লিভারপুল ক্লাবের প্রতীক : স্টিভেন জেরার্ড

লিভারপুল ক্লাবের প্রতীক : স্টিভেন জেরার্ড

ক্লাব ফুটবল মানেই টাকা আর টাকা, আর এখনকার ক্লাব গুলোর প্লেয়ার বেচা-কেনার কথা নাইবা বল্লাম। বলতে গেলে রাতারাতি বদলে যায় গায়ের জার্সি, ড্রেসিং রুম, কিন্তু স্টিভেন জেরার্ড এমন একজন যিনি একটি ক্লাবে ২৫ বছর থেকেছেন। সত্যিই অবাক করার বিষয়।
.
ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা, হয়তো তার ক্লাবকে এতো বেশি ভালোবাসতেন তাই কখনও অন্য কোনো ক্লাবে পা বাড়াইনি। রোমার টট্রি, মিলানের মালদিনি, বার্সার জাভি, ইনিয়েস্তা, রিয়ালের ক্যাসিয়াস, এবং ম্যান ইউ’র গিগস।
হুম, আরোও অনেকেই আছেন। ক্লাব ফূটবলের প্রতি এ ভালোবাসার কোন ব্যাখ্যা নেই বল্লেই চলে

১৯৮০ সালের ৩০মে, ইংল্যান্ডের মার্সিসাইডের হুইস্টন শহরে জন্ম নেন স্টিভেন জর্জ জেরার্ড । হুইস্টন জুনিয়র ক্লাবের হয়ে ফুটবলের শুরু, সেখানেই লিভারপুলের ফুটবল স্কাউটরা তাকে প্রথম নোটিস করে । ৯ বছর বয়সে সে লিভারপুল একাডেমিতে যোগ দেয় ।
১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর লিভারপুলের হয়ে প্রথম খেলতে নেমেছিলেন স্টিভেন জর্জ জেরার্ড। মাত্র সতের বছর বয়সে। এরপর কত কিছু বদলে গেছে পৃথিবীতে, শুধু বদলায়নি জেরার্ডের অলরেড পরিচয়। ওই লাল জার্সতেই হয়েছেন বিশ্বসেরা ফুটবলারদের একজন। ১৯৯৯-২০০০ সিজনটিতে ক্যাপ্টেন হ্যারি রেডন্যাপের সাথে সেন্টার মিডফিল্ডে প্রায়ই সুজোগ দেওয়া হতো, এই সিজনে তিনি তার প্রথম গোল করেন এবং প্রথম লাল কার্ড পান। ২০০০-২০০১ সিজনে তিনি প্রায় ৫০টি ম্যাচের মূল একাদশে সুযোগ পান, ওই সিজনে ১০টি গোল করেন,এবং এফ এ কাপ, লীগ কাপ ও উয়েফা কাপ জিতেন।

এছাড়া চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ জিতেছেন দশটি শিরোপা। ২০০৩ সালের অক্টোবরে প্রথমবারের মত লিভারপুলের অধিনায়কত্ব পান। ২০০৪-০৫ সিজনে তিনি ইনজুরিতে পড়েন এবং নভেম্বরের শেষে চ্যাম্পিয়নস লীগের গ্রুপ ম্যাচে ‘অলিম্পিয়াকোস” এর বিপক্ষে ৫ মিনিটের জন্য মাঠে নেমেই উইনিং গোল করেন । যেটা তার ভাষায় তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা গোল । ২০০৫ সালে লীগ কাপের ফাইনালে চেলসির সাথে ২-২ সমতায় থাকা ম্যাচে তার আত্মঘাতী গোলে চেলসি ৩-২ এ কাপ জিতে যায়। ২০০৫ সালের চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল , এসি মিলানের সাথে জেরার্ডের শেষ মুহূর্তের গোলে ম্যাচ ৩-৩ এ সমতা । সেকেন্ড হাফে তার অসাধারণ পারফরমেন্সের কারণে ৩-০ তে পিছিয়ে থাকার পরও দল ৩-৩ এ ম্যাচ

ড্র করে পেনাল্টি শুটআউটে ৩-২ গোলে ২০ বছর পর লিভারপুল চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতে । জেরার্ড হন ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ এবং সে বছর তিনি ‘উয়েফা ক্লাব ফুটবলার অফ দ্যা ইয়ার’ ট্রফি জেতেন ।এর মধ্যে চেলসি উঠে পড়ে লাগে, তাকে সপ্তাহে ১ লাখ ইউরো প্রস্তাব দেয়া হয় । লিভারপুল সিইও রিক প্যারি প্রেসে ঘোষণা দেন তাদের পক্ষে জেরার্ডকে আর আটকে রাখা পসিবল না । পরের দিনই সবাইকে অবাক করে জেরার্ড ক্লাবের সাথে ৪ বছরের নতুন চুক্তি করে!

২০০৫-০৬ মৌসুমে ৫৩ ম্যাচে তিনি ২৩ গোল করেন । ইংলিশ লীগের সমস্ত খেলোয়াড়দের ভোটে প্রথমবারের মত ‘প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার’ হন । ২০০৬ এ ‘এফ এ কাপ’ ফাইনালে তার ২ গোলের সুবাদে লিভারপুল কাপ জেতে । সেই গোলে তিনি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এফ এ কাপ, লীগ কাপ, ইউয়েফা কাপ এবং চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনালে গোল করার কৃতিত্ব দেখান! ২০০৬-০৭ চ্যাম্পিয়ন লীগে চেলসিকে হারিয়ে তিন বছরের মধ্যে ২য় বার তারা ফাইনালে ওঠে যাতে মিলানের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়। ২৮ অক্টোবর,২০০৭ ও আর্সেনালের বিপক্ষে ক্লাবের হয়ে ৪০০তম ম্যাচটি তিনি খেলেন এবং গোলও করেন । সে বছর ভিন্ন ভিন্ন পরপর ৭টি ম্যাচে গোল করে তিনি লিভারপুলের জন অলড্রিচকে ছাড়িয়ে যান! ১৩ এপ্রিল ২০০৮ এ তিনি ইপিএল এ লিভারপুলের পক্ষে ৩০০তম ম্যাচটি খেলেন (এ ম্যাচেও তিনি গোল করেন এবং ৩-১ এ লিভারপুল জিতে যায় ) । সে বছর ২১ গোল করে তিনি সতীর্থ ফার্নান্দো তোরেসের সাথে ‘PFA Player of the Year’ নমিনেটেড হন।২০০৮-০৯ সিজনে তিনি গ্রোয়েন ইনজুরিতে পড়েন,পরে মাঠে ফিরেই লিভারপুলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন লীগের ম্যাচে তার ১০০তম গোলটি করেন । ১০ মার্চ ২০০৯ সালে ইউরোপিয়ান ক্লাবের বিপক্ষে তার ১০০ তম ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে তার ২ গোলে লিভারপুল ৪-০ তে সে ম্যাচ জেতে । ৪ দিন পর ওল্ড ট্রাফোর্ডে তার পেনাল্টিতে ম্যান ইউ’র বিপক্ষে ৪-১ এ লিভারপুল সে ম্যাচ জেতে। এ ম্যাচের পর জিদান তাকে ‘বেস্ট প্লেয়ার ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড’ বলে অবিহিত করেন! ২২ মার্চ ২০০৯ এ এ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে তিনি ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাট্টিক করেন। ১৩মে ২০০৯ সালে রায়ান গিগসকে ১০ ভোটে পেছনে ফেলে তিনি ফুটবল রাইটার্স এসোসিয়েশন এর দেয়া ‘ফুটবলার অফ দ্যা ইয়ার” খেতাব জেতেন । ১৯ বছরের মধ্যে প্রথম লিভারপুল খেলোয়াড় হিসেবে তার এ কৃতিত্ব । সে বছর ৫ ডিসেম্বর তিনি লিভারপুলের হয়ে তার ৫০০ তম ম্যাচ খেলেন । ২০০৯-১০ সিজনে ৪৬ ম্যাচে ১২
গোল ও ৯টি এ্যাসিস্ট করেন ।২০০৯-১০ সিজন শেষে ৬ বছর পর রাফায়েল বেনিতেজ লিভারপুল ছেড়ে যান । নতুন ম্যানেজার রয় হজসন এসেই জেরার্ডকে ‘নট ফর সোল্ড’ ট্যাগ লাগিয়ে দেন । ২০১২ সালে ম্যানচেষ্টার সিটির সাথে উভয় লেগে তার গোলে ৬ বছর পর লিভারপুল ফাইনালে ওঠে যেখানে কার্ডিফ সিটিকে হারিয়ে তারা কাপ জেতে । ২০১২ সালের ১৩ মার্চ এভারটনের বিপক্ষে ডার্বিতে তার ৪০০তম লীগ ম্যাচে ক্যারিয়ারের তৃতীয় হ্যাট্টিক করেন ।২০১২ সালের ১৮ আগষ্ট লিভারপুলের ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি তার ২৫০তম ম্যাচটি খেলেন । ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই তিনি পুনরায় নতুন চুক্তিতে সাইন করেন । ৩আগষ্ট ২০১৩ সালে তার চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের জন্য অলিম্পিয়াকোসের সাথে এক ম্যাচ এ্যানফিল্ডে অনুষ্ঠিত হয় । যেখানে জেমি ক্যারাগার,রবি ফাউলার এর মতো পুরোনোরা অংশ নেন । এ ম্যাচ থেকে ৫ লাখ ইউরো সংগৃহীত হয় । এ বছর ১৬ সেপ্টেম্বর ক্যাপ্টেন হিসেবে তার ৪০০তম ম্যাচটি খেলেন।
৫ অক্টোবর ক্রিস্টাল প্যালেসের সাথে ম্যাচে গোল করে প্রথম লিভারপুল খেলোয়াড় হিসেবে ১৫ মৌসুমে গোল করার কৃতিত্ব দেখান ।
১৯ অক্টোবর প্রিমিয়ার লীগে তার ১০০তম গোলটি করেন। লিভারপুলের জার্সিতে ৭০৯তম ম্যাচ। অ্যানফিল্ডের রাজা মাঠে এলেন তার তিন রাজকন্যাকে নিয়ে। রাজকন্যারা এতো ছোট যে, কারোরই বোঝার বয়স হয়নি, বাবার মনে কতখানি কষ্টের ঝড়ঝাপটা। রাজার রাজত্ব যে অবসান হোতে চললো। অ্যানফিল্ডে ক্যারিয়ারে শেষ ম্যাচের আগে-পারে দর্শক আর সতীর্থরা ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিককে যে রকম অভ্যর্থনা জানালেন, তা প্রত্যাশিতই ছিলো। তবে যেটা সবচে বেশি প্রত্যাশা করেছিলেন, সেই জয় নিয়ে অ্যানফিল্ড থেকে যেতে পারলেন না অলরেড গ্রেট।
তার সময়ে ইংল্যান্ডের অবিসংবাদিত সেরা ফুটবলার হোয়েও জিততে পারেননি কোন লিগ শিরোপা। অথচ চাইলেই হতো। ইউরোপের এমন কোনো বড় ক্লাব নেই, যারা এই মিডফিল্ডারকে দলে ভেড়াতে চায়নি। কিন্তু জেরার্ড শুধুই লিভারপুলের। লিভারপুলও জেরার্ডের। অর্থের চেয়েও একটা দলের প্রতীক হওয়া যে অনেক বড় কিছু, তা বুঝতেন তিনি। তাই অন্য যে কোন উঠতি ফুটবলারের কাছে দল অন্ত:প্রাণ হিসেবে যুগে যুগে ‘আইডল’ হয়ে থাকবেন স্টিভেন জেরার্ড।
.
কেউ কেউ বলেন, শুধু লিভারপুল ফুটবল ক্লাবটিই নয়, ওই শহরটারই সবচে বড় দূত স্টিভেন জেরার্ড। সতের বছর যে অ্যানফিল্ডে কাটালেন, সেই মাঠে বিদায়ী ম্যাচে সতীর্থরা তাকে জয় উপহার দিতে পারেননি তাঁকে। ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে লিভারপুল হেরেছে ৩-১ গোলে। একটা লিগ শিরোপা না জেতার দীর্ঘ কষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি অনন্ত দীর্ঘশ্বাস। তারপরও কারও প্রতি কোনো অনুযোগ-অভিযোগ নেই জেরার্ডের। এরকম মহৎ না হলে তিনি তো আর গ্রেট হতে পারতে না। জেরার্ডরা যুগে যুগে আসে না। লিভারপুল ভক্তরা সেটা জানেন। আর সেজন্যই তাদের কষ্টের মাত্রাটাও অনেক বেশি। বছরের পর বছর শিরোপাহীন একটা ক্লাবের জন্য অন্তহীন ভালবাসা তৈরি হয় একজন স্টিভেন জেরার্ডের জন্যই। সেই জায়গাটা কি আর কখনো পূরণ করতে পারবেন, আর কোনো অলরেড? সংশয় আছে।
. জেরার্ড সম্পর্কে কয়েকজন বিখ্যাত ফুটবলারদের মন্তব্যঃ
.
দশ বছর ধরে জেরার্ড আমার আদর্শ ছিল এবং সে বিশ্বের একজন সেরা খেলোয়াড়। বিশ্বের সকল মিডফিল্ড খেলোয়াডদের কাছে সে একজন আদর্শ।
………………(ডেনিয়েল ডি রসি)
.
আমি খুব সহজেই বলবো যে ফুটবল বোঝে এমন যাদের সাথে আমি কাজ করেছি জেরার্ডই তাদের সেরা।
……………….(ব্রেন্ডন রজার্স)
.
আমার কাছে, যে পজিশনে সে খেলে সেখানে বিশ্বের একজন সেরা খেলোয়াড় সে। সে যেভাবে দায়িত্ব নিয়ে খেলে আমার কাছে সে গ্রেটদের একজন।
………………..(রোনালদিনহো)
.
স্টিভেন জেরার্ড আমার বিশ্বসেরা দলের ক্যাপ্টেন।
………………….(ফ্রান্সিস্কো )
.
সে কি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়? মেসি এবং রোনালদোর কারনে সে হয়তো মনযোগ পায়না কিন্তু আমি মনে করি সে পারতো।
………………..(জিনেদিন জিদান)
.
আমি স্টিভেন জেরার্ডের একজন বড় ফ্যান। তার সিংহের মত বিশাল হৃদয় আছে, এবং আক্রমনের ক্ষমতা ও ডিফেন্স করার গুনে সে একজন পরিপূর্ণ আধুনিক ফুটবলার।
…………………(রিকার্ডো কাকা)
.
.
গোলসংখ্যা
আন্তর্জাতিক-১১৪ ম্যাচে ২১ গোল।
ক্লাব ম্যাচ-৫০৪ ম্যাচে ১২০ গোল ।
.
শেষকথাঃ লিভারপুল মানেই স্টিভেন জর্জ জেরার্ড, গ্রেটদের একজন। গ্রেটরা বার বার জন্মায় না। শতাব্দীতে একবার জন্মায়।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

six + one =