লুইস সুয়ারেজ – এক বার্সা কিংবদন্তীর বিদায়

৬ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে বার্সেলোনা থেকে এথলেটিকো মাদ্রিদে যোগ দিয়েছেন উরুগুইয়ান স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ। এর মধ্যে দিয়ে ইতি ঘটলো বার্সেলোনার সাথে সুয়ারেজের ৬ বছরে সম্পর্কের।

২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালির বিপক্ষে ম্যাচে ডিফেন্ডার জিওর্জিও চিয়েলিনি কে কামড় দেয়ার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর লুইস সুয়ারেজকে ৪ মাসের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করে ফিফা। নিষেধাজ্ঞার পরেও ইংলিশ ক্লাব লিভারপুল থেকে ৭৫ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে সুয়ারেজ কে কিনে নেয় বার্সেলোনা। নিষেধাজ্ঞার জন্য মৌসুমের শুরুতে স্কোয়াডের বাইরে থাকতে হয় তাকে। তবে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে চিরচেনা রূপেই ফিরে আসেন সুয়ারেজ। এল ক্লাসিকো তে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে প্রথমবারের মতন মাঠে নামেন বার্সার জার্সি গায়ে।

বাকিটা যেন রূপকথার অংশ। মেসি এবং নেইমারের সাথে মিলে গড়ে তোলেন সময়ের সেরা ত্রয়ী। “এমএসএন ট্রায়ো”। গোলের পর গোল করে নিজেদের অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে যান এই তিনজন। ২০১৭ সালে নেইমার বার্সা ছেড়ে ফ্রেঞ্চ ক্লাব পিএসজিতে যোগ দিলে ভেঙে যায় এই এটাকিং ট্রায়ো। তার আগ পর্যন্ত তিন বছরে এই ত্রয়ীর পা থেকে আসে ৩৬৩ গোল। একসাথে ১০৮ ম্যাচ খেলেছেন তারা। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গড়ে ৩.৩৬ গোল এসে তাদের পা থেকে। প্রথম মৌসুমে ১২২ গোল করে কোনো ত্রয়ীর পক্ষে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন তারা। ২০১১-১২ মৌসুমে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো,গ্যারেথ বেল এবং করিম বেঞ্জেমার গড়া এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ১১৮ গোলের রেকর্ড টপকে যান মেসি,সুয়ারেজ এবং নেইমার। পরের মৌসুমেই নিজেদের রেকর্ড ভেঙে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৩২ গোলের রেকর্ড গড়েন এই ত্রয়ী। তিন বছরে যথাক্রমে ৫৮,৪১ এবং ৫৪ গোল করে মেসি রেখেছেন প্রধান ভূমিকা। সুয়ারেজের পা থেকে আসে ২৫, ৫৯ এবং ৩৬ গোল। আর নেইমার তিন বছরে করেন যথাক্রমে ৩৯,৩১ এবং ২০ গোল। তিন বছরে একে অন্যকে ১৭৩ টি এসিস্টও করেন তারা।

৬ মৌসুমে বার্সার হয়ে ২৮৩ ম্যাচে গোল করেছেন ১৯৮ টি, এসিস্ট ৯৭ টি। মেসি (৬৩৪) এবং সিজারের (২৩২) পর ১৯৮ গোল নিয়ে বার্সার ইতিহাসে সুয়ারেজই এখন ৩য় সর্বোচ্চ গোলদাতা। পিছে ফেলে এসেছেন ১৯৪ এবং ১৮৪ গোল করা জোসেফ সামিতিয়ের এবং লাস্লো কুবালাকে। সুয়ারেজ বার্সার হয়ে জিতেছেন সর্বমোট ১৩ টি ট্রফি। চারটি লা লীগা, একটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, চারটি কোপা ডেল রে, একটি ক্লাব বিশ্বকাপ, একটি ইউরোপিয়ান সুপার কাপ এবং দুইটি স্প্যানিশ সুপার কাপ শিরোপা জেতেন তিনি। বার্সায় তার দ্বিতীয় মৌসুমে লা লীগায় ৪০ গোলসহ মোট ৫৯ গোল দিয়ে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শ্যু এওয়ার্ড জিতে নেন তিনি। পিএসজির বিপক্ষে ৬-১ গোলের প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক ম্যাচের প্রথম গোলটি এসেছিল সুয়ারেজের পা থেকে। ২০১৪-১৫ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে ৩-১ গোলে জয় পাওয়া ম্যাচে এক গোল করে বার্সাকে পঞ্চম চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফি জিততে সহায়তা করেন সুয়ারেজ।

বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ৮-২ গোলের পরাজয়ের ম্যাচেও গোল করেছেন সুয়ারেজ। তবে এই বিশাল পরাজয়ের পর পরিবর্তন আসে বার্সা ম্যানেজারের পদে। নতুন কোচ রোনাল্ড কোম্যান এসে জানিয়ে দেন তার পরিকল্পনায় নেই ৩৩ বছর বয়সী লুইস সুয়ারেজ। তাই ৬ বছরের অসংখ্য স্মৃতি পিছে ফেলে বার্সা ছেড়ে এথলেটিকো মাদ্রিদে যোগ দিচ্ছেন তিনি। স্প্যানিশ স্ট্রাইকার ডেভিড ভিয়ার পথই যেন অনুসরণ করলেন তিনি। বার্সা ছেড়ে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন এথলেটিকো মাদ্রিদে।

বার্সার হয়ে বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে তাই সতীর্থ এবং ভক্তদের ভালবাসা জানানোর পাশাপাশি অশ্রুসিক্ত সুয়ারেজ জানিয়ে গেলেন চিয়েলিনির সাথে ঘটনার পর সবাই যখন তাকে ছেড়ে গিয়েছে, কেউ পাশে ছিল না, সেইসময় তার উপর বিশ্বাস রেখেছিল ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা। ৬ মৌসুমে ১৯৮ গোল করা লুইস সুয়ারেজ তো কিংবদন্তী হিসেবেই ন্যু ক্যাম্প ছেড়ে যাচ্ছেন। এক কিংবদন্তীর বিদায় দেখলো স্প্যানিশ ক্লাবটি।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × three =