাটা স্বাভাবিক। কিন্তু পুরো নব্বইটা মিনিট ধরে নিরলসভাবে একই গতিতে দৌড়ে যাওয়া তাঁদের সামনে থাকা এনগোলো কান্তে সেটা হতে দিচ্ছেন কই? কান্তেকে দেখে কে বলবে লেস্টার সিটির ডিফেন্সিভ ইউনিট অনেক ধীরগতির?
3231AEEB00000578-0-image-a-5_1458220123724

পুরো মৌসুম লেস্টারের ম্যাচজয়ের মন্ত্র মোটামুটি একইরকম আছে বলা চলে। প্রথম প্রথম প্রতিপক্ষকে খেলতে দেয় লেস্টার, তাদেরকে আক্রমণ শানাতে দেয়, অপেক্ষা করে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার উপযুক্ত সময়টার জন্য। প্রতিপক্ষ প্রথমে তাই বল নিয়ে খেললেও ভালো আক্রমণ করতে পারে না লেস্টারের জমাটবদ্ধ ডিফেন্সের কারণে। পেছনে হাথ-মরগান আর তাঁদের সামনে কান্তে-ড্রিঙ্কওয়াটার। বল কেড়ে নেওয়ার সাথেই দুর্ধর্ষ কাউন্টার অ্যাটাক এবং ম্যাচশেষে তিন পয়েন্ট নিয়ে বাড়ি ফেরা। আর এই ইন্টারসেপশানের মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজটা যে কান্তে করছেন সেটা বলাই বাহুল্য। এই মন্ত্রে ফুটবল খেলার জন্য আপনার সামনে গোল দেওয়ার সুযোগ আসবে কিন্তু অনেক কম, কারণ অধিকাংশ সময়ে দেখা যাবে বল পজেশানে আপনি পিছিয়ে থাকবেন প্রতিপক্ষের চেয়ে, যেটা কিনা এখন লেস্টারের ক্ষেত্রে হয়েছে অনেক ম্যাচেই। যেহেতু আপনি সুযোগ পাচ্ছেন কম, সেই সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারটা নিশ্চিত করাটাই হতে হবে আপনার একমাত্র লক্ষ্য। কান্তের বানিয়ে দেওয়া যেসব সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে এখন লেস্টারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ভার্ডী ও মাহরেজ। শুধু ট্যাকল ইন্টারসেপ্টের বিষয়টার দিকেই গুরুত্ব দিলে কান্তের প্রতি অবিচার করা হবে। ৮২% পাস অ্যাক্যুইরেসি নিয়ে তিনি যে লেস্টার একাদশের সবচেয়ে বেশী সফল পাসদাতা!

Kante-Arsenal
কোচ ক্লদিও রানিয়েরির প্রথম সাইনিং এই কান্তে। ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির এই পকেট ডায়নামাইটের গায়ে যে এরকম অফুরন্ত শক্তি সে সম্বন্ধে রানিয়েরিও ঠিক জানতেন না, “আমি ওকে বলেছি, আমি সেইদিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন তুমি নিজে ক্রস করে দৌড়িয়ে এসে ঐ ক্রসেই হেড করে গোল দেবে!” এমনই প্রাণশক্তিতে ভরপুর কান্তে। যখন দলে আসলেন, ৪-৪-২ ফর্মেশানে খেলার জন্য মিডফিল্ডারের অভাব ছিলনা দলে। অ্যান্ডি কিং, ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটার, মার্ক অলব্রাইটন, ম্যাটি জেইমস, ছিলেন নাপোলি থেকে আসা অভিজ্ঞ সুইস সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার গোখান ইনলারও। ফলে প্রথম তিন ম্যাচ খেলা কান্তেকে যখন লিগ কাপের এক ম্যাচে বিউরির বিরুদ্ধে নামানো হল, তিনি খেললেন ওয়াইড মিডফিল্ডার হিসেবে, পরে আর্সেনালের কাছে লিগে ৫-২ গোলে বিধ্বস্ত হবার পর বোধোদয় হয় রানিয়েরির, কান্তে খেলা শুরু করেন প্রয় সেন্ট্রাল মিডফিল্ড পজিশানে। তারপরের কাহিনী ত এখন মোটামুটি সবারই জানা।

eebd7bdd73575208bbb4daeedaf6fea9_crop_exact
একটা তথ্য দিয়ে শেষ করতে চাই, স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের মতে এই মৌসুমের সেরা মিডফিল্ডার এনগোলো কান্তে, জেইমি ক্যারাঘারের মতে মৌসুমের সেরা ট্রান্সফার। এরপর আর কিছু বলা যায় না, যায় কি?

কমেন্টস

কমেন্টস

2 thoughts on “লেস্টারের ইঞ্জিনরুম : এনগোলো কান্তে

মন্তব্য করুন

two × two =