লুকাস তোরেইরা : আধুনিক এক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এল আর্সেনালে

লুকাস তোরেইরা : আধুনিক এক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এল আর্সেনালে

ফুটবল পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আগে কোন একটা নির্দিষ্ট পজিশনের খেলোয়াড়ের ভূমিকা যা ছিল, এখন যে তাই আছে, জিনিসটা কিন্তু তা না। সবাইকে একাধিক প্রতিভার অধিকারী হতে হয়, একাধিকভাবে কার্যকরী হতে হয়। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকার কথাই ধরুণ, আগের যুগে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের একমাত্র কাজ ছিল কোনও না কোনভাবে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া, ট্যাকল বা ইন্টারসেপশনের মাধ্যমে। রয় কিন, জেনারো গাত্তুসো, জিলবার্তো সিলভা, এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো, ক্লদ ম্যাকেলেলে – সবাই মিডফিল্ডে খেললেও সবসময় রক্ষণের দিকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের দেখাদেখি উঠে এসেছেন স্যামি খেদিরা, জাভি মার্টিনেজ, এনগোলো কান্তে, ক্যাসেমিরোদের মত তারকারা। এদের প্রত্যেকেরই খেলার স্টাইল, “আগে রক্ষণ, পরে অন্যকিছু”। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের ভূমিকাটাও পরিবর্তিত হচ্ছে আস্তে আস্তে। সবাই ট্যাকল বা লড়াই করে ইন্টারসেপ্ট করার পাশাপাশি ঠিকঠাক পাস দিয়ে কিভাবে রক্ষণ থেকেই আক্রমণের কাজটা গড়ে দেওয়া যায় সে বিষয়েও আস্তে আস্তে দক্ষ হবার চেষ্টা করছেন। এই ‘হাইব্রিড’ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের গুরু বলা যেতে পারে স্পেন ও বার্সেলোনার কিংবদন্তী ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সার্জিও বুসকেটসকে। এই বুসকেটসের দেখাদেখি বেশ কয়েকজন আধুনিক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার উঠে এসেছেন, আসছেন। যেমন চেলসির জর্জিনহো, প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের মার্কো ভেরাত্তি, আয়াক্সের ফ্রেঙ্কি ডে ইয়ং, বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের জুলিয়ান ভাইগেল প্রমুখ। এসব মিডফিল্ডারদের খেলার স্টাইল হল – রক্ষণ করব ঠিকই, কিন্তু সেটা গায়ের জোরে নয়, বরং নিজের বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটিয়ে দুই সেন্টারব্যাকের মধ্যে থেকে পেছন থেকেই প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করব সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থেকে বল কেড়ে নিয়ে। অর্থাৎ দিন যতই যাচ্ছে, আধুনিক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের গায়ে গতরে জোর থাকার পাশাপাশি নিজেদের পাসিং গেইমটার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হচ্ছে। শুধু গায়ের জোরে বা কঠিন একটা ট্যাকল করে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিলেই হবে না, বরং নিজেকেই আক্রমণের সূচনা করতে হবে নিখুঁত পাস প্রদানের মাধ্যমে। এরকম এক আধুনিক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে দলে আনার মাধ্যমেই আর্সেনালে নিজের যুগ শুরু করতে যাচ্ছেন স্প্যানিশ কোচ উনাই এমেরি। তাঁর নাম লুকাস তোরেইরা। মাত্র ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির, গায়ে গতরে খাটো এই উরুগুইয়ান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারই হতে যাচ্ছেন আর্সেনাল মিডফিল্ডের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

শেষ কবে আর্সেনালকে একজন প্রথাগত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার খেলাতে দেখেছেন? ২০০২ বিশ্বকাপের পর সেই যে জিলবার্তো সিলভা এলেন ব্রাজিল থেকে, তারপর সেরকম কোন আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কেনেনি আর্সেনাল, সবসময় অন্যান্য ভূমিকার সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের দিয়ে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজ করাতে চেয়েছে। যেসব মিডফিল্ডারের রক্ষণকাজ ভুলে আক্রমণে উঠে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে সব সময়, তাদেরকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে জোর করে খেলিয়েছেন আর্সেন ওয়েঙ্গার। যে কারণে এই কয়েক বছরে ভুগেছে গ্রানিত শাকা, অ্যারন র‍্যামসে, জ্যাক উইলশেয়ার, ডেনিলসনের মত খেলোয়াড়েরা। আবার অন্য ভূমিকার বেশ কিছু খেলোয়াড় আছে যাদেরকে কোনরকমে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে কিভাবে খেলতে হয় তা আর্সেন ওয়েঙ্গার শিখিয়ে দিলেও আর্সেনাল সেই ফল বেশীদিন ভোগ করতে পারেনি, অন্যান্য ক্লাব এসে তাদেরকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে, যেমন – অ্যালেক্সান্ডার সং, সেস ফ্যাব্রিগাস, ম্যাথিউ ফ্লামিনি – প্রমুখ। বছর দুয়েক আগে মোহামেদ এলনেনিকে আনা হলেও প্রত্যাশামাফিক খেলতে পারেননি তিনি। তাই বলা যেতে পারে সেই জিলবার্তো সিলভার পর আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের দেখা পায়নি আর্সেনাল। এই সমস্যাটা আর্সেনালে এসেই বুঝেছেন নতুন কোচ উনাই এমেরি। বুঝেছিলেন, অ্যারন র‍্যামসি ও গ্রানিত শাকা দের তাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে দেওয়ার জন্য দলে একটা আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার থাকতেই হবে। আর এ কারণেই সাম্পদোরিয়া থেকে লুকাস তোরেইরা কে নিয়ে আসা।

লুকাস তোরেইরা : আধুনিক এক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এল আর্সেনালে

ইতালিয়ান সিরি আ যারা মোটামুটি অনুসরণ করেন তারা জানেন গত দুই মৌসুমে লুকাস তোরেইরা কে বলা হচ্ছে সিরি আ এর অন্যতম সেরা প্রতিভা। “নতুন মার্কো ভেরাত্তি” নামে পরিচিত এই তোরেইরা এককালে ভেরাত্তির মত পেসকারাতেও খেলেছেন। গত মৌসুমে সাম্পদোরিয়ার অপ্রত্যাশিত উত্থানের পেছনে তোরেইরা এর ভূমিকা ছিল অনেক বেশী। কোচ মার্কো জিয়ামপাওলোর অধীনে সাম্পদোরিয়া খেলত অনেকটা ডায়মন্ড ৪-৪-২ বা ৪-১-৩-২ ফর্মেশনে, আর ডিফেন্সের একটু সামনে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন তোরেইরা, যেখানে তাঁর কাজ ছিল পুরো ডিফেন্সকে আগলে রাখা, হুট করে আক্রমণ করতে গিয়ে দলের রক্ষণ যেন উন্মুক্ত না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখা। স্ট্রাইকার ও পরে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা শুরু করে পরে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে চলে আসা তোরেইরা পাস দিতে বেশ পটু, এবং সেইটা ঐ ক্যারিয়ারের শুরুতে আক্রমণভাগে খেলার জন্যই। ছোটখাট, গাট্টাগোট্টা তোরেইরা লড়াই করে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিতে বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠাবোধ করেননা। এই বিশ্বকাপেই সেটা দেখা গেছে, দ্বিতীয় রাউন্ডে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পিছে যন্ত্রের মত ছুটে গেছেন এই তোরেইরা, তাঁকে শান্তিমত খেলতেই দেননি। আর্সেনালকে খুব সম্ভবত ৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলাতে চলেছেন উনাই এমেরি, আর তাই যদি হয়, সেক্ষেত্রে তিন মিডফিল্ডারের একদম মাঝের জায়গাটাতেই থাকবেন তোরেইরা। অনেকটা দুই সেন্টারব্যাকের মধ্যে তৃতীয় সেন্টারব্যাক হিসেবে। গত কয়েক মৌসুম ধরেই আর্সেনালের মূল সমস্যা এটাই ছিল। কেউ আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার না হবার কারণেই এই ভূমিকায় যাকেই খেলতে দেওয়া হত তারা রক্ষণকাজ ভুলে উপরে চলে যেতেন, ফলে আর্সেনালের মিডফিল্ডে চিচিং ফাঁক অবস্থার সৃষ্টি হত, প্রতিপক্ষ আলোর বেগে কাউন্টার করতে পারত, আর সেই কাউন্টার আক্রমণ ঠেকানোর মত গতি ও ট্যাকটিকাল বিদগ্ধতা আর্সেনালের সেন্টারব্যাকদের ছিলনা। এখন থেকে এই সমস্যাটা আর হবার কথা না আর্সেনালের।

তোরেইরার অবস্থান

এ ছাড়াও তোরেইরার নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষমতার কারণে উপকার পাবেন মূলত তিনজন – হেক্টর বেয়েরিন, গ্রানিত শাকা ও সিদ কোলাসিনাচ। তোরেইরা পেছনে রক্ষণের কাজ করা মানে শাকাকে আর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডের কাজ করতে হবেনা, সামনে গিয়ে যখন তখন নিশ্চিন্তে আক্রমণে যোগ দিতে পারবেন, পেছন থেকে নিখুঁত পাস দিতে পারবেন তোরেইরা। আর তূলনামূলক আক্রমণাত্মক ফুলব্যাকদ্বয় বেয়েরিন ও কোলাসিনাচকেও লম্বা লম্বা পাস দিয়ে আক্রমণে যেতে সাহায্য করবেন তোরেইরা। পেছন থেকে আর্সেনালের নিশ্ছিদ্র হবার সুবধা নিতে পারেন দুই স্ট্রাইকার অ্যালেক্সান্দ্রে ল্যাকাজেটে ও পিয়েরে-এমেরিক অবামেয়াং। তারাও তখন প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগে প্রেস করে খেলতে পারবেন, যেরকম পারেন লুইস সুয়ারেজ ও এডিনসন কাভানি – উরুগুয়ের হয়ে।

২৩ বছরের তোরেইরার সামনে এখন বিশাল সুযোগ, নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে গড়ে তোলার। আর উনাই এমেরির অধীনে খেললে সেরা না হলেও অন্তত সেরাদের একজন তো হতেই পারবেন তিনি।

আরও পড়ুন –

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

sixteen − ten =