লিনগার্ড এর ফিরে আসা!

লিনগার্ড এর ফিরে আসা

হেসে লিনগার্ড নামটা শোনামাত্রই সাধারণ ফুটবল দর্শকের মাথায় যে ছবিটা ভেসে উঠবে তা হল পরিশ্রমী একজন উইঙ্গার, গোল করার চাইতে দলের হয়ে খেলাটা গড়ে দেওয়ার দিকেই যার মনোযোগ বেশী। ২০১১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে অভিষেক হলেও গত ছয় বছরে ইউনাইটেডের জার্সি গায়ে ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ৭০টার মত। কখনই মূল একাদশের খেলোয়াড় ছিলেন না, কিন্তু কালকে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে ওয়াটফোর্ডের সাথে যে খেলা খেললেন, মূল একাদশের একজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে মরিনহো অবশেষে তাঁর উপরে ভরসা করতেই পারেন!

২০১১ সালে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে অভিষেক হলেও বিভিন্ন সময়ে ধারে খেলেছেন ব্রাইটন, ডার্বি কাউন্টি, বার্মিংহ্যাম, লেস্টার সিটির মত ক্লাবের বিপক্ষে। সাত বছর বয়সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমিতে ভর্তি হওয়া এই খেলোয়াড় ইউনাইটেডের যুবদলের হয়ে ২০১১ সালের এফএ ইয়ুথ কাপ জিতেছেন, সেই মৌসুমের মূল দলের পদন্নতি ঘটে তাঁর। যেখানেই খেলেছেন, স্কোয়াডের সবচেয়ে প্রতিভাধর খেলোয়াড়, সবচেয়ে সুপারস্টার খেলোয়াড় না হলেও নিজের পরিশ্রম দিয়ে সেটা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সমসময়ে! মূল একাদশের খেলোয়াড় না হলেও ডেভিড ময়েস থেকে শুরু করে লুই ভ্যান হাল, এমনকি হোসে মরিনহো – যখনই কোন কোচ লিনগার্ড এর কাছে যেরকম খেলা চেয়েছেন, তাই-ই পেয়েছেন। আর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করাটাকে তো নিজের খেলার স্টাইলের অন্যতম একটা অংশ বানিয়ে নিয়েছেন এই লিনগার্ড। ২০১৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নস কাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিভারপুলের বিপক্ষে গোল, প্রিমিয়ার লিগে আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী চেলসির সাথে গোল, ২০১৬ সালের এফএ কাপ ফাইনালে ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে দলকে জয় এনে দেওয়া গোল, কমিউনিটি শিল্ডে লেস্টার সিটির বিপক্ষে গোল – গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কোচের নির্দেশনা অনুযায়ী লিনগার্ডের জ্বলে উঠার প্রমাণই বহন করে।

লিনগার্ডের খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ঠ্য বোধহয় এটাই – কোচের পছন্দের খেলোয়াড় তিনি, যদিও মূল একাদশের খেলোয়াড় নন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের আক্রমণভাগে লিনগার্ড এর চেয়ে হেনরিক মিখিতারিয়ান, অ্যান্থনি মার্সিয়াল, মার্কাস রাশফোর্ড, রোমেলু লুকাকু, জলাতান ইব্রাহিমোভিচ – এদেরকেই কোচেরা বেশী পছন্দ করেন। তবে কালকে ওয়াটফোর্ডের বিপক্ষে যেরকম খেললেন, তাঁর পরেও কি মাতা-মিখিতারিয়ানদের বদলে মরিনহো লিনগার্ড কে নিয়মিত খেলাবেন না?

কাল ওয়াটফোর্ডের বিপক্ষে তাদেরই মাঠে তাদেরকে ৪-২ গোলে হারিয়ে এসেছে মরিনহোর দল। দুটো গোল করেছেন অ্যাশলি ইয়াং, একটি করে গোল করেছেন অ্যান্থনি মার্সিয়াল ও হেসে লিনগার্ড। কিন্তু সব ছাপিয়ে কালকের ম্যাচে সবার আলোচনার বিষয় একটাই, সেটা হল লিনগার্ডের ফর্ম।

লিনগার্ড এর ফিরে আসা
লিনগার্ড এর ফিরে আসা

এ পর্যন্ত লিনগার্ডকে ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে আমরা সবাই উইঙ্গার হিসেবেই দেখে এসেছি মূলত। গত মৌসুমে চেলসির বিপক্ষে কোচ হোসে মরিনহোর আদেশ অনুযায়ী মার্কাস র‍্যাশফোর্ডের সাথে স্ট্রাইকার হিসেবেও খেলেছেন তিনি। তবে কালকে খেললেন একটু ভিন্ন পজিশানে। কাগজে কলমে কালকে ৩-৪-৩ ফর্মেশানে খেলা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের উইঙ্গার হিসেবে তাকে দেখানো হলেও ম্যাচ শুরু হবার সাথে সাথে দেখা গেল সামনে লুকাকু আর মার্সিয়ালকে রেখে লিনগার্ড তাঁদের পিছে নাম্বার ১০ বা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা শুরু করলেন, ফলে ফর্মেশানটা ৩-৪-৩ থেকে পরিবর্তিত হয়ে হয়ে গেল ৩-৪-১-২ এর মত। আর এই ভূমিকাতেই যেন উদ্ভাসিত হলেন লিনগার্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগে বাসেলের বিপক্ষে হারা ম্যাচে জঘন্য খেলার পর ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচে লিনগার্ডকে স্কোয়াডেই রাখেননি মরিনহো। কিন্তু অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হেনরিক মিখিতারিয়ানের অফ ফর্মের কারণে এই ওয়াটফোর্ডের সাথে আবার সুযোগ পান লিনগার্ড, নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। সেই সুযোগটাই যেন দু’হাত ভরে কাজে লাগালেন তিনি।

লুকাকু মার্সিয়ালের পেছনে নাম্বার টেন হিসেবে খেললেন তিনি। লুকাকু আর মার্সিয়াল দুজনই একটু দুইপাশে সরে গিয়ে লিনগার্ডকে জায়গা করে দিলেন সামনে আসার। লুকাকু আর মার্সিয়ালের ক্রমাগত মুভমেন্টের কারণে ওয়াটফোর্ডের দুজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার তাঁদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন, ফলে লিনগার্ডকে ম্যান-মার্ক করার জন্য সেরকম কেউ থাকলো না, লিনগার্ড খেলতে থাকলেন স্বাধীনভাবে। ওয়াটফোর্ডের খেলোয়াড়দের মাঝের ফাঁকা জায়গাগুলোতে খেলার কারণে পেছনে পগবাও বল দখলে রাখতে পারলেন সফলভাবে।

এর সুফল পেলেন লিনগার্ড মারাত্মকভাবে। একাই গোলের সুযোগ সৃষ্টি করলেন ৬টার মত। প্রিমিয়ার লিগের এক ম্যাচে এই মৌসুমে ইউনাইটেডের আর অন্য কোন খেলোয়াড় এত সুযোগ সৃষ্টি করেননি এক ম্যাচে। পুরো সন্ধ্যার পারফরম্যান্সকে আরও স্মরণীয় করে রাখলেন নিজে অসাধারণ একটা গোল করে। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে এসে চার-পাঁচটা ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যে গোলটা করলেন লিনগার্ড, চোখে লেগে থাকবে অনেকদিন!

ক্যারিয়ারের প্রথম কোন ম্যাচে একই সাথে গোল আর গোলসহায়তা করলেন লিনগার্ড। এখন মূল একাদশে নিয়মিত হবেন তো তিনি?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eighteen + thirteen =